Dawah wa Tablig Islamic Website

Site Contact = Mob no. 01783385346 :: Email Address = shalampb@gmail.com

3

Page- 3


অধ্যায়-১৫

ফিরিস্তাদের প্রতি আল্লাহ তা’আলার ওহী অবতরণের ভীতি
আল্লাহর বাণীঃ

﴿حَتَّى إِذَافُزِّعَ عَن قُلُوبِهِمْ قَلُوا مَاذَاقَالَ رَبُّكُمْ قَالُواالْحَقَّ وَهُوَالْعَلِيُّ الْكَبِيرُ﴾ (سبا:۳۲)

অর্থ- “যখন তাদের মন থেকে ভয়-ভীতি দূর হয়ে যাবে, তখন তারা পরষ্পরে বলবে, তোমাদের পালনকর্তা কি বলেছেন? তারা বলবে, তিনি সত্য বলেছেন এবং তিনি সবার উপরে মহান।” [সূরা সাবা:২৩] সহীহ বুখারীতে আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, মহানবী (সাঃ) বলেছেনঃ ‘যখন আল্লাহ তাআলা আকাশে কোন বিষয়ের ফয়সালা করেন, তখন তাঁর কথার সমর্থনে বিনয়াবনত হয়ে ফিরিস্তারা তাদের ডানাগুলো নাড়াতে থাকে। ডানা নাড়ানোর আওয়াজ যেন ঠিক পাথরের উপর শিকলের আওয়াজ। তাদের অবস্থা এভাবেই চলতে থাকে।’

﴿حَتَّى إِذَافُزِّعَ عَن قُلُوبِهِمْ قَلُوا مَاذَاقَالَ رَبُّكُمْ قَالُواالْحَقَّ وَهُوَالْعَلِيُّ الْكَبِيرُ﴾ (سبا:۳۲)

অর্থ- “যখন তাদের মন থেকে ভয়-ভীতি দূর হয়ে যাবে, তখন তারা পরষ্পরে বলবে, তোমাদের পালনকর্তা কি বলেছেন? তারা বলবে, তিনি সত্য বলেছেন এবং তিনি সবার উপরে মহান।” [সূরা সাবা:২৩] কথাটি একজন চুপিসারে শোনে তার থেকে আরেকজন চুপিসারে শোনে। এবার যে শোনে সে অপর জনের নিকট ওটি পৌছিয়ে দেয়। সুফইয়ান তার হাতের তালু দ্বারা এর ধরণ বর্ণনা করেন। এমনকি ওটি যাদুকর অথবা জ্যোতিষির নিকট চালান দেয়। হয়তো চালান দেয়ার আগেই তাকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ পেয়ে বসে, হয়তো বা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ তাকে ধরে ফেলার পূর্বেই শয়তান তাকে সে কথা বলে দেয় অতপর জ্যোতিষি শয়তানের পক্ষে থেকে শ্রবণকৃত কথার সাথে শতটি মিথ্যা বলে। তারপর বলা হয়, অমুক দিন কি অমুক অমুক কথা বলা হয়নি। তখন আকাশ থেকে শোনা কথাটি বিশ্বাস করা হয়। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৭০০) নাওয়াস বিন সামআন রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেছেন,

إِذَا قَضَى اللهُ اَلْاَمْرَ فِى السَّمَاءِ، ضَرَبَتِ الْمَلَاءِكَةُ بِأَجْنِحَتِهَا خُضْعَانًا لِقَوْلِهِ، كَأَنَّهُ سِلْسِلَةٌ عَلَى صَفْوَانٍ، يَنْفُذُهُمْ ذَٰلِكَ، ﴿حَتَّىٰۤ إِذَافُزِّعَ عَن قُلُوبِهِمْ قَلُوا مَاذَاقَالَ رَبُّكُمْ قَالُوا ٱلْحَقَّ وَهُوَٱلْعَلِيُّ الْكَبِيرُ﴾ (سَبَا:۳۲) فَيَسْمَعُهَا مُسْتَرِقُ السَّمْعِ، وَ مُسْتَرِقُ السَّمْعِ هَكَذَا بَعْضُهُ فَوْقَ بَعْضٍ- وَصَفَهُ سُفْيَانُ بِكَفِّهِ، فَحَرَّفَهَا وَبَدَّدَ بَيْنَ أَصَابِعِهِ، فَيَسْمَعُ الْكَلِمَةَ فَيُلْقِيهَا إِلَٰى مَنْ تَحْتَهُ، ثُمَّ يُلْقِيهَا الْاَٰخَرُ إِلَٰى مَنْ تَحْتَهُ، حَتَّى يُلْقِيهَا عَلَٰى لِسَانِ السَّاحِرِ أَوِ الْكَاهِنِ، فَرُبَّمَا أَدْرَكَهُ الشِّهَابُ قَبْلَ أَنْ يُّلْقِيهَا، وَرُبَّمَ أَلْقَاهَا قَبْلَ أَن يُّدْرِ كَهُ، فَيَكْذِبُ مَعَهَا مِائَةَ كَذْبَةٍ، فَيُقَالُ: أَلَيْسَ قَدْ قَالَ لَنَا يَوْمَ كَذَا وَكَذَا، كَذَا وَ كَذَا؟ فَيُصَدَّقُ بِتِلْكَ الْكَلِمَةِ الَّتِى سُمِعَتْ مِنَ السَّمَاءِ (صَحِيحُ الْبُخَارِي، التَّفْسِيْرِ، بَابُ قَوْلُهُ تَعَالَٰى حَتَّى إِذَا فُزِّعَ عَنْ قُلُوبِهِمْ، ح:٠٠٨٤)

“আল্লাহ তা’আলা কোন বিষয়ে ওহী করতে চাইলে, উহার বিষয়টি উচ্চারণ করেন। আকাশসমূহ কেঁপে উঠে অথবা আকাশে অবস্থিত সৃষ্টজীব ওটি শুনে মূর্ছা যায়। আল্লাহর ভয়ে বিকট আওয়াজ করে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সিজদায় পড়ে যায়। সর্ব প্রথম জিবরিল মাথা উপরে উঠান তখন আল্লাহ তার নিকট যা ইচ্ছা করেন ওহী করেন। জিবরাঈল এরপর ফিরিস্তাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করে। সে যখনই কোন আকাশ অতিক্রম করে তখনই ফিরিস্তারা তাঁকে প্রশ্ন করে, ‘হে জিবরাঈল, আমাদের রব কি বললেন? তখন সে বলে, তিনি সত্যই বলেছেন। তিনি উচ্চ মহান। তখন তারা সবাই জিবরাঈলের অনুরূপ কথা বলে। আর জিবরাঈল আল্লাহর নির্দেশিত স্থানে ওহীর কাজ সম্পন্ন করেন।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৭০০)

ব্যাখ্যাঃ

فزع অর্থ ফিরিস্তাদের অন্তর থেকে ভয়-ভীতি দূর করা। ফিরিস্তাদের আল্লাহ সম্পর্কে বহু জ্ঞান রয়েছে। তারা জানে যে, আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী, মর্যাদাবান এবং সমস্ত জগতের অধিপতি। এজন্য তারা আল্লাহ তা’আলাকে অত্যন্ত ভয় পায়। কেননা তারা আল্লাহ তা’আলা থেকে এক মুহূর্তের জন্যও অমুখাপেক্ষী নয়। আল্লাহ তা’আলার গুণাবলী বিভিন্ন প্রকার। তন্মধ্যে কতিপয় গুণাবলী হল মহত্মপূর্ণ আর কতিপয় হল সৌন্দর্যপূর্ণ। যেসব গুণাবলী অন্তরে ভয়-ভীতি, অস্থিরতা ও রবের প্রতি আতঙ্ক সৃষ্টি করে তাকে জালালী বা মহত্বপূর্ণ গুণাবলী বলা হয়। আর প্রকৃত পক্ষে এ জালালী গুণাবলীতে যিনি গুনান্বিত তিনিই হলেন আল্লাহ। কেনন তিনি তাঁর পূত-পবিত্র গুণাবলীতে পরিপূর্ণ। আর বাস্তবে যদি তাই হয় তবে গুণাবলীতে পরিপূর্ণ সত্তাই হল ইবাদতের উপযুক্ত। পক্ষান্তরে সৃষ্ট মানুষ হল অসম্পূর্ণ গুণাবলীর অধিকারী। নিশ্চয়ই তাদের জীবন পরিপূর্ণ নয়, কেননা কখনো মাখলুক এমন ঘটনার সম্মুখীন হয় যে সে মৃত্যু মুখে পতিত হয়। আবার কখনো এমন অবস্থার স্বীকার হয় যে, রুগ্ন-অসুস্থ হয়ে যায়। সুতরাং তারা অত্যন্ত দুর্বল ও মুখাপেক্ষী। তাদের কোন পরিপূর্ণ গুণাবলী নেই। তাই এটিই হল তাদের অসম্পূর্ণতা ও অপারগতার দলীল এবং তারা যে প্রতিপালিত ও বাধ্যতার দলীল। সুতরাং বান্দার উচিত হল যার রয়েছে পরিপূর্ণ গুণাবলী, মহত্ত্ব ও সৌন্দর্য তাঁরই দিকে ধাবিত হওয়া, আর তিনি হলেন একক-অদ্বিতীয় আল্লাহ। এটিই এ অধ্যায়ের উদ্দেশ্য যা প্রকাশ্য আল-হামদুলিল্লাহ।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়।

০১। সূরা সাবার ২৩ নং আয়াতের তাফসির।

০২। এ আয়াতে রয়েছে শিরক বাতিলের প্রমাণ। বিশেষ করে, সালেহীনের সাথে যে শিরককে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এটিই সে আয়াত, যাকে অন্তর থেকে শিরক বৃক্ষের কর্তনকারী বলে আখ্যায়িত করা হয়।

০৩। ﴿قَالُوا الْحَقُّ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ﴾ এ আয়াতটির তাফসীর।

০৪। হক্ব সম্পর্কে ফিরিশতাদের জিজ্ঞাসার কারণ।

০৫। ‘এমন এমন কথা বলেছেন’ – এ কথার মাধ্যমে জিবরাঈল কর্তৃক জবাব প্রদান।

০৬। সিজদারত অবস্থা থেকে সর্ব প্রথম জিবরাঈল কর্তৃক মাথা উঠানোর উল্লেখ।

০৭। সমস্ত আকাশবাসীর উদ্দেশ্যে জিবরাইল কথা বলবেন। কারণ তাঁর কাছেই তারা কথা জিজ্ঞাসা করে।

০৮। ওহী প্রসঙ্গে ধ্বনিত বিকট আওয়াজে চেতনা হারানোর বিষয়টি আকাশমণ্ডলীর সকল অধিবাসীর জন্য প্রযোজ্য।

০৯। আল্লাহর কালামের প্রভাবে সমস্ত আকাশ প্রকম্পিত হওয়া।

১০। আল্লাহর নির্দেশিত স্থানে ওহী নিয়ে জিবরাঈল গমন করেন।

১১। শয়তানের চুপিসারে আল্লাহর বাণী শোনার বর্ণনা।

১২। তাদের একে অপরের উপর সওয়ার হবার বর্ণনা।

১১। শয়তানের উপর অগ্নিস্ফুলিঙ্গ প্রেরণ।

১৪। কখনো কথা শুনে তা সহচরের কাছে পৌছানোর পূর্বেই অগ্নিগোলক গিয়ে শয়তানকে জ্বালিয়ে দিত, আবার কখনো অগ্নিসম্পাতের পূর্বেই কথা শয়তান তার সহচরের কাছে পৌছিয়ে দিত।

১৫। গণক বা জ্যোতিষরা কখনো কখনো সত্য কথা বলে থাকে।

১৬। তারা সাধারণত মূল কথার সাথে শতটি মিথ্যা কথা বলে থাকে।

১৭। শয়তান তার মিথ্যাচারের সত্যতা কেবল আকাশ থেকে শোনা কথা দিয়েই প্রমাণ করে।

১৮। মানুষের অন্তর বাতিলকে গ্রহণ করে থাকে। মানুষিক প্রবৃত্তি শত শত মিথ্যা পরিত্যাগ করে একটি মাত্র সত্যকে কিভাবে গ্রহণ করতে পারে?

