Dawah wa Tablig Islamic Website

Site Contact = Mob no. 01783385346 :: Email Address = shalampb@gmail.com

2

Page- 2


অধ্যায়-৮

যে ব্যক্তি কোন গাছ, পাথর প্রভৃতির দ্বারা বরকত অর্জন করতে চায়
আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ

أَفَرَأَيْتُمُ اللَّاتَ وَالْعُزَّى

"তোমরা লাত ও উয্‌যা সম্পর্কে ভেবে দেখেছ? আর তৃতীয় আরেকটি মানাৎ সম্পর্কে? (এ সব অক্ষম, বাকশক্তিহীন, হটা-নড়ার শক্তিহীন মূর্তিগুলোর পূজা করা কতটা যুক্তিযুক্ত)" আবু ওয়াকিদ আল-লাইছী রা.. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, 'আমরা রাসূল সা.. এর সাথে হুনাইনের যুদ্ধের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। আমরা তখন সবেমাত্র ইসলাম গ্রহণ করেছি (নও মুসলিম)। একস্থানে পৌত্তুলিকদের একটি কুলগাছ ছিল যার চারপাশে তারা বসত এবং তাদের সমরাস্ত্র ঝুলিয়ে রাখত। গাছটিকে তারা- ذات أنواط (যাত আনওয়াত) বলত। আমরা একদিন একটি কুলগাছের পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন আমরা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললাম, "হে আল্লাহর রাসূল মুশরিকদের যেমন 'যাতু আনওয়াত' আছে আমাদের জন্যও অনুরূপ 'যাতু আনওয়াত' নির্ধারণ করে দিন। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ

اللهُ أَكْبَرُ , إِنَّهَا السُّنَنُ , قُلْتُمْ وَالَّذِي نَفْسِي بَيَدِهِ كَمَا قَالَتْ بنو إِسْرَائِيلَ : اجْعَلْ لَنَا إِلَهًا كَمَا لَهُمْ آلِهَةٌ- (الأعراف : ١٣٨) لَتَرْكَبُنَّ سَنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ (جامع الترمذي , الفتن , باب ما جاء لتكين سنن من كان قبلكم , ح: . ٢١٨ ومسند أحمد : ٥\٢١٨)

আল্লাহু আকবার, তোমাদের এ দাবিটি পূর্ববর্তী লোকদের রীতি-নীতি ছাড়া আর কিছু নয়। যার হাতে আমার জীবন তাঁর কসম করে বলছি , তোমরা এমন কথাই বলেছ যা বনী ইসরাইল মুসা আ.. কে বলেছিল। তারা বলেছিলঃ [মুসনাদি আহমাদ]

اجْعَل لَّنَا إِلَهًا كَمَا لَهُمْ آلِهَةٌ قَالَ إِنَّكُمْ قَومٌ تَجْهَلُونَ-

অর্থ- "হে মুসা, মুশরিকদের যেমন মা'বুদ আছে আমাদের জন্য তেমন মা'বুদ বানিয়ে দাও। মুসা আ.. বললেন, তোমরা মূর্খের মতো কথা বার্তা বলছ।" [সূরা আ'রাফ ১২৮] তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের রীতি-নীতি অবলম্বন করছ। [জামি তরমিযী, হাদীস নং ২১৮; মুসনাদ আহমাদ, ৫/২১৮; তিরমিযী এ হাদীসটিকে বর্ণনা করে এটাকে সহীহ বলে আখ্যায়িত করেছেন।]

ব্যাখ্যা-

এমন ধরণের কাজের বিধান কি? উত্তর- বরকত হচ্ছে কল্যাণের আধিক্য, স্থায়িত্ব ও অবিচ্ছিন্ন হওয়া। কুরআন ও হাদীস থেকে সাব্যস্ত হল একমাত্র আল্লাহই বরকত দিয়ে থাকেন। আর সৃষ্টির মধ্যে একে অপরকে বরকত দিতে পারে না। আল্লাহর বাণীঃ تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرً- অর্থ- বরকতময় ঐ সত্তা যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফুরকান (কুরআন) অবতীর্ণ করেন। [সূরা ফুরকান- ১] অর্থাৎ ঐ সত্তার কল্যাণসমূহ সুমহান প্রচুর ও স্থায়ী যিনি তাঁর বান্দার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেন। তিনি আরও বলেনঃ وَبَارَكْنَا عَلَيْهِ وَعَلَى إْسْحَقَ- "আমি ইব্রাহীম ও ইসহাকের প্রতি বরকত অবতীর্ণ করেছি।" [সূরা সফ্‌ফাত: ১১৩] তিনি আরও বলেনঃ وَجَعَلْنِي مُبَارَكًا "(ঈসা আ.. বলেন) আল্লাহ আমাকে বরকতময় বানিয়েছেন।" [সূরা মারইয়াম- ৩১] সুতরাং বরকত দানকারী একমাত্র আল্লাহই। অতএব কোন সৃষ্টির জন্য এ কথা বলা বৈধ হবে না যে, আমি অমুক বস্তুকে বরকত দিয়াছি। অথবা আমি তোমাদের কাজকে বরকতময় করব অথবা তোমাদের আগমন বরকতময়; যেহেতু কল্যাণের আধিক্য, স্থায়িত্ব ও অবিচ্ছিন্ন হওয়া তাঁরই পক্ষ থেকে যাঁর হাতে সমস্ত কিছুর ইখতিয়ার। পবিত্র কুরআন ও হাদীসে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ বস্তুর মধ্যে যে বরকত দিয়েছেন তা হয় স্থান অথবা সময়ের মধ্যে বা মানুষের মধ্যে।

প্রথম প্রকার- যেমন- বায়তুল্লাহ শরীফ, বায়তুল মুকাদ্দিস ইত্যাদি। এ সকল স্থানে অফুরন্ত ও স্থায়ী কল্যাণ আছে। এর অর্থ এই নয় যে, এগুলোর মাটি ও দেয়াল অর্জন করতে হবে। এমনি ভাবে হাজারে আসওয়াদ বা কালো পাথরও একটি বরকতমণ্ডিত পাথর। যে ব্যক্তি এটি ইবাদত মূলক এবং অনুসরণ মূলক চুম্বন করবে সে রাসূল (সা..) এর আনুগত্যের বরকত লাভ করবে। ওমর (রা..) কালো পাথর চুম্বন দেয়ার সময় বলেন, 'নিশ্চয় আমি জানি তুমি একটি পাথর, তুমি উপকারও করতে পারবে না আবার অনিষ্টও করতে পারবে না। তার বাণী 'তুমি উপকার করতে পারবে না অনিষ্টও না।' অর্থাৎ তুমি না কারো উপকার বয়ে আনতে পার আর না কারো অনিষ্টের কোন কিছু প্রতিহত করতে পার। অপরদিকে সময়ের বরকতের উদাহরণ হল, রামযান মাস ও আল্লাহর মহিমান্বিত কতকগুলি দিবস। এ সকল দিন ও স্থানের নিজস্ব কোন বরকত নেই; বরং বরকত ও ফজিলত রয়েছে এ সময়ে ও স্থানে আল্লাহর ইবাদত ও বন্দেগীতে যা অন্য সময়ে বা স্থানে নেই।

দ্বিতীয় প্রকার- মানুষের মধ্যে বরকত। আল্লাহ নবী ও রাসূলগণের ব্যক্তি সত্তায় বরকত নিহিত করেছেন। অর্থাৎ তাদের দেহ বরকতমণ্ডিত। হাদীসে রয়েছে, সাহাবায়েকিরাম মহানবীর থুতু ও চুল থেকে বরকত নিতেন। এটি শুধু নবীদের জন্য নির্দিষ্ট। সাহাবীদের ক্ষেত্রে এমন কোন দলিল পাওয়া যায়নি যে, তাদের নিকট থেকে সাধারণ মুসলমানগণ বরকত নিতেন। সাহাবী ও তাবেঈনগণ খলীফা থেকে এ ধরণের কোন বরকত নিতেন না, এমন কি নবীর পর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি আবু বকর (রা..) থেকেও অন্য সাহাবীরা বরকত নিতেন না। অতএব তাদের থেকে বরকতের ধরণ হল আমলের বরকত সত্তার বরকত নয়, যে বরকত নবী (সা..) এর নিকট থেকে নেয়া হত। অতএব আমরা বলব প্রত্যেক মুসলমানেরই বরকত রয়েছে কিন্তু তা সত্তার বরকত নয় বরং তাদের আমলের বরকত, তাদের ইসলাম, ঈমান, ইয়াকীন ও নবীর অনুসরণের বরকত ও সৎব্যক্তিদের অনুসরণ, আলেমদের নিকট থেকে ইলম গ্রহণ ও তাদের ইলম থেকে উপকৃত হওয়া ইত্যাদি। তবে তাদের স্পর্শ করে তাদের উচ্ছিষ্ট গ্রহণ করে বরকত মনে করা না জায়েয। মুশরিকগণ তাদের ভ্রান্ত মা'বূদদের সাথে সম্পর্ক গড়ে কল্যাণ ও তার স্থায়িত্ব ও অবিচ্ছিন্নতা কামনা করে। তাদের রয়েছে বরকত গ্রহণের বহুমুখী পন্থা, যার সবগুলিই শির্‌কী বরকত গ্রহণ পন্থা। অনুরূপ গাছ-পালা, পাথর, বিভিন্ন স্থান, নির্ধারিত গুহা, কবর, পানির ঝর্ণা অথবা অন্য যে সব বস্তুতে অজ্ঞ লোকের বরকতের বিশ্বাস রাখে ও বরকতময় মনে করে তা মহা শিরকের অন্তর্ভুক্ত এবং এগুলো স্পর্শ করা বা সেখানে গড়াগড়ি দেয়া বা সেগুলির সাথে জড়জড়ি করা হয় এই জন্য যে তারা আল্লাহর নিকট তাদের জন্য মধ্যস্থতা করবে এসব করাও মহা শির্‌ক। আর যদি তাতে এও বিশ্বাস পোষণ করা হয় যে, তা আল্লাহর নৈকট্যের উসীলা, ইহা আল্লাহর সাথে বানিয়ে নেয়া হয় এবং ইহাও মহা শির্‌ক। জাহেলী যুগের লোকেরা যে সব বৃক্ষ ও পাথরের তারা ইবাদত করত সেগুলির এবং যে সব কবর থেকে তারা মিথ্যা বরকত নিত সেক্ষেত্রে তার এ ধারণাই রাখত। তারা বিশ্বাস করত যে, নিশ্চয়ই তারা যদি সেখানে আস্তানা গাড়ে অবস্থান নেয় ও তার সাথে জড়াজড়ি করে বা তার উপর ধূলা-বালি ছিটিয়ে দেয়, তবে নিশ্চয়্‌ই এ স্থান বা এ স্থানে যে রয়েছে বা যার আত্মা সেখানে সন্নিবেশিত সে তার জন্য মধ্যস্থতা করবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন। أَلَا لِلَّهِ الدِينُ اخَالصُ وَالَّذِينَ اتَّخَذُو امِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاء مَانَعْبُدُ هُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونا إِلَى اللهِ زُلْفَى- অর্থাৎ "যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছে (তারা বলে) আমরা তাদের ইবাদত শুধু এজন্য করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ায়ে দিবে।" [সূরা যুমার- ৩] আর উক্ত বরকত গ্রহণ ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত, মনে করুন যদি কেউ কবরের মাটি এ উদ্দেশ্যে গ্রহণ করে বা ছিটায় যে নিশ্চয়ই তা বরকতময়, অতএব যদি তা শরীরে মাখে তবে তার শরীরও নিশ্চয়ই বরকতময় হবে। তবে তা ছোট শির্‌ক হবে। কেননা শরীর যাকে বরকতের কারণ হিসেবে গ্রহণ করেনি সে তা কারণ হিসেবে গ্রহণ করেছে। গাছ, পাথর, কবর, অথবা কোন স্থানের মাধ্যমে বরকত অর্জন করা বড় শির্‌ক।

'লাত' হচ্ছে একটি বড় সাদা পাথর যা তায়েফবসীর নিকট ছিল। মহানবী (সাঃ) এর নির্দেশে ওটি ধ্বংস করে দেয়া হয়। 'ওয্‌যা' মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী স্থানের একটি গাছ যেখানে সৌধ নির্মাণ করা হয়। মক্কা বিজয়ের পর এটি কেটে ফেলা হয়। এখানে ছিল একজন মহিলা মহিলা জ্যোতিষী যে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য জ্বিন হাযির করত। তাকেও হত্যা করা হয়। وَمَنَاةَ الثَالِثَةَ اَلْاُخْرَى অর্থ- 'এবং তোমরা কি তৃতীয় অন্য একটি জঘন্য (দেবী) মানাত এর প্রতি লক্ষ্য করেছ?" [সূরা নজম- ২০] 'মনাত' এটিও মুশরিকদের একটি দেবী। তাকে মানাত নামে অভিহিত করার কারণ হল, তার সম্মানে সেখানে বেশী বেশী পশু জবাই করে রক্ত প্রবাহিত করা হত। যার জন্য মানাত বলা হয়। আলোচ্য অধ্যায়ের সাথে উক্ত আয়াতের সামঞ্জস্য লাভ ও মানাত হল দু'টি পাথর ও ওয্‌যা হল একটি বৃক্ষ। মুশরিকগণ এ তিনটির নিকট যা কিছু করত ঠিক ঐ ধরণের কর্মকাণ্ড তার পরবর্তী যুগের মুশরিকগণও পাথর, বৃক্ষ ও গুহার নিকট যেয়ে থাকে। আর এর মধ্যে আরও মারাত্মক হল, কবর কে মা'বূদ বানিয়ে সেখানে ইবাদত ও তার অভিমুখী হওয়া।

