Dawah wa Tablig Islamic Website

Site Contact = Mob no. 01783385346 :: Email Address = shalampb@gmail.com

4

Page- 4


অধ্যায়-২২

এই উম্মতের কিছু লোক মূর্তি পূজা করে
আল্লাহর বাণীঃ

﴿أَلَمْ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ أُوتُوا نَصِيبًا مِّنَ ٱلْكِتَٰبِ يُؤْمِنُونَ بِٱلْجِبْتِ وَٱلطَّٰغُوتِ﴾

অর্থ- “তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যারা কিতাবের কিছু অংশ প্রাপ্ত হয়েছে, যারা মান্য করে প্রতিমা ও শয়তানকে।” [সূরা নিসা-৫১-৫২] আল্লাহর বাণীঃ

﴿قُلْ هَلْ أُنَبِّئُكُمْ بِشَرٍّ مِّنْ ذَٰلِكَ مَثُوبَةً عِنْدَ ٱللهِۚ مَنْ لَّعَنَهُ ٱللهُ وَغَضِبَ عَلَيْهِ وَجَعَلَ مِنْهُمُ ٱلْقِرَدَةَ وَٱلْخَنَازِيرَ وَعَبَدَ ٱلطَّٰغُوتَۚ﴾

অর্থ- ‘বলুন, আমি কি তোমাদেরকে বলব, অধিক মন্দ পরিণামীদের কথা যা আল্লাহর নিকট আছে? যাদের প্রতি আল্লাহ অভিশাপ করেছেন, যাদের প্রতি তিনি ক্রোধান্বিত হয়েছেন, তাদের কতক কে বানর ও শূকরে রূপান্তরিত করে দিয়েছেন এবং যারা শয়তানের আরাধনা করেছে।” [সূরা মায়েদা- ৬০] আল্লাহর বাণীঃ

﴿قَالَ ٱلَّذِينَ غَلَبُوا عَلَىٰۤ أَمْرِهِمْ لَنَتَّخِذَنَّ عَلَيْهِمْ مَّصْجِدًا﴾

অর্থ- “তাদের (সেই সময়ের মানুষদের) কর্তব্য বিষয়ে যাদের মত প্রবল হলো তারা বললঃ তাদের (আসহাবে কাহাফদের) স্থানে মসজিদ নির্মাণ করব।” [সূরা কাহফ- ২১] আবূ সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ

((لَتَتَّبِعُنَّ سُنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، حَذْوَ الْقُذَّةِ بِالْقُذَّةِ، حَتَّى لَوْ دَخَلُوا جُحْرَ ضَبٍّ لَّدَخَلْتُمُوهُ، قَالُوا: يَارَسُولَ اللهِ! اَلْيَهُودَ وَالنَّصَارَٰى؟ قَالَ: فَمَنْ؟)) (صحيح البخارى، أحاديث الأنبياء، باب ما ذكر عن بني إسرائيل، ح:٦٥٤٣ وصحيح مسلم، العلم، باب اتباع سنن اليهود والنصارى، ح:٩٦٦٢)

“তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের আদর্শ পুংখানুপুংখভাবে মেনে চলবে। এমনকি তারা যদি “গুইসাপ” এর গর্তে প্রবেশ করে তাহলে তোমরা তাতেও প্রবেশ করবে। লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! তারা কি ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানরা? তিনি বললেন আর কারা? [বুখারী ও মুসলিম] সাওবান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ

((إِنَّ اللهَ زَوَٰى لِيَ الأَرْضَ فَرَأَيْتُ مَشَارِقَهَا وَمَغَارِبَهَا، وَإِنَّ أُمَّتِي سَيَبْلُغُ مُلْكُهَا مَا زُوِيَ لِي مِنْهَا، وَأُعْطِيتُ الْكَنْزَيْنِ: الأَحْمَرَ وَالأَبْيَضَ، وَإِنِّي سَأَلْتُ رَبِّي لأُمَّتِي أَنْ لَّا يُّهْلِكَهَا بِسَنَةٍ عَامَّةٍ، وَّأَنْ لَّا يُسَلِّطَ عَلَيْهِمْ عَدُوًّا مِّنْ سِوَٰى أَنْفُسِهِمْ، فَيَسْتَبِيحَ بَيْضَتَهُمْ، وَإِنَّ رَبِّي قَالَ: يَا مُحَمَّدُ! إِنِّي إِذَا قَضَيْتُ قَضَاءً فَإِنَّهُ لَا يُرَدُّ، وَإِنِّي أَطَيْتُكَ لأُمَّتِكَ أَنْ لَّا أُهْلِكَهُمْ بِسَنَةٍ عَامَّةٍ، وَّأَنْ لَّا أُسَلِّطَ عَلَيْهِمْ عَدُوًّا مِّنْ سِوَٰى أَنْفُسِهِمْ فَيَسْتَبِيحَ بَيْضَتَهُمْ، وَلَوِ اجْتَمَعَ عَلَيْهِمْ مَّنْ بِأَقْطَارِهَا، حَتَّى يَكُونَ بَعْضُهُمْ يُهْلِكُ بَعْضًا وَّيَسْبِي بَعْضُهُمْ بَعْضًا)) (صحيح مسلم، الفتن، باب هلاك هذه الأمة بعضهم ببعض، ح:٩٨٨٢)

“আল্লাহ আমার জন্য পৃথিবী চক্ষুসীমার যতটুকু আনা হয়েছে ততদূর পর্যন্ত আমার উম্মতের সম্রাজ্য বিস্তৃত হবে। আমি আমার প্রভুর নিকট আমার উম্মতের জন্য দু‘আ করেছি তিনি যেন আমার উম্মতকে গণ দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে ধ্বংস না করেন এবং তাদের নিজেদেরকে ব্যতীত অন্য কোন শত্রুকে তাদের উপর চাপিয়ে না দেন যে তাদের শক্তিকে নিঃশেষ করে ফেলবে। (উত্তরে) আমার প্রভু বলেন, হে মুহাম্মাদ, আমি তোমার উম্মতের জন্য দু‘আ মঞ্জুর করলাম তাদেরকে ব্যপকভাবে দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে ধ্বংস করব না, তাদের ছাড়া তাদের উপর কোন শত্রু বিভিন্ন দেশ থেকে তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়; বরং তারা নিজেরা একে অপরকে ধ্বংস করবে, একে অপরকে বন্দী করবে।” বারকানী তাঁর সহীহ গ্রন্থে এটি বর্ণনা করেছেন। তিনি আরো আক্ষেপ করেছেনঃ

((وَإِنَّمَا أَخَافُ عَلٰى أُمَّتِي الأَئِمَّةَ الْمُضِلِّينَ، وَإذَا وَقَعَ عَلَيْهِمُ السَّيْفُ لَمْ يُرْفَعْ إِلٰى يَوْمِ الْقِيَامَةِ، وَ لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يَلْحَقَ حَيٌّ مِّنْ أُمَّتِى بِالْمُشْرِكِينَ، وَحَتَّى تَعْبُدُ فِئَامٌ مِّنْ أُمّتِي الْأَوْثَانَ، وَإِنَّهُ سَيَكُونُ فِي أُمَّتِي كَذَّابُونَ ثَلَاثُونَ، كُلُّهُمْ يَزْعُمُ أَنَّهُ نَبِىُّ، وَّأَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ، لَا نَبِيَّ بَعْدِي، وَلَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِّنْ أُمَّتِي عَلَى الْحَقِّ مَنْصُورَةً، لَّا يَضُرُّهُمْ مِّنْ خَذَلَهُمْ حَتَّى يَاْتِيَ أَمْرُ اللهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَٰى)) (سنن أبي داود، الفتن والملاحم، باب ذكر الفتن ودلائلها، ح:٢٥٢٤ ومسند أحمد: ٥/٨٧٢، ٤٨٢)

“আমি আমার উম্মাতের জন্য বিভ্রান্তকারী নেতাদের আশংকা করছি।” তাদের উপর তরবারী পড়ে গেলে কিয়ামত পর্যন্ত আর উঠবে না। আমার উম্মতের একজন জীবিত ব্যক্তি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত না হওয়া পর্যন্ত, উম্মতের কিছু লোক মূর্তিপূজা না করা পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না। আমার উম্মতের ত্রিশজন মিথ্যাবাদী আবির্ভুত হবে তাদের প্রত্যেকেই মনে করবে সে একজন নবী অথচ আমি শেষ নবী। আমার পরে আর কোন নবী নেই। আমার উম্মতের একদল লোক সর্বদা হকের উপর থাকবে। বিজয়ীর বেশে থাকবে। লাঞ্ছনা কারীর লাঞ্ছনা এবং বিরোধীতাকারীর বিরোধীতা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না যতক্ষণ না আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ আসে।

