Tawhid5

Pages 1 2 3 4 5 6 7 8
[Page- 6]

অধ্যায়-৪১
শিরকের কতিপয় গোপনীয় আবস্থা
আল্লাহ তা‘আলার বাণী-
﴿فَلَا تَجْعَلُواْ لِلَّهِ أَنْدَادًا وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ﴾
অর্থঃ “অতএব আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকে সমকক্ষ করো না” [সূরা বাকারা-২২]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আন্দাদা হচ্ছে এমন শিরক যা অন্ধকার রাত্রে নির্মল কাল পাথরের উপর পিপীলিকার পদচারণার চেয়েও সূক্ষ্ম। এর উদাহরণ হচ্ছে, তোমার এ কথা বলা, ‘আল্লাহর কসম এবং হে অমুক, তোমার জীবনের কসম, আমার জীবনের কসম।’ ‘যদি ছোট্ট কুকুরটি না থাকতো, তাহলে অবশ্যই আমাদের ঘরে চোর ঢুকতো।’ ‘হাঁসটি যদি ঘরে না থাকতো তাহলে অবশ্যই চোর আসতো।’ কোন ব্যক্তি তার সাথীকে এ কথা বলা, আল্লাহ যা চেয়েছেন’ ও ‘তুমি যা চেয়েছো’ এবং এ কথা বলা যে আল্লাহ এবং অমুক না হলে এসব ক্ষেত্রে অমুক কথা প্রয়োগ করো না। বর্ণিত সকল বক্তব্যই শিরক। (ইবনে আবি হাতিম)
ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেছেনঃ
((مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللهِ فَقَدْ كَفَرَ أَوْ أَشْرَكَ)) (جامع الترمذي، الأيمان والنذور، باب ما من حلف بغير الله فقد أَشرك، ج:٥٣٥١ والمستدرك للحاكم:١/٨١)
“যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর নামে কসম করলো, সে কুফরী অথবা শিরক করলো।” ইমাম তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম হাকেম তাকে হাসান ও সঠিক বলেছেন।
ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেছেনঃ
((لأَنْ أَحْلِفَ بِاللهِ كَاذِبًا إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَخْلِفَ بِغَيْرِهِ صَادِقًا)) (معجم الكبير للطبر اني:٩/٣٨١، رقم:٢٠٩٨ ومصنف عبدالرزاق:٨/٩٦٤، رقم:٩٢٩٥١)
“আল্লাহর নামে মিথ্যা শপথ করা আমার কাছে গাইরুল্লাহর নামে সত্য শপথ করার চেয়েও বেশি পছন্দনীয়।”
হুযাইফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেছেনঃ
“আল্লাহ এবং অমুক ব্যক্তি যা চেয়েছেন, এ কথা তোমরা বলো না। বরং এ কথা বলো, আল্লাহ যা চেয়েছেন অতঃপর অমুক ব্যক্তি যা চেয়েছ।” [আবু দাউদ সহীহ সূত্রে বর্ণনা করেছেন।]
ইবরাহীম নাখ্‌যী থেকে এ কথা বর্ণিত আছে যে, اعوذ بالله وبك অর্থ ‘আমি আল্লাহ এবং আপনার কাছে আশ্রয় চাই’। এ কথা বলা তিনি অপছন্দ করতেন। اعوذ بالله ثم بك অর্থ- ‘আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই অতঃপর আপনার কাছে আশ্রয় চাই’। এ কথা বলা তিনি জয়েয মনে করতেন। তিনি আরো বলেন, لولا الله ثم فلان ‘যদি আল্লাহ অতঃপর অমুক না হয়’ এ কথা বলে, কিন্তু لو لا الله و فلان অর্থাৎ ‘যদি আল্লাহ এবং অমুক না হয়’ এ কথা বলো না।
 
ব্যাখ্যা-
তাওহীদের হাকিকত বা মর্মকথা হচ্ছে যে, হৃদয় গহীনে ‘আল্লাহ ছাড়া কেউ থাকবে না তাঁর কোন শরীক নেই, নেই কোন সমকক্ষ। ‘আল্লাহ ছাড়া কারো নামে কছম করা, যদি আল্লাহ এবং অমুক না থাকতো এ জাতীয় কথা প্রয়োগ না করে শুধু আল্লাহর ব্যাপারে উল্লেখ করায় প্রযোজ্য। এ প্রসঙ্গে দুটি স্তর রয়েছে; প্রথমটি হচ্ছে পুর্ণতা অর্থাৎ পরিপূর্ণ তাওহীদ যেমন সে বলবে, ‘যদি আল্লাহ না থাকতেন তবে এমন হতো না। দ্বিতীয়টি হচ্ছে জায়েয, যেমন সে বলবে ‘যদি আল্লাহ না থাকতেন অতঃপর অমুক না থাকতো তবে এটা হতো না’ কিন্তু এটা পূর্ণ তাওহীদ নয়। প্রথমটায় হচ্ছে পরিপূর্ণ তাওহীদ এজন্যই ইবনে আব্বাস বলেছেন এখানে অমুককে রেখ না।
ইবনে আব্বাস (রা..) যেমন বলেছেন, এগুলো সবই শিরক, যেমন কেউ যদি বলে, আল্লাহ এবং অমুক যদি না থাকতো কেননা “এবং” যা অংশীদারিত্ব ও বিলম্বহীনতার অর্থ বহন করে। পক্ষান্তরে “অতঃপর” বিলম্বের অর্থ প্রকাশ করে। ফলে যদি আল্লাহ না থাকতেন অতঃপর অমুক না থাকতো বলা বৈধ হবে; কিন্তু পূর্বের বাক্যটি অর্থাৎ “এবং” বাক্যটি শিরকে আসগার হবে।
‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া কারো নামে কসম খাবে সে কুফুরী অথবা শিরক করবে। কসম মূলতঃ বাক্যের গুরুত্ব প্রকাশের জন্য প্রয়োগ করা হয় এবং যার নামে কসম করা হয় তার বড়ত্ব প্রকাশ পায়, ফলে কসম আল্লাহর নাম ছাড়া অন্য কারো নামে কসম খাওয়া শিরকে আসগার তথা ছোট শিরক কিন্তু কখনও কখনও তা বড় শিরকে পরিণত হতে পারে যখন কসমকৃত ব্যক্তিকে আল্লাহর মতো বড়ত্ব দান করা হবে। কসম তিন অক্ষরের যে কোন একটি দ্বারা সম্পাদন হয়ে থাকে। অক্ষরগুলী হচ্ছে- الوالو، الباء، التاء
কসমের নিয়ত না করেও সচারচার যারা বলে থাকেন নবী (সা..) এর কসম, কাবা ঘরের কসম, যে কোন ওলীর নামে কসম ইত্যাদি সেগুলোও শিরকে পরিণত হবে। কেননা এতে গায়রুল্লাহর সম্মান প্রদর্শন হয়ে থাকে।
আল্লাহর নামে মিথ্যা কসম করা অপেক্ষা গাইরুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে কসম খাওয়া মারত্মক অপরাধ। মিথ্যা বলা কবীরাগুনাহ হলেও শিরকে আসগার তথা ছোট শিরক তার চেয়েও মারাত্মক। ফলে ইবনে মাসউদ (রা..) পছন্দ করতেন যে, তাওহীদের সাথে মিথ্যা বলবেন কিন্তু শিরকের সাথে সত্য বলবেন না। কেননা তাওহীদের উত্তমত মিথ্যা বলবেন কিন্তু শিরকের সাথে সত্য বলবেন না। কেননা তাওহীদের উত্তমতা মিথ্যার ঘৃনতার চেয়ে বড় এবং শিরকের ঘৃনতা, মিথ্যার ঘৃনতার চেয়ে নিকৃষ্ট।
এ “নাহী” (নাকচ করা) হারাম অর্থ বুঝায়, অর্থাৎ এ ধরনের কথা বলা হারাম। কেননা এ ধরনের কথা দ্বারা ইখতিয়ারের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অন্যকে শরীক করা হয়ে থাকে। তবে অবশ্য এ ধরনের কথা বলা জায়েয হবেঃ “তাই হবে যা আল্লাহ চাইবেন অতপর অমুক” কেননা মানুষের ইখতিয়ার আল্লাহর ইখিতিয়ারের অধীন, যেমনঃ আল্লাহ তা ‘আলা বলেন-
﴿وَمَا تَشَاؤُونَ إِلَّا أَن يَشَاء اللهُ إِنَّ اللهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيْمًا﴾
অর্থ “তুমি চাও না কিন্তু তাই চাও যা আল্লাহ চায়–”[সূরা দাহরঃ ৩০]
ইবরাহীম নাখয়ীর “আমি আল্লাহ ও আপনার কাছে আশ্রয় চাই” এ ধরনের কথা অপছন্দের কারণ হলো, এখানে الواو বর্ণটি আশ্রয় চাওয়ার ক্ষেত্রে অংশীদারিত্বের দাবী রাখে। আশ্রয় চাওয়ার দুটি দিক যা ইতিপূর্বে বর্ণনাও করা হয়েছেঃ প্রকাশ্য দিক ও অপ্রকাশ্য দিক।
শরণাপন্ন হওয়া, আশ্রয় লওয়া, কামনা, ভয়-ভীতি এবং যার কাছে আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে তার দিকে হৃদয়কে ধাবিত করা একমাত্র আল্লাহর জন্য বিশুদ্ধ অন্যের জন্যে নয়। বর্ণিত কারাহাত বা অপছন্দনীয় দ্বারা সালাফে সালেহীন অধিকাংশই হারাম উদ্দেশ্য নিয়ে থাকেন। কখনো কখনো তা হারাম নয় এমন ক্ষেত্রেও ব্যবহার হয়ে থাকে কিন্তু তা একমাত্র সে ক্ষেত্রেই যার কোন দলীল নেই।
 