নির্দিষ্ট গাছটি সম্পর্কে মুশরিকদের তিনটি আকিদা-বিশ্বাস ছিল, (ক) তারা এটিকে সম্মান করত। (খ) তারা এখানে ভক্তির সাথে নৈকট্য লাভের আশায় অবস্থান করত। (গ) ঐ গাছ তাদের অস্ত্রগুলো ঝুলিয়ে রাখত। এ আশা পোষণ করত যে, গাছটি থেকে অস্ত্রে বরকত চলে আসবে, যার ফলে তা অতি ধারাল হবে ও তার ব্যবহারকারীর জন্য অতি কল্যাণময় হবে। তাদের এ কাজ ছিল মহা শির্‌ক। কেননা তাদের মধ্যে উক্ত তিনটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সাহাবাদের মধ্যে যারা নতুন মুসলমান হয়েছিল তারা বলেছিলঃ يارسول الله اجعل لنا ذات أنواط তারা ধারণা করেছিল যে, নিশ্চয়ই এটি শিরকের অন্তর্ভুক্ত হবে না এবং কালেমায়ে তাওহীদের দ্বারা ঐ কর্ম নাকচ হয় না, এ জন্য উলামায়েকিরাম বলেন, কখনো কখনো কতিপয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিকটও কিছু কিছু শিরকের বিষয় গোপন থেকে যায়। যেমন- সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে কতিপয় আরবী ভাষায় পণ্ডিত ছিলেন, যারা মক্কা বিজয়ের পর ইসলামে দীক্ষিত হন তাদের নিকটও ইবাদতের তাওহীদের এসব প্রকার অস্পষ্ট ছিল। হাদীসে বর্ণিত সাহবাদের উক্ত আকাঙ্ক্ষার জবাবে আল্লাহর রাসূল বলেন- "আল্লাহু আকবার! নিশ্চয়ই এটি ভ্রান্ত পথ। ঐ সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা ঐ ধরণের কথাই বললে যা বনী ইসরাঈল মূসা (আ..)-কে বলেছিল, (হে মুসা) যেমন তাদের মা'বূদ রয়েছে আমাদের জন্যও অনুরূপ মা'বূদ নির্ধারণ করেদিন। নবী (সা..) সতর্কতা স্বরূপ তাদের আকাঙ্ক্ষাকে মূসা (আ..) এর জাতির আকাঙ্ক্ষার সাথে তুলনা করেন। যে আকাঙ্ক্ষা তারা মূর্তিপূজকদের দেখে মুসা (আ..) এর নিকট করেছিল যে, তাদের মত আমাদেরও এক মা'বূদ নির্ধারণ করে দিন। উক্ত সাহাবীগণ তাদের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়ন করেননি নবী তাদেরকে এ থেকে বাধা দেন তাঁরা বিরত হয়ে যান। পক্ষান্তরে তারা তা বাস্তবায়ন করলে অবশ্যই তা বড় শিরকের অন্তর্ভুক্ত হত। কিন্তু তাঁরা যেহেতু শুধু মৌখিক ভাবে চেয়েছিলেন, কার্যে বাস্তবায়ন করেননি, তাই তাঁদের এ কথা ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কেননা তাদের এ চাওয়াতে গায়রুল্লাহর সাথে সম্পর্কের বহিপ্রকাশ ঘটে। এ কারণে নবী সা.. তাদেরকে নতুন করে ইসলাম গ্রহণ করতে বলেননি। এর মাধ্যমে এ কথা স্পষ্ট হয় যে, যে মহা শিরকে মুশরিকগণ নিমজ্জিত ছিল তা শুধু জাতে আনওয়াত থেকে বরকত নেয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং সেখানে সম্মান প্রদর্শন, সেখানে অবস্থান ও ইতিকাফ এবং অস্ত্র ঝুলিয়ে বরকত গ্রহণও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইতিপূর্বে অতিবাহিত হয়েছে যে যখন কোন বৃক্ষ অথবা পাথর অথবা অন্যান্য বস্তু থেকে বরকত গ্রহণের ক্ষেত্রে যদি এ বিশ্বাস অন্তর্ভুক্ত থাকে যে, এ বস্তু আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম এবং তার নিকট তার অভাব তুলে ধরে অথবা সেখান থেকে বরকত গ্রহণ করলে অভাব প্রয়োজন পূর্ণ হওয়ার আরও বেশী আশা থাকে তবে এটি হবে মহা শির্‌ক। এ ধরণের কাজ করে থাকত জাহিলী যুগের লোকেরা। বর্তমান যুগের কবর-মাজার পূজারী ও নানা কুসংস্কারবাদীদের কৃতকর্ম লক্ষ্য করলে দেখা যাবে পূর্বের যুগের কাফির ও মুশরিকগণ লাত, উয্‌যা ও যাতে আনওয়াত এ যা যা করত এবং তাদের ক্ষেত্রে যে বিশ্বাস রাখত বতর্মানের এরা কবর-মাজারেও ঠিক ঐ ধরণের কর্ম আঞ্জাম দিয়ে থাকে এবং ঐ ধরণের বিশ্বাস রাখে। বরং কবর-মাজারের লোহার গ্রিলগুলোর প্রতিও অনুরূপ বিশ্বাস রাখে। যে সব দেশে শির্‌ক ছড়িয়ে রয়েছে, সেখানে বিভিন্ন আস্তানায় দেখা যায় যে, লোকেরা মাজারের দেয়াল বা লোহার জানালাগুলোকে যখন স্পর্শ করে তখন তারা মনে করে যে, তারা যেন দাফনকৃত ব্যক্তিকেই স্পর্শ করছে। অতএব তারা যেহেতু তার সম্মান করছে তাই সে তাদের জন্য মধ্যস্থতা করবে। আর এ ধরণের বিশ্বাস হল আল্লাহর সাথে মহা শির্‌ক। কেননা, সে উপকার গ্রহণ ও অনিষ্ট প্রতিরোধের জন্য সে আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যের সাথে আত্মিক সম্পর্ক গড়েছে এবং তাকে সে আল্লাহর নৈকট্যের মাধ্যম সাব্যস্ত করেছে। যেমন, পূর্বের লোকেরা করেছিল যারা বলেছিলঃ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللهِ زُلْفَ- "আমরা তো তাদের ইবাদত শুধু এই জন্যই করি যে তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকট করে দিবে।" [সূরা যুমার- ৩] আরও একটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয়, যে ব্যাপারে ইতিপূর্বে সতর্ক করা হয়েছে, কতিপয় লোক কোন কোন জায়গায় স্পর্শ নৈকট্য অর্জনের কারণ জ্ঞান করে থাকে। যেমন- কতিপয় অজ্ঞ লোককে দেখা যায়, সে হারাম শরিফে আসে এবং হারামের বা্‌ইরের দরজাগুলো বা দেয়ালের কোন অংশ বা কোন পিলার বরকতের জন্য স্পর্শ করছে। তার বিশ্বাস যদি হয় যে, এ খুটির আত্মা রয়েছে অথবা সেখানে কোন লোক দাফনকৃত রয়েছে অথবা কোন পবিত্র আত্মা এ সবের খেদমত করে থাকে এজন্য সে তো স্পর্শ করে তবে তা মহা শিরকের অন্তর্ভুক্ত। পক্ষান্তরে সে যদি এ বিশ্বাসে স্পর্শ করে যে, এ জায়গা হল বরকতময়, আর তা মুক্তির কারণ হতে পাড়ে তবে তা ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নের বিষয়গুলো জানা যায়।

০১। সূরা নাজমের আয়াত أَفَرَ أَيْتُمُ اللَّاتَ وَالْعُزَّى এর তাফসীর।

০২। সাহাবায়ে কিরামের কাংখিত বিষয়টির পরিচয়।

০৩। প্রকৃত প্রস্তাবে তারা (সাহাবায়ে কিরাম) এ কাজ (শির্‌ক) করেননি।

০৪। তাঁরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে চেয়েছিলেন এ কথা ভেবে যে, আল্লাহ তা (কাঙ্ক্ষিত বিষয়টি) পছন্দ করেন।

০৫। সাহাবায়ে কিরামই যদি এ ব্যাপারে অজ্ঞ থাকেন তাহলে অন্য লোকেরা তো এ ব্যাপারে আরো বেশী অজ্ঞ থাকবে।

০৬। সাহাবায়ে কিরামের জন্য যে অধিক সওয়াব দান ও গুনাহ মাফের ওয়াদা রয়েছে অন্যদের ব্যাপারে তা নেই।

০৭। মহানবী (সা..) তাঁদের ওযর গ্রহণ করেননি বরং তাদের উক্তির প্রতিবাদ করেছেন, 'আল্লাহু আকবার' নিশ্চয়ই এটা পূর্ববর্তী লোকদের নীতি। তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের নীতি অনুসরণ করছ। (এ কথার মাধ্যমে।) উপরোক্ত তিনটি কথার দ্বারা বিষয়টি অধিক গুরুত্ব লাভ করেছে।

০৮। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে 'উদ্দেশ্য'। এখানে এ কথাও জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, সাহাবায়ে কিরামের দাবি মূলত- মুসা (আ..) এর কাছে বনী ইসরাঈলের মা'বুদ বানিয়ে দেয়ার দাবীরই অনুরূপ ছিল।

০৯। রাসূল সা.. কর্তৃক না সূচক জবাবের মধ্যেই তাঁদের জন্য 'লা-ইলাহা ইল্লল্লাহ' এর মর্মার্থ অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে নিহিত আছে।

১০। রাসূল সা.. বিষয়টির উপর কসম করে এটার অধিক গুরুত্ব প্রকাশ করেছেন, আর তিনি কোন বিশেষ কল্যাণ ব্যতীত কসম করতেন না।

১১। শিরকের স্তরের মধ্যে রয়েছে বড় (আকবার) ও ছোট (আসগার), কারণ তারা এর ফলে মুরতাদ (ইসলাম থেকে বরে হয়ে যাওয়া) হয়ে যায় নি।

১২। "আমারা কুফরি যামানার খুব কাছাকাছি ছিলাম" (অর্থাৎ আমরা সবেমাত্র মুসলমান হয়েছি) এ কথার দ্বারা বুঝা যায় যে, অন্যান্য সাহাবায়ে কিরাম এ ব্যপারে অজ্ঞ ছিলেন না।

১৩। আশ্চর্যজনক ব্যাপার যারা 'আল্লাহু আকবার' বলা পছন্দ করে না, এটা তাদের বিরুদ্ধে একটা দলিল।

১৪। ইসলাম ও ঈমান বিরোধী কাজের পথ রুদ্ধ করে দেয়া।

১৫। জাহেলী যুগের লোকদের সাথে নিজেদের সামঞ্জস্যশীল করার নিষেধাজ্ঞা।

১৬। শিক্ষা দেয়ার সময় প্রয়োজন বোধে রাগান্বিত হওয়া।

১৭। 'এটা পূর্ববর্তী লোকদের রীতি-নীতি'- এ বাণী একটা চিরন্তন নীতি।

১৮। মহানবী সা.. এর একটা অন্যতম মুজিযা (নবুয়াতের নিদর্শন)। কারণ, তিনি যেমনটি বলেছিলেন তেমনটি ঘটেছিল।

১৯। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা'আলা ইহুদি ও খৃষ্টানদের চরিত্র সম্পর্কে যে দোষ-ত্রুটির কথা বলেছেন, তা থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করার জন্যই বলেছেন। (অর্থাৎ তারা যে দোষে দোষী, তা আমাদের মধ্যে বিরাজ করলে আমরাও দোষী বলে গণ্য হব।)

২০। তাদের (আহলে কিতাবের) কাছে এ কথা স্বীকৃত যে, ইবাদতের ভিত্তি হচ্ছে (আল্লাহ কিংবা রাসূলের) নির্দেশ। এখানে কবর সংক্রান্ত বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে। من ربك (তোমার রব কে?) দ্বারা যা বুঝান হয়েছে তা সুস্পষ্ট। (অর্থাৎ আল্লাহ শির্‌ক করার নির্দেশ না দেয়া সত্বেও তুমি শির্‌ক করেছ। তাহলে যার হুকুমে তোমার রবের শির্‌ক করছ সে {মিথ্যা ইলাহ} কে?) من نبيك (তোমার নবী কে?) এটা নবী কর্তৃক এ (কবরে সয়াল-জবাব) খবর প্রদান করা। (অর্থাৎ কবরে কি প্রশ্ন করা হবে এ কথা নবী ছাড়া অন্য কেহ বলতে পারে না {কারণ আল্লাহ তাঁকে অবহিত করেছেন}। এখানে এ কথা দ্বারা বুঝান হচ্ছে যে, কে তোমার নবী? তিনি তো শির্‌ক করার কথা বলেননি বরং তিনি শির্‌ক করতে নিষেধ করেছেন। তাহলে তোমার শির্‌ক করার নির্দেশ দাতা {মিথ্যা নবী) কে?) من دينك (তোমার দ্বীন কি?) এ কথা তাদের اجعل لنا آلهة {আমাদের জন্যও ইলাহ ঠিক করে দিন} এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন করা হবে। (অর্থাৎ তোমরা দ্বীন তো শির্‌ক করার নির্দেশ দেয়নি বরং শির্‌ক করতে নিষেধ করেছে, তাহলে তোমাকে শিরকের নির্দেশ দান কারী (বাতিল) দ্বীন কি?