১৯। শয়তানরা তাদের শোনা কথাটি পরস্পর থেকে শুনে মনে রাখে এবং তা দিয়েই প্রমাণ করার অপচেষ্টায় মেতে ওঠে।

২০। আল্লাহর গুণাবলী সাব্যস্ত করা। যা আশ্’আরি ও মুআত্তালার বিপরীত।

২১। ফিরিশতাদের চেতনা হারিয়ে ফেলে ও আকাশমণ্ডলী প্রকম্পিত হওয়া আল্লাহর ভয়েরই প্রভাব।

২২। তারা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সিজদায় অবনত হয়।


অধ্যায়-১৬

শাফায়াত (সুপারিশ)
আল্লাহর বাণীঃ

﴿وَأَنْذِرْ بِهِ ٱلَّذِينَ يَخَافُونَ أَنْ يُحْشَرُوۤاْ إِلَىٰ رَبِّهِمْ ۙ لَيْسَ لَهُمْ مِّنْ دُونِهِ ۧ وَلِىٌّ وَلَا شَفِيعٌ﴾

অর্থ- “(কুরআন) এর মাধ্যমে তুমি ঐ সকল লোককে ভয় দেখাও যারা নিজেদের প্রভুর নিকট একত্র হওয়ার ভয়ে ভীত। তিনি ব্যতীত তাদের কোন অভিভাবক নেই, সুপারিশকারীও নেই। [সূরা আন’আমঃ ৫১] আল্লাহর বাণীঃ

﴿قُلْ لِلَّهِ ٱلشَّفَٰعَةُ جَمِيعًاۖ﴾

অর্থ- “বল, সকল সুপারিশ কেবল আল্লাহরই।” [সূরা যুমার-৪৪] আল্লাহর বাণীঃ

﴿مَنْ ذَا ٱلَّذِى يَشْفَعُ عِنْدَهُۥۤ إِلَّا بِإِذْنِهِۦۚ﴾

অর্থ- “কে আছে যে তাঁর (আল্লাহর) অনুমতি ব্যতীত তাঁর নিকট সুপারিশ করবে?” [সূরা বাকারাহ- ২৫৫] আল্লাহর বাণীঃ

﴿وَكَمْ مِّنْ مَّلَكٍ فِى ٱلسَّمَٰوَٰتِ لَا تُغْنِى شَفَٰعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِنۢ بَعْدِ أَنْ يَأْذَنَ ٱللَّهُ لِمَنْ يّشَآءُ وَيَرْضَىٰۤ﴾

অর্থ- “আর আকাশে কত ফিরিশতা আছে তাদের সুপরিশ কোন কাজে আসবে না তবে আল্লাহ যাকে চান ও পছন্দ করেন তাকে অনুমোতি দেয়ার পর!” [সূরা নাজম-২৬] আল্লাহর বাণীঃ

﴿قُلِ ٱدْعُواْ ٱلَّذِينَ زَعَمْتُم مِّنْ دُونِ ٱللَّهِ ۖ لَا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍفِى ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَلَا فِى ٱلْأَرْضِ﴾

অর্থ- “বল, আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের সংকল্প করতে ডাক। তারা আকাশ ও পৃথিবীতে অনুপরিমাণও কোন কিছুর মালিক নয়”। [সূরা সাবা- ২২-২৩] আবুল আব্বাস ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেছেন- যা কিছুর সাথে মুশরিকদের সম্পর্ক আছে তার সবগুলোকেই আল্লাহ অস্বীকার করেছেন। তিনি ব্যতীত অন্য কারোর মালিকানা ও অংশীদারিত্বকে তিনি অস্বীকার করেছেন। আল্লাহর কোন সহযোগী থাকাকেও অস্বীকার করেছেন। আল্লাহ যাকে অনুমতি দেন তার সুপরিশ ব্যতীত আর কারোর সুপারিশ কোন উপকারে আসবে না। আল্লাহ বলেছেনঃ

﴿وَلَايَشْفَعُونَ إِلَّالِمَنِ ٱرْتَضَىٰ﴾

অর্থ- “আল্লাহ যার প্রতি সন্তুষ্ট সে ছাড়া আর কারোর জন্য তারা সুপারিশ করতে পারবে না।” [সূরা আম্বিয়া, আয়াত-২৮] মুশরিকরা যে সুপারিশের ধারণা করে তা কিয়ামতের দিন থাকবে না যেমন কুরআন তা অস্বীকার করেছে। মহানবী (সাঃ) বলেছেন, তিনি এসে তার প্রভুর উদ্দেশ্যে সিজদা করবেন, তাঁর প্রশংসা করবেন। তিনি প্রথমেই সুপারিশ করতে আরম্ভ করবেন না। এরপর তাঁকে বলা হবে, মাথা তোল বল তোমার কথা শোনা হবে। চাও, তোমাকে দেয়া হবে। সুপারিশ কর, তোমার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। আবূ হুরায়রা তাকে বলেন, আপনার সুপারিশ লাভের সবচেয়ে হকদার ব্যক্তি কে? তিনি বলেন, যে ব্যক্তি নিখাদ মনে বলবে, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌। এই সুপারিশ লাভ করবে আল্লাহর অনুমতিক্রমে খালেস নিয়তের লোকরা। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করবে তার জন্য এটি হবে না। মূল কথা হল, আল্লাহ নিখাদচিত্তের অধিকারীদের উপর অনুগ্রহ করবেন। তিনি সুপারিশ করার অনুমতি দিবেন তার দু’আর মাধ্যমে তাদের ক্ষমা করবেন। যে সুপারিশ শিরকযুক্ত সেটিকে পবিত্র কুরআন অস্বীকার করেছে। মহানবী (সাঃ) বলেছেন, তাওহীদ ও ইখলাসবাদী ব্যতীত আর কেউ সুপারিশ লাভ করতে পারবে না।

ব্যাখ্যাঃ

বিগত দুটি অধ্যায়ের পর এ অধ্যায়ের অবতারণা ন্যায় সঙ্গত হয়েছে। কেননা যারা নবী (সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট প্রার্থনা করে এবং তাঁর নিকট ফরিয়াদ করে অথবা তাঁকে ব্যতীত অন্য কোন নবী বা ওলীদের নিকট প্রার্থনা করে, যখন তাদের সামনে তাওহীদে রুবুবিয়াতের (আল্লাহর প্রভুত্বের একত্ব) প্রমাণ পেশ করা হয়, তখন তারা বলেঃ আমরা তো তা বিশ্বাস করি; কিন্তু তারা হলো আল্লাহর নিকটতম সম্মানিত বান্দা এবং আল্লাহর নিকট তাদের মর্যাদা রয়েছে। সুতরাং তারা আমাদের জন্য সুপারিশ করবে। আর যে ব্যক্তি তাদের দিকে প্রত্যাবর্তন করবে তাকে তারা সুপারিশের মাধ্যমে সন্তুষ্ট করবে। কেননা আল্লাহর নিকট রয়েছে তাদের মর্যাদা, আর তারা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত যাদের আল্লাহ মর্যদায় উঁচু করেছেন। যার ফলে তাদের সুপারিশ কবুল করা হবে। এই হল তাদের ভ্রান্ত ধারণা। শায়খ মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব মুশরিকদের অবস্থা ও তাদের প্রমাণাদি সামনে রেখে বলেন- যখন তাদের সাথে এসব ক্ষেত্রে তর্ক করা হয়, তাদের নিকট শুধু সুপারিশ করার দলীল ব্যতীত আর কোন দলীল নেই। যার ফলে এ পর্যায়ে শাফায়াতের অধ্যায়ের অবতারণা হয়েছে। শাফায়াত বা সুপারিশের অর্থ হল দু’আ। কেউ যদি বলে আমি আল্লাহর রসূলের মাধ্যমে সুপারিশ বা শাফায়াত কামনা করি, তার অর্থ হচ্ছে, আমি রাসূলের নিকট আবেদন করি তিনি যেন আমার জন্য আল্লহর নিকট দু’আ করেন আর এটি হলো দোয়া-প্রার্থনা। কুরআন ও সুন্নাতের অন্যান্য দলীল দ্বারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নিকট দোয়া-প্রার্থনা বাতিল সাব্যস্ত হয়। ঐ সমস্ত দলীল দ্বারা মৃত ব্যক্তি এবং যারা ইহকাল থেকে বিদায় নিয়েছেন তাদের থেকে সুপারিশ প্রার্থনা করাও মহা শিরক। তবে জীবিত ব্যক্তির নিকট চাওয়া জয়েয, কেননা তারা তো ইহকালে অবস্থান করছেন এবং উত্তর দেয়ার সামর্থ রাখেন। আল্লাহ তা’আলা জীবিত ব্যক্তির থেকে দোয়া করানো সুপারিশ কামনা করার অনুমতি দিয়েছেন। যার ফলে নবী (সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর জীবদ্দশায় কখনো সাহাবীগণ আসতেন এবং তাদের জন্য দোয়ার আবেদন করতেন। আমাদের জানা উচিত সব সুপারিশ ও দোয়া কবুল হবে এমন নয় বরং কোন সুপারিশ গ্রহণ হবে আবার কোনটি প্রত্যাখ্যানও হতে পারে। সুপারিশ গ্রহণ হওয়ারও কিতিপয় শর্ত রয়েছে অনুরূপ প্রত্যাখ্যান হওয়ারও কিছু কারণ আছে। অতএব আমরা বুঝতে পারি যে কুরআন ও হাদীসের দৃষ্টিতে সুপারিশ দুই প্রকার- (১) নিষিদ্ধ সুপারিশ, (২) অনুমোদিত সুপারিশ। নিষিদ্ধ সুপারিশ হলো- যে সুপারিশ আল্লাহ তা’আলা মুশরিকদের জন্য নিষেধ করেছেন। যেমন- শায়খ মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব (রহঃ) তার প্রথম দালীল সূরা আনআমের ৫১নং আয়াতের বর্ণনা করেছেন।

তাওহীদ পন্থী ব্যতীত সকলের জন্য এই শাফায়াত নিষিদ্ধ। আবার তাওহীদপন্থীদের সুপারিশ বা শাফায়াত ও কবুল হবে কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে। আর তা হলো- (১) সুপারিশকারীর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে সুপারিশ করার অনুমতি। (২) সুপারিশকারী ও যার জন্য সুপারিশ করা হবে, উভেয়ের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি থাকা। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে সুপারিশের অধিকার আল্লাহ ব্যতীত কারো নয়। এজন্য লেখক (রহঃ) এর পর দ্বিতীয় আয়াতে- قُل لِلَّهِ الشَّفَٰعَةُ جَمِيعًا (অর্থ- বলুনঃ সব ধরণের সুপারিশ আল্লাহরই অধিকার) নিয়ে এসেছেন।

সকল প্রকার সুপারিশ কেবল আল্লাহর অধিকারে। প্রকৃতপক্ষে মুমিনদের ও যারা মুমিন নয় তাদের আল্লাহ ব্যতীত কোন সাহয্যকারী ও সুপারিশের অধিকার নাই। বরং সুপারিশ আল্লাহ তা’আলার অনুমতি ও সন্তুষ্টি সাপেক্ষেই হবে। যেহেতু কোন সুপারিশ উল্লেখিত শর্ত সাপেক্ষেই উপকারে আসবে না এই লেখক (রহঃ) তারপর দুটি আয়াত নিয়ে আসেন- প্রথম আয়াত- مَنْذَا ٱلَّذِى يَشْفَعُ عِنْدَهُ، إِلَّابِإِذْنِهِ অর্থ- “কে আছে যে তার অনুমতি ব্যতীত তাঁর নিকট সুপারিশ করবে?” [সূরা বাকারা- ২৫৫] দ্বিতীয় আয়াত- وَكَمْ مِّنْ مَّلَكٍ فِى ٱلسَّمَٰوَٰتِ لَا تُغْنِى شَفَٰعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِنۢ بَعْدِ أَنْ يَأْذَنَ ٱللَّهُ لِمَنْ يّشَآءُ وَيَرْضَىٰۤ অর্থ- “আর আকাশে অনেক ফিরিশতা আছে তাদের সুপরিশ কোন কাজে আসবে না তবে আল্লাহ যাকে চান ও পছন্দ করেন তাকে অনুমোতি দেয়ার পর!” [সূরা নাজম-২৬]

আয়াতদ্বয় আনার উদ্দেশ্য হলো- প্রথম আয়াত দ্বারা অনুমতির শর্তারোপ করা। অর্থৎ ফিরিশতা, নবী বা নৈকট্য অর্জনকারী যে কোন ব্যক্তি হোন না কেন আল্লাহর অনুমতি (শর্ত) ব্যতীত কেউ সুপারিশ করতে পারবেন না। আল্লাহ তা’আলা একমাত্র সুপারিশের মালিক এবং তিনিই একমাত্র সুপারিশের তৌফিক দিয়ে থাকেন। দ্বিতীয় আয়াতের উদ্দেশ্য সুপারিশকারীর কথার উপর এবং যার জন্য সুপারিশ করা হবে তার প্রতি সন্তুষ্টি থাকতে হবে। উল্লেখিত শর্তমূহের উপকারিতা যে সমস্ত মাখলুকের নিকট (আজ্ঞতাবশতঃ) সুপারিশ কামনা করা হয়, তাদের সাথে সুপারিশের জন্য সম্পর্ক না রাখা এবং তাদের ক্ষেত্রে এ ধারণা না রাখা যে আল্লাহর নিকট তাদের এমন মর্যাদা রয়েছে যার দ্বারা তারা সুপারিশ করার অধিকার রাখে। মুশরিকগণ এ ধরনেরই বিশ্বাস করে যে, তাদের বাতিল মা’বুদগুলি অবশ্যই সুপারিশ করবে এবং আল্লাহ তাদের সুপারিশকে প্রত্যাখ্যান করবেন না। উল্লেখিত আয়াতগুলি দ্বারা ঐ সমস্ত মুশরিকদের দাবীর অসারতা প্রমাণিত যারা ধারণা করে যে, (সুপারিশের জন্য) আল্লাহ তা’আলার অনুমতি (প্রয়োজন নাই) এবং যার জন্য সুপারিশ করা হবে তার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি (ছাড়াই) কেউ সুপারিশ করতে পারে (এটা মুশরিকদের ভ্রান্ত ধারণা)। যখন একথা সাব্যস্ত হয়ে গেল যে আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত কেউ সুপারিশের মালিক নয়। আর যে ব্যক্তি সুপারিশ করবে সে আল্লাহর অনুমতিতেই করতে পারবে। অতএব মাখালুকের সাথে তার সুপারিশ পাওয়ার জন্য তারা কিভাবে সম্পর্ক গড়তে চায়? পক্ষান্তরে সম্পর্কতো শুধু তাঁরই সাথে হওয়া উচিত যে সুপারিশের প্রকৃত মালিক। কিয়ামতের দিন নবী (সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিঃসন্দেহে সুপারিশ করবেন; কিন্তু ঐ সুপারিশ আমরা কার নিকট চাইব? তা একমাত্র আল্লাহরই নিকট চাইব। এবং এ ভাবে বলব- اللهم شفع فينا نبيك “হে আল্লাহ! আমাদের জন্য আপনার নবীর সুপারিশ নসীব করুন।” কেননা আল্লাহ তা’আলাই নবী (সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে সুপারিশের তৌফিক দিবেন ও অন্তরে ইলহাম করে দিবেন যে, অমুকের জন্য সুপারিশ করুন এটি তাদের জন্য যারা এই সুপারিশের জন্য একমাত্র আল্লাহর নিকট দোয়া করেছে যে নবী (সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যেন তাদের জন্য সুপারিশ করেন। এই জন্যই শায়খ (রহঃ) তারপর সূরা সাবার ২২-২৩ নং আয়াত বর্ণনা করেন।

