Dawah wa Tablig Islamic Website

Site Contact = Mob no. 01783385346 :: Email Address = shalampb@gmail.com

Question & Answer-1

Pages 1 2
Page 2

আল্লাহ তাআলা কোথায় আছেন?
লেখক: হাফেজ মো: নুরআলম

আল্লাহ তাআলা আমাদের রর ও ইলাহ। একমাত্র তিনিই ইবাদত আরাধনার উপযোগী। সে হিসেবে তিনি কোথায় সে বিষয়ে সম্যক ধারণা অর্জন আমাদের জন্য ওয়াজিব, যাতে আমরা তাঁর প্রতি একাগ্রচিত্তে ধাবিত হতে পারি, যথার্থরূপে ইবাদত-বন্দেগি পালনে সক্ষম হই।

আল্লাহ কোথায় আছেন? এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হল তিনি আরশের উপরে আছেন। আরশের উপরে থাকা আল্লাহ তাআলার একটি অন্যন্য সিফাত, আল কোরআন ও সহিহ হাদীসে এ বিষয়ে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে, যেমন রয়েছে আল্লাহ তাআলার শ্রবন করা, দেখা, কথা বলা, অবতীর্ণ হওয়া এবং এ জাতীয় অন্যান্য সিফাতসমূহ। সালাফে সালেহীনদের আকিদা আর মুক্তিপ্রাপ্ত দল বা আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআত এ আকিদাই পোষণ করেন কোনোরূপ পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সৃষ্টির সাথে তুলনা ব্যতীত। কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেন:

لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ ﴿الشوري﴾

তাঁর মত কিছু নেই আর তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। (সূরা শুরা,৪২: ১১ আয়াত)

এ কারণে যখন ইমাম মালেক রহ. কে (আর-রহমান, যিনি আরশের উপরে উঠেছেন) এ আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। উত্তরে তিনি বলেছিলেন: استواء তথা আরশের উপরে ওঠার বিষয়টি জানা, কিন্তু তার ধরণ অজানা, আর এ বিষয়ের উপর ঈমান আনা ওয়াজিব। হে মুসলিম ভাই, ইমাম মালেক রহ. এর বক্তব্যের প্রতি খেয়াল করুন। কারণ, তিনি আল্লাহ যে উপরে আছেন, তার উপর ঈমান আনাকে প্রতিটি মুসলিমের জন্য ওয়াজিব বলেছেন। কিন্তু কিভাবে আছেন, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।

তার জন্য এটাও বিশ্বাস করা দরকার যে, আল্লাহ আসমানের উপর আছেন, তার সম্মান অনুযায়ী, কোন সৃষ্টির সাদৃশ্য হয়ে নয়। কারণ এ সিফাতসমূহ আল্লাহ তাআলার পূর্ণতা প্রকাশ করে। তা আল্লাহ তাআলা স্বয়ং তাঁর কিতাবে স্পষ্ট করে ব্যক্ত করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাদীসেও তা বিদৃত করেছেন। আর সত্যিকারের ফিতরতও তা স্বীকার করে, আর সত্যিকারের বুদ্ধি বিবেচনাও তা মেন নেয়।

হে বিবেকবান মুসলিম ভাই! আল্লাহ্‌ যদি সর্বত্র সবকিছুতেই বিরাজিত থাকেন, তবে মে’রাজের কি দরকার ছিল? মে’রাজের রাত্রে বোরাকে চড়ে সপ্তাকাশের উপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্‌র দরবারে গমনই তো প্রমাণ করে যে মহান আল্লাহ্‌ সাত আসমানের উপর অবস্থিত আরশেই রয়েছেন। নতুবা মে’রাজ অর্থহীন হয়ে যায় না কি?

পরকালে মুক্তি পেতে হলে অবশ্যই সঠিক ইসলামী আক্বীদা জানতে ও তার উপর আমল করতে হবে। অন্যথায় পরকালে মুক্তি পাওয়া যাবে না। এ সঠিক আকীদার অনেক মাসআলা রয়েছে। তন্মধ্যে ‘আল্লাহ কোথায়?’ এটিও একটি আকীদার গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা, যাতে ভ্রান্ত দল জাহমিয়াসহ আরও বহু দল পথভ্রষ্ট হয়েছে। আমি উক্ত গুরুত্ব পূর্ণ মাস’আলাটি সম্মানিত পাঠক ও পাঠিকাগণের জন্যে এখানে আল কুরআনের আলোকে তুলে ধরলাম, যাতে তারা এর দ্বারা উপকৃত হতে পারে এবং সূফীদের সর্বেশ্বরবাদের ভ্রান্ত বিশ্বাস (আল্লাহ নিরাকার ও সর্বত্র বিরাজমান) থেকে বাঁচতে পারে। সূফীদের সর্বেশ্বরবাদের অর্থ হলো: তাদের নিকট খালিক – সৃষ্টিকারী আর মাখলূক্- সৃষ্টি জীব এর মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। সবই মাখলূক–সৃষ্টি জীব, আর সবই ইলাহ-উপাস্য।(নায়ুযুবিল্লাহ)

আহলুস্ সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের আলিম ও অনুসারীগণের আক্বীদা বা বিশ্বাস হলোঃ তারা সুদৃঢ় বিশ্বাস করেন যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা স্বীয় সত্ত্বায় ও নিজ গুণাবলীসহ আরশের উপর সমুন্নত। সকল সৃষ্টি জীবের উপর সমুন্নত। সকল সৃষ্টি জীব হতে আলাদা ও পৃথক। আহলুস্ সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের লোকেরা ভ্রান্ত জাহমিয়াদের ন্যায় আকীদাহ পোষণ করেন না। তারা বলে যে, আল্লাহ তাঁর সৃষ্টি জীবের সাথে সর্বত্র বিরাজমান আছেন। আহলে সুন্নাতের আলেমগণ এমন ভ্রান্ত কথা বিশ্বাস করেন না। আর যারা জাহমিয়াদের মত বলবে যে আল্লাহ তাঁর সৃষ্টি জীবের সাথে জমিনে আছেন তারা পথভ্রষ্ট ও কাফির হয়ে যাবে। এতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ তাদের এ আক্বীদা কুরআন, সহীহ হাদীস, সাহাবা, তাবেঈন ও ইসলামের ইমামগণের বিশ্বাসের পরিপন্থী।

এখানে একটি সংশয়ের নিরসন করা দরকার, যে কারণে জাহমিয়া ও সূফীরা বিপথগামী হয়েছে। আর তা হলোঃ আল্লাহ তা’আলা কুরআনের কিছু আয়াতে বলেছেন যে তিনি সৃষ্টি জীবের সাথে আছেন যেমন বলেছেন:

”তিনি তোমাদের সাথে আছেন তোমরা যেখানেই থাক।” (সূরা হাদীদ আয়াত: ৪)

তারা এ আয়াত ও এর সমার্থ বোধক অন্যান্য আয়াত হতে বুঝেছেন যে তিনি সস্তায় সৃষ্টি জীবের সাথে আছেন। কিন্তু তাদের এ বুঝ কুরআন, সহীহ হাদীস, সাহাবী, তাবেঈ ও ইসলামের ইমামগণের বিশ্বাসের পরিপন্থী। এ আয়াতগুলোর সঠিক তাফসীর বা ব্যাখ্যা নিন্মরূপঃ

তিনি আরশের উপর সমুন্নত থেকে তাঁর সৃষ্টি জীবের সাথে আছেন- এর অর্থ হলোঃ তিনি সৃষ্টি জীবের অবস্থাসমূহ জানেন, তাদের কথাসমূহ শুনেন, তাদের কর্মসমূহ দেখেন, তাদের বিষয় সমুহ পরিচালনা করেন, দরিদ্রকে রুজি দান করেন, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ করে দেন, যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন, যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজত্ব কেড়ে নেন, যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করেন, যাকে ইচ্ছা অপমান করেন, তাঁরই হাতে সকল কল্যাণ এবং তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।

• এক্ষণে আমরা “আল্লাহ্‌ কোথায়?” এ বিষয়ে কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদীস এবং সালফে সালেহীন তথা শ্রেষ্ঠ যুগের মহা পণ্ডিতদের বক্তব্য ও আকীদাহ্ দলীলসহ আলোচনা করার চেষ্টা করব:

কুরআন থেকে প্রমান:

১। আল্লাহ তাআলা বলেন:

أَأَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْض(الملك )

তোমরা তার থেকে নির্ভয় হয়ে গেলে যিনি আসমানে আছেন, আর তিনি তোমাদের সহকারে জমিনকে ধ্বসিয়ে দিবেন না?।(সূরা মূলক ৬৭: ১৬ আয়াত)।

ইবনে আব্বাস রা. এই আয়াতের তাফসীরে বলেন: তিনি হলেন আল্লাহ। (তাফসীরে ইবনুল জাওযি)।

২। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:

يَخَافُونَ رَبَّهُمْ مِنْ فَوْقِهِمْ(النحل)

তারা তাদের উপরস্থ রবকে ভয় করে। (সূরা নাহল,১৬: ৫০ আয়াত)।

৩। আল্লাহ তাআলা ইসা আ. সম্বন্ধে বলেন:

بَلْ رَفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ(النساء )

বরং আল্লাহ তাকে তাঁর নিকটে উত্তলন করে নিয়েছেন। (সূরা নিসা, ৪: ১৫৮ আয়াত)।

৪) মহান আল্লাহ্‌ এরশাদ করেন:

অর্থ:‘ নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ্‌, যিনি আকাশ সমূহ এবং পৃথিবীকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।’ (সূরা আরাফ-৫৪)

৫। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা বলেন:

الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى ﴿طه﴾

পরম করুণাময় আরশের উপর আছেন। (সূরা তাহা, ২০: ৫ আয়াত।)

{اسْتَوَى} ইস্তাওয়া এর অর্থ:

প্রখ্যাত তাবিঈ আবুল আলিয়াহ বলেছেন: ইস্তাওয়া অর্থ ইরতাফা’য়া। অর্থাৎ তিনি উঁচু হল। ইস্তাওয়া ইলাস্ সামায়ে এর অর্থ: তিনি আকাশের উপর আরশ এর উপর সমুন্নত হলেন। প্রখ্যাত তাবিঈ মুজাহিদ বলেছেন: ইস্তাওয়া অর্থ ‘আলা। এর অর্থ সে সমুন্নত হল। ‘আলা আলাল আরশে এর অর্থঃ তিনি আরশের উপর সমুন্নত হলেন।দেখুন: সহীহ বুখারী। (বাবু ওয়া কানা আরশুহু ‘আলাল মায়ে অর্থাৎ তাঁর আরশ পানির উপর আছে।)

হে প্রিয় পাঠক ও পাঠিকাগণ! কুরআনে ব্যবহৃত সকল ইস্তাওয়া ক্রিয়ার অর্থ: তিনি আরশের উপর উঁচু হলেন বা সমুন্নত হলেন। ইস্তাওয়া ক্রিয়াটি কুরআনে মোট নয়বার ব্যবহৃত হয়েছে। আর আরশ শব্দটি মোট বিশবার ব্যবহৃত হয়েছে।

1. وَهُوَ اللَّهُ فِي السَّمَاوَاتِ وَفِي الْأَرْضِ يَعْلَمُ سِرَّكُمْ وَجَهْرَكُمْ وَيَعْلَمُ مَا تَكْسِبُونَ

“আল্লাহ তিনিই উপাস্য আসমানে এবং জমিনে। তিনি তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য জানেন। তিনি আরও জানেন তোমরা (ভাল- মন্দ) যা কর। এ আয়াতে ফী ‘আলার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থ তিনিই আসমান সমূহের উপরে আছেন।” (সূরা আন’আম, ৬ আয়াত: ৩)।

2. كِيمًابَلْ رَفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَ

”বরং আল্লাহ তাঁকে( ঈসা আলাইহিস্ সালামকে) উঠিয়ে নিয়েছেন তাঁর নিজের কাছে। আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞানয় (সূরা নিসা: ৪, আয়াত: ১৫৮)

3. تَعْرُجُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ

“ফিরিশতাগণ এবং রূহ ( জিবরাঈল) তাঁর (আল্লাহ) দিকে উঠেন, এমন দিনে যার পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছর।” (সূরা মা’আরিজ ৭০, আয়াত: ৪)

4. يَخَافُونَ رَبَّهُمْ مِنْ فَوْقِهِمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ

তাঁরা (ফিরিশতারা) তাঁদের উপর তাঁদের প্রভূকে ভয় করে, আর তাঁদেরকে যা আদেশ দেয়া হয় তা পালন করে। (সূরা নাহল: ১৬, আয়াত: ৫০)

5. أَأَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ فَإِذَا هِيَ تَمُورُ

“তোমরা কি নিশ্চিত আকাশে যিনি আছেন, তিনি তোমাদেরসহ ভূমি ধসিয়ে দিবেন না। অতঃপর তা কাঁপতে থাকবে।” (সূরা মুলক: ৬৭, আয়াত: ১৬)

6. أَمْ أَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا فَسَتَعْلَمُونَ كَيْفَ نَذِيرِ

“তোমরা কি নিশ্চিত আকাশে যিনি আছেন, তিনি তোমাদের উপর কঙ্কর বর্ষণ করবেন না। অচিরেই তোমরা জানতে পারবে কেমন ছিল আমার সতর্ককারী।” (সূরা মুলক ৬৭, আয়াত: ১৭)

পূর্বের দু’আয়াতেও ফী অব্যয়টি আলা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

7. ذُو الْعَرْشِ الْمَجِيدُ

“মহান আরশের অধিকারী।” (সূরা বুরূজ, ৮৫ আয়াত: ১৫)

8. تِ السَّبْعِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ قُلْ مَنْ رَبُّ السَّمَاوَا

”বলুন: সপ্তাকাশ ও মহা আরশের মালিক কে?” (সূরা মু’মিনূন ২৩, আয়াত: ৮৬)

9. ذِي قُوَّةٍ عِنْدَ ذِي الْعَرْشِ مَكِينٍ

“যিনি শক্তিশালী, আরশের মালিকের নিকট মর্যাদা শালী।” (সূরা তাকবীর ৮১, আয়াত: ২০)

10. اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ

“আল্লাহ ব্যতীত কোন (সত্য) উপাস্য নেই, তিনি মহা আরশের প্রভু- মালিক।” (সূরা নামল ২৭, আয়াত: ২৬)

11. سُبْحَانَ رَبِّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ رَبِّ الْعَرْشِ عَمَّا يَصِفُونَ

“তারা যা বর্ণনা করে, তা থেকে আসমান ও জমিনের প্রভু- মালিক, আরশের প্রভু-মালিক পবিত্র। (সূরা যুখরুফ ৪৩, আয়াত: ৮২)

12. فَتَعَالَى اللَّهُ الْمَلِكُ الْحَقُّ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ

“অতএব মহিমান্বিত আল্লাহ, তিনি সত্যিকার মালিক, তিনি ব্যতীত (সত্য) কোন মাবুদ নেই। তিনি সম্মানিত আরশের মালিক।” (সূরা মু’মিনূন ২৩, আয়াত: ১১৬)

13. قُلْ لَوْ كَانَ مَعَهُ آلِهَةٌ كَمَا يَقُولُونَ إِذًا لَابْتَغَوْا إِلَى ذِي الْعَرْشِ سَبِيلًا

“বলুন: তাদের কথামত যদি তাঁর সাথে অন্যান্য উপাস্য থাকত, তবে তারা আরশের মালিক পর্যন্ত পৌছার পথ অন্বেষণ করত।” (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭ আয়াত: ৪২)

14. لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا فَسُبْحَانَ اللَّهِ رَبِّ الْعَرْشِ عَمَّا يَصِفُونَ

“যদি তাতে তথা আসমান ও জমিনে আল্লাহ ব্যতীত অন্যান্য উপাস্য থাকত, তবে উভয় ধ্বংস হয়ে যেত। অতএব তারা যা বলে, তা থেকে আরশের অধিপতি আল্লাহ পবিত্র।” (সূরা আম্বিয়া ২১, আয়াত: ২২)

15. تَوَلَّوْا فَقُلْ حَسْبِيَ اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْش

“এ সত্ত্বেও যদি তারা বিমুখ হয়ে থাকে, তবে বলে দাও, আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, তিনি ব্যতীত (সত্য) কোন উপাস্য নেই। আমি তাঁরই উপর ভরসা করি এবং তিনিই মহান আরশের অধিপতি।” (সূরা তাওবা ৯, আয়াত: ১২৯)

16. رْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ الرَّحْمَنُ فَاسْأَلْ بِهِ خَبِيرًاالَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَ

“(আল্লাহ) যিনি আসমান, জমিন ও এতদুভয়ের অন্তর্বর্তী সবকিছু ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আরশে সমুন্নত হয়েছেন। তিনি পরম দয়াময়। তাঁর সম্পর্কে যিনি অবগত, তাকে জিজ্ঞেস কর।” (সূরা ফুরকান ২৫, আয়াত: ৫৯)

17. قِرَفِيعُ الدَّرَجَاتِ ذُو الْعَرْشِ يُلْقِي الرُّوحَ مِنْ أَمْرِهِ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ لِيُنْذِرَ يَوْمَ التَّلَ

তিনিই সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী, আরশের মালিক, তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা অহী নাযিল করেন, যাতে সে সাক্ষাতের দিন সম্পর্কে সকলকে সতর্ক করে। (সূরা গফির /মু’মিন ৪০, আযাতঃ ১৫)

18. هِ رَبِّ الْعَالَمِينَوَتَرَى الْمَلَائِكَةَ حَافِّينَ مِنْ حَوْلِ الْعَرْشِ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَقُضِيَ بَيْنَهُمْ بِالْحَقِّ وَقِيلَ الْحَمْدُ لِلَّ

“তুমি ফিরিশতাগণকে দেখবে, তারা আরশের চার পাশ ঘিরে তাদের পালনকর্তার পবিত্রতা ঘোষণা করছে। তাদের সবার মাঝে ন্যায় বিচার করা হবে। বলা হবে, সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব প্রতি পালক আল্লাহর।” (সূরা যুমার ৩৯, আয়াত: ৭৫)

19. ا شَفِيعٍ أَفَلَا يٍّ وَلَ اتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ مَا لَكُمْ مِنْ دُونِهِ مِنْ وَلِ خَلَقَ السَّ اللَّهُ الَّذِي تَتَذَكَّرُونَ

“আল্লাহ যিনি নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি আরশে সমুন্নত হয়েছেন। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন অভিভাবক ও সুপারিশ কারী নেই। এরপরও কি তোমরা বুঝবে না?” (সূরা সাজদা ৩২, আয়াত: ৪)

20. الْأَمْرَ مَا مِنْ شَفِيعٍ إِلَّا مِنْ بَعْدِ إِذْنِهِ إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يُدَبِّرُ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ رَبُّكُمْ اللَّهُ ذَلِكُمُ

“নিশ্চয়ই তোমাদের পালনকর্তা আল্লাহ যিনি তৈরি করেছেন আসমান ও জমিনকে ছয় দিনে, অতঃপর তিনি আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন। তিনি কার্য পরিচালনা করেন। কেউ সুপারিশ করতে পাবে না তবে তাঁর অনুমতি ছাড়া ইনিই আল্লাহ তোমাদের পালনকর্তা। অতএব, তোমরা তাঁরই এবাদত কর। তোমরা কি কিছুই চিন্তা কর না?” (সূরা ইউনুস ১০, আয়াত: ৩)

21.) “আল্লাহ, যিনি ঊর্ধ্বদেশে স্থাপন করেছেন আকাশ মণ্ডলীকে স্তম্ভ ব্যতীত। তোমরা সেগুলো দেখ। অতঃপর তিনি আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন। এবং সূর্য ও চন্দ্রকে কর্মে নিয়োজিত করেছেন। প্রত্যেকে নির্দিষ্ট সময় মোতাবেক আবর্তন করে। তিনি সকল বিষয় পরিচালনা করেন, নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা স্বীয় পালনকর্তার সাথে সাক্ষাত সম্বন্ধে নিশ্চিত বিশ্বাসী হও।” (সূরা রাদ ১৩, আয়াত: ২)

22.) “নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। তিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন। তিনি পরিয়ে দেন রাতের উপর দিনকে এমতাবস্থায় যে, দিন দৌড়ে রাতের পিছনে আসে। তিনি সৃষ্টি করেছেন সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্রকে এমন ভাবে যে তা সবই তাঁর আদেশের অনুগামী। শুনে রেখ, তাঁরই কাজ সৃষ্টি করা এবং আদেশ দান করা। আল্লাহ, বরকতময় যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক।” (সূরা আরাফ ৭, আয়াত: ৫৪)

একটি সংশয় নিরসন: কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ্‌ বান্দার ‘সাথে’ রয়েছেন বলা হয়েছে। এর অর্থ এ নয় যে তিনি তাদের সাথে মিলিত ও সংযুক্ত অবস্থায় রয়েছেন। কেননা এরূপ অর্থ পূর্বসূরী বিদ্বানগণ কেহই করেন নি। পক্ষান্তরে এটা ভাষাগতভাবেও আবশ্যক নয়। আল্লাহ্‌ তা’আলা ‘সাথে’ থাকার ব্যাখ্যা নিজেই দিয়েছেন। যেমন- তিনি বলেন:

هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُوَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنْزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ

“তিনি নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডল সৃষ্টি করেছেন ছয়দিনে, অতঃপর আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন। তিনি জানেন যা ভূমিতে প্রবেশ করে ও যা ভূমি থেকে নির্গত হয় এবং যা আকাশ থেকে বর্ষিত হয় ও যা আকাশে উত্থিত হয়। তিনি তোমাদের সাথে আছেন তোমরা যেখানেই থাক। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখেন।” (সূরা হাদীদ ৫৭, আয়াত: ৪)

“তোমরা যেখানেই থাক না কেন তিনি তোমাদের সাথেই রয়েছেন। আল্লাহ্‌ তোমাদের কৃতকর্মের সম্যক দ্রষ্টা।” (হাদীদ/৪) অর্থাৎ তাঁর দৃষ্টির মাধ্যমে তিনি আমাদের সাথে আছেন, স্ব অস্তিত্বে নয়। হযরত মুসা ও হারূন (আঃ)কে আল্লাহ্‌ ফেরাউনের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন:

“আমি তোমাদের সাথেই রয়েছি শুনছি ও দেখছি।” (সূরা ত্বা-হা/ ৪৬)

অত্র আয়তে আল্লাহ্‌ পাক সাথে থাকার অর্থ নিজেই করেছেন দেখা ও শোনার মাধ্যমে। অর্থাৎ আমি তোমাদের সাহায্যকারী ও রক্ষাকারী। যেমন- সাধারণভাবে আমরা বলে থাকি ‘আপনি উমুক কাজটি করুন আমরা আপনার সাথে আছি’। অর্থাৎ আমরা আপনাকে সমর্থন ও সহযোগিতা করব। যেমন- টেলিফোনে কথা বলার সময় একজন অপরজনকে বলে থাকে: কে আপনি আমার সাথে? জবাবে বলে আমি উমুক আপনার সাথে। অথচ এখানে দুজন অঙ্গা-অঙ্গী হয়ে থাকে না। দু’জন দু’দেশ থেকে কথা বলে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে সাথে থাকার অর্থ মিশে থাকা নয় বরং মহান আল্লাহ্‌ সেই আরশে আ’যীমে থেকেই তাঁর সাহায্য-সহযোগিতা, দেখা-শোনা ও জ্ঞানের মাধ্যমে আমাদের সাথে রয়েছেন। তিনি অসীম ক্ষমতাবান এবং যা চান তাই করতে পারেন।

এ সমস্ত আয়াতের তাফসীরে ইবনে কাসীর রহ: বলেন: তাফসীরকারকগণ এ ব্যপারে একমত পোষণ করেন যে, “তারা আল্লাহ সম্বন্ধে ঐভাবে বর্ণনা করবেন না যেভাবে জাহমীয়ারা (একটি ভ্রষ্ট দল) বলে যে, আল্লাহ সর্বত্র আছেন। আল্লাহ তাআলা তাদের এ জাতীয় কথা হতে পাক পবিত্র ও অনেক ঊর্ধ্বে।”

হাদিছ থেকে প্রমান

১। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সপ্তম আসমানের উপর উঠানো হয়েছিল, তাঁর রবের সাথে কথোপকথনের জন্য। আর সেখানেই পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করা হয়েছিল। (বুখারী ও মুসলিম)।

২। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

ألاَ تأمَنُونيِْْ وَأنا أمِينُ مَنْ فيِ السَّمَاء (وهو اللهُ) (ومعني في السَّماء: علي السَّمَاء) (متفق عليه)

তোমরা কি আমাকে আমিন (বিশ্বাসী) বলে স্বীকার কর না? আমি তো ঐ সত্ত্বার নিকট আমিন বলে পরিগণিত যিনি আসমানের উপর আছেন। (আর তিনি হলেন আল্লাহ)। (বুখারী ও মুসলিম)।

৩। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন:

ارْحَمُوا مَنْ فيِ الارضِ يَرْحَمكٌمْ مَنْ في السَّمَاء (أي هو الله) (الترمذي وقال حسن صحيح)

যারা জমিনে আছে তাদের প্রতি দয়া কর, তবেই যিনি আসমানে আছেন তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। (তিরমিযী হাসান সহীহ)।

৪। অন্য হাদীসে এসেছে:

سأَلَ رَسُولُ الله صلي الله عليه وسلَّمَ جَارِيَةً فَقَالَ لَهَا: أيْنَ اللهَ؟ فَقَالَتْ في السَّماءِ قَالَ مَنْ أنا؟ قَالَتْ أنْتَ رَسٌولُ اللهِ قَالَ: أعْتِقْهَا فإنَّها مُؤْمِنَةً . (مسلم)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্রীতদাসীকে জিজ্ঞেস করলেন: বলতো আল্লাহ কোথায়? সে বলল, আসমানে। তারপর তিনি বললেন: বলতো আমি কে? সে বলল: আপনি আল্লাহর রাসূল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, একে মুক্ত করে দাও, কারণ সে মুমিনা। (মুসলিম)।

৪। অন্যত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

وَالْعَرْشُ فَوْقَ الْمَاء وَاللهُ فَوْقَ عَرْشِهِ وَهُوَ يَعْلَمُ مَا انتُمْ عَلَيْهِ. (حسن رواه أبو داود)

আরশ পানির উপর আর আল্লাহ আরশের উপর। তৎসত্তেও, তোমরা কি কর বা না কর তিনি তা জ্ঞাত আছেন। (আবু দাউদ হাসান)।

৫। আবু বকর রা. বলেছেন:

ومَنْ كَانَ يَعْبُدُ اللهَ فإنَّ اللهَ فيِ السماء حَيٌّ لا يمُوتُ (رواه الدارمي في الرد غلي الجهمية باسناد صحيح)

যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদত করে (সে জেনে রাখুক) নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আসমানের উপর জীবিত আছেন, কখনোই মৃত্যুমুখে পতিত হবেন না। (সুনানে দারেমী সহীহ সনদ) জাহমীয়াদের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ.-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আমরা কিভাবে আমাদের রব সম্বন্ধে জানতে পারব? উত্তরে তিনি বলেছেন: তিনি আসমানে আরশের উপর আছেন, সৃষ্টি হতে আলাদা হয়ে। অর্থাৎ আল্লাহ পাকের জাত আরশের উপর আছেন, সৃষ্টি থেকে আলাদা হয়ে। তার এই উপরে থাকা সৃষ্টির সাথে কোন সামঞ্জস্য নেই।

ইবনে কাসীর(রহঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ্‌ তা’আলা আরশের উপর সমাসীন, কোন অবস্থা ও সাদৃশ্য স্থাপন ছাড়াই তার উপর বিশ্বাস রাখতে হবে । কোন জল্পনা কল্পনা করা চলবে না, যার দ্বারা সাদৃশ্যের চিন্তা মস্তিস্কে এসে যায় ; কারন এটা আল্লাহ্‌র গুনাবলী হতে বহুদুরে। মোটকথা, যা কিছু আল্লাহতাআলা বলেছেন ওটাকে কোন খেয়াল ও সন্দেহ ছাড়াই মেনে নিতে হবে কোন চুল চেরা করা চলবে না । কেননা মহান আল্লাহ্‌ রব্বুল আলামীন কোন কিছুর সাথে সাদৃশ্য যুক্ত নন । [তাফসীর ইবনে কাসীর]

চার ইমামগণই এ ব্যাপারে একমত যে, তিনি আরশের উপর আছেন । ইমাম আবু হানিফা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ “ পবিত্র কোরআনে আল্লাহ্‌র যে সমস্ত সিফাত (গুন)বর্ণিত হয়েছে যেমন-আল্লাহ্‌র হাত,পা,চেহারা,নফস ইত্যাদি আমরা তা দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি। স্বীকার করি এগুলো হচ্ছে তাঁর সিফাত বা গুণাবলী। আমরা যেমন কখনও আল্লাহ্‌র সিফাত সম্পর্কে এ প্রশ্ন করিনা বা করবোনা যে,এ সিফাতগুলো (হাত,পা,চেহারা,চোখ ইত্যাদি) কেমন,কিরুপ বা কিভাবে,কেমন অবস্থায় আছে,তেমনি আল্লাহ্‌র সিফাতের কোন নিজস্ব ব্যাখ্যা বা বর্ণনা দিতে যাইনা। কেননা তিনি তা বর্ণনা করেন নাই। যেমন-আমরা একথা কখনো বলিনা যে, আল্লাহ্‌র হাত হচ্ছে তাঁর কুদরতি হাত,শক্তিপ্রদ পা বা তাঁর নিয়ামত। এ ধরনের কোন ব্যাখ্যা দেয়ার অর্থ হল আল্লাহ্‌র প্রকৃত সিফাতকে অকার্যকর করা বা বাতিল করে দেয়া বা অর্থহীন করা । আল্লাহ্‌র হাতকে আমরা হাতই জানবো এর কোন বিশেষণ ব্যবহার করবো না। কুদরতি হাত রূপে বর্ণনা করবোনা । কোন রকম প্রশ্ন করা ছাড়াই যেরূপ কোরআনে বর্ণিত হয়েছে হুবুহু সে রকমই দ্বিধাহীনে বিশ্বাস করি”। [আল ফিকহুল আকবার]

আবু মুতি আল হাকাম ইবনে আব্দুল্লাহ আল বালাখি বলেনঃ আমি ইমাম আবু হানিফা (রাহিমাহুল্লাহ)কে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে কেউ যদি বলে যে, আমি জানিনা আল্লাহ্‌ কোথায় -আসমানে না পৃথিবীতে, তাহলে তার সম্পর্কে আপনার অভিমত কি? প্রত্যুত্তরে তিনি বলেছেন-সে কাফের, কেননা আল্লাহ্‌ বলেছেন,

“পরম করুণাময় (রাহমান)আরশের উপর সমাসীন। (সুরা-ত্ব হা-৫)

আবু মুতি বলেছেন, অতঃপর আমি তাঁকে (ইমাম আবু হানিফাকে) জিজ্ঞেস করেছিলাম যে কেউ যদি বলে যে, আল্লাহ্‌ উপরে অধিষ্ঠিত, কিন্তু আমি জানিনা আরশ কোথায় অবস্থিত আকাশে না পৃথিবীতে তাহলে তার সম্পর্কে আপনার অভিমত কি? প্রত্যুত্তরে তিনি বলেছেন- যদি সে ব্যক্তি “আল্লাহ্‌ আকাশের উপরে “এ কথা অস্বীকার করে তা হলে সে কাফের। (শারহুল আকিদাহ আত তাহাওইয়াহ লি ইবনে আবিল ইজ আল হানাফি পৃষ্ঠা নং-২২৮)

ইমাম মালিক(রাহিমাহুল্লাহ)বলেনঃ “আল্লাহ্‌র হাত”বলতে আল্লাহ্‌র হাতই বুঝতে হবে, এর কোন রুপক (মাজাযী) অর্থ করা যাবেনা,মাজাযী (রুপক) বর্ণনা দেয়া যাবে না। আল্লাহ কেমন,কিসের মত এরকম প্রশ্ন করা বিদআত এমনকি তাঁর হাত বিশেষণে ভূষিত করে, কুদরতি হাত বলাও যাবেনা কেননা কোরআনে ও সহীহ হাদীসে এভাবে বর্ণনা নাই ”। (আল আসমা ওয়াস সিফাত পৃষ্ঠা নং-৫২৬) আল্লাহ্‌র আরশে অধিষ্ঠিত হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ্‌ আরশে অধিষ্ঠিত একথা জানি, কিভাবে অধিষ্ঠিত তা জানিনা। এর উপর দৃঢ় ঈমান পোষণ করা ওয়াজিব এবং এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদআত।