২১। মুশরিকদের রীতি-নীতির মত আহলে কিতাবের (আসমানী কিতাব প্রাপ্তদের; ইহুদী ও খ্রীষ্টান) রীতি-নীতি ও দোষনীয়।

২২। মুশরিক অবস্থায় যে বাতিল এক সময় অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল তা পরিবর্তনকারী একজন নওমুসলিমের অন্তর পূর্বের সে অভ্যাস ও স্বভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। ونحن حدثاء عهد بكفر (আমরা কুফরি যুগের খুব নিকটবর্তী ছিলাম বা নতুন মুসলমান ছিলাম) সাহাবীদের এ কথার দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয়।


অধ্যায়-৯

আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা।
আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ

قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ ومَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ- (الانعام: ١٦٢-١٦٣)

অর্থ- "আপনি বলুন, 'আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ (সবই) আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের উদ্দেশ্যে নিবেদিত, যার কোন শরিক নেই।" [সূরা আন'আম- ১৬২] আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন আরও বলেনঃ

فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحرْ (الكوثر:٢)

অর্থ- "অতএব আপনি আপনার রবের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং করবানী করুন।" [সূরা কাউসার- ২] আলি (রা..) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, 'রাসূল সা.. চারটি বিষয়ে আমাকে অবহিত করেছেন,

لَعَنَ اللهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللهِ , وَلَعَنَ اللهُ مَنْ لَعَنَ وَالِدَيْهِ , وَلَعَنَ اللهُ مَنْ آوَى مُحْدِثًا , وَلَعَنَ اللهُ مَنْ غَيَّرَ مَنَارَ الأَرْضِ- (صحيح ميلم , الأضاحي , باب تحريم الذبح لغير الله تعالي ولعن فاعله ,ح: ١٩٧٨)

(ক) لَعَنَ اللهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللهِ অর্থ- "যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে (পশু) যবহ করে তার উপর আল্লাহর লা'নত।"

(খ) وَلَعَنَ اللهُ مَنْ لَعَنَ وَالِدَيْهِ অর্থ- "যে ব্যক্তি পিতা-মাতাকে অভিশাপ দেয় তার উপর আল্লাহর লা'নত।"

(গ) وَلَعَنَ اللهُ مَنْ آوَى مُحْدِثًا অর্থ- "যে ব্যক্তি কোন বিদাতীকে আশ্রয় দেয় তার উপর আল্লাহর লা'নত।"

(ঘ) وَلَعَنَ اللهُ مَنْ غَيَّرَ مَنَارَ الأَرْضِ অর্থ- "যে ব্যক্তি জমির সীমানা (চিহ্ন) পরিবর্তন করে তার উপর আল্লাহর লা'নত।" [সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৯৭৮] তারিক বিন শিহাব কর্তৃক হাদীসে রাসূল সা.. এরশাদ করেছেনঃ

دَخَلَ الْجَنَّةَ رَجُلٌ فِي ذُبَابٍ – وَدَخَلَ النَّارَ رَجُلٌ فِي ذُبَابٍ – قَالُوا : وَكَيْفَ ذَلِكَ يَا رَسُولَ اللهِ؟ قَالَ : مَرَّ رَجُلَانِ عَلى قَوْمٍ لَهُمْ صَنَمٌ لاَ يَجُوزَهُ أَحَدٌ حَتَى يُقَرِّبَ لَهُ شَيْئًا فَقَالُوا لأَحَدِهُمْ : قَرِّبْ , قَالَ: لَيْسَ عِنْدِي شَيْءٌ أُقَرِّبُ , قَالُوا لَهُ: قَرِّبْ وَلَوْ ذُبَابًا, فَقَرَّبَ ذُبَابًا فَخَلُّوا سَبِيلَهُ, فَدَخَلَ النَّارَ, وَقَالُوا لِلآخَرِ: قَرِّبْ, قَالَ : مَا كُنْتُ لِأُقَرِّبَ لِأَحَدٍ شَيْئًا دُونَ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ , فَضَرَتُوا عُنُقَهُ فَدَخَلَ الْجَنَّةَ- (أخرجه أخمد في كتاب الزهد وأبو نعيم في الحلية:١\٢٠٣ كلاهما موقوفا على ملمان الفارسي)

অর্থ- "এক ব্যক্তি একটি মাছির ব্যাপারে জান্নাতে প্রবেশ করেছে। আর এক ব্যক্তি একটি মাছির ব্যাপারে জাহান্নামে গিয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! এমনটি কিভাবে হল? তিনি বললেন, 'দু'জন লোক এমন একটি কওমের নিকট দিয়ে যাচ্ছিল যার জন্য একটি মূর্তি নির্ধারিত ছিল। উক্ত মূর্তিকে কোন কিছু নযরানা বা উপহার না দিয়ে কেউ সে স্থান অতিক্রম করত না। উক্ত কওমের লোকেরা দু'জনের একজনকে বলল, 'মূর্তির জন্য তুমি কিছু নযরানা পেশ করো'। সে বলল, 'নযরানা দেয়ার মত আমার কাছে কিছুই নেই' তারা বলল, 'অন্তত একটা মাছি হলেও নযরানা দিয়ে যাও।' অতঃপর সে একটি মাছি মূর্তিকে উপহার দিল। তারাও লোকটির পথ ছেড়ে দিল। এর ফলে মৃত্যুর পর সে জাহান্নামে গেল। অপর ব্যক্তিকে তারা বলল, 'মূর্তিকে তুমিও কিছু নযরানা দিয়ে যাও। সে বলল, 'একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নৈকট্য লাভের জন্য আমি কাউকে কোন নযরানা দেই না' এর ফলে তার গর্দান উড়িয়ে দিল। (শির্‌ক থেকে বিরত থাকার কারণে) মৃত্যুর পর সে জান্নাতে প্রবেশ করল। [মুসনাদ আহমাদ, ১/২০৩]

ব্যাখ্যা-

আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে জবাই করার ব্যাপারে হুঁশিয়ারী এসেছে, নিশ্চয়ই তা আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করা। জবাই করার অর্থ হল, 'রক্ত প্রবাহিত করা।' জবাই করার ক্ষেত্রে দু'টি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ- কার নামে জবাই করা হচ্ছে এবং কি উদ্দেশ্যে জবাই করা হচ্ছে। জবাই করার সময় 'বিসমিল্লাহা' বললে তার অর্থ হয়, আমি আল্লাহর নামে, সাহায্য ও তাঁর বরকত কামনা করে জবাই করছি। জবাই করার ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য হল ইবাদত ধর্মী দিক। এ সকল বিবেচনায় এর চারটি অবস্থা হল-

প্রথম- কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে এবং তাঁরই নামে জবাই করা। এটিই হচ্ছে তাওহীদ, এটিই হচ্ছে ইবাদত। অতএব জবাইয়ের সময় দু'টি শর্ত জরুরী, (১) আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে জবাই করবে, (২) আল্লাহর নাম নিয়ে জবাই করবে। যেমন কুরবানীর পশু, হাজ্জে জবাই কৃত পশু, আকীকা ইত্যাদি। যদি কেউ জবাই করার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর নাম না নেয়, তবে তা হালাল হবে না। আর যদি জবাইকৃত পশু দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য উদ্দেশ্য না থাকে এবং অন্য কারো উদ্দেশ্যও না থাকে বরং তা মেহমানদারী বা তা নিজে খাবে এজন্য যদি জবাই করে থাকে, তবে তা জায়েয হবে, এতে শরীয়তের অনুমতি রয়েছে। কেননা আল্লাহর নাম নিয়ে জবাই করেছে ও অন্য উদ্দেশ্যে জবাই করেনি। অতএব তা আল্লাহর হুসিয়ারী ও নিষেধের আওতাভুক্ত নয়।

দ্বিতীয়- আল্লাহর নামে জবাই করা এবং কবরবাসীর নৈকট্য লাভের আশা করা। এটি শির্‌ক যেমন, সে বলে 'বিসমিল্লাহ' আমি আল্লাহর নামে জবাই করছি। এবং সে জবাই করে রক্ত প্রবাহিত করে; কিন্তু এর দ্বারা তার নিয়ত হল দাফনকৃত কোন নবী বা সৎব্যক্তির নৈকট্য অর্জন করা। সুতরাং যদিও সে আল্লাহর নামে জবাই করেছে তবুও তা আর এক দিক দিয়ে শির্‌ক এর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। কেননা সে দাফনকৃত ব্যক্তির সম্মানে এবং নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে রক্ত প্রবাহিত করেছে আল্লাহর জন্য নয়। কোন কোন গ্রাম বা শহরে দেখা যায় যে, তারা যদি কোন আগন্তুকের সম্মান প্রদর্শন করতে চায় তবে তার চতুস্পদ জন্তুর মধ্যে উট বা অন্য কোন প্রাণীর দ্বারা তাকে অভ্যর্থনা জানায় এবং তাঁর সন্তুষ্টির জন্য তা জবাই করে ও তার আগমনের সময় রক্ত প্রবাহিত করে। এ জবাই যদিও আল্লাহর নামে করা হয় তবুও তার দ্বারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে সন্তুষ্ট করা উদ্দেশ্য থাকে, এ জন্য উলামায়ে কিরাম উক্ত কাজকে হারাম ফতোয়া দিয়েছেন। কেননা তাতে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে রক্ত প্রবাহিত হয়েছে। সুতরাং তা খাওয়া জায়েয না। যেহেতু জীবিত কারও সম্মানে জবাই করা ও রক্ত প্রবাহিত করা জায়েয নেই অতএব কোন মৃত (নবী-ওলী) ব্যক্তির সম্মানে জবাই করা তো অবশ্যই হারাম হবে। কেননা রক্ত প্রবাহিত করে শুধু এক আল্লাহরই সম্মানে করা যেতে পারে। কেননা তিনিই রগ-শিরা-উপশিরায় রক্ত চলাচল করান। অতএব এর মাধ্যমে ইবাদত ও সম্মান তাঁরই প্রাপ্য।

তৃতীয়ত- আল্লাহকে বাদ দিয়া অন্যের নামে জবাই করা এবং অন্যের নৈকট্যের আশা করে। এটি উভয় দিক থেকেই শির্‌ক। যেমন কেউ বলে, 'মসীহের নামে' আর এ কথা বলে সে তার হাত জবাইয়ের জন্য চালিয়ে দিল এবং এর দ্বারা মসীহের নৈকট্য ও উদ্দেশ্য করল। এটি দুই দিক দিয়েই মহা শির্‌ক, সাহায্য প্রার্থনাও ইবাদতের শির্‌ক। অনুরূপ কেউ যদি জিলানীম, বাদভী, হুসাইন, যয়নব, খাজা ইত্যাদির নামে জবাই করে তাও মহাশির্‌ক। সাধারণত যাদের দিকে কতিপয় মানুষ ধাবিত হয় তারও বিধান একই। কেননা তাদের নামে জবাই করার সময় তাদের নিয়ত উদ্দেশ্য তাদের নৈকট্য অর্জন হয়ে থাকে। এজন্য উক্ত দু'ভাবেই এক্ষেত্রে শির্‌ক হয়ে থাকে।

চতুর্থত- আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে জবাই করে তা আল্লাহ তা'আলার জন্য উৎসর্গ করা যা অতি বিরল। তবে কখনো এরূপ হয়ে যে, কোন ওলির নামে জবাই করে তার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য কামনা করা হয়। এ ধরণের কার্যকলাপই প্রকৃত পক্ষে সাহয্য প্রার্থনা ও ইবাদতে শিরক হয়ে থাকে। ফলকথা, আল্লাহ ব্যতীত অন্যের উদ্দেশ্যে জবাই ইবাদতের শির্‌ক এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নাম নিয়ে পশু জবাই সাহয্য প্রার্থনায় শির্‌ক হয়ে থাকে। আর এ জন্যই আল্লাহ তা'আলা বলেন,

وَلاَ تَأكُلُوا مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللهِ عَلَيْهِ وَإِنَّهُ لَفِسْقٌ وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَى أَوْلِيَآئِهِمْ لِيُجَدِلُوكُمْ وَإِنْ أَطَعْتُمُو هُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ –

অর্থ- 'আর যে জন্তু জবাই করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়নি, তা তোমরা ভক্ষণ করো না, কেননা এটা গর্হিত বস্তু, শয়তান নিজেদের সঙ্গী-সাথীদের মনে নানা প্রকার সন্দেহ ও প্রশ্ন সৃষ্টি করে থাকে, যেন তারা তোমাদের সাথে ঝগড়া ও বিতর্ক করতে পারে, যদি তোমরা তাদের আকীদা-বিশ্বাস ও কাজ-কর্মে আনুগত্য কর, তবে নিঃসন্দেহে তোমরা মুশরিক হয়ে যাবে।' [সূরা আন'আম- ১২১]