এখানে তিনটি অবস্থা রয়েছেঃ (১) যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদের ডাকে, তাদেরকে দেখুক তারা কি আকাশে ও পৃথিবীতে অনুপরিমাণ ও কোন কিছুর মালিক? আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ لَايَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِى ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَلَافِى ٱلْأَرْضِ  অর্থ- “যাদেরকে তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে মা’বূদ মনে করতে, তাদের আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে অণু পরিমাণ কিছু নেই।” অতএব তাদের স্বতন্ত্র কর্তৃত্ব বলতে কোন কিছু নেই। (২) আল্লাহর কোন বিষয়ে তাদের কোন অংশীদারিত্ব নেই। অর্থাৎ তাদের মধ্য থেকে কেউ আল্লাহর মন্ত্রীও নয় এবং সাহায্যকারীও নয়। (৩) শাফায়াতের অধিকার কারোর নেই তবে যে অনুমতি লাভ করবে সেই শাফায়াতের অধিকার পাবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ১- কাকে অনুমতি দেয়া হবে? ২- শাফায়াতকারী হিসাবে আল্লাহ কার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন? ৩- কোন ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করলে তিনি সন্তুষ্ট হবেন? উক্ত তিনটি প্রশ্নের উত্তর শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়ার উক্তিতে বিদ্যমান।

قال أبو العباس: نفى الله عما سواه ……… نفاها القرآن  কিয়ামতের দিন উল্লিখিত শর্ত ব্যতীত সুপারিশ স্বীকৃত হবে না। মুশরিকদের বিশ্বাস যে, নিশ্চয়ই শাফায়াত সুপরিশ আল্লাহর অনুমতি ও সন্তুষ্টি ব্যতীতই অর্জন হবে। কেননা তাদের নিকট সুপারিশকারীই হলো সুপারিশের অধিকারী; কিন্তু প্রকৃত কথা হলো, কুরআন ও হাদীস দ্বারা সুপারিশ শর্তসাপেক্ষে অর্জন হওয়াই সাব্যস্ত। এ হলো শাফায়াতের জন্য অনুমতি প্রয়োজনের দলীল। নবী (সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও অন্যদেরকে অনুমতি দেয়া হবে; কিন্তু তাঁরা নিজেরাই শাফায়াত অনুমতি ব্যতীত শুরু করবেন না বরং তাঁরা প্রথমতঃ অনুমতি চাইবেন, তারপর অনুমতি দেয়া হবে। কেননা তাঁরা তো শাফায়াতের মালিক নন। তার মালিক একমাত্র আল্লাহ তা’আলা।
সুতরাং যার প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট থাকবেন তার জন্য আল্লাহর অনুমতিক্রমে সুপারিশ করা হবে। আর সেই সৌবাগ্যবান ব্যক্তি হলো ইখলাসধারী ও তাওহীদ পন্থী ব্যক্তি। অতএব উক্ত সুপারিশ মুশরিকদের ভাগ্যে জুটবে না। এই জন্য তিনি বলেনঃ ব্যাপার যদি এরূপই হয় তবে যারা মৃত ব্যক্তি, রাসূল, নবী, সৎ ব্যক্তি ওলী বা অসৎ ব্যক্তিদের প্রতি যারা ধাবিত হয় এবং তাদের নিকট শাফায়াত চায় তারা নিশ্চয়ই মুশরিক। কেননা তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নিকট শাফায়াত চাওয়ার মাধ্যমে দোয়া প্রার্থনায় ধাবিত হয়েছে। অথচ তারা শাফায়াতের মালিক নয়। বরং তারা নিশ্চয়ই শাফায়াত করবেন (আল্লাহর) অনুমতি ও সন্তুষ্টির পর। আল্লাহর সন্তুষ্টি হবে তাওহীদপন্থীদের জন্য। আর তাওহীদপন্থী হলো যারা কোন মৃত ব্যক্তির নিকট শাফায়াত চায় না। অতএব যে ব্যক্তি কোন মৃত ব্যক্তির নিকট শাফায়াত চাইল সে নিজেকে নবী (সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর শাফায়াত থেকে বঞ্চিত করল। কেননা সে আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করল।

শাফায়াতের হাকীকত, অর্থাৎ শাফায়াত অর্জনের তাৎপর্য কি? এবং কিভাবে শাফায়াত অর্জন হবে? উত্তর হলোঃ শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়ার বক্তব্যেঃ আল্লাহ তা’আলা শাফায়াতের মাধ্যমে তাওহীদপন্থীদেরকে ক্ষমা করবেন। সেটি হবে শাফায়াতকারীর ফযীলত ও তার প্রতি আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ প্রকাশের জন্য। আর এটিই হলো শাফায়াতের হাকীকত, আল্লাহ তা’আলা অনুগ্রহ করলেন ও তাঁর অনুমতি সাপেক্ষে শাফায়াত করানোর মাধ্যমে তার প্রতি অনুগ্রহ ও সম্মান প্রদর্শন করলেন এবং যার জন্য শাফায়াত করা হলো তার প্রতি অনুগ্রহ ও দয়া করলেন শাফায়াত গ্রহণ করার মাধ্যমে। অতএব আল্লাহর বড়ত্ব-মহত্ব ও তাঁর একক কর্তৃত্বের প্রতি যার অন্তর্দৃষ্টি রয়েছে বিষয়টি তার কাছে অবশ্যই সম্পূর্ণ ফুটে উঠে যে শাফায়াতের একমাত্র আধিপত্য আল্লাহ তা’আলারই। হুকুম ও বাদশাহী সম্পূর্ণ তাঁরই। সুতরাং ব্যাপার যেহেতু এরূপই তাহলে শাফায়াতের প্রত্যাশার জন্য একমাত্র তাঁরই সাথে অন্তরের সম্পর্ক গড়া ওয়াজিব। কুরআন মাজীদে ঐ শাফায়াতকেই নাকচ করা হয়েছে যার মধ্যে শিরক রয়েছে। যেমন- আল্লহ তা’আলার বাণীঃ لَيْسَ لَهُمْ مِّنْ دُونِهِ وَلِيُّ وَلَا شَفِيعٌ لَّعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ অর্থ- “যেখানে তিনি ছাড়া তাদের না কোন সাহায্যকারী হবে, না থাকবে কোন সুপারিশকারী।” [সূরা আনআম-৫১] এ ধরনের বাণীর মধ্যে যে সমস্ত শাফায়াতে শিরক রয়েছে তাকে নাকচ করা হয়েছে। অনুরূপ মুশরিকদের জন্যেও শাফায়াত করাও নিষেধ। কেননা আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হননি। অতএব যখন এর মাধ্যমে প্রমাণ হয় যে তিনিই শাফায়াত বাস্তবায়নকারী, তিনিই নিয়ামত দানকারী, তিনিই তাঁর মহত্ব প্রকাশের সামর্থ দেন এবং অন্তর একমাত্র তাঁরই দিকে সম্পৃক্ত করার তৌফিক তিনিই দিবেন। তারই সাথে শাফায়াত সুসাব্যস্ত। সুতরাং প্রত্যেক মহা শিরকে পতিত ব্যক্তি থেকে শাফায়াত নাকচ হয়ে যায়। কেননা শাফায়াত হলো ইখলাস-তাওহীদ পন্থীদের জন্য যা আল্লাহর একটি অনুগ্রহ। আর এই হলো স্বীকৃত শাফায়াত অর্থাৎ যা আল্লাহর অনুমতিক্রমে সুসাব্যস্ত। অনুমতি দুই প্রকার- (১) অবস্থাগত অনুমতি (২) শরীয়ত সম্মত অনুমতি। অস্থাগত অনুমতির অর্থ হলোঃ যে ব্যক্তি শাফায়াতের অনুমতিপ্রাপ্ত সে আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুমতি পাওয়ার পূর্বে কখনোও শাফায়াত করতে পারবে না। অতএব আল্লাহ যদি তাকে বাধা দিয়ে থাকেন তবে তার দ্বারা শাফায়াত সম্ভব হবে না এমনকি সে মুখ পর্যন্ত খুলতে পারবে না। শরীয়ত সম্মত অনুমতির অর্থ হলোঃ শাফায়াতে শিরক অন্তর্ভুক্ত যেন না হয় এবং যার জন্য শাফায়াত করা হবে সে যেন মুশরিক না হয়। অবশ্য নবী (সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর চাচা আবু তালিব এ বিধানের আওতামুক্ত। কেননা তার ক্ষেত্রে নাবী (সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার আযাব হালকা হওয়ার জন্য শাফায়াত করবেন। কিন্তু শাফায়াত তাকে জাহান্নাম থেকে বের করার জন্য কোন উপকারে আসবে না বরং তা হবে শুধু আযাব হালকা করার জন্য। আর এ ব্যপারটি নিতান্তই নবী (সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর জন্য কেননা এক্ষেত্রে আল্লাহ তাঁকে অহী করেন ও এর অনুমতি দেন। শাফায়াতের এ অধ্যায়ের মাধ্যমে ফুটে উঠে যে, বিদআতী, কুসংস্কারবাদী ও আল্লাহ ব্যতীত অন্যের সাথে সম্পর্ককারীরা যে, শাফায়াতের সাথে সম্পর্ক রাখে তা নিশ্চয়ই বাতিল শাফায়াত। আর তাদের বক্তব্যঃ وهؤلاء شفعاءنا عند الله  অর্থ- “ঐ সমস্ত ব্যক্তিত্ব আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করবেন।” বাতিল ও ভ্রান্ত বক্তব্য। কেননা যে শাফায়াত কার্যকরী তা শুধু তাওহীদ পন্থী ইখলাস বাদীদের জন্যই। যেহেতু তারা আল্লহ ব্যতীত অন্যদের নিকট শাফায়ত তলব করে। সুতরাং তারা যেন আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নিকট শাফায়াত প্রার্থনা করে। আর এটিই হলো তাদের শাফায়াত থেকে বঞ্চিত হওয়ার আলামত। এই অধ্যায়ের ফল কথা হলোঃ উক্ত বিদআতী ও কুসংস্কারবাদীদের যে শাফায়াতের সাথে সম্পর্ক তা তাদের কোন উপকার করবে না বরং ক্ষতি করবে। কেননা তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নিকট শাফায়াত কামনা করে প্রকৃত শাফায়াত থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং নিশ্চয়ই তারা এমন কিছুতে জড়িত হয়েছে আল্লাহ যার কোন অনুমোদন দেননি। কেননা তারা শিরকী শাফায়াত ব্যবহার করেছে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যের শরণাপন্ন হয়েছে এবং আল্লহকে বাদ দিয়ে অন্যের সাথে সম্পর্ক গড়েছে।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়-

০১। আয়াতসমূহের তাফসীর।

০২। নিষিদ্ধ সুপারিশের বিবরণ।

০৩। শরীয়ত অনুমোদিত সুপারিশের বর্ণনা।

০৪। বড় সুপারিশের উল্লেখ। যাকে প্রশংসিত স্থান বলা হয়।

০৫। মহানবী (সাঃ) প্রথমেই সুপারিশ করতে উদ্যত হবেন না; বরং তিনি সিজদায় অবনত হবেন। অনুমতি পাওয়ার পর সুপারিশ করবেন।

০৬। যে সুপারিশ লাভের হকদার বেশি? (সে হলো তাওহীদপন্থী)

০৭। যে ব্যক্তি আল্লাহর শিরক করবে সে এই সুপারিশ লাভ করতে পারবে না।

০৮। সুপারিশের স্বরূপ বর্ণনা।


অধ্যায়-১৭

হিদায়াত দানকারী একমাত্র আল্লাহ
আল্লাহর বাণীঃ

﴿إِنَّكَ لَاتَهْدِى مَنْ أَحْبَبْتَ﴾

অর্থ- “নিশ্চয়ই আপনি যাকে ভাল বেসেছেন তাকে হেদায়েত করতে পারবেন না।” [সূরা কাসাস-৫৬] ইবনুল মুসাইয়্যেব হতে সহীহ হাদীসে রয়েছে। তিনি তার পিতা হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আবু তালিবের মৃত্যু আসন্ন হলে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার নিকট এলেন। তার নিকট ছিল আব্দুল্লাহ বিন আবী উমাইয়াহ ও আবূ জাহল। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে বললেন, হে চাচা! বলুন, “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌।” এমন একটি কথা যার মাধ্যমে আমি আল্লাহর দরবারে আপনার জন্য শুপারিশ করবো। তখন তারা উভয়ে তাকে (আবু তালিব কে) বলল, তুমি কি আব্দুল মুত্তালিবের ধর্ম থেকে বিমুখ হবে? মহানবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে কথাটি আবার বললেন। তারাও তাদের কথার পুনরাবৃত্তি করল সে সবশেষে বলল, আমি আব্দুল মুত্তালিবের ধর্মে আছি এবং লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলতে অস্বীকার করল। মহানবী (সাল্লাল্লাহু প্রার্থনা করব। তখন আল্লাহ নাযিল করলেন- ﴿مَاكَانَ لِلنَّبِىِّ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُو أَنْ يَّسْتَغْفِرُواْ لِلْمُشْرِكِينَ﴾ অর্থ- “নবী ও ঈমানদারদের উচিত নয় মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা।” [সূরা তাওবা- ১১৩] আর আবু তালিব সম্পর্কে আল্লাহ্ নাযিল করেনঃ

﴿إِنَّكَ لَاتَهْدِى مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَٰكِنَّ ٱللَّهَ يَهْدِى مَنْ يَّشَآءُۚ﴾

নিশ্চয়ই আপনি যাকে ভালবেসেছেন তাকে হেদায়াত করতে পারবেন না। তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হেদায়েত করেন।” [সূরা কাসাসঃ ৫৬]