ইমাম মালিক(রাহিমাহুল্লাহ)আরও বলেনঃ “আল্লাহ্‌ তাঁর আরশে অধিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে যতটুকু বর্ণনা দিয়েছেন তার বাইরে কোন প্রশ্ন করা নিষিদ্ধ ।আল্লাহ্‌ আরশে কিভাবে,কেমন করে সমাসীন বা উপবিষ্ট আছেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ্‌তাআলা আমাদেরকে অবহিত করেননি। তাই এ বিষয়টির কাইফিয়াত আমাদের কাছে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত।” আল্লামা ইবনে হাজর (রাহিমাহুল্লাহ) ফাতহ গ্রন্থে (১৩তম খণ্ড পৃষ্ঠা নং ৪০৬) বলেছেন,উপরক্ত বর্ণনার সনদ বিশুদ্ধ-

ইমাম শাফীঈ(রাহিমাহুল্লাহ)জোরালো অভিমত ব্যক্ত করেন এ প্রসঙ্গেঃ “আল্লাহ্‌তালার আরশে অধিষ্ঠিত হওয়া এবং আল্লাহ্‌র হাত, পা ইত্যাদি যা তাঁর সিফাত বলে বিবেচ্য আর তা কোরআন ও সহীহ সূত্রে সুন্নাহ দ্বারা প্রমানিত হওয়ার পরও যদি কোন ব্যক্তি বিরোধিতা করে, অস্বীকার করে, নিষ্ক্রিয় করে তবে সে অবশ্যই কাফের বলে গন্য হবে। তিনি আরও বলেনঃ আমরা আল্লাহ্‌র গুণাবলী স্বীকার করি ও বিশ্বাস করি তবে সৃষ্টির কোন কিছুর সাথে আল্লাহ্‌র গুনাবলীর কোন আকার সাব্যস্ত করিনা,সাদৃশ্য (তুলনা) করি না। কেননা আল্লাহ্‌ নিজেই তাঁর সাদৃশ্যের বিষয়টি বাতিল করে দিয়েছেন এ বলে-

(সৃষ্টি জগতের) কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়।” (সূরা-শুরা,আয়াত-১১) -সিয়ারে আলামিন নুবালা-১০ম খণ্ড,পৃষ্ঠা নং,-৮০; আর দেখুন আইনুল মাবুদ-১৩তম খণ্ড পৃষ্ঠা নং-৪১;তাবাকতে হানাবিল ১ম খণ্ড পৃষ্ঠা নং-২৮৩-

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল(রহঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ্‌র আসমা ও সিফাতগুলো সম্পর্কে কোরআন ও সহীহ হাদীসগুলোতে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে এগুলোকে ঠিক সেভাবে সে পর্যায়েই রাখা উচিৎ । আমরা এগুলো স্বীকার করি ও বিশ্বাস করি এবং আল্লাহ্‌র সিফাতের কোন সাদৃশ্য করি না । আর এটাই হচ্ছে বিচক্ষন ও বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরামের অনুসৃত নীতি ”। [-ইবনুল জাওযী প্রনীত মুনাক্বীবে ইমাম আহমদ , পৃষ্ঠা নং-১৫৫-১৫৬]

ইমাম আহমদ (রহঃ)আরও বলেনঃ “কোরআন ও হাদীসে আল্লাহ্‌র সিফাতগুলোর বর্ণনা যেমনভাবে এসেছে তার বাহ্যিক ও আসল অর্থ স্বীকার করতে হবে,মেনে নিতে হবে, এর প্রকৃত তথা আসল অর্থকে বাদ দেয়া যাবে না। নিস্ক্রিয় করা যাবে না, খারিজ করা যাবে না ।

আল্লাহ্‌র সিফাতগুলো যথা আল্লাহ্‌র আরশের উপর অধিষ্ঠিত হওয়া আল্লাহ্‌র হাত, পা দেখা শোনা ইত্যাদি সম্পর্কে যেরুপ বর্ণিত আছে তার বাহ্যিক ও আসল অর্থ ছাড়া রূপক , অতিরঞ্জিত অথবা অন্তর্নিহিত কোন পৃথক অর্থ বা ব্যাখ্যা বা বর্ণনা রসুল(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কর্তৃক দেওয়া হয়েছে এমন প্রমান নেই। আমরা যদি এ সত্য উপলব্ধি করি যে, সালফে সালেহীন আল্লাহ্‌র গুনাবলী সঠিক অর্থ বুঝেছেন । তাহলে আমাদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় হলো তারা এগুলোর যে অর্থ বুঝেছেন,আমাদেরকে ঠিক সেই অর্থই বুঝতে হবে । [-মাজমুআতুররাসায়িলিল মুনীরিয়্যাহ পৃষ্ঠা নং(১৭৬-১৮৩]

অতএব, সার কথা হল, আল্লাহ্‌র অবয়ব বিশিষ্ট অস্তিত্বকে, সত্ত্বাকে গুনাবলীকে অস্বীকার করে (অর্থাৎ নিরাকার করে) সন্যাসী,সুফী, পীর সাহেবেরা অলীক সাধনা বলে তাদের ক্বলবে বসিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান করার জন্যই আল্লাহ্‌কে নিরাকার বানিয়ে ধর্মীয় সমাজে প্রচার করেছেন। এটি ‘তাওহীদ আল আসমা ওয়াস সিফাত’ এর সুস্পষ্ট খেলাফ। অবয়ব বিশিষ্ট তথা অস্তিত্বময় আল্লাহ্‌কে নিরাকার না করলে তো তাঁকে (আল্লাহ্‌কে) তাদের ক্বলবে বসানো যাবে না । নিরাকার আল্লাহ্‌কে অলীক সাধনায়,কল্পনায় ক্বলবে বসিয়ে এই মুসলিম রূপধারী পুরোহিতরা নিজেদেরকে দেবতার মর্যাদায় ভূষিত হয়ে সমাজে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে চলেছেন । আসলে এ সবই ভণ্ডামির বেসাতি, স্বার্থোদ্ধারের ধান্দা ।

যুক্তির নিরখে প্রমান:

১। মুসল্লী সিজদায় বলেন: (আমরা মহান উঁচু রবের পবিত্রতা বর্ণনা করছি)। দোয়া করার সময় সে তার হস্তদয়কে আসমানের দিকে উত্তলন করে।
২। যখন বাচ্চাদের প্রশ্ন করা হয়, বলত আল্লাহ কেথায়? তখন তারা তাদের স্বভাবজাত প্রবৃত্তির বশে বলে: তিনি আসমানে।
৩। সুস্থ বুদ্ধি, বিবেক, আল্লাহ যে আসমানে আছেন তা সমর্থন করে। যদি তিনি সর্বত্রই বিরাজমান হতেন তবে অবশ্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা জানতেন এবং সাহাবীদের শিক্ষা দিতেন। দুনিয়ার বুকে এমন অনেক নাপাক অপবিত্র জায়গা আছে যেখানে তাঁর থাকার প্রশ্নই উঠে না।
৪। যদি বলা হয়, আল্লাহ তাআলা তার জাত সহকারে আমাদের সাথে সর্বস্থানে আছেন, তবে তার জাতকে বিভক্ত করতে হয়। কারণ, সর্বত্র বলতে বহু জায়গা বুঝায়। এটাই ঠিক যে আল্লাহ তাআলার পবিত্র জাত এক ও অভিন্ন। তাকে কোন অবস্থাতেই বিভক্ত করা যায় না। তাই ঐ কথার কোন মূল্য নেই, যে তিনি সর্বত্র বিরাজমান। আর এটা প্রমাণিত যে, তিনি আসমানে আরশের উপর আছেন। তবে তিনি তাঁর শ্রবেনর, দেখার ও জ্ঞানের দ্বারা সকল বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবহিত ।

হে সম্মানিত পাঠক পাঠিকাগণ! আমি আশা করি আপনারা পূর্বের আলোচনা থেকে আল্লাহর অবস্থান সম্পর্কে আহলুস্ সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের আক্বীদা আল কুরআনের আলোকে জানতে পেরেছেন। আর তা হলো আল্লাহ আরশের উপর সমুন্নত। তবে তিনি সৃষ্টি জীবের সব কিছু জানেন, দেখেন, পরিচালনা করেন ও তার প্রতিদান দান করেন। আল্লাহ সবাইকে এ মাস’আলাটি সহ আকীদার অন্যান্য মাস’আলাসমূহ সঠিক ভাবে জানার তাওফীক দান করুন।

পরিশেষে আমি সারা বিশ্বের সকল মানুষকে জানিয়ে দিতে চাই যে কেবল সহীহ আক্বীদাই বা সঠিক বিশ্বাসই সারা বিশ্বের সকল মানুষের হৃদয়, তাদের বাণী ও তাদের কাতারকে একত্রিত করতে সক্ষম। সঠিক বিশ্বাসই এ উম্মতের প্রথম যুগের মানুষের অন্তর, বাণী ও কাতারকে একত্রিত করেছিল। তাঁরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নেতৃত্বে তাওহীদের ছায়া তলে একত্রিত হয়েছিলেন। তাঁরা এক দলভুক্ত ছিলেন। তাই তাঁদের মত একত্রিত হওয়া ও একত্রিত করার জন্যে প্রত্যেকেই কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে সঠিক আক্বীদা শিখা ও তা প্রচার ও প্রসার করার জন্যে সর্বশক্তি ব্যয় করা একান্ত কর্তব্য।

আল্লাহ সবাইকে সঠিক আক্বীদা শিখার, তার প্রতি আমল ও তা যথাযথ প্রচার ও প্রসার করার তাওফীক দান করুন আমীন।
লেখক: হাফেজ মো: নুরআলম


নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নূরের তৈরী, না মাটির তৈরী?
লেখক: আখতারুল আমান বিন আব্দুস সালাম

[প্রেরক- দাওয়াহ ওয়া তবলীগ প্রতিনিধি- হাফিজ নূর আলম:: ৬/২/২০১৮]
আমাদের মনে রাখতে হবে, সৃষ্টির উপাদানের উপর ভিত্তি করে কোন ব্যক্তির মর্যাদা নির্ণয় করা সরাসরি কুরআন ও হাদীছ বিরোধী কথা। কারণ মহান আল্লাহ বলেই দিয়েছেনঃ.
‘নিশ্চয় আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে ঐব্যক্তি বেশি সম্মানিত যে তোমাদের মধ্যে সর্বধিক তাক্বওয়াশীল’ পরহেযগার”। (সূরা হুজুরাত: ১৩)

নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ
হে মানব মণ্ডলি! নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক এক, সাবধান! কোন আরবীর আজমীর (অনারব) উপর, কোন আজমীর আরবীর উপর প্রাধান্য নেই। অনুরূপভাবে কোন লাল বর্ণের ব্যক্তির কালো ব্যক্তির উপর, কোন কালো ব্যক্তির লাল বর্ণের ব্যক্তির উপর প্রাধান্য নেই। প্রাধান্য একমাত্র তাকওয়া পরহেযগারিতার ভিত্তিতে হবে। ‘নিশ্চয় আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি বেশি সম্মানিত যে তোমাদের মধ্যে সর্বধিক তাক্বওয়াশীল’-পরহেযগার (আহমাদ প্রভৃতি, হাদীছ ছহীহ। দ্রঃ শাইখ আলবানীর গায়াতুল মারাম, পৃঃ১৯০, হা/৩১৩)

এ জন্যই তো আযরের মত মূর্তী পুজারী মুশরিক ব্যক্তির ঔরষজাত সন্তান ইবরাহীম (আলাইহিস্ সালাম) অন্যতম শ্রেষ্ঠ নবী, শুধু কি তাই মহান আল্লাহর খলীল তথা অন্তরঙ্গ বন্ধুও বটে, তার মিল্লাতের অনুসরন করার নির্দেশ আমাদের নবীকেও করা হয়েছে। পক্ষান্তরে নূহ নবীর মত একজন সম্মানিত ব্যক্তির ঔরষজাত সন্তান কাফের হওয়ার জন্য নিকৃষ্ট ব্যক্তি। বীর্য থেকে মানুষ সৃষ্টি হলেও মানুষই বীর্য অপেক্ষা উত্তম। এমনকি তুলনা করাটাও অনর্থক। আদী পিতা আদম (আলাইহিস্ সালাম) মাটির তৈরী হলেও মাটির থেকে তিনি সন্দেহাতীতভাবে উত্তম, এমনকি তুলনা করাটাও বাহুল্য কাজ..। আবু লাহাব সম্মানিত কুরাইশ বংশের হয়েও অতি নিকৃষ্ট কাফের, যার শানে আল্লাহ সূরা লাহাব নাযিল করেছেন। মহান আল্লাহ এই সূরায় বলেনঃ পরম করুনাময়, দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু। ‘আবু লাহাবের দুটি হাত ধ্বংস হোক, সে নিজেও ধ্বংস হোক। তার সম্পদ, ও যা সে উপার্জন করেছে -কোনই কাজে আসেনি। সে অচিরেই লেলিহান অগ্নিতে প্রবেশ করবে। এবং তার স্ত্রীও-যে ইন্ধন বহন করে, তার গলদেশে খর্জুরের রশি নিয়ে। (সূরা আল লাহাব)

এ থেকেই অকাট্যভাবে প্রতীয়মান হয় যে, মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার জন্মের উপাদানের উপর ভিত্তিশীল নয়। বরং এই শ্রেষ্টত্ব এবং সম্মান তাক্বওয়ার ভিত্তিতে হয়ে থাকে। কাজেই নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নূর থেকে সৃষ্টি না হয়ে মাটি থেকে সৃষ্টি হওয়া তাঁর জন্য মোটেও মানহানিকর বিষয় নয় যেমনটি অসংখ্য বিদআতী তাই ধারণা করে বসেছে। বরং নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাটির তৈরী হয়েও সৃষ্টির সেরা ব্যক্তিত্ব, সর্বাধিক মুত্তাক্বী-পরহেযগার। সমস্ত সৃষ্টি কুলের সর্দার, নবীকুল শিরোমণী, আল্লাহর খালীল-অন্তরঙ্গ বন্ধু। আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে হাশরের মাঠে মহান শাফাআতের অধিকারী, হাওযে কাউছারের অধিকারী, সর্ব প্রথম জান্নাতে প্রবেশকারী। মাক্বামে মাহমূদের অধিকারী, রহমাতুল লিল আলামীন, শাফিঊল লিল মুযনিবীন। এসব বিষয়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মাঝে কোনই দ্বিমত নেই। ইহাই ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈনে ইযাম, আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের বিশ্বাস। যুগ পরম্পরায় এই বিশ্বাসই করে আসছেন সকল সুন্নী মুসলিম।

‘সৃষ্টির উপাদানের ভিত্তিতে ব্যক্তি শ্রেষ্ঠত্ব অজর্ন করে’ এটা ইবলীস শয়তানের ধারণা ও দাবী মাত্র। এই অলিক ধারণার ভিত্তিতেই সে আগুনের তৈরী বলে মাটির তৈরী আদমকে সিজদাহ করতে অস্বীকার করে ছিল। অথচ আল্লাহ অন্যান্য ফেরেশতাদের সাথে তাকেও আদমকে সিজদা করার নির্দেশ করে ছিলেন। তার উচিত ছিল আদমকে সেজদা করা কিন্তু সে তা না করে নিজ সৃষ্টির উপাদানের খোড়া যুক্তি দেখিয়ে নিজেকে উত্তম ও আদম (আলাইহিস্ সালাম)কে অধম মনে করে আদমকে সিজদা করা থেকে বিরত হয়ে ছিল।

মহান আল্লাহ সূরা আরাফে তার ঘটনাটি এইভাবে উদ্ধৃত করেছেনঃ
‘আর আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, এর পর আকার-অবয়ব তৈরী করেছি। অতঃপর আমি ফেরেশতাদেরকে বলেছি-আদমকে সেজদা কর, তখন সবাই সেজদা করেছে, কিন্তু ইবলীস সে সেজদাকারীদের অন্তর্ভূক্ত ছিল না। আল্লাহ বললেনঃ আমি যখন নির্দেশ দিয়েছি, তখন তোকে কিসে সেজদা করতে বারণ করল? সে বললঃ আমি আমি তার চাইতে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দ্বারা। বললেনঃ তুই এখান থেকে নেমে যা। এখানে অহঙ্কার করার অধিকার তোর নাই। অতএব তুই বের হয়ে যা। নিশ্চয় তুই হীনতমদের অন্তর্ভূক্ত। (সূরাহ আল্ আরাফঃ১১-১৩)