ব্যাখ্যাঃ

মূলে আরবীতে (الأوثان) শব্দ এসেছে। মানুষ আল্লাহর সাথে যা কিছুরই ইবাদত করে অথবা তার নিকট ফরিয়াদ করে, অথবা এ বিশ্বাস রাখে যে, সে আল্লাহর হুকুম ছাড়াই উপকার বা ক্ষতি সাধন করতে পারে অথবা তার থেকে গোপনে গোপনে ভয় পায়। যেমন- আল্লাহ কে ভয় করা হয় তাকেই (وثن) বলা হয়। তাই সেটি মূর্তি হোক, মৃত ব্যক্তি হোক, কবর হোক অথবা অন্য কিছু হোক। তাওহীদ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ ও তার অপরিহার্যতা, আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে ভয় পাওয়া, শিরকের অন্তর্ভুক্ত। তাওহীদের প্রকার, মহা শিরক ও ছোট শিরকের প্রকার এবং মাধ্যম ও কারণ সমূহ বর্ণনা করার পর শায়খ মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব (রহঃ) মাথায় এ প্রশ্ন উপস্থিত হয় যে, কোন লোক এমন কথাও বলতে পারে যে, উল্লিখিত বর্ণনাসমূহ সঠিক। কিন্তু এ উম্মতে মুহাম্মাদীয়াকে তো মহা শিরকে পতিত হওয়া থেকে হেফাযত করা হয়েছে। কেননা নবী (সাঃ) বলেনঃ “শয়তান আরব ভু-খন্ডে মুসুল্লি ব্যক্তিরা যে তার ইবাদত করবে এ থেকে নিরাশ হয়ে গেছে অবশ্য সে তাদের পদস্খলনের চেষ্টা করতেই থাকবে।” উক্ত প্রশ্নের উত্তরেঃ হাদীস থেকে দলীল যথাস্থানে হয়নি, শয়তান ঠিকই নিরাশ হয়েছিল কিন্তু আল্লাহ শয়তানকে আরব ভু-খন্ডে যে একেবারে তার ইবাদত হবে না তা থেকে নিরাশ করেননি। দ্বিতীয়তঃ নবী (সাঃ) বলেন, শয়তান ঐ ব্যাপার থেকে নিরাশ হয়ে যে, জাযিরাতুল আরবে নামাযীরা তার ইবাদত করবে। আর নিঃসন্দেহে নামাযী ব্যক্তিরা তো লোকদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধই করে থাকে। আর সবচেয়ে বড় অসৎ কাজ হলো আল্লাহর সাথে শরীক স্থাপন করা। যে সমস্ত মানুষ যথাযথভাবে নামায আদায় করে শয়তান প্রকৃতই তাঁদের থেকে নিরাশ যে, তাঁরা কখনই তার ইবাদত করবে না। অতএব, আমরা বলবঃ এই হাদীসের এ অর্থ নয় যে, এ উম্মতের কেউ শয়তানের ইবাদত করবে না। এ কারণেই নবী (সাঃ) এর ইন্তেকালের কিছু দিন পরেই আরবের এক গোষ্ঠী মুরতাদ হয়ে যায়, আর এতো শয়তানের ইবাদতের ফলেই, কেননা শয়তানের ইবাদতের অর্থ হলো তার অনুসরণ করা। যেমন- আল্লাহ তা‘আলার বাণী ﴿أَلَمْ أَعْهَدْ إِلَيْكُمْ  يَٰبَنِىۤءَادَمَ أَن لَّاتَعْبُدُوا الشَّيْطَٰنَۖ إِنَّهُۥ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ﴾ অর্থ হে আদম সন্তান আমি কি তোমাদের নিকট এ অঙ্গীকার নেইনি যে, তোমরা শয়তানের ইবাদত করবে না। কেননা সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” [সূরা ইয়াসীন- ৬০] উক্ত আয়াতের তাফসীরে বলা হয়েছে, যেমন ভাবে শিরকে পতিত হওয়া ও ঈমান ও ঈমানের দাবী সমূহকে প্রত্যাখ্যান করা শয়তানের ইবাদত অনুরূপ তার আদেশ ও নিষেধের ক্ষেত্রে তার অনুসরণ করাও ইবাদত।

আকিদাহ বিশ্বাসের ক্ষেত্রে যাতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ বিরোধী আবরণ রয়েছে সেটিকেই ‘জীবত’ বলা হয়। সেটি যাদু হতে পারে, জ্যোতিষী হতে পারে এমন নোংরা জিনিস হতে পারে যাতে মানুষের ক্ষতি হয়। শরীয়ত সীমালংঘন করে যারই ইবাদত অনুসরণ ও আনুগত্য করা হয় তাকেই ‘ত্বাগুত’ বলা হয়। শরীয়তের দৃষ্টিতে অনুসরণ ও আনুগত্যের সীমা হলো, যার আনুগত্য করা হবে সে এমন কাজের হুকুম দিবে যার শরীয়ত হুকুম দিয়েছে এবং এমন কাজ থেকে নিষেধ করবে যা থেকে শরীয়ত নিষেধ করেছে। অতএব, শরীয়তের গণ্ডি হতে বের হয়ে যার ইবাদত, অনুসরণ ও আনুগত্য করা হবে সেই তাগুতের অন্তর্ভুক্ত। সামঞ্জস্যতা- আলোচ্য অধ্যায়ের সাথে উক্ত আয়াতের সামঞ্জস্য হলো, ইহুদী ও খ্রিস্টানরা আহলে কিতাব হওয়া সত্বেও মূর্তি ও শয়তানের প্রতি ঈমান আনে এবং নবী (সাঃ)ও বলেছেন যে বিগত উম্মাতদের মধ্যে যা কিছু দেখা দিয়েছিল এ উম্মাতের মধ্যেও তা দেখা দিবে। এ উম্মাতের মধ্যে যাদুর প্রতি ঈমান রাখবে এরূপ লোকও হবে এবং তাদের মধ্যে কেউ আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ইবাদত করবে। ফলকথা হলো তারা তাদের পূর্ববর্তীদের তরীকায় চলবে।

ত্বাগুতের ইবাদত ব্যাপক। এটি কবর পূজা হতে পারে, কবরবাসীকে প্রভূ হিসেবে গণ্য করা, তাদেরকে আল্লাহর নিকট সুপারিশকারী হিসেবে মানা প্রভৃতি হতে পারে। আর উম্মতে মুহাম্মদিয়ার বহু লোক কবর, আস্তানা, গাছ ও পাথরের ইবাদতে নিমজ্জিত হয়ে গেছে।

যেহেতু এটি পূর্ববর্তী উম্মতে সংঘটিত হয়েছে তাই এই উম্মতেও সংঘটিত হবে।

السنن শব্দের অর্থ পথ। অর্থাৎ তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের পথ অনুসরণ করবে। নবী (সাঃ) لَنتبعن শব্দটি প্রয়োগ করে শপথ করতঃ এমন গুরুত্বসহ এ ভবিষ্যতদ্বানী করেন যে, এ উম্মত পূর্বের উম্মতের এমনভাবে অনুসরণ করবে এবং এমনভাবে তাদের সমতায় পৌঁছবে যেমন তীরের একপার দ্বিতীয় পারের সমান সমান হয়ে থাকে উভয়ের মাঝে কোন পার্থক্য থাকে না।

অর্থাৎ, পূর্ববর্তী জাতি মহূহের মধ্যে যে কুফরী ও শিরক দেখা দিয়েছে তা এই জাতির মধ্যেও দেখা দিবে।

বিভ্রান্তকারী নেতা যাদেরকে লোকেরা গ্রহণ করে থাকে, তারা ধর্মীয় নেতা হতে পারে, আবর রাজনৈতিক নেতাও হতে পারে। তারা শিরক ও বিদ‘আতের মাধ্যমে মানুষকে বিভ্রান্ত করবে। আর সেগুলি তারা লোকদেরকে এমন সুন্দর দেখাবে যে তারা সেগুলিকে হক মনে করবে।

মুসলিম দেশ ত্যাগ করে মুশরিকদের ধর্মের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তাদের দেশে চলে যাবে অথবা নিজ ধর্ম ত্যাগ করে মুশরিকদের মতোই শিরকে লিপ্ত হবে। তারাও অনুরূপ শিরক করবে যেরূপ মুশরিকরা করে ও তাদের সাথেই মুরতাদ হয়ে যাবে।