ব্যাখ্যাঃ

হেদায়েত দুই প্রকারঃ হেদায়েতে তাওফীক ও ইলহাম। অর্থাৎ আল্লাহ কর্তৃক বান্দাকে হেদায়াত কবুলের জন্য বিশেষ সাহায্য করা। আর তার উদ্দেশ্য হলোঃ আল্লাহ তাঁর কোন বান্দার অন্তরে হিদায়াত গ্রহণের বিশেষ আগ্রহ সৃষ্টি করে দেন। যা অন্যের অন্তরে দেননি। অতএব তৌফিক হলো, বিশেষ সাহায্য লাভ, আল্লাহ যার জন্য পছন্দ করেন তাকে তার তৌফিক দান করলে সে হিদায়াত গ্রহণ করে থাকে এবং এর মধ্যে সে প্রচেষ্টা করে থাকে। সুতরাং তা অন্তরে দেয়া হয় নবীর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওযাসাল্লাম) হতে নয়। অতএব অন্তর হলো আল্লাহর হাতে তিনি যেভাবে পছন্দ করেন সেভাবে পরিবর্তন করে থাকেন। এমন কি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওযাসাল্লাম) যাকে পছন্দ করে ছিলেন তাকে মুসলমান করতেও হিদায়াত দান করতে পারেননি। যিনি তাঁকে আত্মীয়দের মাঝে সর্বধিক উপকার সাধন করেছিলেন তিনি হলেন আবু তালেব। তা সত্বেও তিনি তাঁকে হিদায়াতে তৌফিক দান করতে পারেননি। হিদায়াতের দ্বিতীয় প্রকারঃ এর সম্পর্ক মানুষের সাথে। এ হলো ইরশাদ ও নির্দেশ সূচক হিদায়াত এ হিদায়াত নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওযাসাল্লাম) এর জন্য ও আল্লাহর পথে প্রত্যেক আহ্বানকারী ও প্রত্যেক নবী-রাসূলের জন্য সাব্যস্ত। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ ﴿إِنَّمَآ أَنْتَ مُنْذِرٌۖ وَلِكُلِّ قَوْمٍ هَادٍ﴾ অর্থ- “আপনি তো শুধু ভীতি প্রদর্শনকারী। আর প্রত্যেক জাতির জন্য কেউ না কেউ হাদায়াতকারী অবশ্যই হয়ে থাকে।” [সূরা রা’দ, আয়াত- ৭] তিনি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওযাসাল্লাম) কে আরো বলেনঃ ﴿وَإِنَّاكَ لَتَهْدِىۤ إِلَىٰ صِرَٰطٍ مُّسْتَقِيمٍ﴾ অর্থ- “নিশ্চয়ই মানুষদেরকে আপনি সরল পথের দিকে নির্দেশনা দেন।” [সূরা শুরা- ৫২] আপনি সর্বোত্তম দলীল ও সর্বোত্তম নির্দেশিকা দ্বারা লোকদেরকে সরল পথের দিকে পথ নির্দেশনা দিচ্ছেন। যা মো’যেযা এবং শক্ত দলীল প্রমাণ দ্বারা মদদপুষ্ট যা আপনার সততারও প্রমাণ বহনকারী। যখন হিদায়াতে তৌফিক মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওযাসাল্লাম) এর এত মহত্ব, শান ও তাঁর রবের নিকট এত মর্যাদা সত্বেও নাকচ হয়ে যায়। অতএব বড় ব্ড় উদ্দেশ্য যেমন হিদায়াত, ক্ষমা প্রদর্শন, সন্তষ্টি কামনা, খারাপী থেকে দূরত্ব কামনা ও যাবতীয় কল্যাণ কামনার ক্ষেত্রে আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত অন্যের সাথে সম্পর্ক রাখা বাতিল পর্যবসিত হয়।

وفي الصحيح عن ابنالمسيب … لأستغفرن لك مالمأنه عنك এর মধ্যে لأستغفرن  শব্দের মধ্যে لام শপথের জন্য ব্যবহার হয়েছে, অর্থাৎ আল্লাহর শপথ! আমি অবশ্যই ক্ষমা প্রার্থনার জন্য দোয়া করব। আর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওযাসাল্লাম) প্রকৃত পক্ষেই স্বীয় চাচার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার দোয়া কি তাঁর চাচার কোন উপকারে এসেছিল? কোনই উপকারে আসেনি কেননা এখানে যার জন্য শাফায়াত করা হয়েছিল সে মুশরিক ছিল। আর ক্ষমা প্রার্থনা ও শাফায়াত মুশরিকদের জন্য উপকারে আসবে না। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওযাসাল্লাম) এর এ অধিকার নেই যে কোন মুশরিকের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে তিনি তাকে কোন উপকার সাধন করে দিবেন বা কোন ব্যক্তি শিরক করে তাঁর তাঁর নিকট আশ্রয় গ্রহণ করবে আর তিনি তার বিপদাপদ দূর করে কল্যাণ সাধন করে দিবেন। এজন্যই তিনি বলেনঃ আল্লাহর শপথ! যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে বিরত না করা হবে অবশ্যই ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকব। অতপর আল্লাহ তা’আলা আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ ﴿مَا كَانَ للِنَّبِىِّ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُوا أَن يَّسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِى قُرْبَىٰ﴾ অর্থ- “নবী ও অন্যান্য মুমিনদের জন্যে জায়েয নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, যদিও তারা আত্মীয়ই হোক না কেন, একথা প্রকাশ হওয়ার পর যে তারা জাহান্নামের অধিবাসী।” [সূরা- তাওবা- ১১৩] উক্ত আয়াতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওযাসাল্লাম) কে মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার দোয়া করতে নিষেধ করেছেন। ব্যাপারে যদি এইরূপই হয় তবে যদি মনে করা হয়, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওযাসাল্লাম) আ’লমে বারযাখে ক্ষমা প্রার্থনার দোয়া করতে পারেন তবুও তিনি কোন এমন মুশরিকের জন্য মাগফেরাতের দোয়া করতে পারেন না। যে আল্লাহ ব্যতীত তাঁর নিকট শাফায়াত তলব করে, ফরিয়াদ করে, জবাই করে, মানত করে, অথবা তাঁকে ইবাদতের উপযুক্ত মনে করে, তাঁর উপর ভরসা করে অথবা তাঁর নিকট স্বীয় প্রয়োজন তুলে ধরে শিরকে লিপ্ত হয়। আল্লাহ তা’আলা আবু তালেবের ব্যাপারে অবতীর্ণ করেনঃ ﴿إِنَّكَ لَاتَهْدِى مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَٰكِنَّ ٱللَّهَ يَهْدِى مَن يَشَآءُۚ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ﴾ অর্থ- “তুমি যাকে ভালবাস তাকে ইচ্ছা করলেই সৎপথে আনতে পারবে না। তবে আল্লাহই যাকে ইচ্ছা করেন সৎপথে আনায়ন করেন এবং তিনিই ভাল জানেন সৎপথ অনুসরণকারীদেরকে।”

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

০১। ﴿إِنَّكَ لَا تَهْدِى مَنْ أَحْبَبْتَ﴾ আয়াতটির তাফসীর।

০২। ﴿مَا كَانَ للِنَّبِىِّ﴾ অংশটির তাফসীর।

০৩। আপনি “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলুন রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওযাসাল্লাম) এর এ কথার ব্যাখ্যা। এ বিষয়টি অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ যা এক শ্রেণীর তথা কথিত জ্ঞানের দাবীদারদের বিপরীত। (যারা দাবী করে যে শুধু জানাই যথেষ্ট)

০৪। আবু জাহল ও তার সঙ্গীরা জানত মহানবী “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু দ্বারা কি বুঝিয়েছেন।” আল্লাহ তা’আলা তাদের খারপী করুন, যাদের তুলনায় আবু জাহল ইসলামের মূলের ব্যাপারে বেশী জানত।

০৫। চাচার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে মহানবীর তীব্র আগ্রহ ও প্রাণপণ চেষ্টা।

০৬। যারা এই ধারণা করত যে আব্দুল মুত্তালিব ও তার পূর্ববর্তীরা মুসলমান তাদের প্রতিবাদ।

০৭। মহানবী তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন কিন্তু তাকে ক্ষমা করা হয়নি; বরং নিষেধ করা হয়েছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে।

০৮। মানুষের জীবনে অসৎ সঙ্গীদের কুপ্রভাব।

০৯। পূর্ববর্তীদের সম্মানে বাড়াবাড়ি করার ক্ষতি।

১০। আবু জাহল কর্তৃক পূর্ব পুরুষদের প্রতি অন্ধ ভক্তির যুক্তি প্রদর্শনের কারণে বাতিল পন্থীদের অন্তরের সংশয়।

১১। সর্বশেষ আমলের উত্তম পরিণতির প্রত্যক্ষ প্রমাণ। কেননা আবু তালিব যদি শেষ মুহূর্তে কালিমা পাঠ করত তাহলে তার বিরাট উপকার হতো।

১২। গোমরাহীতে নিমজ্জিত ব্যক্তিদের অন্তরে এ সংশয়ের মধ্যে বিরাট চিন্তার বিষয় নিহিত রয়েছে। কেননা উক্ত ঘটনায় ঈমান আনার কথা বারবার বলার পরও তারা তাদের পূর্বপুরুষদের প্রতি অন্ধ অনুকরণ ও ভালবাসাকেই যুক্তি হিসেবে পেশ করেছে। তাদের অন্তর (পূর্ব পুরুদের ভ্রান্ত ধারণা গুলোতে) আচ্ছন্ন থাকার কারণেই অন্ধ অনুকরণকে যথেষ্ট বলে মনে করেছে।


অধ্যায়-১৮

বনী আদমের কুফরী এবং তাদের দ্বীন পরিত্যাগ করার কারণ নেক্‌কারদের বেলায় বাড়াবাড়ি করা সম্পর্কিত
আল্লাহর বাণীঃ

﴾يَٰۤأَهْلَ ٱلْكِتَٰبِ لَاتَغْلُواْ فِىدِينِكُمْ﴿

অর্থ- “হে গ্রন্থধারীরা, তোমরা তোমাদের দ্বীনে বাড়াবাড়ি করো না।” [সূরা নিসা- ১৭১] ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে সহীহ হাদীসে বর্ণীত- তিনি আল্লাহর বাণী সম্পর্কে বলেনঃ

﴾وَقَالُواْ لَا تَذَرُنَّ ءَالِهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدَّا وَلَاسُوَاعًا وَلَا يَغُوقَ وَنَسْرًا﴿

অর্থ- “এবং তারা বলেছিল- তোমরা কখনো তোমাদের দেব-দেবীকে পরিত্যাগ করো না, আর পরিত্যাগ করো না ওয়াদ, সুওয়া’আ, ইয়াউক ও নাসরকে।” [সূরা নূহ, আয়াত-২৩] এইগুলি (অর্থাৎ ওয়াদ্দু, সু‘আ, ইয়াগুস, ইয়াউক ও নাসর) নূহ জাতির নেক্‌কার লোকদের নাম। তারা মারা গেলে শয়তান তাদের জাতিকে বলল, এরা যে সকল আসনে বসত সে সকল আসনে তাদের প্রতিকৃতি স্থাপন কর এবং এগুলিকে তাদের নামে নামকরণ কর। তখন তারা তাই করল। তবে এগুলির ইবাদত করা তখনও শুরু হয়নি। এরপর এরা যখন মারা গেল এবং ইলম উঠে গেল তখন এই মূর্তিগুলির ইবাদত করা শুরু হল। ইবনুল কাইয়্যুম বলেছেন, একাধিক সালাফে সালেহীন বলেছেন, এই সকল লোক মারা যাওয়ার পর জীবিত লোকেরা তাদের কবরের পাশে অবস্থান করলো। তাদের মূর্তি তৈরি করলো। এরপর দীর্ঘকাল অতিবাহিত হলে তাদের ইবাদত শুরু করে দেয়। ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। আল্লার রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ

((لَا تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى إِبْنَ مَرْيَمَ، إِنَّمَا أَنَا عَبْدٌ، فَقُولُوا: عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُه)) (صحيح البخارى أحاديث الأنباء، باب قوله تعالى ﴿وَاذكر في الكتب مريم﴾ ح:٥٤٤٣، وأصله عند مسلم في الصحيح، ح:١٩٢١)

“তোমরা আমার ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত করো না, যেমন ভাবে খ্রিস্টানরা ঈসা ইবনে মারইয়ামের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করেছিল। আমি তো একজন বান্দা বৈ আর কিছু নই। তাই তোমরা বল, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল” [বুখারী ও মুসলিম] তিনি আরও বলেছেন, আল্লহর রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ

((إِيَّاكُمْ وَالْغُلُوَّ، فَإِنَّمَا أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمُ الْغُلُوُّ)) (سنن النسائي، المناسك، باب النقاط الحص، ح:٩٥٠٣ وسنن ابن ماجه، المناسك، باب قدر حصى الرمي، ح:٩٢٠٣)

“তোমরা বাড়াবাড়ি থেকে সতর্ক থাক। কারণ, এই বাড়বাড়িই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ধ্বংস করেছে। মুসলিম শরীফে ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্নিত আছে। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ

((هَلَكَ الْمُتَنَطِّعُوْنَ – قَلَهَا ثَلَاثَا)) (صحيح مسلم، العلم، باب هلك المتنطعون، ح:٠٧٦٢)

“সীমালংঘনকারীরা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গেছে।” তিনি কথাটি তিনবার উচ্চারণ করেন।