অতএব যারা সৃষ্টির উপাদানের ভিত্তিতে ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্ব সাব্যস্ত করার পক্ষপাতি তাদের উপর্যুক্ত আয়াতগুলি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত, চিন্তা করা উচিত যুক্তিটি কোন্ ভদ্রলোকের? ‘নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে নূরের তৈরী গণ্য করা হলে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ হবে, আর মাটির তৈরী গণ্য করলে সেই শ্রেষ্ঠত্ব বিলুপ্ত হবে, তাতে তার মানহানী হবে’ মর্মের যুক্তিটি শয়তানের যুক্তির সাথে মিলে কিনা চিন্তা-ভাবনা করার উদাত্ত আহ্বান রইল।

নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে নূরের তৈরী জ্ঞান করা, বা এই বিশ্বাস করা যে, তিনিই সর্ব প্রথম সৃষ্টি, যেমন ভারত উপ মহাদেশের হানাফী জগতের সকল ব্রেলভী সম্প্রদায় এবং দেওবন্দীদের কেউ কেউ এই বিশ্বাসই করে থাকেন- এসব বিশ্বাস জাল এবং বাতিল হাদীছ নির্ভরশীল (দ্রঃ ছহীহাহ, ১/৮২০, ৪৫৮ নং হাদীছের অধীন আলোচনা দ্রষ্টব্য)
নবী(ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাটির তৈরী এই বিষয়ে অতীতে ছালাফে ছালেহীনের মাঝে কোনই বিতর্ক ছিল না। এখনও যারা প্রকৃত আলেম তারাও এই মর্মে ঐক্যমত যে নবী (ছাল্লাল্লাহু আআইহি ওয়া সাল্লাম) মাটির তৈরী মানুষ ছিলেন, তিনি অন্যান্য সকল মানুষের মত পিতা-মাতার মাধ্যমে পৃথিবীতে এসেছেন। তারা এটাও বিশ্বাস করেন যে,
মানুষ মাটির তৈরী, ফেরেস্তা নূরের এবং জ্বিনজাত আগুনের তৈরী যেমনটি স্বয়ং নবী বলেছেন (মুসলিম,যুহদ ও রাক্বায়িক্ব অধ্যায়,হা/৫৩৪)
কারণ এই মর্মে কুরআন ও হাদীছের বাণী একেবারে স্পষ্ট। এর পরও বিদআতে যাদের আপাদমস্তক নিমজ্জিত, তারা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর বিষয়ে বিতর্ক উঠায়। তারা বলতে চায়, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাটির তৈরী নন, বরং তিনি নূরের তৈরী, তার ছায়া ছিল না..ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই আমরা বিষয়টির ফায়ছালা সরাসরি কুরআন ও নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হাদীছ থেকে নিব। কারণ মহান আল্লাহ বলেনঃ
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর, এবং তাদের কর যারা তোমাদের (ধর্মীয় বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে) নেতৃত্ব দাকারী, আর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিতর্ক কর, তবে বিষয়টিকে আল্লাহ এবং তদীয় রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও, ইহাই উত্তম এবং ব্যাখ্যার দিক দিয়ে সর্বোৎকৃষ্ট’। (আন্ নিসাঃ ৫৯)
মাটি থেকে নবীর সৃষ্টি হওয়ার প্রমাণ

(ক) কুরআন থেকেঃ
আমার নিকট আশ্চর্য লাগে যে বিদআতীরা কেমন করে মহান আল্লাহর দ্ব্যর্থহীন বাণীকে অস্বীকার করে বলে যে, নবী (ছাল্লাল্লাহু আআইহি ওয়াসাল্লাম) মাটির তৈরী নন, বরং নূরের তৈরী। কারণ মহান আল্লাহ একাধিক স্থানে বলেছেন যে নবী (ছাল্লাল্লাহু আআইহি ওয়া সাল্লাম) সৃষ্টিগত দিক থেকে رشب তথা আমাদের মতই একজন মানুষ। যেমনঃ

(১) সূরা কাহাফে মহান আল্লাহ এরশাদ করেনঃ (হে রাসূল!) ‘আপনি বলে দিন, আমি তো তোমাদেরই মত এক জন মানুষ, আমার নিকট এই মর্মে ওহী করা হয় যে, তোমাদের উপাস্য এক ও একক, অতএব যে নিজ প্রতিপালকের দিদার লাভের আশাবাদী সে যেন সৎকর্ম করে এবং নিজ প্রতিপালকের ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক না করে’(সূরা আল্ কাহাফঃ ১১০)

(২) অন্যত্রে মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘আপনি বলুন আমি আমার প্রতিপালকের পবিত্রতা বর্ণনা করছি। একজন মানব, একজন রাসূল বৈ আমি কে? (সূরা বনী ইসরাইল: ৯৩)

(৩) তিনি আরো বলেনঃ ‘নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের বড় উপকার করেছেন, যেহেতু তাদেরই মধ্য থেকে একজনকে রাসূল হিসাবে পাঠিয়েছেন যিনি তাদের নিকট তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওত করেন, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন, এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দান করেন, যদিও তারা ইতোপূর্বে স্পষ্ট গুমরাহীতে নিমজ্জিত ছিল। (সূরাহ আলে ইমরানঃ ১৬৪)

(৪) তিনি আরো বলেনঃ তোমাদের নিকট আগমন করেছে, তোমাদেরই মধ্যকার এমন একজন রাসূল, যার কাছে তোমাদের ক্ষতিকর বিষয় অতি কষ্টদায়ক মনে হয়, যিনি হচ্ছেন তোমাদের খুবই হিতাকাঙ্খী, মুমিনদের প্রতি বড়ই স্নেহশীল, করুনাপরায়ণ। (সূরা তাওবা: ১২৮)

(৫) তিনি আরো বলেনঃ এ লোকদের জন্যে এটা কী বিস্ময়কর হয়েছে যে, আমি তাদের মধ্য হতে একজনের নিকট অহী প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তুমি লোকদেরকে ভয় প্রদর্শন কর এবং যারা ঈমান এনেছে তাদরকে এই সুসংবাদ দাও যে, তারা তাদের প্রতিপালকের নিকট (পূর্ণ মর্যাদা) লাভ করবে, কাফেররা বলতে লাগলো যে, এই ব্যক্তি তো নিঃসন্দেহে প্রকাশ্য যাদুকর। (সূরা ইউনুস: ২)

(৬) তিনি আরো বলেনঃ তিনিই নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন তাদের নিকট, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তাঁর আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত, যদিও তারা ইতোপূর্বে স্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত ছিল। (সূরা-আল্ জুমুআহ: ২)

(৭) আল্লাহ আরো বলেনঃ আমি তোমাদের মধ্য হতে এরূপ রাসূল প্রেরণ করেছি যে, তোমাদের নিকট আমার নিদর্শনাবলী পাঠ করে ও তোমাদেরকে পবিত্র করে এবং তোমাদেরকে গ্রন্থ ও বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়, আর তোমরা যা অবগত ছিলে না তা শিক্ষা দান করেন। (সূরা বাকারা ১৫১)

এখানে মহান আল্লাহ বলেই দিয়েছেন যে, নবী (ছাল্লাল্লাহু আআইহি ওয়া সাল্লাম) ঐসব লোকদেরই একজন, তিনি তাদের বাইরের কোন লোক নন। কাজেই ঐসব লোক যদি নূরের তৈরী হন, তাহলে নবী(ছাল্লাল্লাহু আআইহি ওয়া সাল্লাম)ও নূরের তৈরী হবেন, আর যদি তারা নূরের তৈরী না হন তবে তিনিও নূরের তৈরী হবেন না এটাইতো স্বাভাবিক। আসলে বিদআতীরা কুরআন ও ছহীহ হাদীছ আয়ত্ব করতে এবং এর সঠিক ব্যাখ্যা অনুধাবন করা থেকে চির ব্যর্থ, তাই তারা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে কুরআন ও হাদীছ বিরোধী কথা বলে যে, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাটির তৈরী নন, বরং তিনি নূরের তৈরী। অথচ এভাবে তারা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে অধিক সম্মান দিতে গিয়ে আরো তাঁকে খাটো করে দিয়েছে। কারণ নূরের তৈরী ফেরেশতার উপর আল্লাহ মাটির তৈরী আদম (আলাইহিস্ সালাম)কে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। তাদেরকে দিয়ে আদমের সিজদা করিয়ে নিয়েছেন। (দ্রঃসূরা আল বাকারাহ: ৩৪, সূরা আল্ আ’রাফ: ১১) তাহলে কার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হল? নূরের তৈরী ফেরেশতাদের নাকি মাটির তৈরী আদম (আলাইহিস্ সাল্লাম)এর? অবশ্যই মাটির তৈরী আদম (আলাইহিস্ সালাম) এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হল। তবে আমরা তর্কের খাতিরে এটা বললেও আমাদের বিশ্বাস, আদম (আলাইহিস্ সালাম) ফেরেশতাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে ছিলেন তাঁর ইলমের মাধ্যমে। আর এটা একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহেই হয়ে ছিল। তিনিই আদমের প্রতি অনুগ্রহ করে ফেরেশতাদের চেয়ে তাকে বেশি ইলম দান করে ছিলেন।

আমি বিশ্বের সকল বিদআতীকে বলতে চাই, এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী ও রাসূল (অনেকে বলেনঃ নবী ও রাসূলদের সর্ব মোট সংখ্যা হলঃ এক লক্ষ চব্বিশ হাজার, মতান্তরে দুই লক্ষ চব্বিশ হাজার। এভাবে বলে থাকেন, এটা প্রমাণ করে তারা ঐমর্মে নবী এর কোন হাদীছ অবগত হন নি। মুসনাদ আহমাদ, ছহীহ ইবনু ইব্বান প্রভৃতিতে নবী ও রাসূলদের সর্ব মোট সংখ্যা একলক্ষ চব্বিশ হাজার বলা হয়েছে, আরো বলা হয়েছে তাদের মধ্যে রাসূলদের সংখ্যা সর্ব মোট ৩১৫ জন দ্রঃ মুসনাদ আহমাদ ৫/১৭৯,হা/২১৫৯২, ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/ প্রভৃতি হাদীছ ছহীহ, সিলসিলাতুল আহাদীছ আছ ছহীহাহ ) এর মধ্যে শুধু নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কিভাবে নূরের তৈরী হলেন? যদি তাঁকে নূরের তৈরী না বলায় তার মান খাটো করা হয়,তবে বাকী এক লক্ষ তেইশ হাজার নয়শো নিরানব্বই জন নবী রাসূলকে মাটির তৈরী বলে কি তাদের মান খাটো করা হয় না? নাকি তারাও নূরের তৈরী? কৈ কোন বিদআতীকে তো বলতে শুনি না যে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর মত বাকী সমস্ত নবী, রাসূলগণও নূরের তৈরী! বরং তারা এমনটি শুধু নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ক্ষেত্রেই বলে থাকে। সুতরাং বাকী সমস্ত নবীকে মাটির তৈরী বলায় যেমন তাদের মান হানী হয় না, তদ্রপ আমাদের নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কেও মাটির তৈরী বলায় তার মানহানী হবে না। তবে কেন বিষয়টি নিয়ে এত বাড়াবাড়ি?

এমনকি অনেক মূর্খ বিদআতী নবীকে যারা মাটির তৈরী মানুষ বলে তাদের সকলকে কাফের ফাৎওয়া মেরে দেয়! একজন মুসলিমকে কাফের বলা কী এতই সহজ? না, কখনই নয়, বরং এই বিষয়টি অতীব জটিল এবং সুকঠিন। কারণ একজন মুসলিম ব্যক্তিকে কাফির ফাৎওয়া দেওয়ার অর্থই হলঃ সে জীবিত অবস্থায় থাকলে তার সাথে তার স্ত্রীর সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। নিজ মুসলিম সন্তান-সন্ততির উপর তার অবিভাবকত্ব চলবে না। সে মৃত্যু বরণ করলে তাকে গোসল দেওয়া যাবে না, কাফন পরানো যাবে না, তার জানাযা ছালাত আদায় করা যাবে না। তার জন্য মাগফেরাতের দুআ করা যাবে না, মুসলিমদের কবরস্থানে তাকে দাফন করা যাবে না। তার কোন মুসলিম আত্মীয় স্বজন তার মীরাছ পাবে না, বরং তার সমুদয় ধন-সম্পদ সরকারী বায়তুল মালে জমা হয়ে যাবে। পরকালে সে জাহান্নামে চিরস্থায়ীভাবে বসবাস করবে…প্রভৃতি। আর যদি সে প্রকৃত অর্থে কাফের না হয় তবে কাফের ফাৎওয়া দাতা আল্লাহর উপর মিথ্যারোপকারী বলে গণ্য হবে ফলে সে সর্বাধিক যালিমে পরিণত হবে। আর তার একমাত্র বাসস্থান হবে জাহান্নাম (দ্রঃ আরাফঃ)। এবং তাকে অন্যায়ভাবে কাফের বলার জন্য নিজেই কাফিরে পরিণত হবে (বুখারী প্রভৃতি)। এ থেকেই প্রতীয়মান হয় বিষয়টি কত জটিল এবং সুকঠিন। এজন্যই বড় বড় ওলামায়েদ্বীন মুসলিম ব্যক্তিকে সহজে কাফের বলেন না,বরং সে ক্ষেত্রে বহু সতর্কতা অবলম্বন করে থাকেন) তাদের এই মূর্খামীদুষ্ট ফাৎওয়া অনুযায়ী সালাফে ছালেহীনের সকলই কাফের গণ্য হবে। কারণ তারা সৃষ্টি গত দিক থেকে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে মাটির তৈরী মানুষই মনে করতেন। তাঁরা আদৌ তাঁকে নূরের তৈরী গণ্য করতেন না।

লেখক: আখতারুল আমান বিন আব্দুস সালাম


অতি গুরুত্বপূর্ণ কতিপয় জিজ্ঞাসা ও সেগুলোর জবাব
সংকলক: শাইখ মুহা:আব্দুল্লাহ আল কাফী
লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

[প্রেরক- দাওয়া ওয়া তবলীগ প্রতিনিধি :: হাফিজ নুরুল আলম :: তারিখ – ০৪/০২/২০১৮ ইং]
প্রিয় মুসলিম ভায়েরা, আকীদা বিষয়ক বারটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং কুরআন, সহীহ হাদীস ও বিশ্ববরেণ্য ওলামাগণের ফাতওয়ার আলোকে সেগুলোর উত্তর প্রদান করা হল। আমাদের বিশ্বাসকে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য এবং সঠিক আকীদার উপর চলার জন্য এ প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা খুব জরুরী। আসুন, আমরা প্রশ্নগুলো পড়ি এবং সেগুলোর উত্তর জানার চেষ্টা করি। মহান আল্লাহ তায়ালার নিকট প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদেরকে পরিশুদ্ধ আকীদা ও বিশ্বাস সহকারে সঠিক পথে চলার তাওফীক দান করেন।

প্রশ্ন-১: জ্যোতির্বিদ, গণক, হস্তরেখা বিদ, যাদুকর প্রভৃতির কাছে যাওয়া বা তাদের কথা বিশ্বাস করার বিধান কি?
উত্তর: কোন জ্যোতির্বিদ, গণক, হস্তরেখা বিদ, যাদুকর প্রভৃতির কাছে যাওয়া বা তাদের কথা বিশ্বাস করা বৈধ নয়। কেননা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, যে ব্যক্তি কোন গণৎকারের কাছে গিয়ে কোন কিছু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে, তার চল্লিশ দিনের ছালাত কবুল করা হবে না। (ছয় শতাধিক মুসলিম) গণৎকার বলতে ভাগ্য গণনাকারী দৈবজ্ঞ, জ্যোতিষী, যাদুকর সকলেই উদ্দেশ্য। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেন, যে ব্যক্তি কোন জ্যোতির্বিদের কাছে যাবে, অত:পর সে যা বলে তা বিশ্বাস করবে, সে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দ্বীনের সাথে কুফরী করবে। (মুসনাদ আহমাদ ও সুনান গ্রন্থ সমূহ)