তাদেরকে বিজয়ী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে একটি সমরাস্ত্রের বিজয় নয়। বরং দলীল প্রমাণ ও হকের বিজয়। যদিও কোন কোন যুদ্ধে তারা পরাজিত হয়েছে বা কখনো তাদের রজত্ব বিলুপ্ত হয়েছে, তা সত্বেও তারা স্বীয় দলীল ও প্রমাণে এবং অন্যদের তুলনায় হক ও সঠিকের প্রতি দৃঢ়তায় তারাই হকপন্থী আর অন্যরা বতিল পন্থী।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

০১। সুরায়ে নিসার ৫১ নং আয়াতের ব্যাখ্যা।

০২। সূরায়ে মায়েদাহর ৬০ নং আয়াতের ব্যাখ্যা।

০৩। সূরায়ে কাহফের ২১ নং আয়াতের ব্যাখ্যা।

০৪। জীবত ও তাগুতের প্রতি ঈমান আনার অর্থ। এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে “জীবত” এবং “তাগুত” এর প্রতি ঈমানের অর্থ কি? এটা কি শুধু অন্তরের বিশ্বাসের নাম ? নাকি জীবত ও তাগুতের প্রতি ঘৃণা, ক্ষোভ এবং বাতিল বলে জানা সত্বেও এর পূজারীদের সাথে ঐক্যমত পোষণ করা বুঝায়।

০৫। ইহুদীদের কথা হচ্ছে, ঐ কাফেররা যারা তাদের কুফরী সম্পর্কে অবগত তারা মুমিনদের চেয়ে অধিক সত্য পথের অধিকারী।

০৬। আবূ সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসে (পূর্বের উম্মতের মধ্যে) যে ধারনের লোকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে সে ধরনের বহু সংখ্যক লোক এ উম্মতের মধ্যে অবশ্যই পাওয়া যাবে।

০৭। এই উম্মতে মূর্তিপূজা হবে-এ সম্পর্কে মহানবীর স্পষ্ট বক্তব্য।

০৮। মুখতার ও তার মতো অন্যদের ইসলাম থেকে বহির্ভূত হয়ে যাওয়া। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, “মুখাতারের মত মিথ্যা এবং ভন্ড নবীর আবির্ভাব। মুখতার নামক এ ভন্ড নবী আল্লাহর একত্ববাদ ও মুহাম্মাদ (সাঃ) এর রিসালাতকে স্বীকার করত। সে নিজেকে উম্মতে মুহাম্মদীর অন্তর্ভুক্ত বলেও ঘোষণা করত, সে আরও ঘোষণা দিতো, রাসূল (সাঃ) সত্য, কুরআন সত্য এবং মুহাম্মদ সর্বশেষ নবী হিসেবে কুরআনে স্বীকৃত। এগুলোর স্বীকৃত প্রদান সত্বেও তার মধ্যে উপরোক্ত স্বীকৃতির সুস্পষ্ট বিপরীত ও পরিপন্থী কার্যকলাপ পরিলক্ষিত হয়েছে। এ ভন্ড মূর্খও সাহাবায়ে কিরামের শেষ যুগে আর্বিভূত হয়েছিল এবং বেশ কিছু লোক তার অনুসারীও হয়েছিল।

০৯। এই মর্মে সুসংবাদ প্রদান যে, হক পুরো পুরিভাবে দূর হয়ে যাবে না যেমন- ইতিপূর্বে হয়েছে; বরং একটি দল সত্যের উপর চিরদিনই প্রতিষ্ঠিত থাকবে।

১০। এর সবচেয়ে বড় নিদর্শন হচ্ছে তারা সংখ্যায় অল্প হওয়া সত্বেও হক পন্থীদের কোন ক্ষতি হবে না।

১১। এ অবস্থা কিয়ামত পর্যন্ত চলবে।

১২। মহানবী হাদীসে যে সকল বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন তার সবগুলোই বাস্তবে ঘটেছে। উল্লেখিত হাদীসে নিম্নোক্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বর্ণনা করা হয়-নবী সাঃ খবর দেন যে, আমার জন্য আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিমকে দুমড়ে এক জায়গায় করে দিবেন। অতপর তিনি যেভাবে বলেছিলেন সেভাবেই হয়েছে; কিন্তু উত্তর ও দক্ষিণ ব্যতীত। তাঁর খবর দেয়া যে তাঁকে দুই ভান্ডার দেয়া হয়েছে। তাঁর খবর দেয়া যে, উম্মতের ব্যাপারে তাঁর দুই দোয়া কবুল হয়েছে। এবং তৃতীয় দোয়া থেকে নিষেধ করা হয়েছে। তিনি আরও ভবিষ্যতবাণী করেন যে, যদি তাঁর উম্মতের মধ্যে তরবারী ছুটে তবে কায়ামত পর্যন্ত বন্ধ হবে না। নবী সাঃ বলেছেন- আমার উম্মতের লোকেরা পরস্পর হত্যা ও বন্দিতে লিপ্ত থাকবে। তাঁর বিভ্রান্তকারী শসকের ব্যাপারে আশংকা করা। এ উম্মতে ভন্ড নবীদের আবির্ভাবের খবর দেয়া। তাঁর খবর যে, এক সাহায্য প্রাপ্ত দল কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। নবী (সাঃ) এর ভবিষ্যতবাণী অনুযায়ী তাঁর সমস্ত বাণীই তাঁর অক্ষরে অক্ষরে সাব্যস্ত হয়েছে। নবী (সাঃ) এর উম্মতের প্রতি বিভ্রান্তকারী শাসকদের ব্যাপারে ভীতি সঞ্চার হওয়া।

১৩। আশংকাকে শুধু বিভ্রান্তকারী নেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধকরণ।

১৪। عبادة الأوثان এর পূজার অর্থ সম্পর্কে সতর্কীকরণ।


অধ্যায়-২৩

যাদু
আল্লাহ ত‘আলা ইরশাদ করেনঃ

﴿وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ ٱشْتَرَىٰهُ مَالَهُۥ فِى ٱلْأَخِرَةِمِنْ خَلَٰقٍۚ﴾

অর্থঃ “আর তারা অবশ্যই অবগত আছে যে, যে ব্যক্তি যাদু অবলম্বন করে তার জন্য পরকাল সামান্যতমও কোন অংশ নেই।” [সূরা বাকারা- ১০২] আল্লাহ পাক আরো ইরশাদ করেনঃ

﴿يُؤْمِنُونَ بِٱلْجِبْتِ وَٱلطَّٰغُوتِ﴾

অর্থ- “তারা (কাফির ও মুশরিকরা) জিবত্ ও তাগুতের প্রতি বিশ্বাস করে।” [সূরা নিসা- ৫১] উমর (রাঃ) বলেন-

((اَلْجِبْتُ: السِّحْرُ، وَالطَّاغُوتُ: الشَّيْطَانُ)) (أخرجه الطبري في التفسير، برقم:٤٣٨٥)

“জিবত্ হচ্ছে যাদু আর তাগুত হচ্ছে শয়তান।” জাবির (রাঃ) বলেনঃ

((اَلطَّوَاغِيتُ كُهَّانٌ كَانَ يَنْزِلُ عَلَيْهِمُ الشَّطَانُ، فِي كُلِّ حَيِّ وَّاحِدٌ)) (أخرجه ابن أبي حاتم في التفسير كما فن الدر المنثور٢/٢٢ ورواه البخاري في الصحيح معلقا، فتح الباري : ٨/٧١٣)

“তাগুত বলতে গণকদের বুঝানো হয়েছে। যাদের উপর শয়তান অবতীর্ণ হতো। আর সাধারণত প্রত্যেক গোত্রের জন্য একজন করে শয়তান নির্ধারিত থাকতো।” আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেছেনঃ

((اِجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُبِقَاتِ، قَالُوا: يَارَسُولَ اللهِ! وَمَاهُنَّ؟ قَالَ: الشِّرْكُ بِاللهِ، وَالسِّحْرُ، وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللهُ إِلَّا بِالْحَقِّ، وَأَكْلُ الرِّبَا، وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ، وَالتَّوَلِّي يَوْمَ الزَّحْفِ، وَقَذْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ)) (صحيح البخاري، الوصايا، باب قوله تعالى ﴿إن الذين يأكلون أموال اليتامىٰ ظلما﴾ ح:٦٦٧٢، ٤٦٧٥ وصحيح مسلم، الإيمان، باب الكبائر وَأكبرها، ح:٩٨)

“তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক জিনিস থেকে বেঁচে থাক। সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ ঐ ধ্বংসাত্মক জিনিসগুলো কি? তিনি জবাবে বললেনঃ (১) আল্লাহর সাথে শিরক করা। (২) যাদু করা। (৩) অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা-যা আল্লাহ তা‘আলা হারাম করেছেন। (৪) সুদ খাওয়া। (৫) এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা। (৬) সতী সাধ্বী মুমিন মহিলাকে অপবাদ দেয়া। জুনদুব (রাঃ) থেকে ‘মারফু’ হদীসে বর্ণিত আছে,

((حَدُّ السَّاحِرِ ضَرْبَةٌ بِالسَّرْبَةٌ بِاسَّيْفِ)) (جامع الترمذي، الحدود، باب حد الساحر، ح:٦٤١)

“যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে তলোয়ারের আঘাতে তার গর্দান উড়িয়ে দেয়া (মৃত্যু দণ্ড)।” [তিরমিযী] সহীহ বুখারীতে বাজালা বিন আবাদাহ থেকে বর্ণিত আছে, ওমর (রাঃ) মুসলিম গভর্ণরদের কাছে পাঠানো নির্দেশ নামায় লিখেছেনঃ

((اُقْتُلُوا كُلَّ سَاحِرٍ وَّسَاحِرَةٍ، قَالَ: فَقَتَلْنَا ثَلَاثَ سَوَاحِرَ)) (صحيح البخارى، اجزية والموادعة، باب الجزية والموادعة مع أهل الذمة والحرب، ح:٦٥١٣ وسنن أبي داود، الخراج، باب في أخذ الجزية من المجوس، ح:٣٤٠٣ ومسند احمد:١/٠٩١، ١٩١ واللفظ له)

“তোমরা প্রত্যেক যাদুকর পুরষ ও যাদুকর নারীকে হত্যা করো।” বাজালা বলেন, এ নির্দেশের পর আমরা তিনজন যাদুকরকে হত্যা করেছি। হাফসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত সহীহ হাদীসে আছেঃ

((أَنَّهَا أَمَرَتْ بِقَتْلِ جَارِيَةٍ لَّهَا سَحَرَتْهَا، فَقُتِلَتْ، وَكَذَٰلِكَ صَحَّ عنْ جُنْدُبٍ قَالَ أَحْمَدُ: عَنْ ثَلَاثَةٍ مِّنْ أصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَٰىى الله عليه وسلم)) (الموطاللإمام مالك العقول، باب ما جاء في الغيلة والسحر، ح:٦٤)

“তিনি তাঁর অধীনস্থ একজন ক্রীতদাসীকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যে দাসী তাঁকে যাদু করেছিল। অতঃপর উক্ত নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয়েছে।” একই রকম হাদীস জুনদুব থেকে সহীহভাবে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম আহমাদ (রাহঃ) বলেছেন, নবী (সাঃ) এর তিনজন সাহাবী থেকে একথা সহীহ্‌ভাবে বর্ণিত হয়েছে।

ব্যাখ্যাঃ

যাদু শিরকে আকবার তথা বড় শিরক এর অন্যতম এবং তা তাওহীদের মূলনীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। যাদুর বাস্তবতা হচ্ছে যাদুকে কার্যকর এবং ক্রিয়াশীল করতে হলে শয়তানকে ব্যবহার এবং তার নৈকট্য লাভ করতেই হয়। আর শুধুমাত্র তার নৈকট্য লাভের মাধ্যমেই জিন-শয়তান যাদুকৃত ব্যক্তির শরীরে যাদুর ক্রিয়া শুরু করে। শয়তানের নৈকট্য লাভ ছাড়া কোন যাদুকরের পক্ষেই প্রকৃত যাদুকর হওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং যুক্তিসঙ্গত কারণেই আমরা বলবো যে, যাদু শিরক-এর পর্যায়ভুক্ত। আল্লাহ পাক বলেনঃ “বলুন আমি পরিত্রাণ কামনা করছি গিরা তথা বন্ধনে অধিক ফুক দানকারিনীদের অনিষ্ট হতে।” نفاثات শব্দটি نفّاثة এর বহুবচন এবং نفث/نفّاثة থেকে মুবালাগা তথা অতিমাত্রায় ফূক দান করার অর্থ বহন করে এবং তা দ্বারা নিঃসন্দেহে যাদুকারিনী বুঝান হয়েছে এবং সরাসরি যাদুকারিনী না বলে অতিমাত্রায় ফুক দানকারনী বলা হয়েছে। কেননা তারা অতি মাত্রায় ফুক দান করতো এবং ঝাড়-ফুঁক ও বিভিন্ন রকমের তন্ত্র-মন্ত্র দ্বারা ফুক দিত এবং সে ফুক এর মাধ্যমে জিন সেই গিরা বন্ধনে কাজ করতো যাতে যাদুকৃত ব্যক্তির শরীরের কিছু একটা থাকতো অথবা এমন কিছু থাকতো যার সাথে যাদুকৃত ব্যক্তির সম্পর্ক রয়েছে। এভাবে যাদু ক্রিয়াশীল হয়ে যেত।

আল্লাহ তা‘আলার বাণী, “আর তারা নিশ্চয় অবগত আছে যে, যে ব্যক্তি যাদু ক্রয় (অবলম্বন) করলো” এর অর্থ হচ্ছে যাদুকর ব্যক্তি যাদু ক্রিয়া করলো অর্থাৎ তাওহীদের বিনিময়ে যাদু ক্রয় করল ‌তার অর্থ হলো, তাওহীদ হলো মূল্য এবং যাদু হলো পণ্য। (ماله فى الأخرة من خلق) যাদুকর ব্যক্তির পরকালে কোন অংশ থকবে না, ঠিক একইরূপ অবস্থা মুশরিকদেরও হবে। পরাকালে তাদের ভাগ্যেও কিছুই জুটবে না।

আল্লাহ তা‘আলার বাণী ‘তারা জিবত ও তাগুতে বিশ্বাস করে’। উমর (রাঃ) বলেন, জিবত হচ্ছে যাদু। উল্লেখিত আয়াতে আহলে কিতাবদের দোষারোপ ও র্ভৎসনা করা হয়েছে কেননা তারা যাদুতে বিশ্বাস স্থাপন করেছে। আর এটা ইহুদীদের ক্ষেত্রে অধিক দেখা যায়। এ কথা সুস্পষ্ট বলা যায় যে, যদুবিদ্যা চর্চা ও তা অবলম্বনের কারণে আল্লাহ তাদের র্ভৎসনা করেছেন ও তাদের প্রতি লা’নত বর্ষণ করেছেন এবং তাদের প্রতি ভীষণ ক্রোধ প্রকাশ করেছেন। সুতরাং এ থেকেই প্রতিয়মান হয় যে, সুনিশ্চিত এটা হারাম ও কবীরা গুনাহ। আর যদি তাতে শিরকী কথা থাকে তবে অবশ্যই সেটা শিরক বলেই গণ্য হবে। এভাবেই তার সমস্ত প্রকারের নির্দেশ।
তাগুত হচ্ছে শয়তান আর জিবত ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ হলেও ইহুদী সম্প্রদায়ের নিকট তা যাদুর অর্থেই ব্যবহৃত হয়। তারা যাদু ও শয়তানের উপর বিশ্বাস স্থাপন ও আনুগত্য প্রকাশ করে হক থেকে দূরে সরে গেছে।

জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) এর অভিমত, ‘তাগুত দ্বারা গণককে বুঝানো হয়েছে’। এর আলোচনা সামনে করা হবে।

আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূল করীম (সাঃ) বলেছেনঃ “তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক জিনিস থেকে বেঁচে থাক। সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞাসা করলেন। ইয়া রাসূলুল্লাহ ঐ জিনিসগুলো কি কি? তিনি বললেনঃ আল্লাহর সাথে শিরক করা যাদু করা … ইত্যাদি। উপরোক্ত পাপগুলির সাথে জড়িত ব্যক্তিরা দুনিয়া ও আখিরাতে উভয় ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং নিঃসন্দেহে এগুলি মহাপাপ। সুতরাং যাদু শিরকের অন্তর্ভুক্ত।