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ
০১। আল্লাহর সাথে শরীক করা সংক্রান্ত সূরা বাকারার ২২ নং আয়াতের তাফসীর
০২। শিরকে আকবার অর্থাৎ বড় শিরকের ব্যাপারে নাযিলকৃত আয়াতকে সাহাবায়ে কেরাম ছোট শিরকের ক্ষেত্রে ও প্রযোজ্য বলে তাফসীর করেছেন।
০৩। গাইরুল্লাহর নামে কসম করা শিরক।
০৪। গাইরুল্লাহর নামে সত্য কসম করা, আল্লাহর নামে মিথ্যা কসম করার চেয়েও জঘন্য গুনাহ্।
০৫। বাক্যে অবস্থিত الواو এবং ثم এর মধ্যে পার্থক্য।
 
অধ্যায়-৪২
আল্লাহর নামে কসম করে সন্তুষ্ট না থাকার পরিণাম
ইবনে ওমর (রাযিআল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত আছে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন-
((لَا تَحْلِفُوا بِآبَائِكُمْ، مَنْ حَلَفَ بِاللهِ فَلْيَصْدُقْ، وَمَنْ حُلِفَ لَهُ بِاللهِ فَلْيَرْضَ، وَمَنْ لَّمْ يَرْضَ فَلَيْسَ مِنَ اللهِ)) (سنن ابن ماجه، الكفارات، باب من حلف له بالله فليرض، ح:١٠١٢)
“তোমরা তোমাদের বাপ-দাদার নামে কসম করো না, যে ব্যক্তি আল্লাহর নামে কসম করে, তার উচিত সত্য কসম করা। আর যে ব্যক্তির উদ্দেশ্যে আল্লাহর নামে কসম করা হয়, তার উচিত উক্ত কসমে সন্তুষ্ট থাকা। আল্লাহর কসমে যে ব্যক্তি সন্তুষ্ট হলো না, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার কল্যাণের কোন আশা নেই।” [ইবনে মাজা উত্তম সূত্রে বর্ণনা করেছেন]
 
ব্যাখ্যা-
এ বিধান সকল প্রকার কসমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিচারকের কাছে হোক কিংবা যেখানেই হোক কসমে যেহেতু বড়ত্ব প্রমাণ করা হয়। ফলে যার জন্য আল্লাহর নামে কসম খাওয়া হবে তার উচিত তাকে বিশ্বাস করা যদিও সে মিথ্যা কসম খায় কিন্তু তার উপর ভরসা না করা তাঁর জন্য বৈধ হবে। তবে সে যে মিথ্যা কসম খেয়েছে তা জানতে দিবে না। যেহেতু কসমের মাধ্যমে আল্লাহর বড়ত্ব কামনা করা হয়েছে।
আল্লাহর কসমে যে ব্যক্তি সন্তুষ্ট হল না, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার কল্যাণের কোন আশা নেই। এ দ্বারা বুঝা যায় আল্লাহর কসমের প্রতি সন্তুষ্টি না হওয়া কবীরা গুনাহ।
 
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ
০১। বাপ-দাদার নামে কসম করার উপর নিষেধাজ্ঞা।
০২। যার জন্য আল্লাহর নামে কসম করা হল, তার প্রতি [কসমের বিষয়ে] সন্তুষ্ট থাকার নির্দেশ
০৩। আল্লাহর নামে কসম করার পর, যে তাতে সন্তুষ্ট থাকে না, তার প্রতি ভয় প্রদর্শন ও হুঁশিয়ারী উচ্চারণ।
 
অধ্যায়-৪৩
আল্লাহ এবং আপনি যা চেয়েছেন বলার হুকুম
কুতাইলাহ বর্ণনা করেনঃ
((أَنَّ يَهُودِيَّا أَتَى النَّبِيَّ صَلى الله عليه وَسَلم فَقَالَ: إِنَّكُمْ تَشْرِكُونَ، تَقُولُونَ: مَا شَآءَ اللهُ وَشِئْتَ، وَتَقُولُونَ: وَالْكَعْبَةِ، فَأَمَرَهُمُ النَّبِيُّ صَلى الله عليه وَسَلم إِذَا أَرَادُوا يَّحْلِفُوا أَنْ يَّحْلِفُوا أَنْ يَّقُولُوا: وَرَبِّ الْكَعْبَةِ، وَأَنْ يَّقُولُوا: مَا شَآءَ اللهُ ثُمَّ شِئْتَ)) (سنن النسائي، الأيمان والنذور، باب الحف بالكعبة، ح:٤٠٨٣)
“একজন ইহুদী রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কাছে এসে বললো, ‘আপনারা আল্লাহর সাথে শিরক করে থাকেন।’ কারণ আপনারা বলে থাকেন, ماشاء الله وشئت আল্লাহ যা চান এবং আপনি যা চেয়েছেন।’ আপনারা আরো বলে থাকেন, وَالكعبة ‘কা’বার কসম। এরপর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবাগণকে বললেন, মুসলমানদের মধ্যে যারা কসম বা হলফ করতে চায়, তারা যেন বলে, ورب الكعبة কা‘বার রবের কসম’ আর যেন ماشاء الله ثم شئت ‘আল্লাহ যা চেয়েছেন অতঃপর আপনি যা চেয়েছেন’ একথা বলে।” [হাদীসটি নাসায়ী বর্ণনা করেছেন এবং তা সহীহ বলেছেন।]
ইবনে আব্বাস (রাযিআল্লঅহু আনহুমা) হতে আরো একটি হাদীস বর্ণিত আছেঃ
((أَنَّ رَجُلًا قَالَ لِلنَّبِيِّ صَلى لله عليه وسلم مَا شَآءَ اللهُ وَ شِئْتَ فَقَالَ: أَجَعَلْتَنِي للهِ نِدَّا؟ بَلْ مَا شَآءَ اللهُ وَحْدَهُ)) (عمل اليوم والليلة للنسائي، ح:٨٨٩ وَمسند أحمد:١/٤١٢)
“এক ব্যক্তি রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উদ্দেশ্যে বললো, ماشاء الله وشئت ‘আপনি এবং আল্লাহ যা ইচ্ছা করেছেন’ তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, أجعلتنى الله نداً ‘তুমি কি আল্লাহর সাথে আমাকে শরীক করে ফেলেছো?’ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ যা ইচ্ছা করেছেন, তা এককভাবেই কারেছেন।
আয়েশা (রাযিআল্লাহু আনহা) এর মায়ের পক্ষিয় (আখ্‌ইয়াফী) ভাই, তোফায়েল (রা..) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ
((رَأَيْتُ كَأَنِّى أَتَيْتُ عَلَٰى نَفَرٍ مِّنَ الْيَهُودِ قُلْتُ: إِنَّكُمْ لأَنْتُمُ الْقَوْمُ لَوْلَا أَنَّكُمْ تَقُولُونَ عُزَيْرٌ ابْنُ اللهِ، قَالُوا: وَأَنْتُمْ لأَنْتُمُ الْقَوْمُ لَولَا أَنَّكُمْ تَقُولُونَ: مَا شَاءَ اللهُ وَ شَاءَ مُحَمَّدٌ ثُمَّ مَرَرْتُ بِنَفَرٍ مِّنَ النَّصَارَٰى فَقُلْتُ إِنَّكُمْ لأَنْتُمُ الْقَوْمُ لَوْلَا أَنَّكُمْ تَقُولُونَ: الْمَسِيْحُ اِبْنُ اللهِ قَالُوا: وَأَنْتُمْ لأَنْتُمْ الْقَوْمُ لَوْلاَ أَنَّكُمْ تَقُولُونَ: مَا شَاءَ اللهُ وَشَاءَ مُحَمَّدٌ، فَلَمَّا أَصْبَحْتُ أَخْبَرْتُ بِهَا مَنْ أَخْبَرْتُ، ثُمَّ أَتَيْتُ النَّبِيَّ صَلى الله على وسلم فَأَخْبَرْتُهُ، قَالَ: هَلْ أَخْبَرْتَ بِهَا أَحَدًا؟ قُلْتُ: نَعَمْ، قَالَ: فَحَمِدَ اللهَ وَأَثْنَٰى عَلَيْهِ ثُمَّ قَالَ: أَمَّا بَعْدُ: فَإِنَّ طُفَيْلً رَأَى رُؤْيَا أَخْبَرَ بِهَا مَنْ أَخْبَرَ مِنْكُمْ، وَ إِنَّكُمْ قُلْتُمْ كَلِمَةً كَانَ يَمْنَعُنِي كَذَا وَكَذَا أَنْ أَنْهَاكُمْ عَنْهَا، فَلَا تَقُولُوا: مَا شَاءَ اللهُ وَ شَاءَ مُحَمَّدٌ وَّلَٰكِنْ قُولُوا: مَا شَاءَ اللهُ وَحْدَهُ)) (سنن ابن ماجه، الكفارات، باب النهي أن يقال: ماشاء الله وشئت، ح:٨١١٢ ومسند أحمد:٥/٢٧)
“আমি স্বপ্নে দেখতে পেলাম, আমি কয়েকজন ইহুদীর কাছে এসেছি। আমি তাদেরকে বললাম তোমরা অবশ্যই একটা ভাল জাতি, যদি তোমরা ওযাইরকে আল্লাহর পুত্র না বলতে। তারা বললো, ‘তোমরাও অবশ্যই একটা ভাল জাতি, যদি তোমরা ماشاء الله وشاء محمد ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা করেছেন এবং মুহাম্মাদ যা ইচ্ছা করেন।’ এ কথা না বলতে! অতঃপর নাসারাদের কিছু লোকের কাছে আমি গেলাম এবং বললাম, ‘ঈসা (আ..) আল্লাহর পুত্র এ কথা না বললে, তোমরা একটি উত্তম জাতি হতে পারতে। তারা বলল, ‘তোমরাও ভাল জাতি হতে, যদি তোমরা একথা না বলতে, ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা করেছেন এবং মুহাম্মদ যা ইচ্ছা করেছেন। সকালে এ (স্বপ্নের) খবর যাকে পেলাম তাকে দিলাম। অতঃপর আমি নবী (সা..) কাছে এসে তাকে সংবাদটি জানালাম। তিনি বললেন, এ স্বপ্নের কথা কি আর কাউকে বলেছ? বললাম, হাঁ। তখন তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন গুণ বর্ণনা করলেন। তারপর বললেন, ‘তোফায়েল একটা স্বপ্ন দেখেছে, যার খবর তোমাদের মধ্যে যাকে বলার সে বলেছে। তোমরা এমন কাথাই বলে থাক, যা বলতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে। আর আমিও তোমাদেরকে এভাবে বলতে নিষেধ করছি। অতএব তোমরা ماشاء الله وشاء محمد অর্থাৎ ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা এবং মুহাম্মাদ (সা..) যা ইচ্ছা করেন’ একথা বলো না বরং তোমরা বলো ماشاء الله وحده অর্থাৎ ‘এককভাবে আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন’
 