প্রশ্ন-২: আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কারো নামে কি কসম বা শপথ করা যায়?
উত্তর: আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কারো নাম নিয়ে শপথ করা জায়েজ নয়। নবী সাল্লাল্লাহু বলেন, সাবধান, নিশ্চয় আল্লাহ্‌ পাক তোমাদেরকে তোমাদের বাপ-দাদাদের নাম নিয়ে কসম করতে নিষেধ করছেন। কেউ যদি কসম করতে চায় তবে সে যেন আল্লাহ্‌র নাম নিয়ে করে অন্যথা যেন নীরব থাকে। (বুখারী ও মুসলিম)
আবু হুরায়রা (রা:) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমরা স্বীয় বাপ-দাদা বা মা-দাদী-নানী প্রভৃতির নামে কসম করবে না। আর সত্য বিষয় ছাড়া আল্লাহ্‌র নামে কসম করবে না। (আবূ দাঊদ, নাসাঈ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করবে সে কুফরী করবে অথবা শিরক করবে। (মুসনাদ আহমাদ)

প্রশ্ন-৩: কবরের পরিচয়ের জন্য কোন ন্যাম প্লেট বোর্ড লটকানো যাতে তার নাম মৃত্যু তারিখ প্রভৃতি লিখা থাকবে। বা এমন কোন বোর্ড লটকানো যাতে কুরআনের কোন আয়াত লিখা থাকে, তবে তার বিধান কি?
উত্তর: কবরের উপর কোন কিছু লিখা জায়েজ নয়- না কোন কুরআনের আয়াত না নাম পরিচয়- না কোন বোর্ডের উপর না কোন পাথরের উপর আর না কবর বাঁধাই করে তার দেয়ালে। জাবের (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষেধ করেছেন, কবরকে চুনকাম করতে, তার উপর বসতে এবং তার উপর ঘর উঠাতে। (মুসলিম) তিরমিযী এবং নাসাঈর অপর বিশুদ্ধ বর্ণনায় রয়েছে, এবং তার উপর কোন কিছু লিখতেও নিষেধ করেছেন। (আবূ দাঊদ, নাসাঈ,) তিরমিযীর অপর বর্ণনায়: সেখানে মসজিদ তৈরি করতে এবং কোন বাতি জ্বালাতে নিষেধ করেছেন।

প্রশ্ন-৪: মহিলাদের কবর যিয়ারতে বিধান কি?
উত্তর: মহিলাদের কবর যিয়ারত করা বৈধ নয়। কেননা রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অধিক কবর যিয়ারতকারীনী নারীদের উপর লানত (অভিশাপ) করেছেন। (আবূ দাঊদ, তিরমিযী, নাসাঈ) কেননা তারা একধরণের ফিতনা, তাদের ধৈর্য কম। তাই আল্লাহ্‌ করুণা এবং অনুগ্রহ করে কবর যিয়ারত করা তাদের জন্য নিষিদ্ধ করেছেন। যাতে করে তারা ফিতনায় না পড়ে এবং তাদের দ্বারা অন্যরা ফিতনায় না পড়ে। আল্লাহ্‌ সকলের অবস্থা সংশোধন করুন। -(শায়খ বিন বায)

প্রশ্ন-৫: মৃত ব্যক্তিকে দাফন করে কবরের কাছে কুরআন পাঠ করার বিধান কি? বা ইছালে ছওয়াবের উদ্দেশ্যে মৃতের গৃহে কুরআন পাঠ করার জন্য হাফেয-কারীদের ভাড়া করে নিয়ে আসার হুকুম কি?
উত্তর: মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর তার কবরের কাছে কুরআন পাঠ করা একটি বিদআতী কাজ। কেননা এধরণের কাজ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে ছিল না। তিনি এরূপ করেন নি করার আদেশও করেন নি। বরং দাফনের পর কি করতে হয় তা বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন ব্যক্তিকে দাফন করার পর সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়াতেন এবং বলতেন, তোমাদের মৃত ভায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তার দৃঢ়তার জন্য দুআ কর, কেননা এখনই সে জিজ্ঞাসিত হবে। (আবু দাঊদ)
কবরের কাছে কুরআন পাঠ করা যদি শরীয়ত সম্মত হত বা তাতে কোন কল্যাণ থাকত তবে অবশ্যই নবী সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লাম সে নির্দেশ দিতেন এবং দলীল পাওয়া যেত। অনুরূপভাবে কোন গৃহে হাফেয-কারীদেরকে একত্রিত করে কুরআন পাঠ করে তা মৃতের রূহে বখশে দেয়াও একটি বড় ধরনের বিদআতী কাজ। শরীয়তে যার কোন দলীল নেই। সালাফে ছালেহীন তথা ছাহাবায়ে কেরামের কেউ একাজ করেননি। একজন মুসলিম ব্যক্তি যখন কোন বিপদে পড়বে বা কোন দুর্ঘটনায় পতিত হবে তখন সে ধৈর্য ধারণ করবে এবং আল্লাহ্‌র কাছে এর প্রতিদান আশা করবে। আর ধৈর্য ধারণকারীদের মত দুআ করবে, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেঊন, আল্লাহুম্মা আজুরনী ফী মুসীবাতী ওয়াখলুফলী খাইরান্‌ মিনহা। (শায়খ ইবনু ঊছাইমীন)

প্রশ্ন-৬: মীলাদুন্নবী উপলক্ষে বা কোন পীর-ওলীর উরূস উপলক্ষে যদি কোন প্রাণী যবেহ করা হয়, তবে তা খাওয়া কি জায়েজ?
উত্তর: কোন নবী বা ওলী বা যে কারো জন্মদিন উপলক্ষে যদি তার সম্মানের উদ্দেশ্যে প্রাণী যবেহ করা হয়, তবে তা গাইরুল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে যবেহ করার অন্তর্ভুক্ত হবে- যা সুস্পষ্ট শিরক। আর সে প্রাণীর মাংস খাওয়া জায়েজ নয়। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহ্‌র নামে প্রাণী যবেহ করে আল্লাহ্‌ তার প্রতি লানত (অভিশাপ) করেন। (মুসলিম)

প্রশ্ন-৬: বিদআত এবং কুসংস্কারে লিপ্ত ব্যক্তির জানাযায় শরীক হওয়া বা তাদের মৃতদের জানাযা ছালাত আদায় করা কি বৈধ?
উত্তর: ঐ লোকের বিদআত ও কুসংস্কার যদি শিরকের পর্যায়ভুক্ত হয়, যেমন মৃত বা অনুপস্থিত বা অদৃশ্য কোন ব্যক্তি বা জিন বা ফেরেশতা বা যে কোন সৃষ্টির নিকট থেকে সাহায্য প্রার্থনা করা, বিপদাপদে উদ্ধার কামনা করা, তবে তাদের জানাযায় অংশ নেয়া বা তাদের মৃতদের উপর ছালাতে জানাযা আদায় করা জায়েজ নয়। কিন্তু যাদের কর্মকাণ্ড শিরকের পর্যায়ে পৌঁছে না যেমন সাধারণ বিদআতিগণ- যারা শির্কমুক্ত মীলাদুন্নবী পালন করে, ইসরা-মেরাজ উদ্‌যাপন করে, মুখে নিয়ত উচ্চারণ করে.. প্রভৃতি, তারা হচ্ছে পাপী-গুনাহগার। তাদের জানাযায় শরীক হওয়া যাবে এবং তাদের মৃতদের উপর ছালাতে জানাযাও আদায় করা যাবে। তাওহীদপন্থী পাপীদের ব্যাপারে যা আশা করা যায় তাদের জন্যও তা আশা করা যায়। কেননা আল্লাহ্‌ বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ্‌ ক্ষমা করেন না যে তার সাথে শিরক করে, এবং তিনি এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। (সূরা নিসা- ৪৮) -(সঊদী আরব স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড)

প্রশ্ন-৭: মৃত বা অনুপস্থিত কোন ব্যক্তির নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা তাদের থেকে উদ্ধার কামনা করা কি বড় ধরণের কুফরী বিষয়?
উত্তর: নিশ্চয়। মৃত বা অনুপস্থিত কোন ব্যক্তির নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা- তাদের থেকে উদ্ধার কামনা করা বড় ধরণের শির্কী কাজ। যে ব্যক্তি এরূপ করবে সে ইসলাম ধর্ম থেকে বহিষ্কৃত হয়ে যাবে। কেননা আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌র সাথে অন্য কাউকে মবূদ হিসেবে আহ্বান করে যে ব্যাপারে তার কাছে কোন প্রমাণ নেই। তার হিসাব তার পালনকর্তার কাছে আছে। নিশ্চয় কাফেররা সফলকাম হবে না। (সূরা মুমিনূন-১১৭)আল্লাহ্‌ আরও বলেন, ইনি তোমাদের প্রভু, রাজত্ব তাঁরই। তাঁকে ছেড়ে তোমরা যাদেরকে আহ্বান কর, তারা খেজুরের আঁটির উপর পাতলা আবরণেরও অধিকারী নয়। যখন তোমরা তাদেরকে ডাক তখন তারা তোমাদের ডাক শুনে না। শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেয় না। কিয়ামত দিবসে তারা তোমাদের শিরক অস্বীকার করবে। বস্তুত: আল্লাহ্‌র ন্যায় তোমাকে কেউ অবহিত করতে পারে না। (সূরা ফাতের ১৩- ১৪)

প্রশ্ন-৮: কোন নবী বা ওলী বা সৎ লোকের কবর যিয়ারতের নিয়তে সফর করার হুকুম কি? এধরণের যিয়ারত কি শরীয়ত সম্মত হবে?
উত্তর: কোন নবী বা ওলী বা সৎ লোকের কবর যিয়ারতের নিয়তে সফর করা জায়েজ নয়। বরং তা বিদআত। একথার দলীল হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এ হাদীছ। তিনি বলেন, (ইবাদতের উদ্দেশ্যে) তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও সফর করা যাবেনা। মসজিদে হারাম, আমার মসজিদ এবং মসজিদে আক্বছা। (বুখারী ও মুসলিম) তিনি আরও বলেন, যে ব্যক্তি এমন আমল করবে, যে ব্যাপারে আমাদের কোন নির্দেশনা নেই, তবে তা প্রত্যাখ্যাত। (বুখারী ও মুসলিম) তবে সফর না করে তাদের কবর যিয়ারত করা সুন্নাত। রাসূল বলেন, তোমরা কবর যিয়ারত করতে পার, কেননা উহা তোমাদেরকে আখেরাতের কথা স্মরণ করাবে। (মুসলিম)

প্রশ্ন-৯: ওলীদের কবর দ্বারা সাহায্য প্রার্থনা করার বিধান কি? অনুরূপভাবে তাদের কবর তওয়াফ করা, তাদের নামে নযর-মানত করা, কবরের উপর ঘর উঠানো এবং আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভের জন্য তাদেরকে অসীলা বা মাধ্যম নির্ধারণ করার বিধান কি?
উত্তর: কোন নবী বা ওলীর কবর দ্বারা সাহায্য প্রার্থনা করা, তাদের নামে নযর-মানত করা, আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভের জন্য তাদেরকে অসীলা বা মাধ্যম নির্ধারণ করা হচ্ছে বড় ধরণের শিরক। একারণে ব্যক্তি ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত হয়ে যাবে। আর এ অবস্থায় তার মৃত্যু হলে সে চিরকাল জাহান্নাম বাসী হবে। কিন্তু কবরের তওয়াফ তার উপর ঘর উঠানো প্রভৃতি কাজ হচ্ছে বিদআত। যা গাইরুল্লাহ্‌র ইবাদত করার একটি অন্যতম মাধ্যম। অবশ্য একাজের মাধ্যমে ব্যক্তি যদি কবর বাসী থেকে কোন উপকার পাওয়া বা বিপদ দূরীভূত হওয়ার কামনা করে বা তওয়াফের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির নৈকট্য উদ্দেশ্য করে তবে তা হবে বড় শিরক। -(সঊদী আরব স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড)

প্রশ্ন-১০: মাজারে পশু যবেহ করার হুকুম কি? বা মাজারে কোন উপকার-অপকারের ক্ষেত্রে সাহায্য বা উদ্ধার প্রার্থনা করার বিধান কি?
উত্তর: মাজারে পশু যবেহ করা বড় শিরক। যে এরূপ করবে সে অভিশপ্ত। আলী (রা:) কর্তৃক বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহ্‌র নামে প্রাণী যবেহ করে আল্লাহ্‌ তার প্রতি লানত (অভিশাপ) করেন। (মুসলিম)

প্রশ্ন-১১: আল্লাহ্‌র নেক ওলী-আউলিয়াদের কবরে মসজিদ নির্মাণের বিধান কি? এধরণের মসজিদে ছালাত আদায় করা কি বৈধ?
উ: কোন ওলীর কবরে মসজিদ নির্মাণ করা জায়েজ নয়। এবং সেখানে ছালাতও আদায় করা বিধিসম্মত নয়। কেননা রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ্‌ অভিশাপ করেছেন ইহুদী খৃষ্টানদের উপর। কেননা তারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে কেন্দ্র করে মসজিদ নির্মাণ করেছে। (বুখারী ও মুসলিম) তিনি আরও বলেন, সাবধান, তোমাদের পূর্ববর্তীগণ তাদের নবী এবং নেক লোকদের কবর সমূহে মসজিদ নির্মাণ করেছে। সাবধান, তোমরা কবরে মসজিদ নির্মাণ করবে না। কেননা আমি তোমাদেরকে এরূপ করতে নিষেধ করছি। (মুসলিম) জাবের (রা:) কর্তৃক আরও বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষেধ করেছেন, কবরকে চুনকাম করতে, তার উপর বসতে এবং তার উপর ঘর উঠাতে। (মুসলিম)

প্রশ্ন-১২: যদি কোন ব্যক্তি এরূপ বিশ্বাস করে যে আল্লাহ্‌ তাআলা আকাশ-পৃথিবী সর্বাস্থানে সবকিছুতে বিরাজমান। এ লোকের পিছনে কি ছালাত আদায় করা যাবে?
উ: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদাহ্‌ বিশ্বাস হল, আল্লাহ্‌ তাআলা সমগ্র সৃষ্টি জগতের ঊর্ধ্বে সর্বোচ্চ স্থান আরশে অবস্থা করেন। তিনি স্বীয় সত্বার সাথে সামঞ্জস্য শীল অবস্থায় সুমহান আরশে উন্নীত। একথার দীলল হচ্ছে, আল্লাহ্‌ বলেন, (الرحمن على العرش استوى) দয়াময় আল্লাহ্‌ আরশে সমাসীন। (সূরা ত্বাহা- ৫) তিনি আরও বলেন, তিনি সর্বোচ্চ সুমহান।(বাক্বারা-২৫৫) তিনি ঈসা (আ:) সম্পর্কে বলেন, তিনি তাকে নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন। (নিসা-১৫৮) তিনি আরও এরশাদ করেন, তিনি আকাশের অধিবাসীদের মাবূদ এবং জমিনের অধিবাসীদের মাবুদ। (যুখরুফ-৮৪) তিনি সপ্তাকাশের উপর আরশে আযীমে অবস্থান করা সত্বেও তাঁর জ্ঞান, দৃষ্টি, তত্বাবধান প্রভৃতি আমাদের সাথেই রয়েছে। তিনি এরশাদ করেন, তোমরা যেখানেই থাকনা কেন তিনি তোমাদের সাথেই রয়েছেন। (হাদীদ-৪) এরপরও কেউ যদি বিশ্বাস করে যে আল্লাহ্‌ স্বসত্বায় জমিনে বা সর্বাস্থানে বিরাজমান, তবে তা হবে কুরআন-সুন্নাহ্‌ ও এজমার বিরোধী। অজ্ঞতার কারণে কেউ যদি এরূপ বিশ্বাস করে তবে তাকে সঠিক জ্ঞান দান করতে হবে। তারপরও যদি ঐ বিশ্বাস রাখে তবে সে কাফের হয়ে যাবে- যার পিছনে ছালাত আদায় করা জায়েজ হবে না। -(সঊদী আরব স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড)

আল্লাহ্‌ আমাদের সবাইকে ঈমান রক্ষা করে শিরক মুক্ত জীবন গড়ার তাওফীক দিন।

সংকলক: শাইখ মুহা:আব্দুল্লাহ আল কাফী
লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়