আয়াতে প্রমাণিত হয় যে, জবাই করা ও সালাত পড়া দু'টি ইবাদত। আর তা একমাত্র আল্লাহর জন্যই।

আল্লাহর যে কোন নির্দেশই ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, ইবাদত এমন একটি ব্যাপক নাম যাতে আল্লাহর নিকট প্রিয় ও পছন্দনীয় সকল প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য কথা ও কাজ অন্তর্ভুক্ত। অতএব আল্লাহ যেহেতু সালাতের নির্দেশ দিয়েছেন সুতরাং তা প্রিয় ও ইবাদত।

উক্ত হাদীসটি আলোকপাতের উদ্দেশ্য হল, (রাসূল সা.. এর বাণী) 'যে ব্যক্তি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যের নামে জবাই করে আল্লাহ তাকে অভিসম্পাত দেন।' অর্থাৎ আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যকে সম্মান প্রদর্শন ও অন্যের নৈকট্য অর্জনের জন্য তার প্রতি অভিশাপ। লা'নতের অর্থ- আল্লাহর রহমত থেকে বিতাড়িত করা। সুতরাং যে ব্যক্তির উপর স্বয়ং আল্লাহর লা'নত-অভিশাপ করেন, তাকে তিনি স্বীয় বিশেষ রহমত থেকে বিতাড়িত করেন। পক্ষান্তরে আল্লাহর আম-ব্যাপক রহমত মুসলমান, কাফের সবার মধ্যে পরিব্যাপ্ত। জেনে রাখা উচিত, যে পাপের সাথে অভিশাপের হুঁশিয়ারী জড়িত তা কবীরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নৈকট্য ও সম্মানের উদ্দেশ্যে যেহেতু জবাই করা শির্‌ক এ জন্য শিরকে পতিত ব্যক্তি আল্লাহর অভিশাপ ও হুঁশিয়ারী ও তাঁর রহমত থেকে বিতাড়িত হওয়ারই উপযুক্ত।

হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, নিশ্চয়ই জবাই করে দেবতার নৈকট্য অর্জন জাহান্নামে প্রবেশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর যা বুঝা যায় যে ঐ কাজ করেছে সে মুসলমান ছিল। কিন্তু সে যা করেছে তার ফল জাহান্নামে গেছে। অতএব এটা প্রমাণ করে যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে জবাই করা আল্লাহ তা'আলার সাথে মহা শির্‌ক। কেননা তাঁর বাণী, 'সে জাহান্নামে প্রবেশ করে' প্রমাণ করে যে, অর্থাৎ তা তার জন্য স্থায়ী ভাবে অপরিহার্য হয়ে যায়। উক্ত হাদীস থেকে এটাও প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নৈকট্যের জন্য মাছির মত নগণ্য প্রাণী মানসিক-নজরানা পেশ করায় যখন ঐ ব্যক্তির জাহান্নামে যাওয়ার কারণে পরিণত হয়েছে। তবে যা কিছু তার চেয়ে উপকারী ও বড় তা নজরানা পেশ করাতে জাহান্নামে যাওয়ার বড় কারণ হয়ে দাঁড়াবে। উক্ত হাদীস তার বাণী, قرب 'নজরানা পেশ কর' অর্থাৎ নৈকট্য অর্জনের জন্য জবাই কর। এ থেকে বুঝা যায় যে, ঐ জাতির লোকেরা উক্ত পথিকদেরকে সে কাজের জন্য বাধ্য করেনি, কেননা তার পূর্বে এরও বর্ণনা রয়েছে যে, তারা কাউকে নজরানা পেশ করা ব্যতীত ঐ রাস্তা দিয়ে অতিক্রম করতে দিত না। তাতে বাধ্যবাধকতা ছিল না। অতএব সে যদি চাইত তবে বলতে পারত যেখান থেকে আমি এসেছি সেখানে ফিরে যাব। তবে যদি বলা হয় নজরানা পেশ না করার জন্য হত্যার হুমকি দিয়েছিল, এজন্য সে ঐ কাজ করার জন্য বাধ্য ছিল আর বাধ্য করা অবস্থায় কোন কিছু ধর্তব্য নয়। এর উত্তর হল, এ ঘটনা ছিল আমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের। বাধ্য করা অবস্থায় কুফরী কালাম বা কুফরীকর্ম ঈমানের স্থিতিশিলতা ও দৃঢ়তার সাথে জায়েয হওয়া এ উম্মতের জন্য খাস। পূর্ববর্তী উম্মতের জন্য এর বৈধতা ছিল না।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়

০১। قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي এ আয়াতের ব্যাখ্যা।

০২। فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَر এ আয়াতের ব্যাখ্যা।

০৩। প্রথম অভিশপ্ত ব্যক্তি হচ্ছে গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু জবাইকারী।

০৪। যে ব্যক্তি নিজ পিতা-মাতাকে অভিশাপ দেয় তার উপর আল্লাহর লা'নত। এর মধ্যে এ কথাও নিহিত আছে যে, তুমি কোন ব্যক্তির পিতা-মাতাকে অভিশাপ দিলে সেও তোমার পিতা-মাতাকে অভিশাপ দেবে।

০৫। যে ব্যক্তি বাদআতীকে আশ্রয় দেয় তার উপর আল্লাহর লা'নত। বিদআতী হচ্ছে ঐ ব্যক্তি, যে দ্বীনের মধ্যে এমন কোন নতুন বিষয় আবিস্কার বা উদ্ভাবন করে, যাতে আল্লাহর হক ওয়াজিব হয়ে যায়। এর ফলে সে এমন ব্যক্তির আশ্রয় চায় যে তাকে উক্ত বিষয়ের দোষ ত্রুটি বা অশুভ পরিণতি থেকে রক্ষা করতে পারে।

০৬। যে ব্যক্তি জমির সীমানা বা চিহ্ন পরিবর্তন করে তার উপর আল্লাহর লা'নত। এটা এমন চিহ্নিত সীমানা যা তোমার এবং তোমার প্রতিবেশীর জমির আধিকারের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করে। এটা পরিবর্তনের অর্থ হচ্ছে, তার নির্ধারিত স্থান থেকে সীমানা এগিয়ে আনা অথবা পিছনে নিয়ে যাওয়া।

০৭। নির্দিষ্ট ব্যক্তির উপর লা'নত এবং সাধারণভাবে পাপীদের উপর লা'নতের মধ্যে পার্থক্য।

০৮। এ গুরুত্বপূর্ণ কাহিনীটি মাছির কাহিনী হিসেবে পরিচিত।

০৯। জাহান্নামে প্রবেশ করার কারণ হচ্ছে ঐ মাছি, যা নযরানা হিসেবে মূর্তিকে দেয়ার কোন ইচ্ছা না থাকা সত্বেও কওমের অনিষ্টতা হতে বাঁচার উদ্দেশ্যে সে [মাছিটি নযরানা হিসেবে মূর্তিকে দিয়ে শির্‌কী] কাজটি করেছে।

১০। মুমিনের অন্তরে শিরিকের [মারাত্বক ও ক্ষতিকর] অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ। নিহত (জান্নাতী) ব্যক্তি নিহত হওয়ার ব্যাপারে কি ভাবে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু তাদের দাবির কাছে সে মাথা নত করেনি। অথচ তারা তার কাছে কেবলমাত্র বাহ্যিক আমল ছাড়া আর কিছুই দাবি করেনি।

১১। যে ব্যক্তি জাহান্নামে গিয়েছে সে একজন মুসলমান। কারণ সে যদি কাফের হত তাহলে এ কথা বলা হত না دخل النار فى ذباب একটি মাছির ব্যাপারে সে জাহান্নামে প্রবেশ করেছে। [অর্থাৎ মাছি সংক্রান্ত শিরক ঘটনার পূর্বে সে জান্নাতে যাওয়ার যোগ্য ছিল]

১২। এতে সেই সহীহ হাদীসের পক্ষে সাক্ষ্য পাওয়া যায়, যাতে বলা হয়েছে। الجنة أقرب إلى أحدكم من شراك نعله والنار مثل ذلك অর্থাৎ, 'জান্নাত তোমাদের কোন ব্যক্তির কাছে তার জুতার ফিতার চেয়েও নিকটবর্তী। জাহান্নামও তদ্রুপ নিকটবর্তী]

১৩। এটা জেনে নেয়া প্রয়োজন যে, অন্তরের আমলই হচ্ছে মূল উদ্দেশ্য। এমনকি মূর্তিপূজকদের কাছেও এ কথা স্বীকৃত।


অধ্যায়-১০

যে স্থানে গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে[পশু] জবাই করা হয় সে স্থানে আল্লাহর উদ্দেশ্যে জবাই করা শরিয়ত সম্মত নয়
আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ

لاَتَقُمْ فِيهِ أَبَدً –

অর্থ- "হে নবী, আপনি কখনো সেখানে দাঁড়াবেন না।" [সূরা তওবাহ- ১০৮]
সাহাবী সাবিত বিন আদ-দাহ্‌হাক রা.. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেনঃ

نَذَرَ رَجُلٌ أَنْ يَنْحَرَ إِبِلاً بِبُوَانَةَ فَسَأَلَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ هَلْ كَانَ فِيهَا وَثَنٌ مِنْ أَوْثَانِ الْجَاهِلِيَّةِ يُعْبَدُ؟ قَالُوا: لاَ, قَالَ هَلْ كَنَ فِيهَا عِيدٌ مِنْ أَعْيَادِهِمْ؟ قَالُوا لاَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَوْفِ بِنَذْرِكَ فَإِنَّهُ لاَ وَفَاءَ لِنَذْرٍ فِي مَعْصِيَةِ اللهِ وَلاَ فِيمَا لاَيَمْلِكُ ابْنُ آدَمَ – (سنن أبي داود, باب ما نؤمر يه من وفاء النذر , ح: ٣٣١٣ والسنن الكبرى للبيهقي , ح: ١٠\٨٣)

অর্থ- "এক ব্যক্তি বুওয়ানা নামক স্থানে একটি উট কুরবানী করার জন্য মান্নত করল। তখন রাসূল সা.. জিজ্ঞাসা করলেন, 'সে স্থানে এমন কোন মূর্তি ছিল কি, জাহেলিয়াত যুগে যার পূজা করা হতো?' সাহাবায়ে কিরাম বললেন, 'না'। তিনি বললেন, 'সে স্থানে কি তাদের কোন উৎসব বা মেলা অনুষ্ঠিত হতো?' 'তারা বললেন, 'না।' [অর্থাৎ তেমন কিছু হতো না] তখন রাসূল সা.. বললেন, 'তুমি তোমার মান্নত পূর্ণ করো।' তিনি আরও বললেন, 'আল্লাহর নাফরমানীমূলক কাজে মান্নত পূর্ণ করা যাবে না। আদম সন্তান যা করতে সক্ষম নয় তেমন মান্নতও পূরা করা যাবে না।" [সুনান আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৩১৩; সুনান কাবীরুল বায়হকী, হাদীস নং ১/৮৩; হাদীসটি সনদ বুখারী ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ।]

ব্যাখ্যাঃ

এ অধ্যায়ে বর্ণিত مكان (মাকান) দ্বারা নির্ধারিত স্থান ও তার পার্শ্ববর্তী স্থান বুঝানো হয়েছে। আর এ দুটি অর্থই এক্ষেত্রে উদ্দেশ্য অর্থাৎ যে স্থানে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের উদ্দেশ্যে জবাই করা হয় সে-স্থানের পার্শ্বে জবাই করা যাবে না। এমনকি সে স্থানেও জবাই করা যাবে না যেখানে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের উদ্দেশ্যে জবাই হয়। কেননা তাতে উভয় অবস্থাতেই যারা গায়রুল্লাহর জন্য জবাই করে তাদের সাথে মিল ও সাদৃশ্য হয়ে যায়। উক্ত মাসালার উদাহরণ হল, মনে করুন, যদি কোন স্থানে, মুশরিক ও কুসংস্কারপন্থী ও বিদা'আতীরা কবরবাসীর বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে মাজার বা আস্তানায় গায়রুল্লাহর নামে জবাই করে তবে সেখানে নিশ্চয়ই তাওহীদবাদী মুসলমানদের জন্য জবাই করা জায়েয হবে না, যদিও উক্ত জবাই একমাত্র আল্লাহরই উদ্দেশ্যে হয়। কেননা এভাবে ঐ স্থানের মর্যাদা দেয়াতে ঐ সমস্ত মুশরিকদের সদৃশ হয়ে যায়, যারা ঐ সব স্থানে গায়রুল্লাহর জন্য বিভিন্ন ইবাদত আঞ্জাম দিয়ে থাকে। সুতরাং যেখানে গায়রুল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু জবাই হয় সেখানেই আল্লাহর উদ্দেশ্যে জবাই করা শুধু হারাম ও নাজায়েয নয় বরং তা শিরকের বাহন, যাতে সে স্থানের তা'জীম সম্মান প্রদর্শিত হয়। যার হুকুম হল হারাম ও শিরকের মাধ্যম।