ব্যাখ্যাঃ

শায়খ মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহাব (রহঃ) এই অধ্যায় ও এর পরবর্তী অধ্যায়গুলিতে বর্ণনা করেন যে, এ উম্মত ও পূর্ববর্তী উম্মতের মাঝে শিরক অনুপ্রবেশর নিশ্চয়ই বসচেয়ে বড় কারণ হলো, সৎ ব্যক্তিদের সম্মান ও মর্যদার ক্ষেত্রে الغلو অর্থ বাড়াবাড়ি সীমালংঘন করা, যা থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল নিষেধ করেছেন। মৌলিক নীতিমালা ও আকীদার বর্ণনার পর এক্ষেত্রে পথ-ভ্রষ্টতার কারণ বর্ণনা উদ্দেশ্য। غلو : الغو শব্দটি আরবী বাক্য غلا فى الشىء কোন বিষয়ে বাড়াবাড়ি করা বুঝায় যখন বিষয়টিকে নিয়ে সীমালংঘন হয়ে যায়। অতএব বনী আদমের কুফরী ও তাদের দ্বীন পরিত্যাগ করার কারণ হলো, সৎ ব্যক্তিদের সম্মান ও মর্যাদায় ঐ সীমা অতিক্রম করা যতটুকু আল্লাহ তা’আলা অনুমতি দিয়েছেন। সৎ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হলোঃ নবী, রাসূল, ওলী এবং প্রত্যেক ঐ সমস্ত ব্যক্তি যারা সৎ ও ইখলাসের গুণে গুণান্বিত। তাঁরা হলো যাবতীয় নেক কাজে অগ্রগামী বা মধ্যপন্থী। আর তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর নিকট মর্যাদা। আল্লহর উদ্দেশ্যেই সৎলোকদেরকে ভালবাসা, তাঁদেরকে সম্মান করা এবং তাঁদের সৎকর্ম ও ইলমের অনুসরণ করা হলো আমাদের করণীয়। সৎব্যক্তিগণ যদি নবী ও রাসূলদের অন্তর্ভুক্ত হন তবে তাঁদের শরীয়ত ও হুকুম আহাকামের উপর চলতে হবে তাঁদের প্রতি সম্মান ও ভালবাসা প্রদর্শন এবং তাদের প্রতি আন্তরিকতা, তাদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদও তাঁদেরকে সহযোগিতা করা ইত্যাদি। তাদের এক্ষেত্রে বড়াবাড়ি নমুনা হলো, তাঁদের কাউকে কোন কোন ক্ষেত্রে আল্লাহর আসনে বসিয়ে দেয়া বা কারো কারো ক্ষেত্রে এরূপ বলা যে, তিনি লাওহ ও কলমের ভেদ জানেন বা তিনিই ভূপতি। যেমন- বুসাইরী তার প্রসিদ্ধ কবিতায় আবৃত্ত করেনঃ অর্থাৎ নিশ্চয়ই নবী (সাঃ) কে এমন কোন নিদর্শন দেয়া হয়নি যা তার নবী (সাঃ) এর মান-মর্যাদার সমতুল্য হতে পারে। এই কবিতার ব্যাখ্যাকারকগণ বলেন- নবী (সাঃ) কে যত নিদর্শনাবলী মোজেযা দেয়া হয়েছে এমন কি আল-কুরআনেরও মর্যাদা তাঁর নবী (সাঃ) এর সমতুল্য নয়। (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক) আরও বলা হয় তাঁর তো এত বড় স্থান ও মর্যাদা যে, তাঁর {নবী (সাঃ) এর} নাম নেয়ার ফলে মৃতদের মাটিতে মিশে যাওয়া হাড় একত্রিত হয়ে জীবিত হয়ে যায়। এ ধরনের বাড়াবাড়ি তারাই করে যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যের পূজারী এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে নবী ও রাসূলদের দিকে ধাবিত হয় ও তাদের মধ্যে আল্লাহর গুণাবলীতে বিশ্বাসী অথচ যার কখনো অনুমতি দেয়া হয়নি বরং তা হলো আল্লাহ তা’আলার সাথে মহা শিরক স্থাপন এবং স্রষ্টার সৃষ্টিতে সাদৃশ্য জ্ঞাপন নাউযুবিল্লাহ। এ হলো আল্লাহর সাথে কুফুরী। অতএব এখানে রয়েছে শরীয়তে অনুমোদিত সৎলোকদের সম্মানের সীমা-রেখা এবং অন্য দিকে রয়েছে সীমালঙ্ঘন ও বাড়াবাড়ি। এক্ষেত্রে তৃতীয় অবস্থা হলোঃ অত্যাচার, কঠোরতা ও অবিচার, অর্থাৎ সৎলোকদের সাথে আন্তরিকতা, সম্মান ও তাঁদের হক আদায় না করে এবং তাঁদের ভাল না বেসে তাদের প্রতি অবিচার করা। সুতরাং তাঁদের অবজ্ঞা করা হলো অবিচার ও তাঁদের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি হলো সীমালঙ্ঘন।

﴿يَٰۤأَهْلَ ٱلْكِتَٰبِ لَا تَغْلُوا فِى دِينِكُمْ﴾ এই কিতাবের মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা আহলে কিতাবকে বাড়াবাড়ি করা থেকে নিষেধ করেছেন। تغلوا ক্রিয়াটি نهى এর পর আসার কারণে দ্বীনের ভিতর সব সধরণের বাড়াবাড়ি নিষেধ। আল্লহ তা’আলা আহলে কিতাবদের যে সমস্ত ঘটনাবলী বর্ণনা করেছেন তা লক্ষ্য করলে দেখা যাবে তারা সৎব্যক্তিদের কেন্দ্র করে বাড়াবাড়ি করেছে। যেমন খ্রিস্টানরা ঈসা (আঃ) কে নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে এবং তারা বাড়াবাড়ি তাঁর মাতা মারইয়াম ও তাঁর হাওয়ারীদেরকে নিয়ে। ইহুদীরাও বাড়াবাড়ি করেছে উযাইর (আঃ) মূসা (আঃ) এর সাথী ও তাদের পুরোহিত পাদরীদেরকে নিয়ে। তারা তাদের জন্য আল্লাহর বৈশিষ্ট্যসমূহ সাব্যস্ত করে, তাদের নিকট শাফায়াত তলব করে, মনে করে যে বিশ্বজগতের আধিপত্বে তাদের অংশ রয়েছে। তাঁরা কার্যপরিচালনা করে যা বিশ্বজগত নিয়ন্ত্রণে তাদের কিছু কিছু কর্তৃত্ব রয়েছে।

وَ فى الصحيح عن ابن عباس ….. فى قول الله تعلى …. ونسرا …. إلى قومهم নূহের (আঃ) জাতিতে শিরকের আনুপ্রবেশ। নূহ (আঃ) এর জাতি যে শিরকে নিমজ্জিত ছিল তা হলো, সৎ ব্যক্তি ও তাদের রূহের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি। শয়তান সে জাতির নিকট বুজুর্গ ব্যক্তির আকৃতিতে আগমন করে এবং তার বুজুর্গী ও আল্লাহর নৈকট্যের দাবী করে বলে, যে ব্যক্তি আমার সাথে সম্পর্ক গড়বে তার জন্য আমি শাফায়াত করব। অতএব শয়তান তাদেরকে সম্মানের এ পর্যায় থেকে নিয়ে যায় প্রতিকৃতি, মূর্তি, আস্তানা ও দরগাহ পর্যন্ত। যেমন আলোচ্য অংশে ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই শিরক পতিত হওয়ার বর্ণনা দিয়ে বলেনঃ “তারা যখন ধ্বংস হয়ে যায়, শয়তান তাদের জাতির অন্তরে ইলহাম করে দেয় যে, তারা যেখানে অবস্থান করতো সেখানে আস্তানা বা দরগাহ গড়ে তোল এবং তাদের নামে নামকরণ কর। অতপর তারা তাই করলো, তবে তখনও তাদের (সৎ ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে) ইবাদত শুরু হয় নাই। অতপর যখন তারা মারা গেল, জ্ঞান ও উঠিয়ে নেয়া হলো তখন তাদের (সৎ ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে) ইবাদত শুরু হয়ে গেল।”

و قال ابن القيم: قال غير واحد …. فعبدو هم এ অংশের উদ্দেশ্য হলোঃ তারা যখন ঐ বুজুর্গ ব্যক্তিদের ছবি তৈরি কারার ইচ্ছা করে তখন তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, তারা সমস্ত ছবির পূজা করবে না কেননা তারা জ্ঞানী ছিল। কিন্তু ভিবষ্যতে যখন জ্ঞানের বিলুপ্তি ঘটল তখন ঐ ছবিগুলির পূজা করা সৎলোক ও বুজুর্গদের নৈকট্য অর্জনের উসীলা ও কারণ মনে করতে লাগল। শয়তান কখনো কখনো উক্ত ছবি প্রতিকৃতির নিকট এসে তার দর্শকদের বা উপস্থিত ব্যক্তিদের মনে এ ধরনের প্রভাব ফেলতো যে এ প্রতিকৃতি তো কথা বলতে পারে এবং তার কথাও শ্রবণ করতে পারে ও এ ধরনের বহু ধারণা তাদের দিয়ে থাকে। যার ফলে তাদের অন্তরে সৎব্যক্তিদের রূহের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যায়। পরিশেষে শয়তান তাদেরকে বুজুর্গদের পূজার প্রতি আকৃষ্ট করে ফেলে। বর্তমানে এই অবস্থা হলো ঐ লোকদের যারা কবর-মাজারে গিয়ে নামাযের মত করে বসে ও আল্লহ তা’আলার ইবাদতের সাথে তাদেরও ইবাদত করে। আর আমলই আল্লাহর সাথে শিরক করার কারণ হয়ে দাড়ায়।

و عن أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: لاتطرونى …. ابن مريم الإطراء শব্দের অর্থ হলোঃ কারো প্রশংসায় সীমালংঘন করা। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) স্বীয় প্রশংসায় সীমালংঘন করতে এই জন্য নিষেধ করেন যে, খ্রিস্টানরা যখন ঈসা (আঃ) এর প্রশংসায় সীমালংঘ করল তখন তার ফল হলো তারা কুফর ও শিরকে পতিত হওয়ার সাথে সাথে তারা এ দাবী ও করে বসল যে ঈসা (আঃ) আল্লাহর পুত্র। এই জন্যেই তিনি বলেনঃ إنما أنا عبد فقولوا: عبد الله ورسوله অর্থঃ “আমি তো একজন বান্দা, অতএব তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূলই বল।”

وقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: إياكم والغلوا …. من كان قبلكم الغلو এই হাদীসে সব ধরনের বাড়াবাড়ি থেকে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা বাড়াবাড়িই হলো সমস্ত খারাপীর কারণ। পক্ষান্তরে মধ্যপন্থা অবলম্বন হলো সমস্ত কল্যাণের চাবিকাঠি।

ولمسلم: عن ابن مسعود …. هلك المتنطعون قالها ثلاثاالمتنطعرن দ্বারা এমন লোকেরা উদ্দেশ্য যার স্বীয় কথায়-কাজে ও কোন জ্ঞানার্জনে এমন চরম বাড়াবাড়ি করবে এবং চরম পন্থা অবলম্বন করবে যার আল্লহ অনুমতি দেননি। تنطع، إطراء، غلو সমার্থবোধক শব্দ তবে غلو শব্দেই সব অর্থ এসে যায়। শায়খ মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহাব (রহঃ) এ অধ্যায়ে সাব্যস্ত করেন যে, বনী আদমের কুফরীর কারণ হলো তাদের দ্বীন পরিত্যাগ করা ও সৎব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করা। যেমন- নূহ (আঃ) এর জাতি সৎলোকদের ক্ষেত্রে বাড়বাড়ি করে, তাদের কবরে গিয়ে অবস্থান নেয় ও পরবর্তীতে তাদের পূজা শুরু করে। তেমনি খ্রিস্টানরা তাদের রাসূল ঈসা (আঃ), হাওয়ারী ও তাদের পাদরীদের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে পরিশেষে তাদেরকেও আল্লাহর সাথে মা‘বূদ শুমার করে। অনুরূপ এ উম্মাতের লোকেরাও নবী (সাঃ) এর জন্যেও আল্লাহর বৈশিষ্টের কিছু তাঁর জন্য সাব্যস্ত করে, অথচ নবী (সাঃ) এই সবই নিষেধ করেছেন।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

০১। যে ব্যক্তি এই অধ্যায় এবং পরবর্তী দুই অধ্যায় ভালভাবে বুঝতে পারবে সে জানতে পারবে যে, ইসলাম আগে অপরিচিত অবস্থায় দুনিয়ায় এসেছে। সাথে সাথে আল্লহর কুদরত এবং মানব অন্তরের আশ্চর্যজনক পরিবর্তন ক্ষমতা লক্ষ্য করতে পারবে।

০২। পৃথিবীতে সর্বপ্রথম শিরক দেখা দিয়েছে নেক্‌কারদের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি থেকে।

০৩। কিসের মাধ্যমে নবীদের দ্বীনের বিকৃতি ঘটেছে তা জানা এবং এর কারণ সম্পর্কে জ্ঞান লাভের সাথে এ কথাও জানা যে আল্লাহ তা‘আলাই তাদেরকে পাঠিয়েছেন।

০৪। শরীয়ত ও প্রকৃতি বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও বিদাআতকে গ্রহণ করার কারণ কি তা জানা।

০৫। হককে বাতিলের সাথে মিশিয়ে ফেলাই হচ্ছে এর কারণ। প্রথমটি হচ্ছে সালেহীনদের প্রতি ভালবাসা। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে কতিপয় জ্ঞানী ধার্মিক ব্যক্তিদের এমন কিছু আচরণ, যার উদ্দেশ্য ছিল মহৎ, কিন্তু পরবর্তীতে কিছু লোক উক্ত কাজের উদ্দেশ্য ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে বিদ‘আত ও শিরকে লিপ্ত হয়।

০৬। সূরায়ে নূহে উল্লেখিত ২৩ নং আয়াতের তাফসীর।

০৭। মনের মধ্যে হকের পরিমাণ কম এবং বাতিলের পরিমাণ বেশি থাকা মানুষের স্বভাব সূলভ বৈশিষ্ট্য।

০৮। এতে সালফে সালেহীন থেকে প্রমাণ রয়েছে যে, বিদাতের পরিণতি কি তা শয়তান ভালো করেই জানে।

০৯। আমলকারীর নিয়ত যতই মহৎ হউক না কেন, বিদাআতের পরিণতি কি তা শয়তান ভালো করেই জানে।