যুনদুব (রাঃ) থেকে মারফু সূত্রে বর্ণিত আছে যে, যাদুকরের হদ তথা শাস্তি হচ্ছে তরবারি দ্বারা হত্যা করা (মৃত্যুদণ্ড)। (তিরমিযী) ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন, সঠিক অর্থে হাদীসটি মাওকুফ। শাস্তির ব্যাপারে মূলতঃ যাদুকরগণের মধ্যে কোন পার্থক্য রাখা হয়নি। যে কোন প্রকার যাদু হোক না কেন যাদুকরকে হত্যা করতে হবে এবং বাস্তবতা হচ্ছে যাদুকরদের শাস্তি এবং মুরতাদের শাস্তি একই কেননা যাদুতে শিরক থাকেই। ফলে যে ব্যক্তি শিরক করল সে মুরতাদ হয়ে গেল এবং তার জানমাল বৈধ হয়ে গেল। (হত্যা যোগ্য হয়েগেল।)

বাজালা বিন আব্দুল্লাহ, থেকে সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ওমর (রাঃ) ফরমানজারী করেছিলেন যে, তোমরা প্রত্যেক যাদুকর এবং যাদুকারিনীকে হত্যা কর, তিনি বলেন ফলে আমরা তিনজন যাদুকারিনীকে হত্যা করেছিলাম। এখান থেকে প্রতীয়মান হয় যে, যাদুকর এবং যাদুকারিনীকে হত্যার ব্যাপারে কোন মত পার্থক্য নেই।

হাফছা (রাঃ) থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণিত আছে যে, তিনি তার অধীনস্থ একজন ক্রীতদাসীকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, সে দাসী তাকে যাদু করেছিল। অতঃপর উক্ত দাসীকে হত্যা করা হয়েছিল। একই রকম হাদীস জুনদুব (রাঃ) থেকেও বর্ণিত হয়েছে। সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) যাদুকরকে হত্যার ফতোয়া ও আদেশ প্রদান করেছেন এ মর্মে সেখানে কোন রকম পার্থক্য করেননি এবং ইহাই ওয়াজিব যে, যেন কোন প্রকার পার্থক্য করা না হয়। প্রত্যেক মুসলামনের প্রতি ওয়াজিব যে, তারা সকল প্রকার যাদু থেকে সাবধান থাকবে এবং এ বিধান প্রচারে পরস্পরকে সহযোগিতা করবে ও এ গর্হিত কাজের বিরোধীতা করবে যেমন ইমামগণ বলেছেন যে, যখনই কোনো যাদুকর কোনো নগরীতে প্রবেশ করবে তখনই সেখানে অশান্তি, অত্যাচার সীমালংঘন এবং সন্ত্রাস বিরাজ করবে।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

০১। সূরা বাকারার ১০২ নং আয়াতের তাফসীর।

০২। সূরা নিসার ৫১ নং আয়াতের তাফসীর।

০৩। জিবত এবং তাগুত এর তাফসীর এবং উভয়ের মধ্যে পার্থক্য।

০৪। তাগুত কখনও জ্বিন আবার কখনও মানুষ হতে পারে।

০৫। ধ্বংসাত্মক সাতটি বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানার্জন যেগুলির নিষেধাজ্ঞা এসেছে।

০৬। যাদুকরকে কাফের হিসাবে আখ্যায়িত করা।

০৭। যাদুকরকে তাওবার সুযোগ ছাড়াই হত্যা করতে হবে।

০৮। উমর (রাঃ) এর যুগে যাদুবিদ্যার অস্তিত্বের প্রমাণ এ কথাই ইঙ্গিত করে যে পরবর্তী যুগের অবস্থা কত ভয়াবহ হবে?


অধ্যায়-২৪

যাদুর প্রকারভেদ

ইমাম আহমাদ (রাহেমাহুল্লাহ) বলেন, আমাদেরকে হাদীস বর্ণনা করেছেন মুহাম্মাদ বিন জা’ফর তিনি বলেন, আউফ আমাদেরকে হাইয়ান বিন আ‘লা থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, কাতান বিন কাবিসা তাঁর পিতার নিকট থেকে আমাদেরকে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি নবী (সাঃ) কে বলতে শুনেছেনঃ

((إِنَّ الْعِيَافَةَ وَلطِّرْقَ وَالطِّيَرَةَ مِنَ الْجِبْتِ))

“নিশ্চয়ই ‘ইয়াফা’ তারক এবং তিয়ারাহ হচ্ছে জিবত এর অন্তর্ভুক্ত।” বর্ণনাকারী আউফ বলেন, “ইয়াফা” হচ্ছে পাখি উড়িয়ে ভগ্য গণনা করা। “তারক্” হচ্ছে মাটিতে রেখা টেনে ভাগ্য নির্ণয় করা। হাসান (রহঃ) বলেন, “জিব্‌ত” হচ্ছে শয়তানের মন্ত্র। হাদীসটির সনদ উত্তম। (আবু দাউদ, নাসায়ী) ইবনু হিব্বান তাঁর সহীহতে মারফুভাবে বর্ণনা করেছেন। ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেছেনঃ

((مَنِ اقْتَبَسَ شُعْبَةً مِّنَ النُّجُومِ فَقَدِ اقْتَبَسَ شُعْبَةً مِّنَ السِّحْرِ، زَادَ مَا زَادَ)) (سنن إبي دواد، الكهانة ولتطير، باب في النجوم، ح:٥٠٩٣)

“যে ব্যক্তি জ্যোতির্বিদ্যার কিছু অংশ শিখলো, মূলতঃ সে যাদুবিদ্যারই কিছু অংশ শিখলো। এ জ্যোতির্বিদ্যা যত বাড়বে যাদুবিদ্যাও তত বাড়বে।” আবু দাউদ সহীহ সনদে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আবু হুরাইরা থেকে নাসায়ীতে বর্ণিত হয়েছেঃ

((مَنْ عَقَدَ عُقْدَةً، ثُمَّ نَفَثَ فِيهَا فَقَدْ سَحَرَ، وَمَنْ سَحَرَ فَقَدْ أَشْرَكَ، وَمَنْ تَعَلَّقَ شَيْئًا وُّكِلَ إِلَيْهِ)) (سنن النسائى، تحريم الدم، باب الحكم في السحرة، ح:٤٥٠٤)

“যে ব্যক্তি গিরা লাগায় অতঃপর ততে ফুঁক দেয় সে মূলতঃ যাদু করে। আর যে ব্যক্তি যাদু করে সে মূলতঃ শিরক করে। আর যে ব্যক্তি কোনো জিনিস (তাবিজ কবজ) লটকায় তাকে ঐ জিনিসের দিকেই সোপর্দ করা হয়।” [নাসাঈ] ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে রাসূল (সাঃ) বলেছেন।

((أَلَا هَلْ أُنَبِّئُكُمْ مَا الْعَضْهُ؟ هِيَ النَّمِيمَةُ: الْقَالَةُ بَيْنَ النَّاسِ)) (صحيح مسلم البر والأدب باب تحريم النميمة ح:٦٠٦٢ ومسند أحمد ١/٧٣٤)

“আমি তোমাদেরকে ‘আদ’ কি এ সম্পর্কে সংবাদ দিব না? তা হচ্ছে চোগলখুরী বা কুৎসা রটনা করা অর্থাৎ মানুষের মধ্যে কথা লাগানো বা বদনাম ছড়ানো।” [মুসলিম] ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেছেনঃ

((إِنَّ مِنَ الْبَيَانِ لَسِحْرًا)) (صحيح البخارى، النكاح، باب الخطبة، ح:٦٤١٥، ٧٦٧٥ ومسند أحمد:٦/٢١، ٩٥، ٣٦، ٤٩)

“নিশ্চয় কোন কোন কথা ও আলোচনার মধ্যে যাদু আছে।” [বুকারী ও মুসলিম]

ব্যাখ্যাঃ

যাদু ভাষাগত দিক থেকে একটি ব্যাপক শব্দ। শয়তানের সহযোগিতায় ও তার ইবাদত ও নৈকট্য লাভের মাধ্যমে যাদুকর যা কিছু প্রয়োগ করে তার সবই যাদুর পর্যায়ভুক্ত। অনেক ক্ষেত্রে শরীয়তে কিছু বিষয়কে যাদু হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে যেগুলো মূলতঃ কোনোভাবেই যাদু নয়। এর কতগুলো স্তর আছে এবং স্তরগুলি সম্পর্কে অবগত হওয়া অতীব জরুরী। এ অর্থেই মহামতি গ্রন্থকার (রহঃ) অত্র অধ্যায়ে সবগুলি প্রকার উল্লেখ করেছেন।