ব্যাখ্যা-
একথা বলা শব্দগত শিরক এবং ইখতিয়ারে আল্লাহর সাথে গায়রুল্লাহর শিরক সাব্যস্ত হয়। আর এ শিরক হল শিরকে আসগার।
এই হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, কখনো কখনো প্রবৃত্তি পূজারীরাও হক্বপন্থীদের প্রতিবাদ করে থাকে যে, যেমন তাদের মধ্যে ভ্রান্ততা রয়েছে হক্বপন্থীদের মধ্যেও রয়েছে। সুতরাং হক্বপন্থীদের উচিত যদি এরূপ হয়ে থাকে তবে, সঙ্গে সঙ্গেই হক গ্রহণ করে নেয়া তা যার নিকট থেকেই পাওয়া যায়। কখনও কখনও কুপ্রবৃত্তি স্বভাবের লোকেরাও সঠিক পথ বুঝতে পারে এবং তার নিকট থেকে তা গ্রহণ করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ওয়াজিব হয়ে যায়। কেননা হক সর্বদা গ্রহণযোগ্য যদিও তা ইহুদী খ্রিস্টানদের মাধ্যমে আসুক না কেন।
শিরকে আসগার তথা ছোট শিরকগুলি নবী (সা..) পর্যাক্রমে দূর করেছেন কিন্তু বড় বড় শিরক নবুয়াতের প্রথম থেকেই দূরীভূত করেছেন এবং শিরকে আকবার উৎখাতে বিলম্ব করা জায়েয হবে না। তবে শব্দগত শিরক বা ছোট শিরক বিশেষ স্বার্থে যেমনঃ দাওয়াতের স্বার্থে অথবা স্বল্প গুরুত্বের বিষয়ের উপর মহা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে বৃহৎ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য সেগুলোকে দেরীতে নিষেধ করা যেতে পারে, কিন্তু মহা শিরক কোন প্রকার স্বার্থের কারণে সহ্য করা যাবে না।
 
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ
০১। ছোট শিরক সম্পর্কে ইহুদীরাও অবগত আছে।
০২। কুপ্রবৃত্তি সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধি থাকা।
০৩। রাসূল (সা..) এর উক্তি, ماشاء الله و شئت “তুমি কি আমাকে (এ কথার দ্বারা) আল্লাহর শরীক বানাতে চাও?” ‘অর্থাৎ এ কথা বললেই যদি শিরক হয়’ তাহলে সে ব্যক্তির অবস্থা কি দাঁড়ায়, যে ব্যক্তি বলে, مالى من الوذ به سواك ‘হে সৃষ্টির সেরা, আপনি ছাড়া আমার আশ্রয়দাতা কেউ নেই এবং (এ কিবতাংশের) পরবর্তী দুটি লাইন। (অর্থাৎ উপরোক্ত কথা বললে অবশ্যই বড় ধরনের শিরকী গুনাহ হবে।) অথবা কেউ যদি রাসূল (সা..) কে আহ্বান করতঃ বলে- হে রাসূলদের ইমাম! আমর তো একমাত্র আপনি ভরসা, আপনি তো আমার জন্য আল্লাহর দরজা। হে রাসূল আপনি ইহকালে আমার হাত ধরে থাকুন ও পরকালেও ধরবেন কেননা আপনি ব্যতীত আমার সংকীর্ণতাকে কেউ সহজ করতে পারবে না। ইত্যাদি এসব অবশ্য শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
০৪। নবী (সা..) এর বাণী দ্বারা বুঝা যায় যে, এটা শিরকে আকবার (বড় শিরক) এর পর্যায়ভুক্ত নয়।
০৫। নেক স্বপ্ন অহীর অংশ বিশেষ।
০৬। স্বপ্ন শরীয়তের কোন কোন বিধান জারির কারণ হতে পারে।
 
অধ্যায়-৪৪
যে ব্যক্তি যামানাকে গালি দেয় সে আল্লাহকে কষ্ট দেয়।
আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন-
﴿وَقَالُواْ مَاهِىَ إِلَّا حَيَاتُنَا ٱلدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْيَا وَمَا يُحْلِكُنَآ إِلَّا ٱلدَّهْرُ ۚ﴾
অর্থ- “অবিশ্বাসীরা বলে শুধু দুনিয়ার জীবনই আমাদের জীবন। আমরা এখানেই মরি ও বাঁচি, যামানা ব্যতীত অন্য কিছুই আমাদেরকে ধ্বংস করতে পারে না। [সূরা জাসিয়াত-২৪]”
সহীহ হাদীসে আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা..) বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেনঃ
((قَالَ اللهُ تَعَالَٰى: يُؤْذِينِي ابْنُ آدَمَ يَسُبُّ الدَّهْرَ وَأَنَا الدَّهْرُ أُقَلِّبُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ)) (صحيح البخاري، التفسير، سورة حم الجاثية، باب وما يهلكنا إلا الدهر، ح:٦٢٨٤ وصحيح مسلم، الأدب وغيرها، باب النهي عن سب الدهر، ح:٦٤٢٢)
“আদম সন্তান আমাকে পীড়া দেয়। কারণ, সে কালকে গালি দেয়। অথচ আমিই হচ্ছি কাল। আমিই (যামানার) রাত দিনকে পরিবর্তন করি।”
অন্য বর্ণনায় আছে-
((لاَ تَسُبَّوا الدَّهْرَ، فَإِنَّ اللهَ هُوَ الدَّهْرُ)) (صحيح مسلم، الألفاظ من الأدب، باب النهي عن سب الدهر، ح:٦٤٢٢)
“তোমরা যামানাকে গালি দিও না। কারণ, আল্লাহই হচ্ছেন যামানা।”
 
ব্যাখ্যা-
যামানাকে ভালোমন্দ বলা বা গালি দেয়া নাজায়েয। এ ধরনের অভ্যাস বর্জন করা খুবই জরুরী। যামানাকে গালি দেয়া পূর্ণ তাওহীদের পরিপন্থী। সাধারণত মূর্খ লোকদের দেখা যায় যে তারা যামানাকে গালি দেয়, যখনই কোন সময় তাদের মন মতো কোন কাজ হয় না তখনই তারা সে সময় বা যুগকে কটুক্তি এবং সেই দিন অথবা মাস অথবা বছরকে অভিশাপ প্রদান করে। এ কথা সর্বজন বিদিত যে যামানার কিছু করার ক্ষমতা নেই বরং যা কিছুর পরিবর্তন ঘটে তা স্বয়ং আল্লাহ করেন। ফলে গালি আল্লাহকে কাষ্ট দেয়। যামানাকে গালি দেয়ার কয়েকটি স্তর আছে। তার মধ্যে সর্বোচ্চ হল যামানাকে অভিশাপ করা; কিন্তু কোন কোন বছরকে কঠিন বছর বলা অথবা কোন কোন দিনকে কালোদিবস হিসাবে আখ্যায়িত করা অথবা কোন কোন মাসকে অশুভ বলে আখ্যায়িত করা যামানাকে গালি দেয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে না। কেননা এটা নির্দিষ্ট একটা ব্যাপার। যে দিনে তার ভাগ্য তার সহায় হয়নি অর্থাৎ যেন সে তার অবস্থার বর্ণনা করছে যামানার ভাল মন্দের নয়।
তাওহীদবাদীরা প্রতিটি বস্তুর সম্বোধন আল্লাহর দিকে করেন আর মুশরিকগণ প্রতিটি বস্তুর সম্বোধন যামানার দিকে করে।
এর অর্থ এ নয় যে, যামানা আল্লাহর নামসমূহের একটি। বরং এখানে বলার অর্থ হল, যামানা স্বয়ং না কোন জিনিসের মালিক না কিছু করে বা করতে পারবে বরং আল্লাহই যামানার ধারাবাহিকভাবে পরিবর্তন করেন এবং এ দু’টির (দিন ও রাত এর) কোন কর্মক্ষমতা নেই ফলে এ দু’টিকে গালি দেয়া তাদের পরিবর্তনকারীকে গালি দেয়ারই নামান্তর।
 