১০। অতিরঞ্জনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা এবং অপব্যাখ্যা সম্পর্কে নীতিমালা জানা।

১১। ভাল কাজের উদ্দেশ্য করে হাঁটু গেড়ে কবরের পাশে বসার অপকারিতা।

১২। মূর্তি বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা এবং ওগুলি দূর করার উদ্দেশ্য।

১৩। নূহ (আঃ) এর জাতির ঘটনাগুলির গুরুত্ব জানা এবং এর অতীব প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানা। অথচ মানুষ এ বিষয়েই গাফিল।

১৪। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এই যে, বিদআত পন্থীরা তাফসীর ও হাদীসের কিতাবগুলিতে শিরক ও বিদাতের ফলে আল্লাহ তা‘আলা ও তাদের অন্তরের মাঝখানে বিরাট প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছিল। তার পরও তারা বিশ্বাস করতো যে নূহ (আঃ) এর কওমের লোকদের কাজই ছিল শ্রেষ্ঠ ইবাদত। তারা একথাও বিশ্বাস করতো যে, আল্লাহ ও তার রাসুল যা নিষেধ করেছিলেন সেটিই ছিল এমন কুফরী যার ফলে (শাস্তি ইসলামী সরকারের জন্য) জান-মাল পর্যন্ত বৈধ হয়ে যায়।

১৫। একথা স্পষ্ট যে, তারা সুপারিশ ছাড়া আর কিছু চায়নি। (কিন্তু এই চাওয়াটা আল্লাহর কাছে বাদ দিয়ে সৎ ব্যক্তি বা ওলী/বুজুর্গদের নিকট হয়েছে। এটাই বড় শিরক)

১৬। তাদের ধারণা এটাই ছিল যে, যে সব পন্ডিত ব্যক্তিরা ছবি ও মূর্তি তৈরি করেছিল তারাও শাফায়াত লাভের আশা পোষণ করতো।

১৭। “তোমরা আমার মাত্রারিক্ত প্রশংসা করো না যেমনি ভাবে খ্রিস্টানেরা মরিয়ম তনয়কে করতো।” রাসূল (সাঃ) তাঁর এ মহান বাণীর দাওয়াত তিনি পূর্ণাঙ্গভাবে পৌঁছিয়েছেন।

১৮। বাড়াবাড়ি কারীরা ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে-এই মর্মে আমাদেরকে রাসূলের উপদেশ।

১৯। ইলমকে ভুলে যাওয়ার পরই লোকেরা সূত্রগুলোর পূজা শুরু করে। এতে ইলম থাকার কদর এবং না থাকার ক্ষতি স্পষ্টভাবে বুঝা যায়।

২০। আলেমগণের মৃত্যু ইলম উঠে যাওয়ার কারণ।

 

অধ্যায়-১৯

নেককার লোকের কবরে আল্লাহর ইবাদত করার ক্ষেত্রে যদি কঠোরতা আসে তাহলে নেককার ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে ইবাদত করার ক্ষেত্রে কি কঠোরতা আসতে পারে।
সহীহ হাদীসে আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে। উম্মে সালামাহ আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর নিকট একটি গির্জার বর্ণনা দেন যেটি তিনি হাবশায় দেখেছিলেন এবং তাতে ছিল কয়েকটি ছবি। মহানবী (সাঃ) বললেনঃ

((أُولَٰئِكِ إِذَا مَاتَ فِيهِمُ الرَّجُلُ الصَّالِحُ، أَوِ الْعَبْدُ الصَّالِحُ، بَنَوْا عَلٰى قَبْرِهِ مَسْجِدًا وَّصَوَّرُا فِيهِ تِلْكَ الصُّوَرَ، أُلَٰئِكِ شِرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللهِ)) (صحيح البخارى، الصلاة، باب تنبش قبور مشركي الجاهلية ويتخذ مكانها مساجد، ح:٧٢٤، ٤٣٤، ١٤٣١وصحيح مسلم، المساجد، باب النهي عن بناء المسجد على القبر، ح: ٨٢٥)

“তাদের মধ্যে কোন নেককার লোক অথবা বান্দা মারা গেলে তারা তার কবরে একটি মসজিদ তৈরি করত এবং তাতে ঐ ছবিগুলি তৈরি করত। তারা আল্লাহর নিকৃষ্ট সৃষ্টি। তারা এখানে দুইটি ফিতনা একত্রিত করেছে। কবরের ফিতনা এবং ছবি ফিতনা।” বুখারী ও মুসলিমে আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে। যখন আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর মৃত্যু যন্ত্রণা উপস্থিত হলো তিনি তার মুখে এক টুকরা কাপড় রাখলেন। এতে যখন অসুবিধা দেখা দিল তখন ওটি সরিয়ে ফেললেন। তিনি ঐ অবস্থায় বললেন।

((لَعْنَةُ اللهِ عَلَى الْيَهُودِ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُرَ أنْبِيائهِمْ مَّسَاجِدَ)) (صحيح البخارى، أحاديث الأنبياء، باب ما ذكر عن بني إسرائيل، ح:٣٥٤٣، ٠٩٣١ وصحيح مسلم، المساجد، باب النهي عن ابخاذ القبور مساجد، ح:٩٢٥)

“ইয়াহুদী, খ্রিস্টানদের উপর আল্লাহর অভিশাপ, তারা তাদের নবীগণের কবরগুলিকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে। তিনি তাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এমনটি না হলে তাঁর কবর উন্মুক্ত করা হত। তবে সেটিকে নামাযের স্থান বানিয়ে নেয়া হতে পারে এই আশংকা করা হয়েছে।” [বুখারী ও মুসলিম] জুনদুব বিন আব্দুল্লাহ থেকে মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে। তিনি বলেছেন, আমি মহানবী (সাঃ) কে তাঁর মৃত্যুর পাঁচদিন পূর্বে বলতে শুনেছিঃ

((إِنِّي أَبْرَأُ إِلَى اللهِ أَنْ يَّكُونَ لِي مِنْكُمْ خَلِيْلٌ، فَإِنَّ اللهَ قَدِ اتَّخَذُنِي خَلِيلًا، كَمَا اتَّخَذَ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا، وَلَوْ كُنْتُ مُتَّخِذًا مِّنْ أُمَّتِي خَلِيلًا لَا تَّخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ خَلِيلًا، أَلَا وَإِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوا يَتَّخِذُونَ قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَّسَاجِدَ فَإِنِّي أَنْهَاكُمْ عَنْ ذَٰلِكَ)) (صحيح مسلم، المساجد، باب النهي عن بناء المساجد على القبور، ح:٢٣٥)

“তোমাদের মধ্য থেকে আমার কোন বন্ধু হোক তা থেকে আমি আল্লাহর নিকট মুক্তি কামনা করি। কারণ, আল্লাহ আমাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন যেমন ভাবে ইবরাহীমকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন। আমি যদি আমার উম্মত থেকে কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতাম তাহলে আবু বকরকে গ্রহণ করতাম। জেনে রাখ, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের নবীদের কবরসমূহকে মসজিদ বা সিজদার স্থান বানিয়ে নিয়েছিল। সাবধান! তোমরা কবরগুলোকে মসজিদ বানিয়ে নিও না। আমি এ ব্যাপারে তোমাদের নিষেধ করছি।” তিনি শেষ জীবনে এ বিষয়ে নিষেধ করেছেন। এরপর তিনি এর পরিকল্পনাকারীকে অভিশাপ দিয়েছেন। এখানে মসজিদের অর্থ সিজদার স্থানকে বুঝান হয়েছে। এখানে এ ভুল বুঝলে হবে না যে কবর স্থানে বা পাশে মসজিদ না বানালেও সেখানে নামায পড়া যাবে। হাদীসে বর্ণিত এর অর্থ এটিই। কারণ সাহাবীগণ কেউ তার কবরের পাশে মসজিদ বানাতেন না বা নামায বা সালাত আদায় করতেন বা সিজাদর স্থান বানাতেন না। তাই পৃথিবীর যে স্থানে নামায বা সালাতা বা সিজদা করা হয় সেইটাই মসজিদ। মহানবী (সাঃ) এর হাদীসে এরূপই বলেছেন, “আমার জন্য ভূ-পৃষ্ঠকে মসজিদ ও তাহরাতের (পবিত্রতার) উপকরণ বানান হয়েছে।” তাই কবর স্থানে সালাত আদায়, সিজদা করা মসজিদ বানান একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে এ সবই নিষেধ। ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে মারফুভাবে উত্তম সনদে আহমদে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ

((إِنَّ مِنْ شِرَارِ النَّاسِ مَنْ تُدْرِكُهُمُ السَّاعَةُ وَهُمْ أَحْيَاءٌ، وَّالَّذِينَ يَتَّخِذُونَ الْقُبُورَ مَسَاجِدَ)) (مسند أحمد:٢١٣٤ وصحيح ابن خزيمة، ح:٩٨٧)

“মানুষের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট লোক তারাই যাদের জীবদ্দশায় কিয়ামত আসবে আর তারা ঐ সময় কবরসমূহকে সাজদার স্থান বানিয়ে নিবে।” আবু হাতিম সহীহ হাদীসে এটি বর্ণনা করেছেন।

ব্যাখ্যাঃ

আলোচ্য অধ্যায়ে ও এর পরবর্তী অধ্যায়গুলি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, নবী (সাঃ) স্বীয় উম্মতের হিদায়াতের জন্য একান্ত আগ্রহী ছিলেন। এই জন্য তিনি উম্মতকে প্রত্যেক এমন বিষয় থেকে সতর্ক করে দেন ও তার উপকরণগুলি বন্ধ করে দেন যা কিছু শিরক পর্যন্ত পৌঁছার কারণ হতে পারে। এখানে এমন ধরণেরও শিরকের ব্যপারে কঠোরতা এসেছে যে, কেউ যদি কোন সৎ ব্যক্তির কবরে এই উদ্দেশ্যে আসে যে সে সেখানে একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করবে কিন্তু সেখানের বরকত কামনার মাধ্যমে (কিন্তু এটাও একটি বড় শিরক)। এধরনের উদ্দেশ্য বহুলোকের হয়ে থাকে। তারা মনেকরে যে, সৎস্যক্তির কবর ও তার নিকটবর্তী জায়গা বরকতময় এবং সেখানে ইবাদত করা সাধারণ জায়গা থেকে ভিন্ন (এ বিশ্বাস স্পষ্ট ভ্রান্ত ও শিরকি বিশ্বাস)। যেহেতু ঐ কবরগুলির নিকটে আল্লাহর ইবাদত করার অনুমতি নাই তাহলে উক্ত কবর বা কবরে শায়িত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে কিভাবে ইবাদত জায়েয হবে? অথচ দেখা যায় যে, কবর ভ্ক্তদের প্রবণতা কখনো কবরের দিকে, কখনো কবরেবাসীর প্রতি আবার কখনো দেখা যায় কবরের আশে-পাশে। সুতরাং ওলীদের কবরের ভিত্তি-বাউন্ডারী মাজারে পরিণত হয়। কখনো কবরের লোহার বেস্টনীকেই মা ‘বূদ বানিয়ে নেয়া হয়। কেননা যখন তা স্পর্শ করে বরকতের নিয়তেই স্পর্শ করে এবং তারা সেটিকে আল্লাহর নিকট পৌঁছার উসীলা মনে করে সালাতরত বসার মতই বসে এবং তার ইবাদত করে তার প্রত্যাশা রাখে ও তাকে ভয় পায়। (এ সবই শিরকি বিশ্বাস ও কর্মকান্ড)

في الصحيح عن عائشة … بأن أم سلمة ذكرت … فيه تلك الصور মসজিদ প্রত্যেক ঐ স্থানকেই বলা হয় যে স্থানকে আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্ধারণ করা হয়। আর উক্ত সৎব্যক্তিদের কবরে আস্তানা ও উক্ত কবর ও কবরের আশে পাশের বাউন্ডারীতে তার প্রতিকৃতি এ জন্যই ছিল যে, যেন লোকদেরকে আল্লাহর ইবাদতের দিকেই আহ্বান করার সাথে সাথে উক্ত সৎব্যক্তিদের সম্মান প্রদর্শন করতঃ তাদের কবরকে ইবাদতের স্থান বানিয়ে নিয়েছে আল্লাহর নিকট তারাই সর্বনিকৃষ্ট সৃষ্টি। অথচ উক্ত হাদীসে এ ধরনের কথা নেই যে তারা ঐ সৎলোকদের ইবাদত লিপ্ত হয়েছিল বরং তারা শুধু তাদের কবরকে সম্মান প্রদর্শন করেছিল ও প্রতিকৃতি তৈরি করেছিল। সুতরাং তারা দুই ফিতনার সমন্বয় ঘটিয়েছিলঃ কবরের ফিতনা ও প্রতিকৃতির ফিতনা। আর উভয় ফিতনা হলো মহা শিরকের উসীলা। এ থেকে এ উম্মতের মধ্যে কারো কবরে ইবাদতগাহ বানিয়ে নেয়ার হুশিয়ারিই বুঝতে পারি।