নবী (সাঃ) বলেছেন, ‘পাখি উড়িয়ে ও মাটিতে রেখা টেনে ভাগ্য গণনা করা জিব্‌ত এর অন্তর্ভুক্ত।’ পাখি উরিয়ে ভাগ্যের ভালোমন্দ নির্ণয় করা ইয়াফার অন্যতম একটি ব্যাখ্যা এবং মাটিতে রেখা টেনে ভাগ্য নির্ণয় করা মূলতঃ গণকদের কাজ যারা মাটিতে অনেকগুলো রেখা টেনে পর্যায়ক্রমে একটি দুটি করে মিটাতে থাকে এবং বলে যে রেখা বাকি আছে তার দ্বারা এই বুঝা যায় ইত্যাদি। মূলতঃ গণকবিদ্যা যাদুর একটা অংশ।

হাসান (রাঃ) বলেছেন, জিব্‌ত শয়তানের মন্ত্র বা মধুর ইহা যাদুরই অন্তর্ভুক্ত। কেননা শয়তান সেদিকে তার সুর দিয়ে মানুষকে আহ্বান করে।

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি জ্যোতির্বিদ্যার কিছু শিখলো সে মূলতঃ যাদুবিদ্যারই কিছু অংশ শিখলো। এ জ্যোতির্বিদ্যা যতো বাড়বে যাদু বিদ্যাও ততো বাড়বে।’ [আবু দাউদ] এখানে বর্ণনা করা হয়েছে যে জ্যোতির্বিদ্যার জ্ঞান অর্জন যাদুবিদ্যা শিক্ষারই পর্যায়ভুক্ত।

যে ব্যক্তি গিরা লাগায় অতঃপর তাতে ফুঁক দেয় সে মূলঃ যাদু করে। ফুঁক দেওয়ার ব্যাখ্যা হচ্ছে যে সে এমন কিছু পড়ে ফুঁক দেয়, যা দ্বারা সে শয়তানকে ব্যবহার করে ও কথাগুলো প্রয়োগের সময় সে জিন হাজির করে এবং সেই জিন ফুঁকের মাধ্যমে উক্ত গিরাতে কাজ করে। যাদুকরের নিকট গিরা লাগানোর উপকার হচ্ছে যে, যতক্ষণ গিরা বলবৎ থাকবে ততক্ষণ যাদুও ক্রিয়াশীল থাকবে। গিরা কখনও স্পষ্ট পরিলক্ষিত হয় আবার কখনও অতি ছোট ছোট ও সূক্ষ্ম হয়। যে যাদু করলো সে শিরক করল। এটা সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য যে ব্যক্তি কোনো কিছু লটকায় তাকে ঐ জিনিসের দিকেই সোপর্দ করা হয়। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ততা রাখে আল্লাহ্‌ই তার জন্য যথেষ্ট আর যখন বান্দা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সাথে সম্পৃক্ততা সৃষ্টি করে তখন তাকে সে দিকে সোপর্দ করা হয়। অথচ আল্লাহ ছাড়া প্রত্যেকেই আল্লাহর মুখাপেক্ষী তিনিই একমাত্র নিয়ামত ও অনুগ্রহের মালিক। “হে মানব সকল! তোমরা সকলেই আল্লাহর নিকট মুখাপেক্ষী এবং আল্লাহ প্রশংসিত ধনবান।”

ইবনে মাসউদ (রাঃ) বর্ণিত হাদীস, ‘আমি কি তোমাদেরকে “আযাহ” (যাদু) এর সম্পর্কে সংবাদ দিব না? তা হচ্ছে চোগলখুরী বা কুৎসা রচনা করা।’ হাদীসে বর্ণিত ‘আযাহ’ অর্থে ব্যবহৃত শব্দটির বিভিন্ন অর্থের মধ্যে একটি যাদুর অর্থ বহন করে। কুৎসা রটনাকে যাদুর অন্তর্ভুক্ত করার কারণ হচ্ছে যে যাদু যেমন দু’জন বন্ধুর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে অথবা দু’জন পৃথক ব্যক্তিকে একত্রিত করে এবং হৃদয়ে তার প্রভাব অতি সূক্ষ্মভাবে সম্পূর্ণ হয়, ঠিক তেমনি চোগলখুরীর মাধ্যমেও বন্ধুত্বের বিচ্ছেদ ঘটে।

ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই কোন কোন কথা বা আলোচনার মধ্যে যাদু আছে।’ কতকগুলো কথা একেবারে যাদুর মত অর্থাৎ অতি বিশুদ্ধ ও প্রঞ্জল ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করা যা কখনও হৃদয় ছুঁয়ে যায় ও অন্তঃকরণে বিশেষ রেখাপাত করে এমন কি ভাষার জোরে হককে বাতিল এবং বাতিলকে হক বলে মনে হয়।
উলামাদের সঠিক মতানুযায়ী এখানে বাক পটুতার সমালোচনা করা হয়েছে, প্রশংসা নয়। ফলে গ্রন্থকার (রাঃ) হাদীসটি অত্র অধ্যায়ে সন্নিবেশিত করেছেন, যাতে হারাম কাজগুলি বর্ণনা করা হয়েছে।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

০১। পাখি উড়িয়ে, মাটিতে রেখা টেনে ভাগ্য নির্ণয়করণ জিবত্‌ তথা যাদুর পর্যায়ভুক্ত।

০২। ইয়াফা, তারক এবং তিয়ারাহ এর তাফসীর।

০৩। জ্যোতির্বিদ্যা যাদুর অন্তর্ভুক্ত।

০৫। কুৎসা রটনা করাও যাদুর শামিল।

০৬। কিছু কিছু বাগ্মিতাও যাদুর আওতায় পড়ে।


অধ্যায়-২৫

গণক ও ভবিষ্যদ্বক্তাদের বর্ণনা

ইমাম মুসলিম (রাহিমাহুল্লাহ) রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সাল্লাম) এর কোন এক স্ত্রী থেকে তাঁর সহীহ মুসলিমে বর্ণনা করেছেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সাল্লাম) ইরশাদ করেছেনঃ

((مَنْ أتَٰى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ فَصَدَّقَهُ، لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ يَوْمًا)) (صحيح مسلم، السلام، باب تحريم الكهانة وَإتيان الكهان، ح:٠٣٢٢ دون قوله فصدقه، فهو عند أحمد فى المسند: ٤/٨٦، ٥/٠٨٣)

“যে ব্যাক্তি কোন গণক তথা ভবিষ্যদ্বক্তার কাছে আসল অতঃপর তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করল এবং গণকের কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করল তাহলে চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার নামায কবুল হবে না।” [মুসলিম] আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ

((مَنْ أَتَٰى كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَٰى مُحَمَّدٍ صَلى لله عليه وسلم)) (سنن أبي داود، الكهانة والتطير، باب في الكهان، ح:٤٠٩٣)

যে ব্যক্তি কোন গণকের কাছে আসল, অতঃপর গণক যা বললো তা সত্য বলে বিশ্বাস করলো, সে মূলতঃ মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর যা নাযিল করা হয়েছে তাকেই অস্বীকার করলো।” [সহীহ বুখারী ও মুসলিমের শর্ত মোতাবেক হাদীসটি সহীহ।] আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ ও হাতিম এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আবু ইয়া’লা ইবনে মাসউদ থেকে অনুরূপ মাওকুফ হাদীস বর্ণনা করেছেনঃ “যে ব্যক্তি পাখি উড়িয়ে ভাগ্যের ভাল-মন্দ নির্ণয় করলো অথবা তার জন্য পাখি উড়ান হল, আথবা যে ব্যক্তি ভাগ্য গণনা করল অথবা যে ব্যক্তি যাদু করল অথবা যার জন্য যাদু করা হল অথবা যে ব্যক্তি কোন গণকের কাছে আসলো অতঃপর সে (গণক) যা বললো তা বিশ্বাস করল। সে ব্যক্তি মূলতঃ মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর নাযিলকৃত জিনিস (কুরআন) কেই অস্বীকার করল। [হাদীসটি বায্‌যার উত্তম সনদে বর্ণনা করেছেন।] ইমাম তাবারানীও এ হাদীসটি আওসাতে হাসান সনদে বর্ণনা করেছেন। তবে ((ومن أتى)) থেকে হাদীসটির শেষ পর্যন্ত তাবারানী কর্তৃক বর্ণিত ইবনে আব্বাসের হাদীসে উল্লেখ নেই। ইমাম বাগাবী (রহঃ) বলেন, গণক ঐ ব্যক্তিকে বলা হয় যে, ব্যক্তি চুরি যাওয়া জিনিস এবং কোন জিনিস হারিয়ে যাওয়ার স্থান ইত্যাদি বিষয় অবগত আছে বলে দাবী করে। এক বর্ণনায় আছে যে, এ ধরণের লোককেই গণক বলা হয়। মূলতঃ গণক বলা হয় এমন ব্যক্তিকে যে ভবিষ্যতের গায়েবি বিষয় সম্পর্কে সংবাদ দেয়। (অর্থাৎ যে ভবিষ্যতবাণী করে) আবার কারো মতে, যে ব্যক্তি মনের গোপন খবর বলে দেয়ার দাবী করে তাকেই গণক বলা হয়। আবুল আব্বাস ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেছেন, গণক, জ্যোতির্বিদ এবং বালির উপর রেখা টেনে ভগ্য গণনাকারী এবং এ জাতীয় পদ্ধতিতে যারাই গায়েব সম্পর্কে কিছু জানার দাবী করে তাদেরকেই আর্‌রাফ (গণক) বলে। ইবনে আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু) বলেছেন, এক গোত্রের কিছু লোক আরবী লিখে নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টি দেয় এবং তা দ্বারা ভাগ্যের ভাল-মন্দ যাচাই করে। পরকালে তাদের জন্য আল্লাহর কাছে কোন ভাল ফল আছে বলে আমি মনে করি না।