মুনাফিকদের তৈরি করা মসজিদে যিরার ক্ষেত্রে এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। কারণ, এটি প্রতিষ্ঠাকরা হয়েছিল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি চ্যালেঞ্জ করে। অতএব, যদি সেখানে সলাত আদায় করা হত তবে তার দ্বারা সলাতে তাদের সাথে অংশগ্রহণ করা হত, যা না জায়েয। কেননা সেখানে সালাত আদায়ে তাদেরকে সমর্থন করা, তাদের দল বৃদ্ধি এবং সাধারণ লোকদের জন্য জায়েয সাব্যস্ত হয়ে যেত। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী সা.. ও মুমিনদেরকে মসজিদে যিরারে সালাত আদায়ে নিষধ করেন। যদি তিনি সা.. ও মুমিনগণ সেখানে সালাত আদায় করতেন তবে তা একমাত্র আল্লাহর জন্যই করতেন এবং সেখানে সলাত আদায় করার দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য দ্বীনের ক্ষতিসাধন বা বিভেদ সৃষ্টি বা আল্লাহর বিরোধিতা কোনক্রমে থাকত না। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁদেরকে এ জন্য সেখানে সালাত আদায় করার দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য দ্বীনের ক্ষতি সাধন বা বিভেদ সৃষ্টি বা আল্লাহর বিরোধিতা কোনক্রমেই থাকত না। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁদেরকে এ জন্য সেখানে সালাত আদায়ে নিষেধ করা হয়েছে, যেন তাতে মোনাফেকদের সাথে অংশগ্রহণ ও সদৃশ না হয়ে যায়। অনুরূপ যে স্থানে গায়রুল্লাহর জন্য পশু জবাই করা হয় সেখানে আল্লাহর জন্যও পশু জবাই জায়েয নয় যদিও তার দ্বারা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য হয়। কেননা এর দ্বারা উক্ত স্থানের সম্মান করা হয় যা মুশরিকদের সাথে সদৃশ হয় যায়।

মহানবী সা.. তার নিকট ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন। কারণ, এটি ব্যাখ্যার দাবি রাখে। পূর্বে এখানে কোন জাহেলী যুগের মূর্তি থেকে থাকলেও সেখানে জবাই করা জয়েয হবে না- এ কথা বলার উদ্দেশ্যেই হাদীসটি এখানে আনা হয়েছে। রাসূল সা.. এর বাণীঃ فهل كان فيها عيد اعيادهم؟ فقالوا: لا ঈদ- এমন একটি স্থান বা সময়কে বলা হয় যার দিকে বার বার ফিরে আসা হয়, যা বার বার ফিরে আসে। সুতরাং কোন জায়গাকে ঈদ এ জন্য বলা হয় যে, সেখানে লোকদের বার বার আগমন ঘটে এবং একটি নির্ধারিত সময়ে তার দিকে মানুষ প্রত্যাবর্তন করে। অতএব তাঁর বাণী 'সেখানে কি তাদের কোন ঈদ হত? অর্থাৎ স্থানের ঈদ ও কালের ঈদ। আর মুশরিকদের ঈদসমূহ চাই স্থান সূচক ঈদ হোক বা কাল সূচক। তাদের শিরকী ধর্মের উপরেই তার ভিত্তি হবে। অর্থাৎ তারা তাদের ঈদ সমূহে শির্‌কী ইবাদতসমূহই পালন করে থাকবে এবং ঐ সমস্ত জাযগায় যেখানে তারা অন্যান্য অনেক কাজ করে থাকে, সেখানকার সবচেয়ে বড় কাজ হল গায়রুল্লাহর নৈকট্যের জন্য জবাই করা ও রক্ত প্রবাহিত করা। সুতরাং এ থেকে বুঝাযায় যে, মুশরিকরা যেখানে গায়রুল্লাহর নিকট্যের জন্য জবাই করে সেখানে তাদের সাথে শরীক হয়ে তাদের প্রকাশ্যে সাদৃশ্য গ্রহণ করা কোনক্রমেই জায়েয হবে না। যদিও সেখানে একমাত্র আল্লাহর নৈকট্য জবাই হয়ে থাকে অথবা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যেই সালাত আদায় হোক না কেন?

রাসূল সা.. উক্ত ব্যক্তিকে বলেন, 'তোমার মানত পূর্ণ কর কেননা আল্লাহর নাফরমানীতে কোন মানত পূর্ণ করা যাবে না….' উলামায়ে কিরাম বলেন, হাদীসের فإنه এর 'ফা' فا এই কথাই প্রমাণ করে যে এ মানত পূর্ণ করার বৈধতার কারণ হল, এ মানতে আল্লাহর নাফরমানী নেই। আর নবী সা.. এর ঐ ব্যক্তির নিকট থেকে ব্যাখ্যা দাবী ঐ কথার প্রমাণ বহন করে যে, যেখানে কোন মূর্তি পূজা হয় অথবা মুশরিকদের ঈদ-উৎসব হয়, সেখানে আল্লাহর জন্য জবাই করাও আল্লাহর নাফরমানীর অন্তর্ভুক্ত।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

০১। لاَ تَقُمْ فِيهِ أَبَدًا এ আয়াতের তাফসীর।

০২। দুনিয়াতে যেমনি ভাবে পাপের (ক্ষতিকর) প্রভাব পড়তে পারে তেমনিভাবে (আল্লাহর) আনুগত্যের (কল্যাণময়) প্রভাবও পড়তে পারে।

০৩। দুর্বোধ্যতা দূর করার জন্য কঠিন বিষয়কে সুস্পষ্ট ও সহজ বিষয়ের দিকে নিয়ে যাওয়া যায়।

০৪। প্রয়োজন বোধে 'মুফতী' জিজ্ঞাসিত বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ (প্রশ্নকারীর কাছে) চাইতে পারেন।

০৫। মান্নতের মাধ্যমে কোন স্থানকে খাস করা কোন দোষের বিষয় নয়, যদি তাতে শরিয়তের কোন বাধা-বিপত্তি না থাকে।

০৬। জাহেলি যুগের মূর্তি থাকলে তা দূর করার পরও সেখানে মান্নত করতে নিষেধ করা হয়েছে।

০৭। মুশরিকদের কোন উৎসব বা মেলা কোন স্থানে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকলে, তা বন্ধ হওয়ার পরও সেখানে মান্নত করা নিষিদ্ধ।

০৮। মুশরিকদের উৎসব স্থলে মানত করলে তা পূর্ণ করতে হবে না। কারণ তা অবাধ্যতার মানত।

০৯। মুশরিকদের উৎসব বা মেলার সাথে কোন কাজ সাদৃশ্যপূর্ণ ও সামঞ্জস্যশীল হওয়ার ব্যাপারে খুব সাবধান থাকতে হবে।

১০। পাপের কাজ কোন মানত নেই।

১১। যে বিষয়ের উপর আদম সন্তানের কোন হাত নেই সে বিষয়ে মান্নত পূরা করা যাবে না।


অধ্যায়-১১

আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারোর উদ্দেশ্যে মানত করা শির্‌ক।
আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ

يُوفُونَ بِاالنَّذْر &narsh; (الدَّهَرِ: ٧)

অর্থ- "তারা মানত পূর্ণ করে।" [সূরা দাহর- ৭] আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ

وَمَا أَنفَقْتُم مِّن نَّفَقَةٍ أَوْ نَذَرْتُم مِّن نَّذْرٍ فَإِنَّ اللهَ يَعْلَمُهُ – (البقرة: ٢٧٠)

অর্থ- "আর তোমরা যা কিছুই খরচ কর আর যে কোন মানতই কর, আল্লাহ তা জানেন।" [সূরা বাকারাহ- ২৭০] সহীহ বুখারীতে আয়েশা রা.. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সা.. বলেছেনঃ

مَنْ نَذَرَ أَنْ يُطِيعَ اللهَ فَلْيُطِعْهُ وَمَنْ نَذَرَ أَنْ يَعْصِيَهُ فَلاَ يَعْصِهِ (صحيح البخاري , الأيمان والنذور , باب في الطاعة &narsh; الخ , ح: ٦٦٩٦, ٦٧٠٠ وسنن أبي داود الأيمان والنذور , باب النذر في المعصة, ح:٣٢٨٩)

অর্থ- "যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের কাজে মান্নত করে সে যেন তা পুরা করার মাধ্যমে তাঁর আনুগত্য করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানীমূলক কাজে মান্নত করে সে যেন তাঁর নাফরমানী না করে"। (আর্থাৎ মান্নত যেন পুরা না করে।) [সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৬৬৯৬, ৬৭০০; সুনান আবূ দাউদ, হাদীস নং- ৩২৮৯]

ব্যাখ্যাঃ

এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা মানত পূর্ণকারীদের প্রশংসা করেন। এতে প্রমাণীত হয় যে, মানত শরীয়তসম্মত ও আল্লাহর প্রিয় ও ইবাদত। আর যেহেতু এটি ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত, ফলে তা গায়রুল্লাহর জন্য পালন করা মহা শির্‌ক।

এ হাদীস জায়েয মানত পূর্ণ করার নির্দেশ রয়েছে, এ থেকে বুঝা যায়, এটি আল্লাহর প্রিয় ইবাদত। কেননা যা কিছু ওয়াজিব তাই ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত এবং যা কিছু তার মাধ্যম বা মানতপ পুরা করা সেগুলিও ইবাদত; অতএব মানত পুরা করাও মানতের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যদি মানতই না মানা হয় তবে পূর্ণই বা কি হবে? এ জন্য মানুষ যে মানতের ইবাদতকে নিজেই নিজের জন্য অপরিহার্য করেছে তা (মানত) পূর্ণ করা ওয়াজিব। রাসূল সা.. এর বাণীঃ ومن نذر أن يعصي الله فلا يعصه অর্থাৎ- "যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানীর মানত করবে, সে যেন তাঁর নাফরমানী না করে।" তা হবে মানুষের নিজের উপরে নিজে আল্লাহর নাফরমানীকে অপরিহার্য করে নেয়া; কেননা আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা পাপাচার, তা আল্লাহর (ইবাদতের) সাথে সাংর্ঘর্ষিক, বরং এ ধরণের লোকের জন্য (নাফরমানির) মানত বা শপথের কাফ্ফারা অপরিহার্য হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলার জন্য মানত করা ভাল ইবাদত এবং গায়রুল্লাহর নামেও মানত করা (ভ্রষ্ট) ইবাদত। অতএব গায়রুল্লাহর জন্য মানতকারী যখন স্বীয় মানত পূর্ণ করে তখন সে গায়রুল্লাহর ইবাদত করল (অর্থাৎ মহা শির্‌ক করল) পক্ষান্তরে আল্লাহর জন্য মানতকারী যখন স্বীয় মানত পূর্ণ করল তখন সে আল্লাহরই ইবাদত করল।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নের বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

১। নেক কাজে মানত পুরা করা ওয়াজিব।

২। মান্নত যেহেতু আল্লাহর ইবাদত হিসেবে প্রমাণিত, সেহেতু গাইরুল্লাহর জন্য মানত কারা শির্‌ক।

৩। আল্লাহর নাফরমানীমূলক কাজে মান্নত পূরণ করা জায়েয নয়।


অধ্যায়-১২

আল্লাহ ব্যতীত গাইরুল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া শির্‌ক।
আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ

وَأَنَّهُ كَانَ رِجَالٌ مِّنَ الْإِنسِ يَعُودُونَ بِرِجَالٍ مِّنَ الْجِنِّ فَزَادُوهُمْ رَهَقًا- (الجن:٦)

অর্থ- মানুষের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক লোক কতিপয় জ্বিনের কাছে আশ্রয় চাইতেছিল, এর ফলে তাদের [জ্বিনদের] গর্ব ও অহমিকা আরো বেড়ে গিয়েছিল। [সূরা জ্বিন- ৬] খাওলা বিনতে হাকীম থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, 'আমি রাসূল সা.. কে এ কথা বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কোন স্থানে অবতীর্ণ হয়ে বলবেঃ

أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ-

অর্থ- "আমি আল্লাহ তা'আলার পূর্ণাঙ্গ কালামের কাছে তাঁর সৃষ্টির সকল অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় চাই।" তাহলে যতক্ষণ পর্যন্ত সে ঐ স্থান ত্যাগ না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত কোন কিছুই তার ক্ষতি করতে পারবে না।