ولهما عنها যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর মৃত্যুআসন্ন হলোঃ طفق يطرح خميصة له على وجهه… হাদীসটি শিরকের উসীলা, ওলী ও সৎলোকদের কবরকে ইবাদত খানায় পরিণত করা ও সৎলোকদের কবরে মসজিদ নির্মাণ করার প্রতি কঠোরতার ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্বপর্ণ হাদীস। কেননা নবী (সাঃ) অতি কষ্ট, অস্থিরতা ও মৃত্যু যন্ত্রণার সময়ও এ বিষটি ভুলে যাননি। বরং তিনি স্বীয় উম্মাতকে শিরকের উসীলাগুলি থেকে বাঁচার জন্য এ অবস্থায়ও অত্যান্ত গুরুত্বারোপ করেন এবং তিনি ইহুদী ও খ্রিস্টানদের প্রতি অভিশাপ ও বদদোয়া করেন। কেননা তারা পূর্ববর্তী নবীদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে। এমতাবস্থায় নবী (সাঃ) এ আশংকা করেন যে, তাঁর পূর্ববর্তী নবীদের কবরকে যেমন মসজিদ বা ইবাদতের স্থান বানিয়ে নেয়া হয়েছে। অনুরূপ হয়ত তাঁর কবরকেও বানিয়ে নেয়া হবে। আর তিনি যে অভিশাপ করেছেন তার দ্বারা প্রকৃত উদ্দেশ্য সাহাবাদেরকে উক্ত কর্ম থেকে সতর্ক করা এবং জানিয়ে দেয়া যে, তাদের ঐ কৃতকর্ম কবীরা গুনাহ ছিল। অতএব এ থেকে তারা যেন বেঁচে থাকে। কোন কবরকে মসজিদ বা ইবাদতের স্থান বানিয়ে নেয়ার তিনটি রূপঃ (প্রথম) কবরে সিজদা করা এ হলো সবচেয়ে ভয়াবহ। (দ্বিতীয়ঃ) কবর সম্মুখে রেখে নামায আদায় করা। এমতাবস্থায় যেহেতু কবর ও তার আশ-পাশের জায়গাকে বিনয়-নম্রতা প্রকাশের জায়গা বানিয়ে নেয়া হয়। অথচ মসজিদ হলো বিনয় ও নম্রতা প্রকাশের স্থান। এজন্যই নবী (সাঃ) কবর সম্মুখে রেখে নামায আদায় করতে নিষেধ করেন। কেননা কবরের দিকে মুখ করে নামায আদায় করা তার সম্মান ও মর্যাদা দানের একটি উসীলা ও কারণ। আর এ অবস্থাটিই শায়খ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাবের অধ্যায়ের সাথে সম্পর্ক রয়েছে। (তৃতীয়ঃ) মসজিদের অভ্যন্তরে কবর দেয়া। ইহুদী ও খ্রিস্টানরা নিবীকে দাফন করে তার কবরের পার্শ্বে বিল্ডিং তৈরি করে তার চারপার্শ্বকে মসজিদে পরিণত করে। সেখানে তারা ইবাদত ও নামায আদায় করত। নবী (সাঃ) কে সাধারণ কবরস্থানে দাফন না করার কারণ। (১) আয়েশা (রাঃ) এর হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, নবী (সাঃ) কে বাইরে সাধারণ কবরস্থানে এই ভয়ে দাফন করা হয়নি যে, তার কবরকে মসজিদ বা ইবাদতের স্থান বানিয়ে সেখানে পূজা করা শুরু হত। (২) কারণ হলো আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, নবী (সাঃ) বলেনঃ “নবীগণের যেখানে মৃত্যু হয় সেখানেই দাফন করা হয়।” সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) নবী (সাঃ) এর ভীতি প্রদর্শন গ্রহন করেন ও তাঁর অসীয়ত অনুযায়ী আমল করতঃ তাঁর রওজা শরীফ (নবী (সাঃ) এর বাড়ী ও তাঁর মিম্বারের মধ্যবর্তী স্থানকে রওজা বলা হয়।) থেকে তিন মিটার বা তার চেয়েও অতিরিক্ত জায়গা নিয়ে প্রথমে এক দেয়াল ছিল তারপর দ্বতীয় দেয়াল তারপর তৃতীয় দেয়াল অতপর লোহার বেড়া দেন। সাহাবাদের একাজটি ছিল নবী (সাঃ) এর নির্দেশের প্রতিফলন। আর এ কাজের জন্য মসজিদেরও কিছু অংশ নেয়াকে তাঁরা বৈধতা দেন যেন নবী (সাঃ) এর কবরের নিকটে সিজদা না দেয়া হয় এবং সেখানে ইবাদত হওয়া থেকে তাঁর কবর সংরক্ষিত থাকে। নিশ্চয়ই কাজটি চিন্তাশীলদের জন্য হয়েছে। কিন্তু যারা চিন্তাশীল ও প্রকৃত বিবেকবান নয় তারা মনে করে যে কবর রয়েছে মসজিদের অভ্যন্তরে। প্রকৃতপক্ষে তো কবর মসজিদের অভ্যন্তরে নয় কেননা কবর ও মসজিদ পৃথক করার জন্য রয়েছে কয়েকটি দেয়াল ও বেড়া এবং কবরের পূর্ব পার্শ্বেও মসজিদের অংশ নয়। ফলকথা নবী (সাঃ) এর কবরকে মসজিদ বা ইবাদতের জায়গা বানিয়ে নেয়া হয়নি।

ولمسلم عن جندب بن عبد الله قال سمعت النبى صلى الله عليه و سلم …. قبور أنبيائهم مساجد বর্তমানে এ উম্মতের মাঝেও অনুরূপ ফিতনা জারী হয়ে চলেছে যেমন ইহুদী ও খ্রিস্টানদের মাঝে ছিল। এ হলো শিরকের বড় মাধ্যম ও কারণ। আর মাধ্যম ও কারণ সব সময় তার পরবর্তী উদ্দেশ্যের দিকে নিয়ে যায়। উলামা ও গবেষকদের ঐক্যমত স্বীকৃত কায়দা হলোঃ শিরক ও অন্যান্য হারাম কর্মের দিকে নিয়ে যাবে এমন ধরনের উসীলা-মাধ্যম ও কারণ সমূহের মুলোৎপাটন করা ওয়াজিব। এজন্যেই কোন কবরে নির্মিত মসজিদে নামায আদায় করা জায়েয নয়। কেননা তা নবী (সাঃ) এর নিষিদ্ধ বিষয়ের পরিপন্থী। অতএব যে মসজিদ কোন কবরে নির্মিত সে মসজিদে এবং কবরের আশে-পাশে নামায আদায় করা জয়েয নয়। সেখানে বরকতের উদ্দেশ্যেই হোক আর জানাযা ব্যতীত অন্যান্য কোন নফলই হোক কোন নামাযই জায়েয নাই। চাই তা কবরে নির্মিত মসজিদ আকারে হোক বা মসজিদ আকারে না হোক। যেমনঃ সহীহ বুখারীতে তালীকারূপে বর্ণনা হয়েছে, ওমর (রাঃ) আনাস (রাঃ) কে এক কবরের নিকট নামায আদায় করতে দেখে বলেন: “কবর” “কবর” অর্থাৎ কবর থেকে বাচুন, কবর থেকে বাচুন (কবরের নিকট নামায আদায় করবেন না) এ থেকে বুঝা গেল যে কবরের পার্শ্বে নামায আদায় করা জায়েয নয়। কেননা তা হলো শিরকের বড় মাধ্যম ও কারণ।

ولأحمد بسند جيد عن ابن مسعود …. أبو حاتم في صحيحه হাদীসে বর্ণিত “যারা কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে।” এর মধ্যে প্রত্যেক ঐ ধরনের লোক অন্তর্ভুক্ত যারা কবরের উপর নামায আদায় করে বা তার দিক হয়ে বা তার নিকটে নামায আদায় করে। এ জন্যই কবরের পার্শ্বে নামায আদায় করার ইচ্ছা পোষণ কারীরা ঐ সমস্ত লোকের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। নবী (সাঃ) যাদের গুণাবলী উল্লেখ করেছেন। প্রিয় পাঠক! এর সাথে সাথে মুসলিম দেশ সমূহে কবরের উপর বিল্ডিং বা কবর পাকা করা ও তার উপর গম্বুজ নির্মাণের যে প্রথা শুরু হয়েছে এবং সেখানে আস্তানা গড়া, তার সম্মান প্রদর্শন, লোকদেরকে তার প্রতি আকৃষ্ট করা, ও উক্ত কবরবাসীদেরকে ওলী সাব্যস্ত ও প্রকাশ করে তাদের ফযীলত ও প্রশংসায় লম্বা-চওড়া কিস্‌সা-কাহিনী বর্ণনা করে প্রমাণ করা হয় যে এ ওলীগণ লোকদের আহ্বান শুনে ও ফরিয়াদ কবূল করে ইত্যাদি। এর দ্বারা বর্তমান ও অতীতকালে খাঁটি ইসলামের চরম অসহায়ত্বের প্রকাশ ঘটে। অবস্থা এতটুকুই নয় বরং তারা এগুলিকে জায়েয বলে এবং এগুলিই তারা তওহীদের অন্তর্ভুক্ত মনে করে। পক্ষান্তরে যারা তাদেরকে এ থেকে নিষেধ করে তাদেরকে তারা অজ্ঞাতার অপবাদ দেয় অথচ এরা তাদেরকে আল্লাহর সাথে আহ্বান করছে, আর তারা তো আহ্বান করছে জাহান্নামের পথে। আল্লাহ তা’আলার নিকট আমরা ক্ষমা ও নিরাপত্তা কামনা করি।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

০১। যে ব্যক্তি নেককারদের কবরের পার্শ্বে আল্লাহর ইবাদত করার জন্য মসজিদ বানায় তার নিয়ত সহীহ হওয়া সত্বেও তার ব্যাপারে রাসূল (সাঃ) এর হুশিয়ারী।

০২। মূর্তি তৈরি সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা এবং এ বিষয়ে কঠোরতা।

০৩। কবরে মসজিদ বা সিজাদার স্থান না বানানোর বিষয়টি তিনি প্রথমেই কিভাবে বর্ণনা করেছেন। অতপর মৃত্যুর পাঁচ দিন পূর্বে তিনি যা বলার তা বলেছেন। তারপর কবর পূজা (কঠোর নিষেধাজ্ঞা) সম্পর্কিত কথাকে তিনি যা বলার তা বলেছেন। অতএব রাসূল (সাঃ) কর্তৃক এ ব্যাপারে অত্যাধিক গুরুত্ব প্রদানের মধ্যেই শিক্ষা ও উপদেশ নিহিত রয়েছে।

০৪। নবী (সাঃ) এর কবর হওয়ার পূর্বেই তাঁর কবরে এরূপ করতে নিষেধাজ্ঞা।

০৫। নবীগণের কবরে এরূপ করা ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের রীতি।

০৬। ঐ সমস্ত কাজের জন্য মহানবী (সাঃ) তাদেরকে অভিশাপ দেন।

০৭। এর উদ্দেশ্য হল আমাদেরকে তাঁর কবর সম্পর্কে সতর্ক করা।

০৮। তার কবরকে উন্মুক্ত না করার কারণ।

০৯। কবরে মসজিদ বানানোর মর্মার্থ।

১০। যারা কবরকে মসজিদে পরিণত করে এবং যাদের উপর কিয়ামত সংঘটিত হবে এ দু’ধরনের লোকের কথা একই সাথে উল্লেখ করেছেন। অতপর কোন পথ অবলম্বন করলে শিরকের দিকে ধাবিত হয় এবং এর পরিণতি কি তাও উল্লেখ করেছেন।

১১। রাসূল (সাঃ) তাঁর ইন্তেকালের পাঁচ দিন পূর্বে স্বীয় খুতবায় বিদআতী লোকদের মধ্যে সবচয়ে নিকৃষ্ট দু’টি দলের জবাব দিয়েছেন। বরং কিছু সংখ্যক জ্ঞানী ব্যক্তিরা এ বিদআতীদেরকে বাহাত্তর দলের বহির্ভুত বলে মনে করেন। এসব বিদআতীরা হচ্ছে “রাফিযী” ও “জাহমিয়া”। রাফিযী দলের কারণেই শিরক এবং কবর পূজা শুরু হয়েছে। সর্বপ্রথম তারাই কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করেছে।

১২। মৃত্যু যন্ত্রণার মাধ্যমে রাসূল (সাঃ) কে যে পরীক্ষা করা হয়েছে তা জানা যায়।

১৩। মহানবী (সাঃ) কে খলীল এর মর্যাদায় ভূষিত করা হয়।

১৪। খুল্লাত হচ্ছে মুহাব্বত ও ভালবাসার সর্বোচ্চ স্থান।

১৫। একথা প্রমাণিত হয় যে, আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) শ্রেষ্ঠ সাহাবী।

১৬। আবু বকর (রাঃ) এর খিলাফতের প্রতি ইঙ্গিত করা।


অধ্যায়-২০

নেককারদের কবরে বাড়াবাড়ি করলে আল্লাহকে বাদ দিয়ে মূর্তির ইবাদত করা হয়।
মালেক তাঁর মুয়াত্তায় বর্ণনা করেছেন, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ

((اَللَّهُمَّ لَا تَجْعَلْ قَبْرِي وَثَنًا يُّعْبَدُ، اِشْتَدَّ غَضَبُ اللهِ عَلٰى قَوْمٍ اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَّسَاجِدَ)) (الموطا لأمام مالك، الصلاة، باب جامع الصلاة، ح:١٦٢ والصف لابن أبي شيبة:٥٤٣)

“হে আল্লাহ, তুমি আমার কবরকে এমন মূর্তিতে পরিণত কর না যার ইবাদত করা হয়। যে জাতি তাদের নবীর কবরগুলোকে মসজিদে পরিণত করেছে সে জাতির উপর আল্লাহ অত্যান্ত রাগান্বিত।” ইবনে জারীর সুফিয়ান হতে, তিনি মানসূর হতে এবং তিনি মুজাহিদ হতে বর্ণনা করেছেনঃ।

﴿أَفَرَءَيْتُمُ ٱلْلَٰتَ وَٱلْعُزَّىٰ﴾

অর্থ- “তোমরা কি লাত ও উয্‌যাকে দেখেছ?” [সূরা নাজম- ১৯] তিনি (সনদে বর্ণিত মুজাহিদ) বলেন, “লাত” লোকদের জন্য ছাতু গুলতো। সে মারা গেলে লোকেরা তার কবরের পাশে অবস্থান গ্রহণ করলো। ইবনে আব্বাসের বরাত দিয়ে আবুল জাওযা ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, সে হাজীদের জন্য ছাতু গুলতো। [বুখারী ও মুসলিম] ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ

((لَعَنَ رَسُولُ اللهِ صلى لله عليه وسلم زَائِرَاتِ الْقُبُورِ، وَالْمُتَّخِذِينَ عَلَيْهَا الْمَسَاجِدَ وَالسُّرُجَ)) (سنن أبي داود، الجنائز، باب فِي زيارة النساء القبور، ح:٦٣٢٣ وجامع الترمذي، الصلاة، باب ما جاء في كراهية أن يتخذ على القبر مسجد، ح:٠٢٣ وسنن النسائي الجنائز، باب التغليظ في اتخاذ السرج على القبر ح:٥٤٠٢)

“আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কবর যিয়ারত কারিনীদের অভিশাপ এবং কবরকে যারা মসজিদ বানিয়ে ও তাতে প্রদীপ জ্বালায় তাদের অভিশাপ দিয়েছেন।” আহ্‌লুস সুনান এটি বর্ণনা করেছেন।

ব্যাখ্যাঃ

শরিয়াতে নেককার ও সাধারণ লোকের কবরের মাঝে কোন পার্থক্য নেই। সকলের কবরের বিধান এক ও অভিন্ন। শরীয়তের দলীলেও নেককার ও অন্যদের কবরের মধ্যে কোন বীশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ নেই। সুতরাং নেককারদের কবরের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি অর্থ হলো, তাদের ব্যাপারে যা হুকুম দেয়া হয়েছে আর যা কিছু নিষেধ করা হয়েছে তার সীমালঙ্ঘন করা। কবরে লিখা, কবর উঁচু করা, তার উপর বিল্ডিং নির্মাণ করা কবরকে মসজিদ বানিয়ে নেয়া, কবরকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উসীলা বা মাধ্যম মনে করা, কবর অথবা কবরবাসীকে তাদের জন্য আল্লাহর নিকট শাফায়াতকারী ধারণা করা। কবরে মানত করা, জবাই করা অথবা কবরের মাটিকে শাফায়াতকারী মনে করা ইত্যাদি সবগুলিকেই আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য লাভের উসীলা বিশ্বাস করা আল্লাহর সাথে মহা শিরক করার অন্তর্ভুক্ত।

روى مالك الموطأ أن رسول الله صلى الله عليه وسلم … لاتجعل قبرى وثنا يعبد … নবী (সাঃ) স্বীয় কবরে পূজা উপাসনা শুরু হওয়ার আশংকায় এ দোয়া ও আশ্রয় প্রার্থনা করেন যে, হে আল্লাহ! আমার কবরকে এমন মূর্তিতে পরিণত করো না, যার পূজা উপাসনা করা হবে। এর উদ্দেশ্যই হলো, যে কবরকে পূজা ও উপাসনা করা হয় তা মূর্তিরই অন্তর্ভূক্ত। আর ঐ পূজার কারণে আল্লাহ অত্যান্ত রাগান্বিত হয়ে থাকেন যা হাদীসের শেষাংশে বর্ণনা করা হয়েছে। শিরক পর্যন্ত পৌছায় এমন উসীলা গ্রহণ করাই কবরের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি। নবী (সাঃ) এই হাদীসে যেখানে কবরের পূজার মাধ্যম বর্ণনা দিয়েছেন সেখানেই তা থেকে বেঁচে থাকার সাথে সাথে ঐ নিকৃষ্ট কাজে লিপ্ত ব্যক্তিদের আল্লাহর মারাত্মক রাগেরও হুশিয়ারী দেন। আরো বর্ণনা দেন যে, পরিশেষে উক্ত উসীলা-মাধ্যমের পরিণতি এ দাঁড়ায় যে, মূর্তির মতই কবরগুলির পূজা শুরু হয়ে যায়। মূলকথা, উক্ত হাদীসে একথায় স্পষ্ট করে দেয় যে, যে কবরের পূজা করা হয় তা মূর্তিই বটে।

ولابن جرير بسنده عن سفيان ….. فعكفرا على قبره لات “লাত” যেহেতু হাজীদেরকে ছাতু গুলে খাওয়াত তার এই কর্মের কারণে লোকেরা তার কবরের ব্যাপারে বাড়াবাড়ির শুরু করে। আর সেখানে সালাতে বসার মত বসার রহস্য হলো, কবরকে সম্মান করত- বরকত, নেকী, উপকার লাভ ও ক্ষতি থেকে বাঁচার আশায় কবরে বসে থাকা। কবরের নিকট উক্ত ভাবে বসাতে কবর মূর্তি ও পূজার আস্তানায় পরিণত হয়।

وعن ابن عباس رضى الله عنهما قال: لعن رسول الله صلى الله عليه وسلم …. কবরে মসজিদ নির্মাণ ও সেখানে বাতি জ্বালান নিষেধ। কেননা তা হলো তার সম্মানে বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন। অতীতকালে কবরে চেরাগ ও মোমবাতি জ্বালানো হত বর্তমানে বড় ধরনের আলোকসজ্জা ও লাইটিং করা হয় যাতে লক্ষ্য স্থল ভালভাবে চিহ্নিত হয় ও ব্যপক সম্মান প্রকাশ পায়। কবরের উপর এরূপ করা নাজায়েয এবং নবী (সাঃ) এর বাণী অনুসারে এগুলো যে করবে সে অভিশপ্ত।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

০১। “আওসান” বা মূর্তির ব্যাখ্যা।

০২। “ইবাদত” এর ব্যাখ্যা।

০৩। যেটি সংঘটিত হওয়ার আশংকা রয়েছে সেটি থেকেই মহানবী (সাঃ) আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন।

০৪। নবীদের কবরকে মসজিদ বানানোর বিষয়টিকে মূর্তিপূজার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন।

০৫। আল্লাহর অত্যন্ত ক্রোধ সম্বন্ধে অবহিত হওয়া।

০৬। এটি এ অধ্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সর্ববৃহৎ মূর্তি “লাতের” ইবাদতের সূচনা কিভাবে হয়েছে তা জানা গেল।

০৭। লাত ছিল একজন নেককার লোক, তা জানা গেল।

০৮। “লাত” প্রকৃতপক্ষে কবরস্থ ব্যক্তির নাম। মূর্তির নামকরণের রহস্য ও উল্লেখ করা হয়েছে।

০৯। মহানবী (সাঃ) কর্তৃক কবর যিয়ারত কারিণীদেরকে অভিশাপ দান।

১০। মহানবী (সাঃ) কর্তৃক কবর আলোকিতকারীকে অভিশাপ দান।


অধ্যায়-২১

মহানবী (সাঃ) কর্তৃক তাওহীদ সংরক্ষণ ও শিরকের পথ রুদ্ধকরণ সম্পর্কিত

﴿لَقَدْ جَآءَكُمْ رَسُولٌ مِّن أَنْفُسِكُم عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِٱلْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ﴾

অর্থ- “তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল তোমাদের দুঃখ কষ্ট তার পক্ষে দুঃসহ, যে হচ্ছে তোমাদের খুবই হিতাকাঙ্খী, মুমিনদের প্রতি বড়ই স্নেহশীল, করুণাপরায়ন।” [সূরা তাওবা- ১২৮] আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেনঃ

((لَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ قُبُورًا وَّلَا تَجْعَلُوا قَبْرِي عِيدًا، وَّصَلُّوا عَلَيَّ فَإِنَّ صَلَاتَكُمْ تَبْلُغُنِي حَيْثُ كُنْتُمْ)) (سنن أبي داود الماسك، باب زيارة القبور، ح:٢٤٠٢)

অর্থ- “তোমরা তোমাদের বাড়ি ঘরগুলোকে কবর বানিয়ে নিও না। আর আমার কবরকে উৎসব স্থল বানিয়ে নিও না। আমার প্রতি দরূদ পড়। কারণ, তোমরা যেখানেই থাক তোমাদের দরূদ আমার নিকট পৌঁছাবে।” [সুনানে আবু দাউদ- ২০৪২] আবু দাউদ উত্তম সনদে এটি বর্ণনা করেছেন। এটির বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত। আলী বিন আল হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি এক ব্যক্তিকে মহানবী (সাঃ) এর কবরে যে দিকে ফাঁকা ছিল সেদিকে আসতে দেখলেন। সে ওখানে ঢুকে দু’আ করবে। তিনি তকে নিষেধ করে বললেন, আমি কি তোমাকে এমন কথা বলব না যেটি আমার পিতার নিকট থেকে শুনেছি। তিনি আমার দাদার নিকট থেকে শুনেছেন। তিনি আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর নিকট থেকে শুনেছেন। তিনি বলেছেনঃ

((لَا تَتَّخِذُوا قَبْرِي عِيدًا وَّلَا بُيُوتَكُمْ قُبُورًا وَّصَلُّوا عَلَيَّ فَإِنَّ تَسْلِيمَكُمْ يَبْلُغُنِي أَيْنَ مَا كُنْتُمْ)) (رواه الضياء المقدسي في المختارة، ح:٨٢٤ ومجمع الزوائد:٤/٣)

“তোমরা আমার কবরকে উৎসব স্থলে পরিণত কর না ও তোমাদের বাড়ি-ঘরকে কবরস্থানে পরিণত কর না। আর আমার উপর দরূদ পড়। কারণ, তোমরা যেখানেই থাক তোমাদের দরূদ আমার নিকট পৌঁছে যায়।” আবু দাউদ এটি নির্বাচিত হাদীস সংকলনে বর্ণনা করেছেন।

ব্যাখ্যাঃ

অর্থৎ তাঁর উম্মত কোন কিছু ক্লেশের মধ্যে পড়ে যাক এটি মহানবী (সাঃ) চান না। আর তিনি যে তাঁর উম্মতের হিতাকাঙ্খী তার দলীল হলো, তিনি তাওহীদের সীমারেখাকে যেমন পূর্ণ ভাবে সংরক্ষণ করেছেন, অনুরূপ আমরা যেন শিরকে পতিত না হই এজন্য সমস্ত পথকে বন্ধ করেছেন।

মূলে আরবীতে ‘ঈদ’ শব্দ এসেছে। এর অর্থ উৎসব স্থান বাচক হতে পারে। যেমন, হাদীসে রয়েছে আবার কাল বাচকও হতে পারে। অর্থাৎ বছরের নির্দিষ্ট সময়ে কবরের নিকট সমবেত হওয়া। “আমার কবরকে উৎসবস্থল বানাইবে না, অর্থাৎ বছরে কোন নির্দ্ধারিত দিবস অথবা নির্দিষ্ট সময়গুলিতে মেলা বা উরস করে সেখানে আগমন করবে না। কেননা এর ফলে নবীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন আল্লাহর সম্মানের মত হয়ে যায়। যেহেতু কবরকে উরস ও মেলা বানানো শিরকের উসীলা এজন্য নবী (সাঃ) বলেন- “তোমরা যেখানেই থাকনা কেন সেখান থেকেই আমার প্রতি দরূদ প্রেরণ কর। কেননা তোমাদের দরূদ ও সালাম আমার নিকট পৌঁছে যায়।”

মহানবী (সাঃ) তাওহীদ সংরক্ষণ করেছেন। শিরকের সকল পথ রুদ্ধ করেছেন। এ পর্যায়ে তিনি তাঁর কবরকে উৎসব স্থলে পরিণত করতে নিষেধ করেছেন। কারণ, এটি শিরকের পথকে সুগম করে। যখন নবী (সাঃ) এর কবরের সম্মানে বাড়াবাড়ি করা নিষেধ তবে অন্য লোকের কবরে এ ধরনের সম্মান করা তো কোন ক্রমেই জায়েয হতে পারে না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও বাস্তব যে, তাঁর অধিকাংশ উম্মত তাঁর নির্দেশনাকে গ্রহণ করে না বরং তাঁর হিদায়াতেও নির্দেশনাকে প্রত্যাখ্যান করে কবরকে মসজিদ ইবাদতের স্থান বানায় ও সেখানে উরস ও মেলা উদযাপন করে। বরং তার উপর গম্বুজ বানায়, আলোক সজ্জা করে বরং সেখানে পশু জবাই করা হয়, কবরের আশে-পাশের স্থানসমূহকে অনুরূপ পূত-পবিত্র মনে করে যেরূপ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত পূত-পবিত্র বরকতময় হারাম শরীফ; বরং কবর-মাজার ভক্তরা নবী বা কোন সৎব্যক্তি বা ওলীর কবরে আসলে এমন বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ ও নিরবতা অবলম্বন করে যে, আল্লহর সামনেও তেমন করে না। এগুলি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) এর সরাসরি বিরোধিতা এবং তাদের সাথে শত্রুতার বহিপ্রকাশ।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

০১। সূরা তাওবার ১২৮ নং আয়াতের ব্যাখ্যা।

০২। শিরকের সীমা এলাকা থেকে তাঁর উম্মতকে অনেক দূরে সরিয়ে ফেলা।

০৩। আমাদের প্রতি ভালোবাসা ও দয়ার বহিঃপ্রকাশ।

০৪। বিশেষ পদ্ধতিতে তাঁর কবর যিয়ারতে নিষেধাজ্ঞা। অথচ তাঁর যিয়ারত সর্বোত্তম কাজের আন্তর্ভুক্ত।

০৫। বেশি বেশি যিয়ারত করতে নিষেধ করা।

০৬। বাড়িতে নফল সালাত পড়তে উৎসাহ দান।

০৭। কবরস্থানে নামায পড়া যাবে না। এটিই সালফে সালেহীনের অভিমত।

০৮। যতদূরেই মানুষ বাস করুক তার দরূদ ও সালাম মহানবীর নিকট পৌঁছে যায়। তাই নৈকট্য লাভের আশায় কবরস্থানে দরূদ পড়ার প্রয়োজন নেই।

০৯। নবী (সাঃ) এর আলমে বরযখে থাকা, তাঁর কাছে তাঁর উম্মতের আমলের মধ্যে দরূদ ও সালাম পেশ করা।

Page- 3

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

© Dawah wa Tablig is the proparty of Md. Shamsul Alam since 2013