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ
০১। কালকে গালি দেয়া নিষেধ।
০২। কালকে গালি দেয়া আল্লাহকে কষ্ট দেয়ারই নামান্তর।
০৩। فإن الله هو الدهر আল্লাহই হচ্ছেন যামানা, রাসূলের বাণী যথেষ্ট গবেষণার অবকাশ রাখে।
০৪। বান্দার অন্তরে আল্লাহকে গালি দেয়ার ইচ্ছা না থাকলেও অসাবধানতাবশতঃ মনের অগোচরে তাঁকে গালি দিয়ে ফেলতে পারে।
 
অধ্যায়-৪৫
কাযীউল কুযাত (মহা বিচারক, প্রভৃতি) নামকরণ প্রসঙ্গে।
আবু হুরাইরা (রা..) থেকে বর্ণিত, সহীহ হাদীসে রাসূল (সা..) ইরশাদ করেন-
((إِنَّ أَخْنَعَ اسْمٍ عِنْدَ اللهِ رَجُلٌ تَسَمَّى بِمَلِكِ الأَمْلَاكِ، لَا مَالِكِ إِلَّا اللهُ)) (صحيح البخاري، الأدب، باب أبغض الأسماء إلى الله، ح:٦٠٢٦ و صحيح مسلم، باب تحرين التسمي الأملاك…، ح:٣٤١٢
“আল্লাহ তা‘আলার নিকট ঐ ব্যক্তির নাম সবচেয়ে ঘৃণিত, যার নামকরণ করা হয় ‘রাজাধিরাজ’ বা ‘প্রভুর প্রভু’। আল্লাহ ব্যতীত কনো প্রভু নেই” [বুখারী]
সুফইয়ান সাওরী বলেছেন, ‘রাজাধিরাজ’ কথাটি ‘শাহানশাহ’ এর মতই একটি নাম। আরও একটি বর্ণনা মতে রাসূল (সা..) বলেন-
((أَغْيَظُ رَجُلٍ عَلَى اللهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَخْبَثُهُ)) (صحيح مسلم، الآداب، باب تحريم التسمي بملك الأملاك….، ح:٣٤١٢ مسند أحمد: ٢/٥١٣)
“কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ধিকৃত এবং খারাপ ব্যক্তি হচ্ছে ‘যার নামকরণ করা হয়েছে রাজাধিরাজ’ ” উল্লেখিত হাদীসে أخنع يعى أوضع শব্দের অর্থ হচ্ছে সবচেয়ে ধিকৃত।
 
ব্যাখ্যা-
মানুষ নির্দিষ্ট কিছু একটার অথবা নির্দিষ্ট ভূমির মালিক, কোন রাজ্যের মালিক হতে পারে; কিন্তু সবকিছুর মালিক, সারা পৃথিবীর মালিক একমাত্র আল্লাহ। সুতরাং রাজাধিরাজ শাহানশাহ মহাবিচারক, এ জাতীয় নাম আল্লাহ ছাড়া কারো জন্যই জায়েয নয়। কেননা তাওহীদের দাবীই হলো যে, এ ধরনের গুণে গণান্বিত ও এ ধরনের নামে নামকরণ একমাত্র আল্লাহর জন্যেই।
একমাত্র আল্লাহই মহা অধিপতি, অতএব, এ ধরনের নাম মানুষের জন্য রাখার অর্থ হল আল্লাহর জন্য যা নির্ধারিত তা গ্রহণ করা। কেননা আধিপত্ব তো একমাত্র আল্লাহর আর মানুষের জন্য এ ধরনের বলা যেতে পারে যে সে অমুক জিনিসের মালিক, প্রত্যেক জিনিসের নয়। অথবা সে অমুক দেশের বাদশাহ বা মালিক কিন্ত সমস্ত বিশ্বের নয়। এ জন্য তাওহীদের দাবী হল, সৃষ্টির মধ্যে কাউকে রাজাধিরাজ বলা যাবে না। বরং কোন কিতাবে যদি পাওয়া যায় তবে তা মিটিয়ে দিতে হবে।
আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট এবং খারাপ ব্যক্তি হওয়ার কারণ যে সে এই নামের দ্বারা আল্লাহর সমকক্ষ হবার জন্য নিজেকে পেশ করেছে।
 
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ
০১। ‘রাজাধিরাজ’ নামকরণে নিষেধাজ্ঞারোপ।
০২। ‘রাজাধিরাজ’ ব্যতীত এর সমার্থবোধক শব্দও নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত যেমন সুফইয়ান সাওরী ‘শাহানশাহ’ শব্দটি উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করেন।
০৩। উল্লেখিত ব্যাপারে এবং এ জাতীয় বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করা। এক্ষেত্রে অন্তরে কি নিয়ত আছে তা বিবেচ্য নয়।
০৪। এও বুঝা উচিত যে, ঐ সমস্ত নাম ও গুণাবলী থেকে নিষেধাজ্ঞার অর্থ হল আল্লাহ তা‘আলারই বড়ত্ব প্রকাশ।
গ্রন্থকার (রহ..) এখানে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, যে সমস্ত নামের অর্থ একমাত্র আল্লাহর জন্যই প্রযোজ্য সেই নামে কারো নাম রাখা বৈধ নয়।
 
অধ্যায়-৪৬
আল্লাহর নামসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও সম্মানার্থে নামের পরিবর্তন করা।
আবু শুরাইহ্ হতে বর্ণিত আছে, এক সময় তার উপাধি ছিল আবু হাকাম[ফয়সালাকারীর পিতা] রাসূল (সাঃ) তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন-
((إِنَّ اللهَ هُوَ الْحَكَمُ، وَإِلَيْهِ الْحُكْمُ، فَقَالَ: إِنَّ قَوْمِي إِذَا اخْتَلَفُوا فِي شَيءٍ أَتَوْنِي فَحَكَمْتُ بَيْنَهُمْ، فَرَضِيَ كِلَا الْفَرِيقَيْنِ، فَقَالَ: مَا أحْسَنَ هٰذَا، فَمَا لَكَ مِنَ الْوَلَدِ؟ قَالَ: شُرَيْحٌ، وَمُسْلِمٌ، وَّعَبْدُاللهِ، قَالَ: فَمَنْ أَكْبَرُهُمْ؟ قُلْتُ: شُرَيْحٌ، قَالَ: فَأَنْتَ أَبُوْ شُرَيْحٍ)) (سنن أبي داود، الأدب، باب تغيير الإسم القبيح، ح:٥٥٩٤ وسنن انسائي، آداب القضاة، باب إذا حكموا رجلا فقضى بينهم، ح:٩٨٣٥)
“আল্লাহ তা‘আলাই হচ্ছেন জ্ঞানের সত্ত্বা এবং তিনিই জ্ঞানের আঁধার। তখন আবু শুরাইহা বললেন, ‘আমার গোত্রের লোকেরা যখন কোনো বিষয়ে মতবিরোধ করে, তখন ফয়সালার জন্য আমার নিকট চলে আসে। তারপর আমি তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেই। তা উভয় পক্ষই গ্রহণ করে। রাসূল (সা..) একথা শুনে বললেন, এটা কতই না ভাল। তোমার কি সন্তানাদি আছে? আমি বললাম, ‘শুরাইহ’, ‘মুসলিম’ এবং ‘আব্দুল্লাহ’ নামে আমার তিনটি ছেলে আছে। তিনি বললেন, তাদের মধ্যে সবার বড় কে?’ আমি বললাম ‘শুরাইহ’। তিনি বললেন, অতএব এখন থেকে তুমি ‘আবু শুরাইহ’ [শুরাইহের পিতা]।” [আবু দাউদ]
ব্যাখ্যা-
একজন তাওহীদবাদী বান্দার আল্লাহর সাথে তার অন্তরের এবং জিহ্বার (ভাষার) কি ধরনের আচরণ হওয়া উচিত তার বর্ণনা করা হয়েছে এ অধ্যায়ে। আল্লাহর নামের প্রতি সম্মান প্রদর্শন কখনও উত্তম আবার কখনও ওয়াজিব।
হাকাম আল্লাহর নামসমূহের অন্যতম। যেহেতু আল্লাহ তা’আলা কাউকে জন্ম দেননি এবং নিজেও জন্মগ্রহণ করেননি। ফলে আবুল হাকাম অর্থাৎ হাকামের পিতা নামকরণ উচিত নয়। দ্বিতীয়ত হাকাম অর্থ হচ্ছে যিনি চূড়ান্ত বিচারক এবং যেহেতু বিচার কার্যের একমাত্র মালিকানা আল্লাহ, ফলে এরূপ নামকরণ কারোর জন্য জায়েয নয়। যদিও মানুষ অধিনস্ত হিসাবে বিচারক হয়ে থাকে। ফলে নবী (সা..) এ নামটিকে অপছন্দ করেন। সুতরাং বলব যে হাকাম অথবা হাকেম নাম না রাখাই আদবের ব্যাপার। কিন্তু কেউ যদি বাস্তবেই আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন করে তবে হাকিম নাম রাখতে তেমন কোন বাঁধা নেই।
 