আল্লাহকে পেতে মাধ্যম গ্রহণ
লেখক : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
সূত্র : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ, সৌদিআরব

[প্রেরক- দাওয়া ওয়া তবলীগ প্রতিনিধি :: হাফিজ নুরুল আলম :: তারিখ – ০৪/০২/২০১৮ ইং]
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁরই প্রশংসা করছি, তাঁর কাছেই সাহায্য চাচ্ছি। আর তার কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমাদের মন্দ কৃতকর্ম, এবং আত্মার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে আল্লাহর দরবারে আশ্রয় নিচ্ছি, আল্লাহ তা’আলা যাকে হিদায়াত করেন তাকে গোমরাহ করার কেউ নেই। আর যাকে গোমরাহ করেন তাকে হেদায়াত করার কেউ নেই, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন মাবুদ নেই, তার কোন শরীক নেই, আর ও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।

স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে মাধ্যম মানার ব্যাপারটা অত্যন্ত বিপজ্জনক বিষয়। পরিতাপের বিষয় যে, অনেক মুসলমানই এ সম্পর্কে পরিষ্কার কোন ধারণা রাখেনা। ফলে আমরা আল্লাহর সাহায্য সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হতে চলেছি, যে সাহায্য করার কথা তিনি কুরআনে তাঁর কাছে আশ্রয় কামনা এবং তাঁর শরীয়তের অনুসরণ করার শর্তে ঘোষণা করেছেন।

আল্লাহ বলেন : “আর মু’মিনদের সাহায্য করা আমার দায়িত্ব”। সূরা আর-রূম: ৪৭ “যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর তবে তিনিও তোমাদের সাহায্য করবেন, এবং তোমাদের পদযুগলে স্থিতি দিবেন”। সূরা মুহাম্মাদ: ৭ “আল্লাহর জন্যই যাবতীয় সম্মান, আর তাঁর রাসূলের জন্য, এবং মু’মিনদের জন্য”। সূরা আল-মুনাফিকূন: ৮ “তোমরা দুর্বল হয়োনা, এবং তোমরা চিন্তা করোনা, তোমরাই বিজয়ী হবে যদি তোমরা ঈমানদার হও”। সূরা আলে-ইমরান: ১৩৯

সৃষ্টি ও স্রষ্টার মাঝে মাধ্যম বলতে কি বুঝায়, এ ব্যাপারে মানুষ তিনটি দলে বিভক্তঃ
একঃ একদল হচ্ছে তারা যারা শরীয়ত প্রণেতা হিসাবে প্রেরিত একমাত্র মাধ্যম রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কেও মানতে নারাজ, বরং তারা দাবী করছে, – আর কত জঘন্যই না তাদের এ দাবী – যে, শরীয়ত শুধুমাত্র সাধারণ মানুষের জন্য, উপরন্ত তারা এ শরীয়ত কে “ইলমে জাহীর” বা প্রকাশ্য বিদ্যা হিসাবে নামকরণ করেছে, তারা তাদের ইবাদতের ক্ষেত্রে কতেক বাজে চিন্তা-ধারণা ও কুসংস্কারকে গ্রহণ করে “ইলমে বাতেন” বা গোপন বিদ্যা নামে চালু করেছে, আর এর দ্বারা যা অর্জিত হয় তার নাম দিয়েছে (কাশ্ফ)। মূলত তাদের এই কাশ্ফ ইবলীশি কুমন্ত্রণা আর শয়তানী মাধ্যম ছাড়া কিছুই নয়, কারণ এটা ইসলামের সাধারণ মুলনীতির পরিপন্থী, এ ব্যাপারে তাদের দলগত শ্লোগান হলোঃ এ কথা (আমার মন আমার রব থেকে সরাসরি বর্ণনা করেছে)। এতে করে তারা শরীয়তের আলেমদের সাথে ঠাট্টা করছে, এবং এ বলে দোষ দিচ্ছে যে, তোমরা তোমাদের বিদ্যা অর্জন করছ ধারাবাহিক ভাবে মৃতদের থেকে আর তারা তাদের বিদ্যা সরাসরি চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী রব এর কাছ থেকে অর্জন করছে।

এ সমস্ত কথা দ্বারা তারা অনেক সাধারন মানুষকে আকৃষ্ট করে তাদের পথভ্রষ্ট করছে। আর শরীয়ত নিষিদ্ধ অনেক কাজ তারা এভাবে জায়েয করেছে যার বিবরণ তাদের কুসংস্কারপূর্ণ বই গুলিতে বিশদভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ফলে এ ব্যবস্থার অবসান কল্পে আলেমগণ তাদেরকে কাফের এবং ধর্ম বিচু্যতির কারণে তাদের হত্যা করার নির্দেশ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। কারণ তারা জানতনা বা জেনেও না জানার ভান করত যে, ইসলামের প্রথম মূলনীতি হলোঃ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর অবতীর্ণ পদ্ধতির বাইরে কেউ আল্লাহর ইবাদাত করলে সে কাফের হিসাবে গণ্য হবে; কেননা আল্লাহ বলেন: সুতরাং তারা যা বলছে তা নয় বরং আপনার রবের শপথ, তারা যতক্ষণ পর্যন্ত আপনাকে তাদের মধ্যকার ঝগড়ার মাঝে বিচারক মানবে না অতঃপর তাদের অন্তরে আপনার ফয়সালার ব্যাপারে কোন প্রকার দ্বিধা দ্বন্দ্বের অস্তিত্ব থাকবেনা, এবং পরিপুর্ণভাবে তা মেনে নিবে না ততক্ষণ পর্যন্ত তারা ঈমানদার হতে পারবে না। সূরা আন্-নিসা: ৬৫ আর এভাবেই শরীয়তের ইলমের বিরোধীতা ও তার আলোকে নির্বাপিত করার কাজ শয়তান তাদের মনে সৌন্দর্য মন্ডিত করে দেখায়। ফলে তারা নিশ্চিদ্র অন্ধকারে ঘুরতে থাকে এবং তাদের খেয়াল খুশি মোতাবেক আল্লাহর ইবাদত করতে থাকে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা তাদের যে চিত্র অংকন করেছেন তা তাদের ক্ষেত্রে সঠিক বলে প্রতিয়মান হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন- বলুন, আমি কি তোমাদেরকে আমলের দিক থেকে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্তদের সংবাদ দেব? (তারা হলো ঐ সব লোক) যাদের দুনিয়ার জীবনের সমস্ত প্রচেষ্টা পন্ড হয়ে গেছে, অথচ তারা মনে করত কত সুন্দর কাজই না তারা করছে, তারাই সে সব লোক যারা তাদের রবের আয়াতসমূহ ও তার সাথে সাক্ষাৎকে অস্বীকার করেছে, ফলে তাদের সমস্ত আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে, সুতরাং কিয়ামতের দিন তাদের জন্য কোন ওজন স্থাপন করবোনা)। সূরা আল-কাহ্ফ: ১০৩-১০৫ এ গ্রুপ শতধা বিভক্ত হয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে লেগেছে, কারণ তারা সহজ সরল পথ থেকে দূরে সরে গেছে, যে পথ ছিল আল্লাহর নেয়ামতপ্রাপ্তদের পথ, অভিশপ্ত বা পথহারাদের পথ নয়। তাদের সমস্ত গ্রুপই জাহান্নামে যাবে, কারণ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: (আমার উম্মত তিয়াত্তর ফেরকা বা গ্রুপে বিভক্ত হবে, বাহাত্তরটি জাহান্নামে আর একটি জান্নাতে যাবে – আর তারাই হচ্ছে- আমি এবং আমার সাহাবাগণ যে পথে আছি, তার উপর থাকবে)। হাদিসটি আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, তিরমিযি সবাই আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আন্হু) থেকে সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন।

দুইঃ যারা মাধ্যম সাব্যস্ত করতে গিয়ে সীমালংঘন করেছে, আর মাধ্যমের ভুল ব্যাখ্যা করে এর উপর এমন কিছু জিনিস চাপিয়েছে, যা চাপানো কক্ষনো জায়েয নয়। তারা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং অন্যান্য নবী ও নেক্কার ব্যক্তিবর্গকে এমনভাবে মাধ্যম মানতে শুরু করেছে যে তাদের বিশ্বাস আল্লাহ তা’আলা কারো কোন আমল এদের মাধ্যম হয়ে না আসলে কবুল করবেননা; কারণ এরাই হচ্ছে তার কাছে যাওয়ার অসীলা। (নাউজুবিল্লাহ)। এতে করে তারা আল্লাহ তা’আলাকে এমন সব অত্যাচারী বাদশাহদের বিশেষণে বিশেষিত করেছে যারা তাদের প্রাসাদে প্রচুর দারোয়ান নিযুক্ত করে রেখেছে যাতে করে কোন শক্তিশালী মাধ্যম ছাড়া তাদের কাছে পৌঁছা কক্ষনো সম্ভব হয়ে উঠেনা। অথচ আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন: যখন আপনাকে আমার বান্দাগণ আমার সম্পর্কে প্রশ্ন করে তখন (বলুন) আমি নিকটে, আহবানকারী যখন আমাকে আহবান করে আমি তার ডাকে সাড়া দেই, সুতরাং তারা যেন আমার হুকুম মেনে নেয় এবং আমার উপরই ঈমান আনে যাতে করে তারা সৎপথ লাভ করে। আল্লাহ তা’আলার এ বাণীর সাথে পূর্ব বর্ণিত লোকদের বিশ্বাসের সংগতি কতটুকু? এ আয়াত ইঙ্গিত করছে যে, আল্লাহর কাছে পৌঁছার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে তার উপর সঠিকভাবে ঈমান আনা এবং তার প্রর্দশিত পথে ইবাদাত করা। দৃশ্যনীয় যে, এ আয়াতে ইবাদতের কথা ঈমানের পূর্বে উল্লেখ করে নেক আমল বা সৎকাজের গুরুত্ব সম্পর্কে সাবধান করা হয়েছে; কেননা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও তার জান্নাত হাসিলের জন্য এটা প্রধান শর্ত।

আল্লাহ তা’আলা কুরআনে অসীলা শব্দের উল্লেখ করেছেন এবং তা দ্বারা পূর্ণ আনুগত্য করাকেই বুঝিয়েছেন কারণ এটা (অর্থাৎ আল্লাহ ও তার রাসূলের পূর্ণ আনুগত্যই) একমাত্র মাধ্যম যা তাঁর নৈকট্য দিতে পারে এবং তার রহমতের দরজা খুলতে ও জান্নাতে প্রবেশ করাতে সক্ষম। তাই বলছেনঃ (হে ঈমানদারগণ তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তার কাছে অসীলা (পূর্ণ আনুগত্যের মাধ্যমে নৈকট্য) অন্বেষণ কর আর তার রাস্তায় জিহাদ কর যাতে করে তোমরা সফলকাম হতে পার।) সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৫ নেককার বান্দাদেরকে যারা অসীলা হিসাবে গ্রহণ করে এমন মুর্খ, চেতনাহীন লোকদেরকে আল্লাহ তা’আলা পরিহাস করেছেন কারণ তারা নেককার বান্দাদেরকে অসীলা বানাচ্ছে, অথচ নেককার বান্দারা নিজেরাই এই অসীলা তথা আল্লাহর আনুগত্য দ্বারা নৈকট্য হাসিলের অধিক মুখাপেক্ষী। আর এ ছাড়া আল্লাহর নৈকট্য লাভের দ্বিতীয় কোন পথ নেই, যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেছেন: (তারা যাদের আহবান করছে তারা নিজেরাই তাদের প্রভূর নৈকট্য লাভের জন্য অসীলা খুঁজছে। তারা তার রহমতের আশা করছে, তার শাস্তির ভয় করছে, নিশ্চয়ই আপনার প্রভুর শাস্তি ভীতিপ্রদ)। সূরা আল-ইসরা: ৫৭

বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, এ সমস্ত অমনযোগী লোকেরা যাদেরকে মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করেছে তাদের সত্তার উপর ভরসা করে থাকার ফলে নেক আমল করা থেকে বিরত থাকছে, খারাপ কাজে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। যা মুসলমানদের অধঃপতনের কারণ হয়েছে। তারা ভুলে গেছে বা ভুলে থাকার ভান করছে যে, আল্লাহ তা’আলা তাঁর রাসূলকে – যিনি সমস্ত মানব সন্তানের নেতা – তাঁকে সম্বোধন করে বলেছেনঃ (বলুনঃ আমি আমার নিজের কোন উপকার বা ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখিনা)। সূরা আল-আ’রাফ: ১৮৮ অনুরুপভাবে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর কলিজার টুকরা কন্যাকে সম্বোধন করে বলেছেনঃ (হে ফাতিমা ! আমার কাছে যত সম্পদ আছে তার থেকে যা ইচ্ছা হয় চেয়ে নাও, আমি আল্লাহর কাছে তোমার কোন কাজে আসবনা )। বুখারী ও মুসলিম তিনি আরো বলেন : (যখন কোন মানুষ মারা যায় তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায়, কেবলমাত্র তিনটি আমল ব্যতীত…)। মুসলিম

যদি নবীগণ ও নেক্কার লোকদের ব্যক্তিসত্তার অসীলা গ্রহণ জায়েয না হওয়ার ব্যাপারে কোন দলীল না থাকত, বরং আমাদের সামনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আন্হু) এর সেই ঘটনাটিই শুধু থাকত, যাতে তিনি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর মৃতু্যর পর তাঁর অসীলা বাদ দিয়ে তার চাচা আব্বাসের দুআ’র শরণাপন্ন হয়েছিলেন, তবে অসীলাবাদী এ দলের মুলোৎপাটনে তাই যথেষ্ট হত। ইমাম আবু হানীফা (রাহমাতুল্লাহ আলাইহি) কতই না সুন্দর বলেছেন: “আমি আল্লাহর কাছে আল্লাহ ব্যতীত অপর কিছুর মাধ্যমে কিছু চাওয়াকে হারাম মনে করি” দুররে মুখতার ও হানাফীদের অন্যান্য কিতাবে তা ইমাম সাহেব থেকে বর্ণিত আছে। যদি ব্যক্তি স্বত্বা দ্বারা অসীলা দেয়া জায়েজ হতো, তবে কুরআন ও হাদীসের যাবতীয় দুআ’ যার সংখ্যা অগণিত তা ব্যক্তি সত্তার অসীলা দিয়েই আসত। (কিন্তু তার একটিও সেভাবে আসেনি)। তিনঃ যারা স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে মাধ্যম বলতে বুঝেছেন সেই রিসালাতকে যার মানে হলো দ্বীন প্রচার, শিক্ষাদান ও দ্বীনের প্রশিক্ষণ। তারা এই রিসালাতের উচ্চ মর্যাদা এবং এর প্রতি মানব জাতির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন। ফলে তারা শরয়ী বিধান লাভের উদ্দেশ্যে এবং ঐশী বাণী বা ওহীর আলোকে আলোকিত হওয়ার জন্য রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে বড় মাধ্যম এবং বৃহৎ অসীলা হিসাবে গ্রহণ করেছেন। যেমনিভাবে তারা কুরআন অধ্যয়ন করছেন তেমনিভাবে তারা রাসূলের পবিত্র জিবনী ও তার সুন্নাত অধ্যয়ন করছেন। এতে তাদের শ্লোগান হচ্ছে আল্লাহর বাণীঃ (নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে আল্লাহর কাছ থেকে নূর এবং সুস্পষট গ্রন্থ এসেছে, এর দ্বারা যারা আল্লাহর সন্তুষটির পিছনে ধাবিত হয় আল্লাহ তাদেরকে হিদায়াত প্রদান করেন, আর তাদেরকে তাঁর ইচ্ছা মোতাবেক অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে যান, এবং সরল সোজা পথে পরিচালিত করেন )। সূরা আল-মায়িদাহ্: ১৫, ১৬ এরাই হলো মুক্তি প্রাপ্ত দল যাদের কথা পূর্বোক্ত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, এবং তাদেরকেই জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়: এ গ্রুপের পথ বিপদসংকুল, কন্টকাকীর্ণ। কেননা সত্যিকার ইসলাম আজ অপরিচিত হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ মুসলমান এর থেকে অনেক দুরে সরে গেছে। তারা এ দ্বীনকে বিদআ’ত ও মনগড়া রসম রেওয়াজে পরিবর্তন করেছে। এই রোগ অতি পুরাতন, এ ব্যাপারে সংস্কারকদের ভুমিকা খুব ভয়াবহ ও কষ্টসাধ্য। উমর বিন আব্দুল আজীজ (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেছেন (আমরা এমন কাজ সংসকার করতে চেষ্টা করছি যাতে আল্লাহ ছাড়া আমাদের আর কোন সাহায্যকারী নেই, যে কাজ করতে গিয়ে বৃদ্ধরা তাদের জীবন শেষ করেছে, আর ছোট ছোট ছেলেরা যুবক হতে চলেছে, বেদুঈনগণ তাদের বাস্তু ত্যাগ করে চলে গেছে। তারা এটাকে দ্বীন (ধর্ম) মনে করেছে অথচ এটা আল্লাহর কাছে দ্বীন বলে সাব্যস্ত নয়।) অবশ্য এটা নতুন কিছু নয়, কারণ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দ্বীনের এ করুণ দৃশ্যের কথা বর্ণনা করতে যেয়ে বলেছেন, (ইসলাম অপরিচিত হিসাবে শুরু হয়েছে। যেভাবে তা শুরু হয়েছিল সেভাবে আবার (অপরিচিত) অবস্থায় ফিরে আসবে। সুতরাং গরীব (এই অপরিচিত) দের জন্যই সুসংবাদ) হাদীসটি মুসলিম শরীফে আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আন্হু)থেকে বর্ণিত। অপর বর্ণনায় এসেছে, (বলা হলঃ হে আল্লাহর রাসূল এই গরীব (অপরিচিত) রা কারা? বললেনঃ বিভিন্ন গোত্র থেকে উত্থিত বিক্ষিপ্ত কতক ব্যক্তিবর্গ) আহমাদ, ইবনে মাজা। তিরমিযির এক (হাছান) বর্ণনায় এসেছে, (এই গরীবদের জন্য সুখবর যারা আমার সুন্নাতের যে অংশ মানুষ নষ্ট করেছে তা পূণঃ সংস্কার করে চালু করেছে)। মুসনাদে আহমাদে অপর এক সহীহ বর্ণনায় এসেছে, (এই গরীব (অপরিচিত) গণ হলোঃ অনেক খারাপ লোকের মাঝখানে এমন কিছু ভাল লোক, যাদের অনুসারীর চেয়ে বিরোধীরাই হবে বেশী)। সুতরাং এ গ্রুপকেই সংসকার কাজে এগিয়ে যেতে হবে, সংস্কারের আলোতে মুসলমানদের জাগিয়ে পুনরায় সঠিক ইসলামের দিকে ফিরিয়ে নিতে হবে। আর বিরোধীতা ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের আমরা তাই বলব যা আল্লাহ তা’আলা তাদের পূর্বসুরীদেরকে বলেছেনঃ (আমাদের কি হলো যে, আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করবনা অথচ তিনি আমাদেরকে যাবতীয় পথের দিশা দিয়েছেন? আর আমরা তোমাদের শত আঘাতের বিপরীতে ধৈর্য্য ধারণ করবো, ভরসাকারীগণ যেন শুধু আল্লাহর উপরই ভরসা করেন)। সূরা ইব্রাহীম: ১২