ব্যাখ্যাঃ

গণক বলতে ভবিষ্যদ্বক্তা ও জ্যোতিষীদের বুঝানো হয়েছে, গণক বিদ্যা এমন একটি পেশা যা তাওহীদের সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং গণক মুশরিক বলে বিবেচিত। কেননা সে জিনদের ব্যবহার করে থাকে এবং তাদের উপাসনা করে তাদের নৈকট্য লাভ করে এবং জিন তাদেরকে ভবিষ্যত সম্পর্কে অবহিত করে। জিনের উপাসনা ও তার নৈকট্য লাভ ছাড়া এটা আদৌ সম্ভব নয়। জাহেলিয়াতের যুগে মানুষ গণকদের নেতৃত্বে আস্থা রাখত এবং বিশ্বাস করত যে তারা গায়েব সম্পর্কে যা পৃথিবীতে অথবা মানব সমাজে ঘটবে তারা তা অবগত আছে। যার ফলে আরবরা গণকদের সম্মান করত ও তাদের প্রতি ভীতি থাকত। জ্বীনদের প্রকৃত ব্যপার ছিলঃ জিনেরা গোপনে চুরি করে ফিরিস্তাদের পরস্পর কথোপকথন শুনে ঐ গণক বা জ্যোতিষির নিকট বলে দিত। শ্রবণ চুরি তিন অবস্থায় হত আর তা হচ্ছে- (১) নবুওয়াতের পূর্বে এবং তা ব্যপকভাবে ছিল, (২) নবুওয়াতের পরে জিনদের পক্ষে শ্রবণ চুরি সম্ভব হয়নি যদিও কিছু হয়েছে তা আল্লাহর কিতাব বা কুরআনের ওহী ব্যতিরেকে। (৩) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর মৃত্যুর পর শ্রবণ চুরির ঘটনা পুর্নরাবৃত্তি ঘটলেও তা খুবই সীমিত আকারে, কেননা আসমানে পাহারার কঠোর ব্যবস্থা ও অগ্নি নিক্ষেপের ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাদীসের ভাষ্যকারগণ এ হাদীসের ব্যাখ্যায় লিখেন যে …. শব্দটি সহীহ মুসলিমে নেই বরং মুসনাদে আহমাদে রয়েছে। যেহেতু উভয়ের বর্ণনা একই যার কারণে লিখক (রহঃ) আহলে ইলমের পথ অনুসরণ করতঃ একটির শব্দ অন্যটির দিকে সম্পর্কিত করেছেন। মূলতঃ গণক এবং আররাফ কখনও একই অর্থে ব্যবহৃত হয় এবং বালির উপর রেখা টেনে ভাগ্য গণনাকারী ও জোতির্বিদ গণকের পর্যায়ভুক্ত।

ইমাম মুসলিম (রহঃ) রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কোন এক স্ত্রী থেকে তাঁর সহীহ মুসলিম শরিফে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কোন গণক তথা ভিবষ্যদ্বক্তার কাছে আসল অতঃপর তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করল এবং গণকের কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করল তাহলে চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার সালাত কবুল হবে না অর্থাৎ তার নামায আদায় হয়ে যাবে কিন্তু সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে কেননা গণকের কাছে আগমণ তার চল্লিশ দিনের নামাযের নষ্ট করে দেবে এবং এও বোধগম্য হয় যে গণকের নিকট এসে কিছু জজ্ঞাসা করাই মাহপাপ যদিও তা বিশ্বাস না করে শুধু ভবিষ্যত সম্পর্কে জানার আগ্রহের কারণে হয়ে থাকে।

‘যে ব্যক্তি গণকের কাছে আসলো, অতঃপর গণক যা বললো তা সত্য বলে বিশ্বাস করলো, সে মূলতঃ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর যা নাযিল করা হয়েছে তারই কুফরী করলো। অর্থাৎ যেন কুরআনকেই অস্বীকার করলো। কুরআন এবং হাদীসে বলা হয়েছে গণক, যাদুকর, ভবিষ্যদ্বক্তা এরা পরিত্রাণ পাবে না এবং তারা মিথ্যা বৈ সত্য বলে না এবং সঠিক মতে এখানে কুফরী ছোট কুফুরী অর্থে ব্যহৃত হয়েছে।

ليس منا এর দ্বারা বুঝা যায় যে উক্ত কাজ হারাম, আর কতিপয় ইমাম বলেন যে, তা কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। গণকদের কথা বিশ্বাস করা সম্পর্কে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ সে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর দ্বীনের সাথে কুফরী করল কেননা গণককে বিশ্বাস করার মাধ্যমে শিরকে আকবার তথা বড় শিরকে সহযোগিতা করা হবে। এ তো তার ব্যাপারে হুশিয়ারী যে গণকের নিকট এলো এবং শুধু জিজ্ঞাসা করল আর গণকের ব্যাপারে বর্ণনা ইতিপূর্বে হয়ে গেছে।

ইমাম বাগাবী (রহঃ) এর মতে আর্‌রাফ এবং কাহিনি মূলতঃ একই জিনিসের দুই নাম।

ইমাম আবুল আব্বাস ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) এর মতে গণক জ্যোতির্বিদ এবং বালিতে দাগ কেটে ভাগ্য নির্ণয়কারী সকলকেই আর্‌রাফ বলা হয়েছে।

ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর মতে যে সম্প্রদায় আবজাদ পদ্ধতিতে ভাগ্য নির্ণয় করে ও তারকারাজিতে দৃষ্টিপাত করে তাদের জন্য পরকালে কোন অংশ নেই, তাদেরকেও গণকের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মোট কথা, গণক বিদ্যার প্রকার অসংখ্য কিন্তু সার কথা হচ্ছে যে গণক তার নিকট আগন্তুক ব্যক্তিকে বোকা বানায় যে সে, সঠিক জ্ঞান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, কিন্তু মূলতঃ সে বাস্তবতার বহুদূরে এবং সে যা কিছু দাবি করে তাও জিনের মাধ্যমে, কিন্তু দুর্বল ঈমানের লোকেরা ধারণা করে যে, তাদের নিকটও এক ধরনের জ্ঞান রয়েছে এবং তারা আল্লহর ওলী।

এ অধ্যায় থেকে নিন্মোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

০১। গণনাকারীকে সত্য বলে বিশ্বাস করা এবং কুরআনের প্রতি ঈমান রাখা এ দুটি বিষয়ে একই ব্যক্তির অন্তরে এক সাথে অবস্থান করতে পারে না।

০২। ভাগ্য গণনা করা কুফরী হওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট ঘোষণা।

০৩। যার জন্য গণনা করা হয়, তার উল্লেখ।

০৪। পাখি উড়িয়ে ভাগ্য পরীক্ষাকারীর উল্লেখ।

০৫। যার জন্য যাদু করা হয়, তার উল্লেখ।

০৬। ভাগ্য গণনা করার ব্যাপারে যে ব্যক্তি ‘আবজাদ’ শিক্ষা করেছেন তার উল্লেখ।

০৭। কাহিন, এবং আর্‌রাফ এর মধ্যে পার্থক্যের উল্লেখ।


অধ্যায়-২৬

নুশরাহ্‌ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে রাসূল (সাঃ) কে নুশরাহ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। জবাবে তিনি বলেনঃ