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ
০১। আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর সম্মান করা। যদিও তার অর্থ উদ্দেশ্য না হয়ে থাকে।
০২। আল্লাহর নাম ও সিফাতের সম্মানার্থে নাম পরিবর্তন করা।
০৩। উপাধির জন্য বড় সন্তানের নাম পছন্দ করা।
 
অধ্যায়-৪৭
আল্লাহ্‌, কুরআন এবং রাসূল সম্পর্কিত কোন বিষয় নিয়ে খেল-তামাশা করা।
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন-
﴿وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ﴾
অর্থঃ “আপনি যদি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, তবে তারা অবশ্যই বলবে, আমরা খেল-তামাশা করছিলাম” [সূরা তাওবাহ-৬৫] –
ইবনে ওমর, মুহাম্মাদ বিন কা’ব, যায়েদ বিন আসলাম এবং কাতাদাহ (রাযিআল্লাহু আনহুম) থেকে বর্ণিত আছে, তাবুক যুদ্ধে এক লোক বললো, এ ক্বারীদের [কুরআন পাঠকারীর] মতো এতো অধিক পেটুক, কথায় এতো অধিক মিথ্যুক এবং যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর সামনে এতো অধিক ভীরু আর কোনো লোক দেখিনি। অর্থাৎ তার কথার মাধ্যমে মুহাম্মাদ (সা..) এবং তাঁর ক্বারী সাহাবায়ে কেরামের দিকে ইঙ্গিত করেছিল। আওফ বিন মালিক লোকটিকে বললেন, তুমি মিথ্যা কথা বলেছ। কারণ, তুমি মুনাফিক। আমি অবশ্যই রাসূল (সা..) কে এ বিষয়ে জানাব, আওফ তখন এ খবর জানানর জন্য রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কাছে চলে আসলো। তারপর গিয়ে দেখলেন কুরআন তাঁর চেয়েও অগ্রগামী। [অর্থাৎ আওফ পৌঁছার পূর্বেই অহীর মাধ্যমে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ব্যাপারটি জেনে গেছেন।] এর ফাঁকে মুনাফিক লোকটি তার উটে চড়ে রাসূল (সা..) এর কাছে চলে আসলো। তারপর সে বললো, ‘হে আল্লাহর রাসূল, চলার পথে আমরা অন্যান্য পথচারীদের মত পরস্পরে হাসি, ঠাট্টা করছিলাম যাতে করে আমাদের পথ চলার কষ্ট লাঘব হয়। ইবনে ওমর (রা..) বলেন, এর উটের গদির রশির সাথে লেগে আমি যেন তার দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম। পাথর তার পায়ের উপর পড়ছিল, আর সে বলছিলো, ‘আমরা হাসি ঠাট্টা করছিলাম’ তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন।
﴿أَبِٱللهِ وَءَايَٰتِهِۦ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِءُونَ﴾
অর্থঃ “তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াত [কুরআন] এবং তাঁর রাসূলের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছিলে? তিনি তার দিকে [মুনাফিকের দিকে] দৃষ্টিও দেননি। এর অতিরিক্ত কোনো কথাও বলেননি।”(সূরা তাওবা-৬৫) –
ব্যাখ্যা-
তাওহীদের দাবীই হল, আল্লাহর বিধি-বিধানকে মনে-প্রাণে গ্রহণ করা এবং তার অনুসরণ ও সম্মান করা। পক্ষান্তরে আল্লাহ, কুরআন ও রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কিত কোন বিষয়ে হাসি-তামাশা, ঠাট্টা-বিদ্রূপ সম্পূর্ণরূপে তাওহীদের পরিপন্থী ও সম্মান বিরোধী। এজন্য তা হলো বড় ধরনের কুফরী। অনুরূপ ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে বিদ্রূপ করাও কুফরী। কাজেই বড় ধরনের কুফুরী সব মানুষকেই ইসলামের গণ্ডী থেকে বের করে দেয়।
অত্র আয়াতের আলোকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, আল্লাহ, নবী ও কুরআনের সাথে বিদ্রূপকারী কাফের এবং এক্ষেত্রে তার কোনই ওযর আপত্তি গ্রহণযোগ্য হবে না। অত্র আয়াতে কারীমা মুনাফেকদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়। তাওহীদপন্থীদের দ্বারা শরীয়তের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ কল্পনাতীত ব্যাপার।
 
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ
০১। এ অধ্যায় থেকে একটি বিরাট মাসআলা প্রমাণিত হলো, যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অথবা সাহাবায়ে কিরাম (রাযিআল্লাহু আনহুম) নিয়া ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে, সে কাফের।
০২। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে একথা অনুধাবন করা যে, আল্লাহ, কুরআন ও রাসূলের সাথে যারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে তারা কুফরী কাজ করে।
০৩। এ ঘটনা সংশ্লিষ্ট আয়াতের তাফসীর প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য, যে এ ধরনের কাজ করে অর্থাৎ আল্লাহ, কুরআন ও রাসূলের সাথে ঠাট্টা-বদ্রূপ করে।
০৪। চোগলখুরী এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্যে একনিষ্ঠতার মধ্যে পার্থক্য।
০৫। এমন কিছু অজুহাত রয়েছে যা গ্রহণ করা উচিত নয়।
 