লেখক : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
সূত্র : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ, সৌদিআরব


মাযার ও কবরের উদ্দেশ্যে কুরবানী, মান্নত ও হাদীয়া পেশ করা এবং এগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শন
লেখক : সালেহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান
অনুবাদ : মুহাম্মদ মানজুরে ইলাহী

[প্রেরক- দাওয়া ওয়া তবলীগ প্রতিনিধি :: হাফিজ নুরুল আলম :: তারিখ – ০৪/০২/২০১৮ ইং]
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিরকের দিকে নিয়ে যাওয়ার সকল পথ বন্ধ করে দিয়েছেন। আর এ সকল পথ হতে উম্মাতকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। এসবের মধ্যে প্রথম হলো কবরের বিষয়টি। তাই তিনি কবর যিয়ারতের এমন নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন, যাতে লোকজন কবরপূজা ও কবরবাসীদের ব্যাপারে যে কোন প্রকার বাড়াবাড়ি থেকে বেঁচে থাকতে পারে। তন্মধ্যে :

১. তিনি আওলীয়া ও পূন্যবান লোকদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা থেকে নিষেধ করেছেন। কেননা এ ধরনের বাড়াবাড়ি করতে করতে মানুষ তাঁদের ইবাদাতে ও উপাসনায় লিপ্ত হয়। তিনি বলেন:

إيَّاكُمْ وَالْغُلُوفَإنَّماَ أهْلَكَ مَنْ قَبْلَكُمْ الْغُلُوُّ.

‘বাড়াবাড়ি করা থেকে বিরত থাক। কেননা তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করার ফলে ধ্বংস ও বিনাশ হয়ে গিয়েছে’ [আহমাদ, রিতমিযী, ইবনে মাজাহ।]%

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

لَا تَطْرُوْنِيْ كَمَا أطْرَتِ النَّصَارَى ابنَ مَرْيَمَ إنَّمَا أنَا عَبْدٌ فَقُوْلُوا عَبْدُ الله وَرَسُولُه.

আমার ব্যাপারে তোমরা বাড়াবাড়ি করো না, যে ভাবে নাসারাগণ মরিয়ম পুত্র ঈসার ব্যাপারে করেছিলো। কেননা আমি শুধু একজন বান্দা। অতএব, আমাকে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল হিসাবে অভিহিত করো। [বুখারী।]

২.রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবরের উপর সৌধ স্থাপন করা থেকে নিষেধ করেছেন। যেমন:

আবুল হাইয়াজ আল আসাদী থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন: আলী বিন আবু তালিব রাদি আল্লাহু আনহু আমাকে বলেন যে, আমি কি তোমাকে সেই দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করব না, যে দায়িত্ব দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে প্রেরণ করেছিলেন? তা হলো যেখানেই প্রতিমা ও ভাস্কার্য দেখবে ভেঙ্গে ফেলবে এবং যেখানেই সুউচ্চ কবর দেখবে সমান করে দেবে’ (মুসলিম।)

অনুরূপ ভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবরে চুনকাম করা ও সৌধ তৈরী করা থেকে নিষেধ করেছেন। জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবরের উপর বসা ও সৌধ তৈরী করা থেকে নিষেধ করেছেন। [মুসলিম।]

৩. কবরের পাশে নামায পড়া থেকেও তিনি সতর্ক করেছেন। আয়েশা রাদি আল্লাহু আনহা বলেন:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মৃত্যু কালীন রোগ শয্যায় চাদর দিয়ে মুখ ঢেকে নিতেন। যখন এতে কষ্ট লাগতো তখন মুখ থেকে চাদর সরিয়ে নিতেন। এমতাবস্থায় তিনি বলেছিলেন ”ইয়াহুদী ও নাসারাদের উপর আল্লাহর লা’নত বর্ষিত হোক। কারণ তারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে মসজিদ তথা সিজদার স্থান বানিয়ে নিয়েছে।” তাদের এসব কাজ- কর্ম থেকে তিনি স্বীয় উম্মাতকে সতর্ক করে দিয়েছেন। লোকেরা তাঁর কবরকে সিজদাগাহ বানাবে এ আশংকা যদি না থাকতো তাহলে তাঁর কবর উন্মুক্ত করে দেয়া হতো। [বুখারী, মুসলিম।]

ألَا وَإنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوا يَتَّخِذُوْنَ قُبُوْرَ أنْبِيَائهِمْ مَسَاجِدَ ألَا فَلَا تتخِذُوا الْقُبُوْرَ مَسَاجِدَ- فَإنِّيْ أنْهَاكُمْ عَنْ ذَلِكَ.

জেনে রাখ, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতির লোকেরা নিজেদের নবীদের কবরসমূহকে মাসজিদ বানিয়ে নিত। সাবধান, তোমরা কবরসমূহকে মাসজিদ তথা সিজদার স্থান বানাবে না। আমি তোমাদেরকে তা থেকে নিষেধ করছি। [মুসলিম।]

কবরকে মাসজিদ বানানোর অর্থ হলো কবরের পাশে নামায পড়া, যদিও কবরের উপর কোন মসজিদ তৈরী না করা হয়। সুতরাং যে কোন স্থানকেই নামাযের জন্য নির্দিষ্ট করা হবে তাই মাসজিদ বলে গণ্য হবে। যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

جُعِلَتْ لِيَ الأرْضُ مَسْجِداً وَطُهُوْراً.

সকল যমীনকে আমার জন্য সিজদার স্থান ও পবিত্র বানিয়ে দেয়া হয়েছে। (বুখারী।)

আর যদি কবরের উপর মাসজিদ বানানো হয় সেটা আরো ভয়াবহ ব্যাপার। অধিকাংশ লোকই এসব ব্যাপারে শরীয়তের খেলাফ করেছে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সব বিষয় থেকে নিষেধ করেছেন তাতে লিপ্ত হয়েছে। ফলে তারা শিরকে আকবার তথা বড় শিরকী কাজে ব্যাপৃত হয়ে গেছে। আর কবরের উপরে মাসজিদ, মাযার ও মাকাম বানিয়ে নিয়েছে, যাতে শিরকে আকবারের সকল প্রকার কাজ-কর্মের চর্চা করা হচ্ছে। যেমন কবরের উদ্দেশ্যে যবেহ করা হচ্ছে, কবরবাসীদের কাছে দোয়া চাওয়া হচ্ছে ও তাদের সাহায্য ও মদদ প্রার্থনা করা হচ্ছে এবং তাদের উদ্দেশ্যে মান্নত প্রভৃতি করা হচ্ছে।

আল্লামা ইবনুল কাইয়েম রা. বলেন: যে ব্যক্তি কবরসমূহের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাত, তাঁর আদেশ- নিষেধ ও তাঁর সাহাবাদের আদর্শ এবং আজকাল মানুষ যেসব কাজ করে থাকে এতদুভয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করতে চায়, সে মূলত: এর একটিকে অন্যটির বিপরীত ও প্রতিকূল দেখতে পাবে এমনভাবে যে, এদু’টি বিষয়ে কখনো সামঞ্জস্য বিধান করা যেতে পারেনা।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবরে নামায পড়া থেকে নিষেধ করেছেন। অথচ এরা কবরের পাশে নামায পড়ে। তিনি কবরকে মাসজিদ বানাতে নিষেধ করেছেন। অথচ এরা কররের উপর মাসজিদ বানাচ্ছে এবং আল্লাহর ঘরের অনুকরণে তার নাম দিচ্ছে দরগাহ। তিনি কবরে প্রদীপ জ্বালাতে নিষেধ করেছেন। অথচ এরা কবরে প্রদীপ জ্বালানোর উদ্দেশ্যে জায়গা পর্যন্ত ওয়াকফ করে থাকে। তিনি কবরকে ঈদ উৎসবের স্থান বানাতে নিষেধ করেছেন। অথচ এসব লোক কবরস্থানকে ঈদ উৎসব ও কুরবানীর স্থানে পরিণত করেছে এবং ঈদে যেমন তারা একত্রিত হয় তেমন, বরং তার চেয়েও বেশী তারা কবরের উদ্দেশ্যে একত্রিত হয়।

তিনি কবরসমূহকে সমান করে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন: ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ গ্রন্থে আবুল গ্রন্থে আবুল হাইয়াজ আল আসাদী থেকে বর্ণনা করেন যে, আলী বিন আবু তালেব রাদি আল্লাহু আনহু তাকে বলেন- আমি কি তোমাকে সেই দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করব না, যে দায়িত্ব দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে প্রেরণ করেছিলেন? তা হলো যেখানেই প্রতিমা ও ভাস্কর্য দেখবে ভেঙ্গে ফেলবে এবং যেখানেই সুউচ্চ কবর দেখবে সমান করে দেবে।

সহীহ মুসলিমের আরেকটি বর্ণনায় সুমামাহ বিন শুফাই বলেন: আমরা রোম দেশের বুরুদেস নামক স্থানে ফাদালাহ বিন উবায়েদ এর সাথে ছিলাম। সেখানে আমাদের এক সাথী মারা গেলেন। তার দাফন কার্যের সময় ফাদালাহ তার কবর সমান করে দেবার হুকুম দিলেন। অতঃপর বললেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছি যে, তিনি কবরকে সমান করে দেবার হুকুম দিয়েছেন।

কবরের ভক্ত এসব লোকেরা প্রচন্ডভাবে এ দু’টো হাদীসের বিরোধিতা করছে। এবং বসতগৃহের মতই কবরকে উঁচু করছে ও এর উপর গম্বুজ তৈরী করছে। ইবনুল কাইয়েম আরো বলেন: দেখুন, কবরের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা কিছু অনুমোদন করেছেন ও ইতিপূর্বে উল্লেখিত যে সব কিছু থেকে নিষেধ করেছেন এবং এসব লোকেরা যা কিছু আইনসিদ্ধ করছে- এতদুভয়ের মধ্যে কী বিরাট পার্থক্য। নিঃসন্দেহে এতে অনেক বিপর্যয় রয়েছে যা গুণে শেষ করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার।

এরপর তিনি এসব বিপর্যয়ের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে পরিশেষে বলেন: রাসূূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবর যিয়ারতের অনুমতি দিয়ে এ ব্যাপারে যে নিয়ম নীতি প্রণয়ন করেছেন, তা শুধু আখিরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয়া এবং কবরবাসীর জন্য দোয়া, রহমত কামনা, ইস্তেগফার ও তার মুক্তির জন্য প্রার্থনার মাধ্যমে তার উপকার করার উদ্দেশ্যেই করেছেন। এর ফলে যিয়ারতকারী নিজের ও মৃতের উভয়েরই কল্যাণ সাধন করছে। পক্ষান্তরে কবরপন্থী এই মুশরিকগণ পুরো ব্যাপারটাকেই পাল্টে দিয়েছে এবং দ্বীনকে বদলে দিয়েছে। মৃতের সাথে আল্লাহর শরীক করা, মৃতের কাছে ও মৃতের অসীলায় দোয়া করা, তার কাছে স্বীয় হাজাত পূরণের প্রার্থনা করা, তার কাছে বরকত চাওয়া, ও শত্রুর বিরুদ্ধে তার কাছে সাহায্যের আবেদন ইত্যাদি বিষয়গুলোকে তারা যিয়ারতের উদ্দেশ্যে বানিয়ে নিয়েছে। এসবের মধ্যে যদি কোন ক্ষতি নেই বলে ধরে নেয়াও হয়, তা সত্বেও শরীয়ত প্রণীত দোয়া রহমত কামনা, ও ইস্তেগফার ইত্যাদি কাজের বরকত থেকে তো তারা বঞ্চিত হয়।[ইগাসাত্থল লাহফান, ১ম খন্ড২১৪-২১৫-২১৭।]

এদ্বারা এটাই প্রতিভাত হয় যে,মাযারের উদ্দেশ্যে মান্নত ও কুরবানী করা বড় শিরক। কবরের উপর কোন ইমারত তৈরী না করা ও মাসজিদ না বানানোর যে আদর্শ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ছিল তার পরিপন্থী আমল করাই হলো এর মূল কারণ। কেননা যখনই কবরের উপর গম্বুজ নির্মাণ করা হয় এবং পাশে মাসজিদ ও মাযার তৈরী করা হয় তখনই জাহেল ও অজ্ঞ লোকেরা ভাবতে শুরু করে যে, কবরবাসীগণ উপকার ও ক্ষতি দুই-ই করতে পারেন। আর যে তাদের কাছে সাহায্য চায় তারা তাকে সাহায্য করেত পারেন এবং তাদের কাছে গেলে তারা হাজাত ও প্রয়োজন পুরা করেন। এজন্যই তারা কবরবাসীদের উদ্দেশ্যে মান্নত ও কুরবানী পেশ করে। যার ফলশ্রুতিতে আল্লাহর পরিবর্তে প্রতিমারূপে এই সব কবরের আজ উপাসনা করা হচ্ছে। অথচ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রার্থনা করেছিলেন:

اللهُمَّ لَا تَجْعَلْ قَبْرِيْ وَثَناً.