ব্যাখ্যাঃ

আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট আশ্রয় প্রার্থনা হল মহা শির্‌ক। আরবী ভাষায় 'ইস্তিআযাহ' শব্দ এসেছে। এর অর্থ- আশ্রয় প্রার্থনা করা অর্থাৎ এমন কিছু কামনা করা যা অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা দেয়। তলব-চাওয়া হল, অভিমুখী হওয়া ও দু'আর একপ্রকার; কেননা এর দ্বারা এটিই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। সুতরাং যার থেকে কিছু চাওয়া হয় সে অবশ্য প্রার্থনাকারীর চেয়ে মর্যাদার দিক দিয়ে উঁচু হয়ে থাকেন। এজন্য তার দিকে ক্রিয়া সম্পন্ন করাকে দু'আ বলা হয়। এ জন্য প্রকৃতপক্ষে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আশ্রয় চাওয়ার দু'আ করা। আর যখন তা দু'আ অতএব ইবাদতেরও অন্তর্ভুক্ত। আর প্রত্যেক প্রকার ইবাদত আল্লাহর জন্য নির্ধারিত যার উপর সবারই ঐক্যমত এবং কুরআনের আয়াত সমূহও ঐ কথারই প্রমাণ বহন করে। যেমন আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلاَ تَدْعُوا مَعَ اللهِ أَحَدًا অর্থাৎ "নিশ্চয়ই সমস্ত মসজিদ আল্লাহরই, অতএব তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আর কাউকে আহবান করো না।" [সূরা জ্বিন- ১৮] তিনি আরও বলেনঃ وَ قَضَ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا أِلَّا إيَّاهُ অর্থাৎ- তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দেন যে, তাঁকে ব্যতীত কারো ইবাদত করো না।" [সূরা ইসরা- ২৩] বরং প্রত্যেক এই সমস্ত দলীল যাতে একমাত্র আল্লাহরই নিকট দু'আ করার কথা বা তাঁরই ইবাদত করার কথা উল্লেখ রয়েছে সেগুলি বিশেষ করে আলোচ্য মাসালারই দলীল। যে আশ্রয় প্রার্থনা একমাত্র আল্লাহর জন্য উপযোগী তার তাৎপর্য হল, তার মধ্যে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য উভয় আমল অন্তর্ভুক্ত। প্রকাশ্য আমল বলতে বুঝায়- আন্তরিক আকর্ষণ, প্রশান্তি, অস্থিরতা, প্রয়োজনীয়তা, ইত্যাদি যার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা হয় তার নিকটেই তুলে ধরা এবং স্বীয় হেফাযত ও মুক্তির যাবতীয় দায়-দায়িত্ব তার নিকটেই সোপর্দ করা। আর এ ধরণের আশ্রয় প্রার্থনা ঐক্যমতে আল্লাহর ব্যতীত আর কারও নিকট জায়েয নেই। আর যদি বলা হয় যা কিছু মাখলুক-সৃষ্টির সাধ্যের অন্তর্ভুক্ত তার আশ্রয় প্রার্থনা মাখলুকের নিকট জায়েয। এ ক্ষেত্রে দলীল প্রামাণ থাকার ভিত্তিতেই জায়েয। আর এ আশ্রয় প্রার্থনার অর্থ হল যে, মাখলুক থেকে আশ্রয় শুধু মৌখিক হয়; কিন্তু আন্তরিক সম্পর্ক ও স্থিরতা আল্লাহর সাথেই হয়ে থাকে এবং তার এর রূপ সৎ খেয়াল থাকে যে, উক্ত মাখলুক শুধুমাত্র এক্ষেত্রে একটি কারণস্বরূপ, আল্লাহই প্রকৃত আশ্রয়দাতা। সুতরাং এ আশ্রয় প্রার্থনা হল প্রকাশ্য, আর প্রকৃত ও অপ্রকাশ্য আশ্রয় প্রার্থনা তার (মাখলুকের) মাধ্যমে বাস্তবায়ন হয় না (এটা শুধু আল্লাহই বাস্তবায়ন করে)। অতএব ব্যাপার যদি এরূপ হয় তবে তা জায়েয, নতুবা নয়। এর মধ্যমে কুসংস্কারবাদী বাতিল পন্থীদের ঐ মত বাতিল, তারা যে মনে করে মৃতব্যক্তি, জ্বিন ও ওলীদের নিকট আশ্রয় প্রর্থনা করা যেতে পারে যার মধ্যে তাদের সাধ্য রয়েছে। পক্ষান্তরে নিশ্চয়ই আল্লাহই তো তাদের চেয়ে সমর্থবান। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ত্রাণকর্তা, মুক্তিদাতা, উদ্ধারকারী হিসেবে সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করা তাওহীদ পরিপন্থী কাজ। যে সকল অন্য কারো নিকট প্রার্থনা করা শির্‌ক। পক্ষান্তরে যে সকল সাধারণ মানুষের ক্ষমতা আছে সেগুলি তার নিকট চাওয়া শির্‌ক নয়।

আয়াতে বর্ণিত رهقا এর অর্থ হল, তাদের অন্তরে এমন ভাবে ভয়-ভীতি ও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে যাতে তারা বিপদগ্রস্ত হয়ে গেছে। আর এ বিপদগ্রস্ত তারা দৈহিকভাবে হয়েছে এবং আত্মীকভাবেও। এ বিপদ তাদের জন্য শাস্তিস্বরূপ ছিল। আর শাস্তি অবতীর্ণ হয় সাধারণ কোন পাপের কারণেই। সুতরাং উক্ত আয়াতে তাদের দোষ প্রমাণিত হয়। আর তাদেরকে এ জন্য দোষারোপ করা হয় যে, তারা এ ইবাদতকে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের জন্য সাব্যস্ত করেছে। অথচ আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দেন যে, তাঁকে ব্যতীত আর অন্য করও নিকট আশ্রয় প্রার্থনা না করে। কাতাদাহ সহ কিতপয় সালাফী বলেছেন رهقا শব্দের অর্থ হচ্ছে পাপ। এ কথা স্পষ্ট যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য করও নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা পাপের কাজ।

নবী সা.. আল্লাহর কথা দিয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করার ফযীলত বর্ণনা করেছেন, আল্লাহ তা'আলা বলেছে مِن شَرِّ مَا خَلَقَ তিনি যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। [সূরা ফালাক- ২] এখানে সৃষ্টজীবের অনিষ্টতা উদ্দেশ্য। কারণ, এমন সৃষ্টজীবও রয়েছে যাতে কোন অনিষ্টতা নেই। যেমন- ফিরিস্তা, নবী, ওলী প্রমুখ।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

০১। সূরা জ্বিনের ৬নং আয়াতের তাসফীর।

০২। গায়রুল্লাহ্‌র আশ্রয় চাওয়া শিরকের অন্তর্ভুক্ত হওয়া।

০৩। হাদিসের মাধ্যমে এ বিষয়ের উপর [অর্থাৎ গায়রুল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া শির্‌ক] দলীল পেশ করা। উলামায়ে কিরাম উক্ত হাদীস দ্বারা এ প্রমাণ পেশ করেন যে, কালিমাতুল্লাহ অর্থাৎ 'আল্লাহর কালাম' মাখলুক (সৃষ্টি) নয়। তাঁরা বলেন 'মাখলুকের কাছে আশ্রয় চাওয়া শির্‌ক।'

০৪। ছোট হওয়া সত্ত্বেও উক্ত দু'আর ফযীলত।

০৫। কোন বস্তু দ্বারা পার্থিব্য উপকার হাসিল করা অর্থাৎ কোন অনিষ্ট থেকে তা দ্বারা বেঁচে থাকা কিংবা কোন স্বার্থ লাভ, এ কথা প্রমাণ করে না যে, উহা শিরকের অন্তর্ভুক্ত নয়।


অধ্যায়-১৩

আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট সাহায্য চাওয়া অথবা দু'আ করা শির্‌ক।
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَلاَ تَدْعُ مِن دُونِ اللهِ مَا لاَيَنْفَعُكَ وَلاَيَضُرُّكَ فَإِنَّكَ إِذًا مِّنَ اظَّالِمِينَ * وَإِن يَمْسَسْكَ اللهُ بِضُرٍّ فَلاَكَشِفَلَهُ إِلاَّ- (يونس: ١٠٦-١٠٧)

অর্থ- "আল্লাহ ছাড়া এমন কোন সত্তাকে ডেকো না, যা তোমার কোন উপকার করতে পারবে না এবং ক্ষতিও করতে পারবে না। যদি তুমি এমন কর তাহলে নিশ্চয়ই তুমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত। আর আল্লাহ যদি তোমাকে কোন বিপদে ফেলেন, তাহলে একমাত্র তিনি ব্যতীত আর কেউ তা থেকে তোমাকে উদ্ধার করতে পারবে না।" [সূরা ইউনুস- ১০৭] আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ

فَابْتَغُوا عِندَ اللهِ الرِّذْقَ وَاعْبُدُوهُ- (ألعنكبوت- ١٧)

অর্থ- "তোমরা আল্লাহর কাছে রিযিক চাও এবং তাঁরই ইবাদত কর।" [সূরা আনকাবুত- ১৭] আল্লাহ তা'আলা অন্য এক আয়াতে বলেছেনঃ

وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّن يَدْعُو مِن دُونِ اللهِ مَنْ لاَّ يَسْتَجِيبً لَهُ إِلَى يَومِ الْقِيَامَةِ- (الأحقاف: ٥)

অর্থ- "তার চেয়ে অধিক ভ্রান্ত আর কে হতে পারে, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ছাড়া এমন সত্তাকে ডাকে যে সত্তা কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়া দিতে পারবে না।" [সূরা আহকাফ &narsh; ৫] আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ

أَمَّن يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ- (النمل: ٦٢)

অর্থ- "বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির ডাকে কে সাড়া দেয় যখন সে ডাকে? আর কে তার কষ্ট দূর করে? [সূরা নামল- ৬২] ইমাম তাবরানী (র..) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম সা.. এর যুগে এমন একজন মুনাফিক ছিল, যে মু'মিনদেরকে কষ্ট দিত। তখন মু'মিনরা পরস্পর বলতে লাগল, চলো, আমরা এ মুনাফিকের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য রাসূল সা.. এর সাহায্য চাই। নবী করিম সা.. তখন বললেন, 'আমার কাছে সাহায্য চাওয়া যাবে না। একমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে।' [তাবারানী] (এ হাদীসটি যঈফ। হাদীসটির সনদে ইবনে লাহী'আহ নামক একজন দুর্বল বর্ণনাকরী আছে। দেখুন, আন্নাহজুস সাদীদ, পৃ. ১৬১)

ব্যাখ্যা-

মূলে (ইস্তেগাসা) শব্দ রয়েছে। এর অর্থ ফরিয়াদ বা আর্তনাদ করা। যে বিষয়ে আল্লাহ ছাড়া আর কারো ক্ষমতা নেই সে বিষয়ে অন্যের নিকট আর্তনাদ করা বড় শির্‌ক। তবে যে বিষয়ে মানুষের ক্ষমতা আছে সে বিষয় তার নিকট আর্তনাদ করা জায়েয, যেমন- আল্লাহ তা'আলা মুসা আ… এর ঘটনা বর্ণনা করে বলেন-فَاسْتَغَاثَهُ عَلى الَّذِي مَنْ عَدُوِِْهِ – অর্থ- "যে ব্যক্তি মুসা আ.. এর গোত্রের ছিল সে তার শত্রুর বিরুদ্ধে ফরিয়াদ করল।" (সূরা আল কাসাস- ১৫) দু'আ দুই প্রকার। ক) আল্লাহর নিকট কোন কিছু ভিক্ষা করা।, অর্থাৎ আল্লাহর নিকট কোন কিছু চাওয়ার জন্য হাত উঠিয়ে তাঁকে আহবান করা। আমরা সাধারণত একে দু'আ বলে জানি। খ) ইবাদতে দু'আ। যেমন- আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَأَنَّ الْمَساجِدَ لِلَّهِ فَلاَ تَدْعُوا مَعَ اللهِ أَحَدًا অর্থ- 'নিশ্চয়ই সমস্ত মসজিদই আল্লাহর জন্য অতএব তার সাথে কাউকে ডেকো না।' [সূরা জ্বিন- ১৮] অর্থাৎ আল্লাহর সাথে আর অন্য কারো ইবাদত করো না এবং আল্লাহর সাথে আর অন্য কারো নিকট প্রার্থনা করো না। যেমন- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, "দু'আ প্রার্থনাই হল ইবাদত।" উভয় প্রকার দু'আর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। অতএব ইবাদতের দু'আ এমন হবে যেমন কোন ব্যক্তি সলাত আদায় করে বা যাকাত দেয়, কেননা ইবাদতের যে কোন প্রকারই হোকনা কেন তাকে দু'আই বলা হয় কিন্তু এ দু'আ ইবাদত হিসেবেই হয়ে থাকে। যখন এ কথা সাব্যস্ত হয়ে গেল (ঠিক এ অবস্থায়) কুরআনী প্রমাণ এবং ইমাম ও আলেমদের পক্ষ থেকে পেশকৃত প্রমাণাদীকেও বুঝার জন্য উল্লেখিত ব্যাখ্যা ও প্রকারভেদ গুরুত্বের দাবি রাখে, কেননা শির্‌ক ও বিদ'আত বিস্তারকারীগণ চাওয়ামূলক দু'আর ব্যাপারে আগত আয়াতগুলির অপব্যাখ্যা করে। অথচ প্রকৃতপক্ষে প্রার্থনা বা চাওয়ামূলক দু'আ এবং ইবাদতমূলক দু'আ হল ইবাদতের একটি প্রকার এবং ইবাদতমূলক দু'আতেও এ জরুরী হয়ে পড়ে যে, আল্লাহর নিকট উক্ত ইবাদত কবূলের জন্য প্রার্থনা করা প্রয়োজন।