অধ্যায়-৪৮
আল্লাহ তা‘আলার নিয়ামতের নাশোকরী করা অহংকারের লক্ষণ ও অনেক বড় অপরাধ
আল্লাহ তা’আলার বাণী-
﴿وَلَئِنْ أَذَقْنَٰهُ رَحْمَةً مِّنَّا مِنۢ بَعْدِ ضَرَّآءَ مَسَّتْهُ لَيَقُولَنَّ هَذَا لِى﴾
অর্থঃ “দুঃখ-দুর্দশার পর যদি আমি মানুষকে আমার রহমতের আস্বাদ গ্রহণ করাই, তাহলে সে অবশ্যই বলে, এ নিয়ামত আমার প্রাপ্য” [সূরা ফুস্‌সিলাত-৫০] –
প্রখ্যাত মুফাস্‌সির মুজাহিদ বলেন, এটা আমারই জন্য, এর অর্থ হচ্ছে, ‘আমার নেক আমলের বদৌলতেই এ নেয়ামত দান করা হয়েছে, আমিই এর হকদার।’ ইবনে আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহুমা) বলেন, ‘সে এ কথা বলতে চায়, ‘সম্পদ আমার আমলের কারণেই অর্জিত হয়েছে অর্থাৎ এর প্রকৃত হকদার আমিই।’
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন-
﴿قَالَ إِنَّمَآ أُوتِيتُهُۥ عَلَٰى عِلْمٍ عِنْدِىۤ﴾
অর্থঃ “সে বলে, নিশ্চয়ই এ সম্পদ আমার ইলম ও জ্ঞানের জন্য আমাকে দেয়া হয়েছে।”(সূরা কাসাস-৭৮)
কাতাদাহ (রাযিআল্লাহু আনহু) বলেন, উপার্জনের নানা পন্থা সম্পর্কিত জ্ঞান থাকার কারণে আমি এ নিয়ামতপ্রাপ্ত হয়েছি। অন্যান্য মুফাস্‌সিরগণ বলেন, ‘আল্লাহ পাকের ইলম মোতাবেকই এ সম্পদের আমি উপযুক্ত।’ মুজাহিদের উপরোক্ত বক্তব্য দ্বারাও বুঝানো হয়েছে যে, এ সম্পদ আমার সম্মান ও মর্যাদা সাপেক্ষে দেয়া হয়েছে।
আবু হুরায়রা (রা..) বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে এ কথা বলতে শুনেছেন-
((إِنَّ ثَلَاثَةً مِّنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ: أَبْرَصَ وَأَقْرَعَ وَأَعْمَٰى، فَأَرَادَ اللهُ أَنْ يَّبْتَلِيَهُمْ، فَبَعَثَ إِلَيْهِمْ مَّلَكًا فَأَتَى الأَبْرَصَ فَقَالَ: أَيُّ شَيْءٍ أَحَبُّ إِلَيْكَ؟ قَالَ: لَوْنٌ حَسَنٌ، وَّجِلْدٌ حَسَنٌ، وَّيَذْهَبُ عَنِّي الَّذِيْ قَدْ قَذِرَنِي النَّاسُ بِهِ، قَالَ فَمَسَحَهُ فَذَهَبَ عَنْهُ قَذَرُهُ، وَأُعْطِيَ لَوْنًا حَسَنًا وَّجِلْدًا حَسَنًا قَالَ: فَأَيُّ الْمَالِ أَحَبُّ إِلَيْكَ؟ قَالَ: الإِبِلُ أَوِ الْبَقَرُ – شَكَّ إِسْحَاقُ – فَأُعْطِيَ نَاقَةً عُشَرَاءَ، وَقَالَ: بَارَكَ اللهُ لَكَ فِيهَا- قَالَ: فَأَتَى الأَقْرَعَ فَقَالَ: أَيُّ شَيْءٍ أَحَبُّ إِلَيْكَ؟ قَالَ: شَعْرٌ حَسَنٌ، وَّيَذْهَبُ عَنِّي الَّذِي قَدْ قَذِرَنِي النَّاسُ بِهِ، قَالَ: فَمَسَحَهُ، فَذَهَبَ عَنْهُ وَأُعْطِيَ شَعْرًا حَسَنًا، قَالَ: أَيُّ الْمَالِ أَحَبُّ إِلَيْكَ؟ قَالَ: الْبَقَرُ – أَوْ الإِبِلُ – فَأُعْطِيَ بَقَرَةً حَامِلًا، وَّقَالَ: بَارَكَ اللهُ لَكَ، فِيهَا فَأَتَى الأَعْمٰى فَقَالَ: أَيُّ شَيْءٍ أَحَبُّ إِلَيْكَ؟ قَالَ: أَنْ يَّرُدَّ اللهُ إِلَيَّ بَصَرِي فَأُبْصِرَ النَّاسَ، فَمَسَحَهُ فَرَدَّ اللهُ إِلَيْهِ بَصَرَهُ، قَالَ: فَأَيُّ الْمَالِ أَحَبُّ إِلَيْكَ؟ قَالَ: الْغَنَمُ،فَأُعْطِيَ شَاةً وَّالِدًا، فَأَنْتَجَ هٰذَانِ وَوَلَّدَ هٰذَا، فَكَانَ لِهٰذَا وَادٍ مِّنَ الإِبِلِ، وَلِهٰذَا وَلدٍ مِّنَ الْبَقَرِ، وَلِهٰذَا وَادٍ مِّنَ الْغَنَمِ قَالَ: ثُمَّ إِنَّهُ أَتَى الأَبْرَصَ فِيْ صُوْرَتِهِ وَهَيْئَتِهِ فَقَالَ: رَجُلٌ مَّسْكِيْنٌ وَّابْنُ سَبِيْلٍ قَدِ انْقَطَعَتْ بِيَ الْحِبَالُ فِي سَفَرِي فَلَا بَلَاغَ لِيَ الْيَوْمَ إِلَّا بِاللهِ ثُمَّ بِكَ، أَسْأَلُكَ – بِالَّذِي أَعْطَاكَ اللَّوْنَ الْحَسَنَ وَالْمَالَ- بَعِيْرًا أَتَبَلَّغُ بِهِ فِي سَفَرِي، فَقَالَ: الْحُقُوقُ كَثِيرَةٌ فَقَالَ لَهُ: كَأَنِّي أَعْرِفُكَ، أَلَمْ تَكُنْ أَبْرَصَ يَقْذَرُكَ النَّاسُ، فِقِيرًا فَأَعْطَاكَ اللهُ عَزَّوَجَلَّ الْمَالَ؟ فَقَالَ إِنَّمَا وَرِثْتُ هٰذَا الْمَالَ كَابِرًا عَنْ كَابِرٍ، فَقَالَ: إِنْ كُنْتَ كَاذِبًا فَصَيَّرَكَ اللهُ إِلٰى مَا كُنْتَ، قَالَ: ثُمَّ إِنَّهُ أَتَى الأَقْرَعَ فِيِ صُورَتِهِ فَقَالَ لَهُ مِثْلَ مَا قَالَ لِهٰذَا، وَرَدَّ عَلَيْهِ مِثْلَ مَا رَدَّ عَلَيْهِ هٰذَا، فَقَالَ: إِنْ كُنْتَ كَاذِبًا، فَصَيَّرَكَ اللهُ إلٰى مَا كُنْتَ، قَالَ: وَأَتَى الأَعْمَىٰ فِيْ صُورَتِهِ فَقَالَ: رَجُلٌ مِّسْكِيْنٌ وَّابْنُ سَبِيلٍ قَدِ انْقَطَعَتْ بِيَ الْحِبَالُ فِي سَفَرِي فَلَا بَلَاغَ لِيَ الْيَوْمَ إِلَّا بِاللهِ ثُمَّ بِكَ، أَسْأَلُكَ- بِالَّذِيْ رَدَّ عَلَيْكَ بَصَرَكَ- شَاةً أَتَبَلَّغُ بِهَا فِي سَفَرِي، فَقَالَ: قَدْ كُنْتُ أَعْمٰى فَرَدَّ اللهُ إلَيَّ بَصَري، فَخُذْ مَا شِئْتَ، وَدَعْ مَا شئْتَ فَوَ اللهِ لَا أَجْهَدُكَ الْيَوْمَ بِشَيْءٍ أَخَذْتَهُ للهِ، فَقَالَ: أمْسِكْ مَالَكَ، فَإِنَّمَا ابْتُلِيتُمْ فَقَدْ رَضِيَ اللهُ عَنْكَ وَسَخِطَ عَلٰى صَاحِبَيْكَ)) (صحيح البخاري، أحاديث الأنبياء، باب حديث أبرص وأعمى وأقرع في بني إسرائيل، ح:٤٦٤٣ وصحيح مسلم، الزهد والقائق، باب الدنيا سجن للمؤمن وجنة للكاقر، ح:٤٦٩٢)
“বনী ইসরাইল বংশে তিনজন লোক ছিল- যাদের একজন ছিল কুষ্ঠরোগী, আরেকজন টাক পড়া অপরজন অন্ধ। আল্লাহ পাক এই তিনজনকে পরীক্ষা করতে চাইলেন। তখন তাদের কাছে তিনি ফিরিস্তা পাঠালেন। কুষ্ঠরোগীর কাছে ফিরিশ্‌তা এসে জিজ্ঞাসা করলো, তোমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কি? সে বললো, সুন্দর চেহারা এবং সুন্দর ত্বক (শরীরের চামড়া)। আর যে রোগের কারণে মানুষ ঘৃণা করে তা থেকে মুক্তি আমার কাম্য। তখন ফিরিস্তা তার শরীরে হাত বুলিয়ে দিল। এতে সে আরোগ্য লাভ করলো। তাকে সুন্দর রং আর সুন্দর ত্বক দেয়া হল। তারপর ফিরিশতা তাকে জিজ্ঞাস করল ‘তোমার প্রিয় সম্পদ কি? সে বলল ‘উট অথবা গরু’। (ইসহাক অর্থাৎ হাদীস বর্ণনাকারী উট কিংবা গরু এ দুয়ের মধ্যে সন্দেহ করেছেন।) তখন তাকে একটি গর্ভবতী উট দেয়া হল। ফিরিশতা তার জন্য দু’আ করে বললেন আল্লাহ এ সম্পদে বরকত দান করুন।
তারপর ফিরিশতা টাক পড়া লোকটির কাছে গিয়ে বললেন, ‘তোমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কি? ‘লোকটি বললো, ‘আমার প্রিয় জিনিস হল সুন্দর চুল। আর লোকজন আমাকে যার জন্য ঘৃণা করে তা থেকে মুক্তি চাই।’ ফিরিশতা তখন তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। ফলে তার মাথার টাক দূর হয়ে গেল। তাকে সুন্দর চুল দেয়া হল। অতঃপর ফিরিশতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন। ‘কোন সম্পদ তোমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়? সে বলল, ‘উট অথবা গরু।’ তখন তাকে গর্ভবতী গাভী দেয়া হলো। ফিরিশতা তার জন্য দু’আ করে বলল, ‘আল্লাহ এ সম্পদে বরকত দান করুন।
তারপর ফিরশতা অন্ধ লোকটির কাছে এসে বলল, ‘তোমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কি?’ লোকটি বললো, ‘আল্লাহ যেন আমার দৃষ্টি ফিরিয়ে দেন। যার ফলে আমি লোকজনকে দেখতে পাব। এটাই আমার প্রিয় জিনিস।’ ফিরিশতা তার চোখে হাত বুলিয়ে দিলেন। ফলে লোকটির দৃষ্টি আল্লাহ পাক ফিরিয়ে দিলেন। ফিরিশতা তাকে বললেন, ‘কি সম্পদ তোমার কাছে প্রিয়?’ সে বলল, ‘ছাগল আমার বেশি প্রিয়।’ তখন তাকে একটি গর্ভবতী ছাগল দেয়া হল। তারপর ছাগল বংশ বৃদ্ধি করতে লাগলো। এমনিভাবে উট ও গরু বংশ বৃদ্ধি করতে লাগল। অবশেষে অবস্থা এই দাঁড়াল যে, একজনের উট দ্বারা মাঠ পূর্ণ হয়ে গেল এবং আর একজনের গরু দ্বারা মাঠ পূর্ণ হয়ে গেল এবং আরেকজনের ছাগল দ্বারা মাঠ ভর্তি হয়ে গেল।
একদিন ফিরিশতা তার দ্বিতীয় বিশেষ আকৃতিতে কুষ্ঠরোগীর কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, ‘আমি একজন মিসকিন।’ আমার সফরের সম্বল শেষ হয়ে গেছে (আমি খুবই বিপদগ্রস্ত) আমার গন্তব্য পৌছার জন্য প্রথমে আল্লাহর অতঃপর আপনার সাহায্য দরকার। যে আল্লাহ আপনাকে এত সুন্দর রং এবং সুন্দর ত্বক দান করেছেন, তাঁর নামে আমি আপনার কাছে একটা উট সাহায্য চাই, যাতে আমি নিজ গন্তব্যস্থানে পৌঁছতে পারি। তখন লোকটি বলল, দেখুন, আমার অনেক দায়-দায়িত্ব আছে, হকদার আছে, ফিরিস্তা বললো, আমার মনে হয় আমি আপনাকে চিনি। আপনি কি কুষ্ঠ রোগী ছিলেন না, লোকজন আপনাকে খুব ঘৃণা করতো এবং আপনি খুব গরীব ছিলেন। তারপর আল্লাহ আপনাকে এ সম্পদ দান করেছেন। তখন লোকটি বললো, এ সম্পদ আমার পূর্বপুরুষ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। ফিরিশতা তখন বললেন, ‘তুমি যদি মিথ্যাবাদী হও তাহলে আল্লাহ যেন তোমাকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দেন।
তারপর ফিরিশতা টাক মাথা ওয়ালা লোকটির কাছে গেলো এবং ইতিপূর্বে কুষ্ঠরোগীর সাথে যে ধরনের কথা বলেছিল, তার (টাক ওয়ালা লোকটির) সাথেও সে ধরনের কথা বলল। প্রতি উত্তরে কুষ্ঠরোগী যে ধরনের উত্তর দিয়াছিল, এ লোকটিও সেই একই ধারনের উত্তর দিল। তখন ফিরিশতাও আগের মতই বললেন, ‘যদি তুমি মিথ্যাবাদী হও তাহলে আল্লাহ পাক যেন তোমাকে পূর্বের আবস্থায় ফিরিয়ে দেন।’ অতঃপর ফিরিশতা দ্বিতীয় আকৃতিতে অন্ধ লোকটির কাছে গিয়ে বললেন, আমি এক গরীব মুসাফির। আমার পথের সম্বল নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে। প্রথমে আল্লাহর অতঃপর আপনার সাহায্য দরকার। যিনি আপনার দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন, তাঁর নামে একটি ছাগল আপনার কাছে সাহায্য চাই, যাতে আমার এই সফরে নিজ গন্তব্যস্থানে পৌঁছাতে পারি। তখন লোকটি বলল, আমি অন্ধ ছিলাম। আল্লাহ পাক আমার দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আপনার যা খুশি নিয়ে যান, আপনার যা খুশী রেখে যান। আল্লাহর কছম, আল্লাহর নামে আপনি আজ যা নিয়ে যাবেন, তার বিন্দু মাত্র আমি বাধা দিব না। তখন ফিরিশতা বলল, আপনার মাল আপনিই রাখুন। আপনাদের শুধুমাত্র পরীক্ষা করা হল। আপনার আচরণে আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন, আপনার সঙ্গীদের আচরণে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হয়েছেন।[বুখারী ও মুসলিম]
ব্যাখ্যা-
আলোচিত অধ্যায়টির উদ্দেশ্য হচ্ছে, যে ব্যক্তি দাবী করে, যে সব নিয়ামত ও রিযিক সে প্রাপ্ত হয়েছে, তা সবই পরিশ্রম ও বিচক্ষণতার ফসল। অথবা যে ব্যক্তি মনে করে, আল্লাহর উপর তার প্রাপ্য হক হিসেবেই সে এসব নিয়ামতের হকদার, তাকে এ কথা জানিয়ে দেয়া যে, এ রকম ধারণা তাওহীদের সম্পূর্ণ পরিপন্থী অহংকারমূলক কথা। বান্দার আমল নিছক একটি কারণ মাত্র, কখন এ কারণ আল্লাহর হুকুমে ফলপ্রসু হয় আবার কখনো বিনা কারণেই মানুষের উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে যায়। সুতারাং সব কিছু প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর অনুগ্রহে হয়ে থাকে।
অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তিকে দেখা যায় যে বড় ধরনের ব্যবসা-বাণীজ্য হবার পর তারা পূর্বের অবস্থাকে অস্বীকার করে ও বলে নিজ যোগ্যতা ও দক্ষতার বলে আমি সম্পদের মালিক হয়েছি ঠিক তেমনই অনেক চাকুরী ও বড় পদ পেয়ে বলে আমি আমার পরিশ্রমে তা অর্জন করেছি।
আবু হুরায়রা (রাঃ) এর হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, আল্লাহ উক্ত তিন ব্যক্তিকেই সুস্থ্যতা দান করেছিলেন; কিন্তু দু’জনই সকল নিয়ামত ও সম্পদকে নিজের দিকে সম্পর্কিত করেছিল। আর তৃতীয় ব্যক্তি সম্পর্কিত করেছিল আল্লাহে দিকে, তাই তাকে উত্তম প্রতিদান দিয়েছিলেন ও তার প্রতি তার নিয়ামতকে স্থায়ী করেছিলেন। উক্ত ব্যক্তিদ্বয়কে শাস্তি প্রদান করেছিলেন। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ যে, অনুগ্রহ করার পর তিনি তার নিয়ামতকে স্থায়ী করেন। আবার ইচ্ছা করলে ফেরত নেন। নিয়ামত স্থায়ী করণের উপায় হচ্ছে যে, বান্দা তার বড়ত্ব বর্ণনা করবে এবং বিশ্বাস করবে যে, সমস্ত অনুগ্রহই আল্লাহর হাতে। পূর্ণাঙ্গ তাওহীদ হচ্ছে যে বান্দা বিশ্বাস করবে যে সে আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী এবং আল্লাহর নিকট থেকে সে কোন কিছুই হকদার নয় বরং আল্লাহই প্রতিপালক এবং সকল প্রকার ইবাদত, কৃতজ্ঞতা ও মহত্বের উপযুক্ত। অতএব তাঁকে স্মরণ করতে হবে ও নেয়ামত সমূহ তাঁরই দিকে সম্পর্কিত করতে হবে।
 