হে আল্লাহ! আমার কবরকে এমন প্রতিমায় পরিণত করো না যার উপাসনা করা হয়। [মুয়াত্তা মালেক ও মুসনাদে আহমেদ।]

আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম এজন্যেই এই দোয়া করেছিলেন যে তাঁর কবর ছাড়া অনেক কবরেই এ ধরনের অবস্থা দেখা দিতে পারে। প্রকৃত পক্ষে মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশেই এ ব্যাপারটি ঘটেছে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে দোয়া করেছিলেন সে দোয়ার বরকতেই আল্লাহ তাঁর কবরকে শিরকের পংকিলতা থেকে রক্ষা করেছেন। যদিও কিছু সংখ্যক জাহেল ও কুসংস্কারচ্ছন্ন লোক তাঁর মাসজিদে কখনো কখনো তার হেদায়াতের খেলাপ কাজ করে ফেলে। কিন্তু তারা তার কবর পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না কেননা তাঁর কবর তাঁর ঘরের অভ্যন্তরে, মাসজিদের অন্তর্গত নয় এবং সেটি চারদিকে দেয়াল দিয়ে ঘেরা। যেমন আল্লামাহ ইবনুল কাইয়্যেম তার ‘নুনিয়া’ কাব্যগ্রন্থে বলেন:

তাঁর দোয়া রাব্বুল আলামীন করেছেন কবুল
তিনটি প্রাচীর দিয়ে ঘিরেছেন নির্ভুল

লেখক : সালেহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান
অনুবাদ : মুহাম্মদ মানজুরে ইলাহী
সূত্র : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ, সৌদিআরব


সূফি তরিকা এবং তাদের সাথে অংশগ্রহণ
শাইখ সালিহ আল মুনাজ্জিদ

[প্রেরক- দাওয়া ওয়া তবলীগ প্রতিনিধি :: হাফিজ নুরুল আলম :: তারিখ – ০৪/০২/২০১৮ ইং]
প্রশংসা আল্লাহর জন্যে, আমরা অবশ্যই জেনে নিব যে, আল-সুফিয়াহ (সূফিবাদ) শব্দটি দ্বারা উলের তৈরি পোশাক পরিধান করাকে (আরবি শব্দ ‘সুফ’ মানে ‘উল’) বুঝায় এবং এছাড়া কিছু নয়।

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘আল-সুফিয়াহ’ (সুফিবাদ) শব্দটি দ্বারা ওলের তৈরি পোশাক পরিধান করাকে নির্দেশ করে, এটাই সঠিক অর্থ। বলা হয়ে থাকে, এটি এসেছে ‘সাফওয়াত আল-ফুকাহা’ (ফুকাহাদের মধ্যে বিশিষ্ট) শব্দটি থেকে অথবা ‘সূফা ইবন আদ ইবন তানিযা’ নামক আরব গোত্র থেকে, যারা তাদের আত্মবিস্মৃতি’র (asceticism) জন্য বিখ্যাত ছিল। আরও বলা হয়ে থাকে এটি এসেছে ‘আহল আল-সুফফা’ (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়কার মদীনার দরিদ্র মুসলিমগণ, যারা মসজিদে থাকতেন) থেকে, অথবা ‘আল-সাফা’ (মক্কার সাফা পর্বত ), অথবা ‘আল-সাফওয়া’ (মানে বিশিষ্ট) অথবা ‘আল-সাফ আল-মুক্বাদ্দাম বায়না ইদায় আল্লাহ’ (আল্লাহর কাছে সম্মানিত দল) নামক শব্দ থেকে। এই সমস্ত মতগুলো হল দইফ বা দূর্বল; যদি এর একটিও সঠিক হতো তাহলে শব্দটি হতো ‘সাফফি’ অথবা ‘সাফা’য়ি’, সুফি নয়।( মাজমু আল ফাতাওয়া ১১/১৯৫)

সুফিবাদ তথা তাসাওউফ এই উম্মতের প্রথম তিন প্রজন্মের মধ্যে সৃষ্টি হয়নি, যেই তিন প্রজন্মের প্রশংসা করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “মানব জাতির শেষ্ঠতম প্রজন্ম হল আমার প্রজন্ম, এরপরে আছে যারা তাদের পরে আসবে, এরপর তাদের পরবর্তী যারা আসবে…” (বুখারী,২৬৫২,২৫৩৩ )

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, সুফিয়াহ (সুফিবাদ) শব্দটি প্রথম তিন প্রজন্মের নিকট পরিচিত ছিল না, বরং এটি এর পরবর্তীতে আবিষ্কৃত হয়েছে। (মাজমু আল ফাতাওয়া, ১১/৫) এই তরিকাগুলো সেই নব আবিষ্কৃত পথ(বিদ’আত) যা কুর’আন-সুন্নাহ এবং শেষ্ঠ প্রজন্মের সালফে সালেহীনদের পথের বিপরীতে যায়। এই তরিকাগুলোর সকল শায়খগণ তাদের নিজস্ব জিকির-আযকার, হিজব (দুয়া’র বই, যা তাদের অনুসারীরা দৈনিক পড়ে) এবং ইবাদতের বিশিষ্ট ধরণ তৈরি করেছে যা দেখে তাদের তরিকাগুলো শনাক্ত করা যায়, এটি শরীয়াতের বিরুদ্ধে যায় এবং উম্মাহকে বিভক্ত করেছে।

আল্লাহ এই উম্মাহর দীনকে পূর্ণতা দান করে দয়া করেছেন এবং আমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করেছেন। কাজেই, নতুন করে যদি কেউ কোন ইবাদতের পদ্ধতি নিয়ে আসে যা শরীয়াতে নেই তার মানে হল সে আল্লাহ তায়ালা যা বলেছেন তাকে প্রত্যাখান করল এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি আমানতের খিয়ানতের অভিযোগ করল।

উপরন্তু, তাদের এই বিদ’আতের সাথে তারা মিথ্যাবাদীতার দোষেও দুষ্ট, কারণ তারা দাবী করছে তারা এই তরিকাগুলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট হতে গ্রহণ করেছে এবং বলছে যে তারা নাকি খুলাফায়ে রাশেদীনের পথ অনুসরণ করছে।

স্ট্যান্ডিং কমিটির সম্মানিত আলেমগণের নিকট এ বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করে জানতে চাওয়া হয়েছিল;

ইসলামে শাধিলইয়াহ,খালওয়াতিয়াহ ইত্যাদি অসংখ্য তরিকাসমূহের ন্যায় কিছু কি রয়েছে? যদি থেকে থাকে, তাহলে তার দলীল-প্রমাণাদি কোথায়? এই আয়াতগুলোর অর্থ কি যেখানে আল্লাহ বলছেন, “তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। নিশ্চিত এটি আমার সরল পথ। অতএব, এ পথে চল এবং অন্যান্য পথে চলো না। তা হলে সেসব পথ তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিবে। তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা সংযত হও”। [সূরা আনআম ৬/১৫৩]

“সরল পথ আল্লাহ পর্যন্ত পৌছে এবং পথগুলোর মধ্যে কিছু বক্র পথও রয়েছে। তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদের সবাইকে সৎপথে পরিচালিত করতে পারতেন” [সূরা নাহল ১৬/৯]

সেই পথগুলো কোনটি যা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, এবং আল্লাহর পথ কোনটি? আর ইবন মাসউদ বর্ণিত এই হাদীসটির অর্থ কি, যেখানে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি দাগ টেনে বলছেন, “এটিই হেদায়াতের পথ” এরপর এর ডানে বামে অনেকগুলো দাগ টেনে বলেন, “এগুলো অন্যান্য পথ এবং প্রত্যেক পথে একটি করে শয়তান উপস্থিত যে মানুষকে সেই পথের দিকে ডাকছে?”

উত্তরঃ আপনি যে সকল তরিকাসমূহ উল্লেখ করেছেন এ ধরণের কিছু ইসলামে নেই, অথবা এর কাছাকাছিও কিছু নেই। ইসলামে যা আছে তা হচ্ছে আপনি যে দুটি আয়াত এবং হাদীসটি উল্লেখ করেছেন এবং অন্য আরেকটি হাদীস যেখানে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেন, “ইহুদীরা একাত্তর ফিরকাহ’য় বিভক্ত হয়েছে এবং খৃষ্টানেরা হয়েছে বাহাত্তর ফিরকাহ’য়। আমার উম্মাহ বিভক্ত হবে তিহাত্তর ফিরকাহ’য়; আর এদের প্রত্যেকটি হবে জাহান্নামী একটি ব্যতীত”। জানতে চাওয়া হল, “তারা কারা, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম?” তিনি বলেন, “আমার উম্মাহর একটি দল সত্যের অনুসরণ করতে থাকবে এবং বিজয়ী হবে, এবং তাদের যারা অভিশাপ দেয় কিংবা বিরোধিতা করে তারা সেই দলটির কোন ক্ষতি করতে পারবে না, যতক্ষণ না আল্লাহর ফরমান নাযিল হয়…’ সত্য আছে কুর’আন এবং সহীহ হাদীস অনুসরণের মধ্যে। এটাই আল্লাহর পথ, এবং সরল পথ। এটিই ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে বর্ণিত সরল পথ, আর এই পথ অনুসরণ করেছেন সাহাবাগণ(রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এবং তাদের পরবর্তী সালফে সালেহীনগণ, এবং তাদের যারা অনুসরণ করেছেন তাঁরা। অন্য সকল তরিকা বা দল হল আয়াতে উল্লেখিত সেই দল যাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, “…এবং অন্যান্য পথে চলো না। তা হলে সেসব পথ তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিবে…” [আল-আন’আম ৬-১৫৩] -ফাতাওয়া আল-লাযনাহ আল-দা’ইয়িমাহ ২/২৮৩,২৮৪ আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।

শাইখ সালিহ আল মুনাজ্জিদ


সালাতে তাকবীরে তাহরীমা ছাড়া অন্যত্র হাত উত্তোলন প্রসঙ্গে একটি প্রশ্নের জবাব
Monthly At-Tahreek

[প্রেরক- দাওয়া ওয়া তবলীগ প্রতিনিধি :: হাফিজ নুরুল আলম :: তারিখ – ০৪/০২/২০১৮ ইং]
প্রশ্ন (১৭/২৫৭) : আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) একদা বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যেভাবে ছালাত আদায় করতেন আমি কি তোমাদের সেভাবে ছালাত আদায় করে দেখাব না? অতঃপর তিনি ছালাত আদায় করলেন। কিন্তু তাকবীরে তাহরীমা ব্যতীত অন্য কোন সময় দু’হাত উত্তোলন করলেন না’ (তিরমিযী ১/৩৫)। তিরমিযী হাদীছটিকে হাসান বলেছেন। আবার বারা ইবনে আযিব (রাঃ) বলেন, ‘নবী করীম (ছাঃ) তাকবীরে তাহরীমা ব্যতীত আর কখনো হাত উঠাতেন না’ (আবূদাঊদ ১/১০৯)। এক্ষণে ছালাতে রাফ‘ঊল ইয়াদায়েন করার প্রমাণে হাদীছদ্বয়ের বিপক্ষে যুক্তি কি?
-ছিয়াম বিন সাইফুদ্দীন মধুপুর, টাংগাঈল।

উত্তর : প্রশ্নে বর্ণিত হাদীছ দু’টি সহ ‘রাফ‘ঊল ইয়াদায়েন’ না করার পক্ষে যে সকল দলীল পেশ করা হয়, তার সবগুলিই যঈফ।
• প্রশ্নে বর্ণিত ১ম হাদীছটি ইমাম আবুদাঊদ বর্ণনা করে বলেন,

هَذَا مُخْتَصَرٌ مِنْ حَدِيثٍ طَوِيلٍ وَلَيْسَ هُوَ بِصَحِيحٍ عَلَى هَذَا اللَّفْظِ

‘এটা লম্বা হাদীছের সংক্ষিপ্ত রূপ। আর এই শব্দে এটি ছহীহ নয়’ (আবুদাঊদ হা/৭৪৮)।
উল্লেখ্য যে, উপমহাদেশের ছাপা আবুদাঊদে হাদীছের শেষে ইমাম আবুদাঊদের উক্ত মন্তব্যটি নেই। কিন্তু অন্যান্য ছাপা আবুদাঊদে তা রয়েছে। এদেশে ছাপা আবুদাঊদ থেকে উক্ত মন্তব্য তুলে দেওয়ার রহস্য অজ্ঞাত।

• দ্বিতীয় হাদীছটি সম্পর্কে তিনি বলেন,

هَذَا الْحَدِيثُ لَيْسَ بِصَحِيحٍ

‘এই হাদীছ ছহীহ নয়’ (আবুদাঊদ হা/৭৫২)।
তাছাড়া বারা ইবনু আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত অন্য আরেকটি বর্ণনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘অতঃপর তিনি আর হাত উঠাননি’ অংশটুকু অন্য সনদে তিনি বলেননি।
• সুফিয়ান বলেন, আমাদেরকে অনেক পরে কূফাতে ‘অতঃপর তিনি আর হাত উঠাননি’ অংশটুকু বলা হয়েছে।
• ইমাম আবুদাঊদ আরো বলেন, ইয়াযীদ থেকে হাদীছটি হুশাইম, খালেদ, ইবনু ইদরীসও বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তারা ‘অতঃপর তিনি আর হাত উঠাননি’ অংশটুকু বলেন নি’ (আবুদাঊদ হা/৭৫০)। এভাবে ইমাম আবুদাঊদ (২০২-২৭৫) রাফ‘ঊল ইয়াদায়েন না করার হাদীছ সমূহকে নাকচ করে দিয়েছেন।
• ইবনু হিববান বলেন, ‘রাফ‘ঊল ইয়াদায়েন’ না করার পক্ষে কুফাবাসীদের এটিই সবচেয়ে বড় দলীল হ’লেও এটিই সবচেয়ে দুর্বলতম দলীল, যার উপরে নির্ভর করা হয়েছে। কেননা এর মধ্যে এমন সব বিষয় রয়েছে যা একে বাতিল বলে গণ্য করে (নায়লুল আওত্বার ৩/১৪ পৃঃ, ফিকহুস সুন্নাহ ১/১০৮)। ইমাম তিরমিযী (মৃঃ ২৭৯হিঃ) ১ম হাদীছটিকে সনদের দিক থেকে ‘হাসান’ বললেও তার আগের হাদীছে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারকের বক্তব্য তুলে ধরেছেন,

لم يثبت حديث ابن مسعود

‘ইবনু মাসঊদ (রাঃ)-এর হাদীছ প্রমাণিত হয়নি’ (তিরমিযী হা/২৫৫-এর আলোচনা)।
• আলবানী বলেন, হাদীছটিকে ছহীহ মেনে নিলেও তা ‘রাফ‘ঊল ইয়াদায়েন’-এর পক্ষে বর্ণিত ছহীহ হাদীছ সমূহের বিপরীতে পেশ করা যাবে না। কেননা এটি না বোধক এবং ঐগুলি হ্যাঁ বোধক। ইলমে হাদীছের মূলনীতি অনুযায়ী হ্যাঁ-বোধক হাদীছ না-বোধক হাদীছের উপর অগ্রাধিকার পাবে। পক্ষান্তরে রাফ‘ঊল ইয়াদায়নের পক্ষে বহু ছহীহ হাদীছ রয়েছে। যেমন:


• ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছালাতের শুরুতে, রুকূতে যাওয়াকালীন ও রুকূ হ’তে উঠাকালীন সময়ে… এবং তৃতীয় রাক‘আতে দাঁড়ানোর সময় রাফ‘ঊল ইয়াদায়েন করতেন’
(মুত্তাফাক্ব আলাইহ, বুখারী, মিশকাত হা/৭৯৩-৯৪)।

• ‘রাফ‘ঊল ইয়াদায়েন’ করা সম্পর্কে চার খলীফা সহ প্রায় ২৫ জন ছাহাবী থেকে বর্ণিত ছহীহ হাদীছ সমূহ রয়েছে। একটি হিসাব মতে ‘রাফ‘ঊল ইয়াদায়েন’-এর হাদীছের রাবী সংখ্যা আশারায়ে মুবাশশারাহ সহ অন্যূন ৫০ জন ছাহাবী
(ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১০৭ পৃঃ) এবং সর্বমোট ছহীহ হাদীছ ও আছারের সংখ্যা অন্যূন চারশত (মাজদুদ্দীন ফীরোযাবাদী, সিফরুস সা‘আদাত ১৫ পৃঃ; বিস্তারিত দ্রঃ ছালাতুর রাসূল (ছাঃ), পৃঃ ৯২-৯৬)। monthly at-tahreek

Page 2
Pages 1 2

Today: 99

Yesterday: 259

This Week: 797

This Month: 8071

Total: 41755

Currently Online: 69

© Dawah wa Tablig is the proparty of Md. Shamsul Alam since 2013