উক্ত আয়াতে ولا تدع من دون الله অর্থ- আল্লাহকে বাদ দিয়ে কাউকে আহবান করা ولاتدع দ্বারা নিষেধাজ্ঞা বুঝানো হয়েছে, এখানে প্রার্থনা ও ইবাদতমূলক উভয় দু'আ নিষেধ করে দেয়া হয়েছে। আর শাইখ মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহ্‌হাব রাহিমাহুল্লাহও এ আয়াত দ্বারা এটাই প্রমাণ করতে চেয়েছেন। সুতরাং এ আয়াতের উদ্দেশ্য হল, কোন ব্যক্তির জন্য এটা জায়েয নেই যে, সে আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কারো নিকট প্রার্থনামূলক হোক আর ইবাদতমূলকই হোক দু'আ করবে। আর সবচেয়ে বড় কথা হল উক্ত নিষেধাজ্ঞার সম্বোধন কৃত ব্যক্তিত্ব যখন বানয়ে নেয়া হয় মুত্তাকীদের ইমাম তাওহীদপন্থীদের ইমামকে। আল্লাহর বাণী, دون الله "আল্লাহকে বাদ দিয়ে" দ্বারা দু'টি উদ্দেশ্য, প্রথমত- কাউকে আল্লাহর সাথে অংশীদার করে আহবান কর না। আর দ্বিতীয়ত- আল্লাহকে বাদ দিয়ে কাউকে আহবান কর না। ما لا ينفعك ولا يضرك আয়াতে (মা) শব্দ এসেছে। আবার বুদ্ধিহীন সৃষ্টিও হতে পারে। যেমন- মূর্তি, গাছ, পাথর প্রভৃতি। আয়াতে فإن فعلت অর্থাৎ আল্লাহকে বাদ দিয়ে যদি কাউকে আহ্বান কর, যে তোমার কোন উপকার ও কোন অনিষ্ট করতে পাবে না। فأنك إذا অর্থাৎ সেই আহবানের কারণে من الظالمين অর্থাৎ যালেমদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাবে। এখানে "যুলুম" বলতে শির্‌ক প্রকাশ পায় তবে তিনি নিশ্চয়ই যালেম ও মুশিরক হয়ে যাবেন, অথচ যার (মুহাম্মদ সা.. এর) মাধ্যমে আল্লাহ তাওহীদকে পরিপূর্ণতা দান করেছেন। তবে যে ব্যক্তি পাপাচার থেকে মুক্ত নয় তার জন্য এটি মারাত্বক হুঁশিয়রী। কেননা গায়রুল্লাহকে আহবান করার জন্য সে বিনা বাক্যে যালেম ও মুশরিক হয়ে যাবে। অতঃপর আল্লাহ তাআ'লা অন্তর থেকে শিরকের সমস্ত শিকড় কেটে দেয়ার জন্য বলেন وَإِن يَمْسَسْكَ اللهُ بضُرِّ فَلاَ كَاشِفَ لَهُ إِلاَّ অর্থাৎ 'আর আল্লাহ যদি তোমাদের ক্ষতিসাধন করেন তাহলে তিনি ব্যতীত আর কেউ তা দূর করার নেই।' [সূরা ইউনুস- ১০৭] যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনাকে কোন ক্ষতি স্পর্শ করে তবে তা, কে দূরীভুত করবে? তিনিই তো যিনি আপনার ভাগ্য লিখে রেখেছেন এবং সিদ্ধান্ত করে রেখেছেন। এর মাধ্যমে গায়রুল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়ার বিষয়টি দৃঢ়ভাবে নাকচ সাব্যস্ত হয়েছে; কিন্তু তা সত্ত্বেও যে বিষয় মানুষের সাধ্যের অন্তর্ভুক্ত তার জন্য মানুষের নিকট ধাবিত হওয়া জায়েয। যেমন সাধারণ সাহায্য কামনা, পানি চাওয়া ইত্যাদি। এর মধ্যে নিশ্চিত এ জন্যই জায়েয রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলারই অনুমতিতে সে পরিমাণ প্রয়োজন মিটানোর মাধ্যম হওয়ার সমর্থ অর্জন করেছে অথচ প্রকৃতপক্ষে তো আল্লাহই যাবতীয় সমস্যা দূরকারী। আয়াতের শব্দ بضر 'কোন প্রকার ক্ষতি', অনিষ্ট, যার ফলে সব ধরণেরই ক্ষতি বুঝান হয়েছে। অর্থাৎ দ্বীনি ক্ষতি, পার্থিব্য ক্ষতি, শারীরিক ক্ষতি, আর্থিক ক্ষতি ও পারিবারিক ক্ষতি সবই এর অন্তর্ভুক্ত। আর সব ধরণের ক্ষতি দূরীভূতকারী হলেন একমাত্র আল্লাহ।

আয়াতটির শব্দের আগে-পিছে করে সাজানো হয়েছে। উলামায়ে কিরাম বলেন, যে শব্দ পরে সংযোগ হওয়ার তাকে পূর্বে সংযোগ করতে তাখসীসের (বা নির্দিষ্টের) ফায়েদা দেয়। যার ফলে فابتغوا عند اللهِ الرزاق এর অর্থ দাঁড়ায়, 'তোমরা আল্লাহরই নিকট রুযী তলব কর' আর অন্যের নিকট রুযীর জন্য ফরিয়াদ কর না। রুযী ব্যাপক, এর মধ্যে প্রত্যেক ঐ বস্তুই অন্তর্ভুক্ত যা মানুষকে দেয়া হয়। যেমন- স্বাস্থ্য, সম্পদ, সুস্থতা ইত্যাদি। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন,واعبده 'এবং তাঁরই ইবাদত কর' যেন এতে প্রার্থনা ও ইবাদত মূলক উভয় দু'আ অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

এ আয়াতে ঐ লোকদের আহ্বান সম্পর্কে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে এবং কোন জীবিতকে বাদ দিয়ে মৃতদেরকে আহ্বান করে একেবারে নিকৃষ্ট পথভ্রষ্টায় নিপতিত হয়েছে এবং স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে যে, তার মৃতদের দিকে ধাবিত, মূর্তিদের দিকে ধাবিত, মূর্তি, বৃক্ষ ও পাথরের দিকে নয় তাই إلى يوم القيامة বলে কিয়ামত পর্যন্ত যারা তাদের আহ্বানে সাড়া দিবেন না বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। আর এ তো মৃতদের ক্ষেত্রে কেননা মৃতরা তো যখন কিয়ামত হবে তখন পুনরুত্থিত হবে এবং শুনা শুরু করবে। আয়াতে من শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে যা জ্ঞান সম্পন্নের প্রতি প্রয়োগ হয়, আর তারা হল মানুষ যারা কথা বলে ও তাদের সাথেও কথা বলা হয়, তারা জানে (এখানে মৃত ব্যক্তি উদ্দেশ্য)

এখানে প্রার্থনামূলক দু'আ উদ্দেশ্য। যা একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্ধারিত। কখনো আর্তনাদের পর আবার কখনো আর্তনাদ ছাড়াই আল্লাহর সৃষ্টি জীবের অনিহা দূর করেন। উক্ত আয়াতে أإله مع الله "তবে কি আল্লাহর সাথে আরো মা'বূদ রয়েছে"? এটি অস্বীকৃতি সূচক প্রশ্ন। অর্থাৎ আল্লাহর সাথে আর কোন মা'বূদ নেই। যাকে আহ্বান করা যাবে বা যা কিছু আল্লাহরই জন্য নির্ধারিত তা কি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট চাওয়া যাবে?

আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু মহানবী সাল্লাল্লাহু 'আলইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট গিয়ে আর্তনাদ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এটি জায়েয। কারণ, মহানবী সাল্লাল্লাহু 'আলইহি ওয়া সাল্লাম এর জীবদ্দশায় তিনি আর্তনাদ শুনে তাদের কষ্ট দূর করতে সক্ষম ছিলেন। তাই সেটি মুনাফিককে হত্যার মাধ্যমে হোক অথবা তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করার মাধ্যমে অথবা অন্য কোন উপায়ে। এ পরিস্থিতিতেও নবী সাল্লাল্লাহু 'আলইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে আদব শিক্ষা দেন এবং বলেন, "আমার নিকট ফরিয়াদ করো না, ফরিয়াদ একমাত্র আল্লাহর নিকটেই করতে হয়"।

মুসলমানরা তাদের বিপদে রাসুল সাল্লাল্লাহু 'আলইহি ওয়া সাল্লাম এর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, "তাদের প্রথম আল্লাহর নিকট আর্তনাদ-ফরিয়াদ করা ওয়াজিব যদিও বিষয়টি তাঁর ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতার আওতায় ছিল।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

০১। সাহায্য চাওয়ার সাথে দু'আকে আত্‌ফ (মিল) করার ব্যাপারটি কোন আম (সামষ্টিক) বস্তুকে খাছ (সুনির্দিষ্ট) বস্তুর সাথে সংযুক্ত কারারই নামান্তর।

০২। وَلاَ تَدْعُ مِن دُونِ اللهِ এ আয়াতের তাফসীর।

০৩। আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে সাহায্য চাওয়া বা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে ডাকা 'শিরকে আকবার' বা মহা শির্‌ক।

০৪। সব চেয়ে নেককার ব্যক্তিও যদি (আল্লাহ ছাড়া) অন্যের সন্তুষ্টির জন্য আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে সাহায্য চায় বা দোয়া করে, তাহলেও সে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত।

০৫। وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللهُ بِضُرٍّ فَلاَ طَتشِفَ لَهُ إِلاَّهُوَ- এ আয়াতের তাফসীর।

০৬। আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে দু'আ করা কুফরি কাজ হওয়া সত্ত্বেও দুনিয়াতে এর কোন উপকারিতা নেই।

০৭। তৃতীয় فَابْْتَغُوا عِنْدَ اللهِ الرِّزْقَ- আয়াতের তফসীর।

০৮। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো কাছে রিজিক চাওয়া উচিত নয়। যেমনি ভাবে আল্লাহ ছাড়া অন্য করো কাছে জান্নাত চাওয়া উচিত নয়।

০৯। চতুর্থ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنْ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللهِ مَنْ لاَ يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ- আয়াতের তাফসীর।

১০। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে যে ব্যক্তি ডাকে তার চেয়ে বড় গোমরাহ্‌ আর কেউ নেই।

১১। যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর কাছে দু'আ করে সেই গায়রুল্লাহ দোয়াকারী সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবচেতন বা অজ্ঞ থাকে, অর্থাৎ তার ব্যাপারে গাইরুল্লাহ সম্পূর্ণ অনবহিত থাকে।

১২। مَدْعُو অর্থাৎ যাকে ডাকা হয় কিংবা যার কাছে দোয়া করা হয়, দোয়াকারীর প্রতি তার রাগ ও শত্রুতার কারণেই হচ্ছে ঐ দোয়া যা তার (গায়রুল্লাহ'র) কাছে করা হয়। [কারণ প্রকৃত মাদ'উ (আল্লাহ তা'আলা)] কখনো এ রকম শির্‌ক কাজের অনুমতি কিংবা নির্দেশ দেননি।

১৩। গাইরুল্লাহ (আল্লাহ ব্যতীত অন্য) কে ডাকার অর্থই হচ্ছে তারা ইবাদত করা।

১৪। ঐ ইবাদতের মাধ্যমেই কুফরি করা হয়।

১৫। আর এটাই তার [গাইরুল্লাহর কাছে দু’আকারীর] জন্য মানুষের মধ্যে সবচেয়ে পাপী ব্যক্তি হওয়ার একমাত্র কারণ।

১৬। পঞ্চম أَمَّن يُجِبُ لْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ- আয়াতের তফসীর।

১৭। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, মূর্তী পূজারীরাও এ কথা স্বীকার করে যে, বিপদগ্রস্থ, অস্থির ও ব্যকুল ব্যক্তির ডাকে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ সাড়া দিতে পারে না। এ কারণে তারা যখন কঠিন বিপদে পতিত হয়, তখন ইখলাস ও আন্তরিকতার সাথে তারা আল্লাহকেই ডাকে।

১৮। এর মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক তাওহীদের হিফাযত, সংরক্ষণ এবং আল্লাহ তা'আলার সাথে আদব-কায়দা রক্ষা করে চলার বিষয়টি জানা গেল।


অধ্যায়-১৪

অক্ষমকে আহ্বান করা শির্‌ক-
আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ

أَيُشْرِكُونَ مَا لاَيَخْلُقُ شَيْئًا وَهُمْ يُخْلَقُونَ* وَلاَيَسْتُطِيعُونَ لَهُمْ نَصْرًا- (الأعراف: ١٩٢-١٩١)

অর্থ- "তারা কি আল্লাহর সাথে এমন সব বস্তুকে শরীক করে যারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না। বরং তারা নিজেরাই সৃষ্ট হয়। আর তারা তাদেরকে (মুশরিকদেরকে) কোন রকম সাহায্য করতে পারে না।" [সূরা আরাফ- ১৯১-১৯২] আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ

وَالَّذِينَ تَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ مَا يَمْلِكُونَ مِن قِطْمِيرٍ-

অর্থ- "তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে (উপকার সাধন অথবা মুসীবত দূর করার জন্য) ডাক তারা কোন কিছুরই মালীক নয়।" সহীহ বুখারীতে আনাস রা.. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ

شُجَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَومَ أُحُدٍ وَكُسِرَتْ رَبَاعِيَتُهُ فَقَالَ: كَيْفَ يُفْلِحُ قَوْمٌ شَجُّوا نَبِيَّهُمْ؟ فَنَزَلَتْ (لَيْسَ لَكَ مِنْ الْأَمْرِ شَيْءٌ)- (صحيح مسلم, الجهاد, باب غَزوة أحد, ح: ١٧٩١ ومسند أحمد: ٣\٩٩, ١٧٨)