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ
০১। সূরা ফুস্‌সিলাতের ৫০ নং আয়তের তাফসীর
০২। ﴾لَيَقُولَنَّ هَٰذَا لِى﴿ এর অর্থ।
০৩। ﴾إِنَّمَآ أُوتِيتُهُۥ عَلَٰى عِلْمٍ عِندِىۤ﴿ এর অর্থ।
০৪। বর্ণিত এই বিস্ময়কর ঘটনার মধ্যে নিহিত বিরাট উপদেশাবলী।
 
অধ্যায়-৪৯
সন্তানাদি পাওয়ার পর আল্লাহর সাথে অংশীদার করা
আল্লাহ তা’আলার বাণী-
﴿فَلَمَّآ ءَاتَٰهُمَا صَٰلِحًا جَعَلَا لَهُۥ شَرَكَآءَ فِيمَآ ءَاتَٰهُمَا ۚ فَتَعَٰلَى ٱللهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ﴾
অর্থঃ “অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে যখন সুস্থ ও ভাল সন্তান দান করলেন তখন দানকৃত বিষয়ে তাঁর অংশীদার তৈরি করতে লাগল। কিন্তু তারা যাকে অংশী স্থাপন করে আল্লাহ তা অপেক্ষা অনেক উন্নত ও মহান।” [সূরা আ’রাফ-১৯০] –
ইবনে হাযম (রহঃ) বলেন, মুফাস্‌সিরীনগণ এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে, এমন প্রত্যেক নামই হারাম, যা দ্বারা গাইরুল্লাহর ইবাদত করার অর্থ বুঝায়। যেমন-আবদু ওমর, আবদুল কা’বা এবং এ জাতীয় অন্যান্য নাম। তবে ‘আব্দুল মুত্তালিব’ এর ব্যতিক্রম’
ইবনে আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহুমা) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, আদম (আঃ) যখন বিবি হাওয়ার সাথে মিলিত হলেন, তখন হাওয়া গর্ভবতী হলেন। এমতাবস্থায় শয়তান আদম ও হাওয়ার কাছে এসে বললো, ‘আমি তোমাদের সেই ব্ন্ধু ও সাথী, যে তোমাদেরকে জান্নাত থেকে বের করেছে। তোমরা অবশ্যই আমার আমার আনুগত্য করো, নতুবা গর্ভস্থ সন্তানের মাথায় হরিণের শিং গজিয়ে দিবো, তখন সন্তান পেট কেটে বের করতে হবে। আমি অবশ্যই এ কাজ করে ছাড়বো, আমি অবশ্যই এ কাজ করে ছাড়বো। শয়তান এভাবে তাদেরকে ভয় দেখিয়ে বললো, ‘তোমার তোমাদের সন্তানের নাম ‘আবদুল হারিচ’ রেখো। তখন তাঁরা শয়তানের আনুগত্য করতে অস্বীকার করলেন। অতঃপর তাদের একটি মৃত সন্তান ভূমিষ্ট হলো। আবারো বিবি হাওয়া গর্ভবতী হলেন। শয়তানও পুনরায় তাঁদের কাছে এসে পূর্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিলো, তারা উভয়েই শয়তানের আনুগত্য করতে অস্বীকার করলেন। অতপর একটি মৃত সন্তান ভূমিষ্ট হলো। বিবি হাওয়া আবারও গর্ভবতী হলেন শয়তান তাদের কাছে এসে পূর্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিলো, এর ফলে তাঁদের অন্তরে সন্তানের ভালবাসা তীব্র হয়ে দেখা দিল। তখন তাঁরা সন্তানের নাম ‘আবদুল হারিছ’ রাখলেন। এভাবেই তাঁরা আল্লাহর প্রদত্ব নেয়ামতের মধ্যে তাঁর সাথে শরীক করে ফেললেন। এটাই হচ্ছে আয়াতের তাৎপর্য। (ইবনে আবি হাতেম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।)
কাতাদাহ সহীহ সনদে অপর একটি হাদীস বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, তারা আল্লাহর সাথে শরীক করেছিলেন আনুগত্যের ক্ষেত্রে, ইবাদতের ক্ষেত্রে নয়। মুজাহিদ থেকে সহীহ সনদে এ আয়াতের ব্যাখ্যা বর্ণিত আছে, আল্লাহর বাণী-
﴿جَعَلَا لَهُۥ شُرَكَآءَ فِيمَآ ءَاتَٰهُمَاۚ﴾
আয়াতের তাফসীরে তিনি বলেন- ‘সন্তানটি মানুষ না হওয়ার আশংকা তাঁরা (পিতা-মাতা) করেছিলেন।
হাসান, সাঈদ প্রমুখের কাছ থেকে এর অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে।
 
ব্যাখ্যা-
উলামায়ে কিরাম ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, বান্দা শব্দের নামের সম্বোধন আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো দিকে করা হারাম বরং তা সকল নবীর শরীয়াতে হারাম ছিল। কেননা এখানে নিয়ামতের সম্পর্ক গাইরুল্লাহর দিকে হয়ে যায়, তাছাড়াও আল্লাহর সাথে আদবের ও বরখেলাফ। এ ব্যাপারে শুধুমাত্র আব্দুল মুত্তালিব নামটি মাকরূহ কিন্তু হারাম নয়। কিন্তু এটা সঠিক নয় এবং এ নামের বৈধতার সপক্ষে যে যুক্তি পেশ করা হয় তাও যুক্তিযুক্ত নয়। কেননা নবী (সাঃ) এর কথা ‘আমি মিথ্যুক নবী নই আমি আব্দুল মুত্তালিবের সন্তান।’ এটা শুধু তিনি অবস্থার খবর দিয়েছেন বৈধ ও অবৈধের বিধান দান করেন নাই। এতে মাখলুকের জন্য উবূদিয়াতের সম্পর্ক নির্ধারণ করেননি। সহাবায়ে কেরাম যে আব্দুল মুত্তালিবের নামে কারো কারো নাম রেখেছিলেন তা মূলতঃ ভূল বর্ণনা করা হয়েছে বরং তারা নাম রেখেছিলেন মুত্তালিব, আব্দুল মুত্তালিব নয়।
উক্ত ঘটনায় আদম ও হাওয়া (আঃ) এর সন্তান পাওয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অংশীদার সব্যস্ত করার অর্থ হলো, তাঁরা সন্তানের নাম আব্দুল হারেছ রাখলেন। আর হারেছ হচ্ছে ইবলিসের নাম এর পূর্বেও ইবলিস তাদের দু’জনকে (আদম ও হাওয়া আঃ) দু’দুবার ধোকা দিয়েছিলেন। যা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে এবং সালাফে সালেহীনদের নিকটও স্বীকৃত। তারা উভয়ই ইবলিসকে যে শরীক করেছিলেন তা মূলতঃ ইবাদতে নয় বরং অনুকরণে যেটা সগীরা গুনাহ এবং নবীদের দ্বারা সগীরা গুনাহ প্রকাশ পেতে পারে। অতএব এ থেকে এও বুঝা গেল যে, প্রত্যেক পাপী শয়তানের অনুসরণ করে বান্দার দ্বারা যে পাপ হয়ে থাকে তা অনুসরণমূলক শিরকের কারণে হয়ে থাকে। উক্ত ঘটনায় তাঁদের না মর্যাদা ক্ষুন্ন হয় না এর দ্বারা বুঝা যায় যে তাঁরা আল্লাহর সাথে শিরক করেছিলেন। আহলে ইলমদের নিকট একথা বিদীত যে নবীদের দ্বারা ছোট্ট পাপ সংঘটিত হওয়া অসম্ভব নয় তবে নিশ্চয়ই তারা উক্ত পাপে স্থায়ী থাকেন না; বরং তারা তা থেকে যথা শিঘ্রই ফিরে যান ও আল্লাহর নিকট তওবা করেন এবং এ ধরনের পাপের কারণে তাঁদের আল্লাহর সাথে সম্পর্ক পূবের তুলনায় আরো বেশি হয়ে যায়।
 
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ
০১। যেসব নামের মধ্যে গাইরুল্লাহর ইবাদতের অর্থ নিহিত রয়েছে, সে সব নাম রাখা হারাম।
০২। সূরা আ’রাফের ১৯০ নং আয়াতের তাফসীর।
০৩। আলোচিত অধ্যায়ে বর্ণিত শিরক হচ্ছে শুধুমাত্র নাম রাখার জন্য। এর দ্বারা হাকীকত [অর্থাৎ শিরক করা] উদ্দেশ্য ছিল না।
০৪। আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নিখুঁত ও পূর্ণাঙ্গ কন্যা সন্তান লাভ করা একজন মানুষের জন্য নিয়ামতের বিষয়।
০৫। আনুগত্যের মধ্যে ও ইবাদতের মধ্যে শিরকের ব্যাপারে সালফে সালেহীন পার্থক্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
 
অধ্যায়-৫০
আসমাউল হুসনা-এর বর্ণনা
আল্লাহ তা’আলার বাণী-
﴿وَلِلَّهِ ٱلْأَسْمَآءُ ٱلْحُسْنَىٰ فَٱدْعُوهُ بِهَاۖ وَذَرُواْ ٱلَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِىۤ أَسْمَٰئِهِۚۦ﴾
অর্থঃ “আল্লাহর অনেক সুন্দর নাম রয়েছে। এসব নামে তোমরা তাঁকে ডাকো। আর যারা তাঁর নামের মধ্যে বিকৃতি ঘটায় তাদেরকে পরিত্যাগ করো।” [সূরা আ’রাফ-১৮০] –
ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, ‘তারা তারা তাঁর নামগুলো বিকৃত করে’ এর অর্থ হচ্ছে তারা শিরক করে।
ইবনে আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু) আরো বর্ণনা করেন, মুশরিকরা ‘ইলাহ’ থেকে ‘লাত’ আর আযীয থেকে ‘উয্‌যা’ নামকরণ করেছে।
আ‘মাস থেকে বর্ণিত আছে, মুশরিকরা আল্লাহর নামসমূহের মধ্যে এমন কিছু [শিরকি বিষয়] ঢুকিয়েছে যার অস্তিত্ব আদৌ তাতে নেই।
 
ব্যাখ্যা-
আল্লাহ তা’আলা নিজ সত্বার জন্য যা ঘোষণা করেছেন তাই সাব্যস্ত করা, অথবা তাঁর রাসূল তার (আল্লাহর) জন্য যেসব সুন্দর সুন্দর নামের ঘোষণা দিয়েছেন সেগুলো স্বীকার করে নেয়া। সাথে সাথে এসব সুন্দর নামের মধ্যে যে সুমহান অর্থ ও পরিচয় নিহিত আছে তা অনুধাবন করা এবং এসব নামের দ্বারা আল্লাহর ইবাদত করা ও তার কাছে দু’আ করা। উক্ত আয়াতের আরো বর্ণিত হয়েছে যে, মুসলমানদের জন্য অপরিহার্য হলো, আল্লাহ তা’আলার নাম সমূহে ইলাহাদকারীদের থেকে দূরে থাকা।
আল্লাহর তা’আলার নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে বিকৃতি বা নামগুলোকে স্বীয় উদ্দেশ্য থেকে সরিয়ে ভিন্ন অর্থে প্রবাহিত করাকে আল্লাহর নামের ও গুণের ইলহাদ বলা হয়। আল্লাহর নামের ইলহাদ এর বিভিন্ন স্তর রয়েছে যেমন মানুষ আল্লাহর নামে উপাস্যদের নাম রাখে। যেমন- তারা নাম রেখেছিল ইলাহ শব্দ থেকে লাত আযীয শব্দ থেকে উয্‌যা ইত্যাদি। আল্লাহর নামে ইলাহাদের অংশ খ্রিষ্টানদের ন্যায় আল্লাহর জন্য সন্তান সাব্যস্ত করা ও গুণাবলী বা এর কিছু অংশ অস্বীকার করা। যেমন-জাহমিয়ারা করে থাকে, তারা আল্লাহর কোন নাম ও গুণেই বিশ্বাস করে না, শুধু আল্লাহর উপস্থিতি বিশ্বাস করা যা বৈধ নয়। পক্ষান্তরে সালাফে সালেহীন-সুমহান উত্তারসূরীদের আকীদা হলোঃ আল্লাহ তা’আলার সমস্ত নাম ও গুণাবলীর উপর ঈমান রাখতে হবে এবং সেগুলোর অপব্যাখ্যা ও রূপক অর্থ করা জায়েয নয়। যেমন- ম‘তাযিলা, আশায়েরা, মাতুরিদিয়া ও অন্যান্য সম্প্রদায়েরা করে থাকে। এক্ষেত্রে মোটকথা হচ্ছে ইলহাদ কুফুরী এবং তার কিছুটা হচ্ছে বিদ’আত।
 
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ
০১। আল্লাহর নামগুলোর যথা যথ স্বীকৃতি।
০২। আল্লাহর নামসমূহ সুন্দরতম হওয়া।
০৩। সুন্দর ও পবিত্র নামে আল্লহকে ডাকার নির্দেশ।।
০৪। যেসব মূর্খ ও বেঈমান লোকেরা আল্লাহর পবিত্র নামের বিরুদ্ধাচরণ করে তাদেরকে পরিহার করে চলা।
০৫। ইলহাদ তথা নাস্তিকতার ব্যাখ্যা।
০৬। আল্লাহর নামের বিকৃত ঘটানোর বিরুদ্ধে ভীতিপ্রদর্শন।

[Page- 6]
Pages 1 2 3 4 5 6 7 8

Islamic Website