অর্থ- উহুদ যুদ্ধে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম আঘাত প্রাপ্ত হলেন এবং তাঁর সামনের দাঁত ভেঙ্গে গেল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম দুঃখ করে বললেন, " সে জাতি কেমন করে কল্যাণ লাভ করবে, যারা তাদের নবীকে আঘাত দেয়।" তখন (لَيْسَ لَكَ مِنْ الأَمْرِ شَيْءٌ) এ আয়াত নাজিল হল। যার আর্থ হচ্ছে, "(আল্লাহর) এ (ফয়সালার) ব্যপারে আপনার কোন হাত নেই।" [সূরা আল-ইমরান- ১২৮] [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং- ১৭৯৭; মুসনাদ আহমাদ /৯৯, ১৭৮] এ বিষয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা… থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম কে ফজরের সালাত শেষ রাকাতে রুকু থেকে মাথা উঠিয়ে سمع الله لمن حمده ربنا ولك الحمد বলার পর এ কথা বলতে শুনেছেন اللهم العن فلانا و فلانا অর্থ- "হে আল্লাহ! তুমি অমুক, অমুক (নাম উল্লেখ করে) ব্যক্তির উপর তোমার লানত নাজিল কর।" তখন এ আয়াত নাজিল হয়- (لَيْسَ لَكَ مِنْ الأَمْرِ شَيْءٌ) অর্থ- "এ বিষয়ে তোমার কোন এখতিয়ার নেই।" অন্য বর্ণনায় আছে, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম সাফওয়ান ইবনে উমাইয়্যা এবং সোহাইল বিন আমর আল-হারিছ বিন হিশামের উপর বদদু'আ করেন তখন এ আয়াত নাজিল হয় (لَيْسَ لَكَ مِنْ الأَمْرِ شَيْءٌ) অর্থ- "এ বিষয়ে তোমার কোন এখতিয়ার নেই।" আবু হুরাইরা রা.. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম এর উপর যখন وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الأَقْرَبِينَ- নাজিল হল তখন আমাদেরকে কিছু বলার জন্য তিনি দাঁড়ালেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ

يَا مَعْشَرَ قُرَيْشٍ! أَوْ كَلمَةً نَحْوَهَا, اشْتَرُوا أَنْفُسَكُمْ لاَ أُغْنِي عَنْكُمْ مِنْ اللهِ شَيْئًا, يَا عَبَّاسُ بْنَ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ لاَ أُغْنِي عَنْكَ مِنْ اللهِ شَيْئًا, وَيَا صَفِيَّةُ عَمَّةُ رَسُولِ اللهِ لاَ أُغْنِي عَنْكِ مِنْ اللهِ شَيْئًا, وَيَا فَاطِمَةُ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَلِينِي مَا شِئْتِ مِنْ مَالِي لاَ أُغْنِي عَنْكِ مِنْ اللهِ شَيْئًا- (صحيح البخاري, الوصايا, باب هل يدخل النساء والولد في الأرقات, ح:٢٧٥٣ و مسند أحمد ٢\٣٦٠)

অর্থ- "হে কুরাইশ বংশের লোকেরা [অথবা এধরণের কোন কথা বলেছেন] তোমরা তোমাদের জীবনকে খরিদ করে নাও। [শিরকের পথ পরিত্যাগ করে তাওহীদের পথ অবলম্বন করার মাধ্যমে জাহান্নামের শাস্তি থেকে নিজেদেরকে বাঁচাও।] আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করার ব্যাপারে আমি তোমাদের কোন উপকারে আসব না। হে আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করার ব্যাপারে আমি তোমার জন্য কোন উপকার করতে সক্ষম নই। হে রাসূলুল্লাহর ফুফু সাফিয়্যাহ, আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করার ব্যাপারে আমি আপনার কোন উপকার করতে সক্ষম নই। হে মুহাম্মদের কন্যা ফাতেমা, আমার সম্পদ থেকে যা খুশী চাও। কিন্তু আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করার ব্যাপারে তোমার কোন উপকার করার ক্ষমতা আমার নেই।" [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৭৫৩; মুসনাদে আহমাদ, ২/৩৬০]

ব্যাখ্যাঃ

বিগত অধ্যায়গুলোর পর এ অধ্যায়ের অবতারণা হল উত্তম অবতারণা এবং জ্ঞানের ও পাণ্ডিত্বের বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহ তাওহীদ ও ইবাদতের ক্ষেত্রে। তিনিই উপযুক্ত হওয়ার দালীল হল, মানুষের স্বভাবজাত চরিত্র, বাস্তবতা ও যুক্তি সব ধরণের দলীলই প্রমাণ করে যে, ইবাদতের উপযুক্ত একমাত্র আল্লাহই, তিনি ব্যতীত আর কেউ নেই। এ অধ্যায়ে বলা হয়েছে যে, একমাত্র আল্লাহই সৃষ্টি করেন। জীবিকা দেন, মালিকানা একমাত্র তাঁরই। আল্লাহ ব্যতীত আর কারো সকল বিষয়ে কোনই ক্ষমতা নেই। এমনকি সৃষ্টি জীবের মধ্যে সবচেয়ে বেশী উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম- এর কোন ক্ষেত্রে ইখতিয়ার নেই তবে এমন কে রয়েছে যার সর্বক্ষেত্রে ইখতিয়ার রয়েছে? তিনি তো একমাত্র আল্লাহ। অতএব, সকল সৃষ্টি জীবের উচিত সেই একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহরই ইবাদত করা। যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম থেকে এ বিষয় নাকচ হয়ে গেল, তার চেয়ে নিম্নদের থেকে ঐ বিষয় নাকচ হবেই। যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে কবরস্থদের প্রতি বা সৎ ব্যক্তি, নবী বা ওলীদের দিকে ধাবিত হয়, তাদের অভ্যন্তরে ধারণা হয় যে, নিশ্চয়ই তাদের কর্তৃত্ব রয়েছে। যেমন তারাও রুজীর ব্যবস্থা করতে পারেন বা তারা আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত মধ্যস্থতা ও সুপরিশ করতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে তা অতি ভ্রান্ত কথা কেননা তাঁরাই তো প্রতিপালিত ও রুযী প্রাপ্ত। তারা কিছু সৃষ্টি করতে পারে না। বরং তাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়েছে। যারা তাদের নিকট চায় তাদেরকে তারা সাহায্য করতে সক্ষম। তাদের কোনই ক্ষমতা নেই। কুরআন মাজীদে বহু প্রমাণ রয়েছে যে, ইবাদতের একমাত্র উপযুক্ত হল আল্লাহ তা'আলা, তিনি ব্যতীত আর কেউ নয়। আর ঐ সমস্ত দলীলের আওতায় কোন কোনটিতে আল্লাহ তা'আলা মুশরিকদের তাওহীদ রুবূবিয়্যাতে স্বীকৃতির বর্ণনা দিয়াছেন। এ ধরণের দলীল সমূহ থেকে স্পষ্ট হয় যায় যে, তোমরা যে সত্তার জন্য রুবূবিয়্যাত সাব্যস্ত কর ইবাদতেরও তিনিই উপযুক্ত। কুরআন মাজীদের দলীল সমূহে এ কথাও বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলাই তো স্বীয় রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), ওলীদেরকে তাঁদের শত্রুদের সাহায্য করেন। কতিপয় কুরআনী দলীলে সৃষ্ট জীবের দুর্বলতাও সাব্যস্ত হয়েছে এবং সাব্যস্ত করা হয়েছে যে, জীবিত করার ক্ষেত্রে মাখলূকের কোন ইখতিয়ার নেই, বরং আল্লাহ তা'আলাই স্বীয় ইখতিয়ারে জীবন দান করেন এবং তাদের বিনা ইখতিয়ারেই তিনি জীবন বের করেন। সুতরাং মাখলুক হল নিরুপায় ও বাধ্য। তাকে এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তরকারী একমাত্র আল্লাহ। বাতিল উপাস্যরা নয়। একমাত্র তিনিই জীবিত করেন এবং তিনিই মৃত্যুদান করেন। আর এ কথা স্বভাজাত চরিত্র থেকেই প্রত্যেকে স্বীকার করে থাকে। আল্লাহ তা'আলা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার এটিও দলীল যে, তিনি উত্তম নাম ও উচ্চ গুণাবলী সম্পন্ন। তাঁর সত্তা পরিপূর্ণ, মহান গুণাবলীর অধিকারী। সর্বময় পরিপূর্ণতা তাঁরই, তাঁর নাম ও গুণাবলীতে কোন অসম্পূর্ণতা নেই।

আয়াতের মূলে قطمير শব্দ এসেছে। এর অর্থ হচ্ছে 'বীজের আবরণ'। যারা বীজের আবরণেরই মালিক নয় তারা কিভাবে তার চেয়েও বেশী বড় জিনিসের মালিক হবে? অতএব, তাদের নিকট দু'আ করা মূর্খতা বৈ আর কিছুই নয়। এতে ফিরিস্তা, নবী, রাসূল, সৎব্যক্তি, অসৎ ব্যক্তি, জ্বিন সবাই অন্তর্ভুক্ত। অতএব, তাদের উচিত সবাইকে ত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহকেই আহ্বান করা।

তিনি তাদের কোন উপকার করতে পারবেন না। অর্থাৎ শাস্তি নির্যাতন থেকে রক্ষা করতে পারবেন না। এ হাদীস একটা স্পষ্ট দলীল যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় আত্মীয়দেরকেও কোন উপকার সাধন করতে পারেননি, তবে তিনি আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত তাদের নিকট অবশ্যই পৌঁছায়েছেন এবং এ মহা আমানত (রিসালত) আদায় করেছেন। পক্ষান্তরে আযাব-গজব থেকে পরিত্রাণ দেয়ার ক্ষেত্রে এ কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, আল্লাহ স্বীয় মাখলুকের মধ্যে কাউকে স্বীয় বাদশাহীর কোন কিছু অর্পণ করেননি বরং তিনি তাঁর রাজত্ব ও ক্ষমতায় একক।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

০১। এ আধ্যায় উল্লেখিত সূরা আ'রাফ এবং সূরা ফাতিরের দু'টি আয়াতের তাফসীর।

০২। উহুদ যুদ্ধের কাহিনী।

০৩। সলাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন তথা বিশ্বনবী কর্তৃক 'দু'আয়ে কুনুত' পাঠ করা এবং নেতৃস্থানীয় সাহাবায়ে কিরাম কর্তৃক আমীন বলা।

০৪। যাদের উপর বদদু'আ করা হয়েছে তারা কাফির।

০৫। অধিকাংশ কাফিররা অতীতে যা করেছিল তারাও তাই করেছে। যেমন- নবীদেরকে আঘাত করা, তাঁদেরকে হত্যা করতে চাওয়া এবং একই বংশের লোক হওয়া সত্ত্বেও মৃত ব্যক্তির নাক, কান কাটা।

০৬। এ ব্যপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর لَيْسَ لَكَ مِنْ الأَمْرِ شَيْءٌ-অবতীর্ণ হওয়া।

০৭। (أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذَّبَهُمْ) (آل عمران:١٢٨) এর পর তারা তাওবা করল। আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করলেন, আর তারা আল্লাহর উপর ঈমান আনল।

০৮। বালা-মুসীবতের সময় দু'আ-কুনুত পড়া।

০৯। যাদের উপর বদদু'আ করা হয়, সলাতের মধ্যে তাদের নাম এবং তাদের পিতার নাম উল্লেখ করে বদদু'আ করা।

১০। কুনূতে নাযেলায় নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে অভিশাপ দেয়া।

১১। (وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الأَقْرَبِينَ) আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর নবী জীবনের ঘটনা।

১২। ইসলামের দাওয়াত প্রচারের ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অক্লান্ত সংগ্রাম ও সাধনার কথা। এমনকি এ মহৎ কাজের জন্য তাঁকে পাগল পর্যন্ত বলা হয়েছে। কোন মুসলিম যদি আজও সে ধরনের দাওয়াতী কাজ করে তবে সেও উক্ত অবস্থার শিকার হবে।

১৩। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর দূরবর্তী এবং নিকট আত্মীয়-স্বজনদের ব্যাপারে বলেছেনلا أغني عنك من الله شيئاঅর্থ- আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করার ব্যাপারে আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারব না। এমন কি নিজ কন্যা ফাতেমা রা.. কেও লক্ষ্য করে বলেছিলেন-يا فاطمة لا أغني عنك من الله شيئا অর্থ- 'হে ফাতেমা! আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করার ব্যাপারে তোমার কোন উপকার আমি করতে সক্ষম হব না।' তিনি সমস্ত নবীগণের নেতা হওয়া সত্ত্বেও নারীকুল শিরোমণির জন্য কোন উপকার করতে না পারার ঘোষণা দিয়েছেন। আর মানুষ যখন এটা বিশ্বাস করে যে, তিনি সত্য ছাড়া কিছুই বলেন না, তখন সে যদি বর্তমান যুগের কতিপয় খাস ব্যক্তিদের অন্তরে সুপারিশের মাধ্যমে অন্যকে বাঁচানর ব্যাপারে যে ধ্যান-ধারণার সৃষ্টি হয়েছে তার দিকে দৃষ্টিপাত করে, তাহলে তার কাছে তাওহীদের মর্মকথা এবং দ্বীন সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞাতার কথা সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়বে।

Page- 2

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

© Dawah wa Tablig is the proparty of Md. Shamsul Alam since 2013