((هِيَ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ))

“এটা হচ্ছে শয়তানের কাজ।” [আহমাদ, আবু দাউদ] ইমাম আবু দাউদ (রহঃ) বলেন, ইমাম আহমাদ (রহঃ)-কে নশরাহ (প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। জবাবে তিনি বলেন, “ইবনে মাসউদ (রাঃ) এর (নুশরাহ) এর সবকিছু অপছন্দ করতেন। সহীহ বুখারীতে কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, আমি ইবনুল মুসাইয়্যিবকে বললাম, “একজন মানুষের অসুখ হয়েছে অথবা তাকে তার স্ত্রীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এমতাবস্থায় তার এ সমস্যার সমাধান করা কিংবা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা (নুশরাহ) এর মধ্যমে চিকিৎসা করা যাবে কি? তিনি বললেন, এতে কোন দোষ নেই। কারণ তারা এর (নুশরাহ) দ্বারা সংশোধন ও কল্যাণ সাধন করতে চায়। যা দ্বারা মানুষের কল্যাণ ও উপকার হয় তা নিষিদ্ধ নয়। হাসান (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একমাত্র যাদুকর ছাড়া অন্য কেউ যাদু নষ্ট করতে পারে না। নুশরাহ হচ্ছে যাদুকৃত ব্যক্তি বা বস্তুর উপর থেকে যাদুর প্রভাব দূর করা। নুশরাহ্ দু’ধরনেরঃ প্রথমটি হচ্ছেঃ যাদুকৃত ব্যক্তি বা বস্তুর উপর হতে যাদুর ক্রিয়া নষ্ট করার জন্য অনুরূপ যাদু দ্বারা চিকিৎসা করা, আর এটাই হচ্ছে শয়তানের কাজ। হাসান বসরী (রহঃ) এর বক্তব্য দ্বারা একথাই বুঝানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নাশের (যাদুর চিকিৎসা) ও মুনতাশার (যাদুকৃত রোগী) উভয়ই শয়তানের পছন্দনীয় কাজের মাধ্যমে শয়তানের নিকটবর্তী হয়। যার ফলে শয়তান যাদুকৃত রোগীর উপর থেকে তার প্রভাব মিটিয়ে দেয়। দ্বিতীয়টি হচ্ছেঃ ঝাড়-ফুঁক, বিভিন্ন ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, ঔষধ প্রয়োগ ও শরীয়ত সম্মত দু’আ ইত্যাদির মাধ্যমে চিকিৎসা করা। এ ধরনের চিকিৎসা বৈধ।

ব্যাখ্যাঃ

নুশরাহ্‌ অর্থ যাদু ক্রিয়া নষ্ট করা বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এটা অবৈধ, আন্‌নুশরাহ মূলতঃ নাশর থেকে নির্গত যার অর্থ সুস্থ্যভাবে রোগী পূর্ণ আরোগ্য লাভ করা। যাদুকৃত ব্যক্তির চিকিৎসা পদ্ধতিকে আন্‌-নুশরাহ বলা হয়। নুশরাহ দু’প্রকারঃ প্রথমটি বৈধ, দ্বিতীয়টি অবৈধ। বৈধ নুশরাহ যখন তা কুরআন, হাদীস ও বর্ণিত দু’আ অথবা ডাক্তারের ঔষধের মাধ্যমে হবে। অবৈধ যা নিষিদ্ধ নুশরাহ প্রথম যাদুকে দ্বিতীয় যাদু দ্বারা নষ্ট করা। কেননা উক্ত যাদুতেও জিনের আশ্রয় গ্রহণ জরুরী এবং যেখানে কুফুরী অথবা শিরকী বাক্য থাকবেই। ফলে বলা হয়েছে যাদুকরই একমাত্র শরীয়ত সম্মত পদ্ধতি ব্যতীত যাদু নষ্ট করে থাকে।

জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সাঃ) কে নুশরাহ বা প্রতিরোধমূলক যাদু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। জবাবে তিনি বলেন, এট হচ্ছে শয়তানের কাজ। আরবে সাধারণত প্রচলিত ছিল যে, ‘শুধু মাত্র যাদুকররাই যাদুর প্রভাব নষ্ট করত।’
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন ইবনে মাসউদ এর সবই অপছন্দ করতেন। এটা যে মুহুর্তে নুশরাহ কুরআন সম্বলিত তাবিজের মাধ্যমে হবে তাও অপছন্দনীয় কিন্তু ঝাড়-ফুঁক দ্বারা তাবিজ ছাড়া যদি নুশরাহ প্রয়োগ করা হয় তবে তাতে অপছন্দ করার কোন কারণ নেই। কেননা নবী (সাঃ) নিজে তা ব্যবহার করেছেন এবং অন্যকে অনুমতি দিয়েছেন।

সহীহ বুখারীতে কাতাদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে আমি ইবনুল মুসাইয়্যিবকে বললাম, ‘একজন মানুষের অসুখ হয়েছে অথবা তার স্ত্রীর কাছে থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এমতাবস্থায় তার এ সমস্যার সমাধান করা কিংবা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা (নুশরাহ্‌) এর মাধ্যমে চিকিৎসা করা যাবে কি? তিনি বললেন, এতে কোন দোষ নেই। কারণ তারা এর (নুশরাহ্‌) সংশোধন ও কল্যাণ সাধন করতে চায়। যা দ্বারা মানুষের কল্যাণ ও উপকার সাধিত হয় তা নিষিদ্ধ নয়। ইবনে মুসাইয়্যেব (রাঃ) এর দ্বারা বুঝাতে চেয়েছন, নুশরাহ্‌ যখন দু’আ, ঝাড় ফুঁক কুরআন দ্বারা হবে তখনই কেবল তা বৈধ হবে; কিন্তু যখন তা যাদুর মাধ্যমে হবে তখন সেটাকে বৈধ বলা নিশ্চয়ই যাবে না। মোটকথা যাদু কিংবা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা যা মূলত যাদু, তাবিজ ও শিরক কালাম তার দ্বারা যখন হবে তখন অবশ্য তা অবৈধ হবে, পক্ষান্তরে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা যদি শরীয়ত সমর্থিত ঝাড়-ফুঁক দ্বারা হয় তখন তা বৈধ হবে।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

০১। নুশরাহ্‌ (প্রতিরোধমূলক যাদু) এর উপর নিষেধাজ্ঞারোপ।

০২। নিষিদ্ধ বস্তু ও অনুমিতপ্রাপ্ত বস্তুর মধ্যে পার্থক্যকরণ, যাতে সন্দেহ মুক্ত হওয়া যায়।


অধ্যায়-২৭

কুলক্ষণসম্পর্কীয় বিবরণ
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেনঃ

﴿أَلَآ إِنَّمَاطَىٰۤئِرُهُمْ عِنْدَ ٱللهِ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَايَعْلَمُونَ﴾

অর্থঃ “মনে রাখ তাদের অলক্ষণও যে আল্লাহরই ইলিমে রয়েছে অথচ তাদের অধিকাংশ লোকই তা বুঝে না। [সূরা আরাফ- ১৩১] আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেনঃ

﴿قَالُوا طَىٰۤئِرُكُمْ مَّعَكُمْ ۖ﴾

অর্থ- “রাসূলগণ বললেন, তোমাদের অকল্যাণ তোমাদের সাথেই রয়েছে।” [সূরা ইয়াসীন- ১৯] আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেছেনঃ

((لَا عَدْوٰى وَلَا طِيَرَةَ وَلَا هَامَةَ وَلَا صَفَرَ)) (صحيح البخاري، الطب، باب لا هامة، ح:٧٥٧٥ وصحيح مسلم، باب لا عدوٰى ولا طيرة ولا هامة ولا صفر، ولانوء ولا غول، ح:٠٢٢٢، ولانوء ولا غول)

“দ্বীন ইসলামে সংক্রামক ব্যাধি, কুলক্ষণ বা দুর্ভাগ্য, পেঁচার ডাক ও সফর মাসের কোন রহস্য নেই।” [বুখারী ও মুসলিম] [মুসলিমের হাদীসে ‘নক্ষত্রের প্রভাবে বৃষ্টিপাত, রাক্ষস বা দৈত্য বলতে কিছুই নেই’ এ কথাটুকু অতিরিক্ত আছে।] বুখারী ও মুসলিমে আনাস (রাঃ) থেকে আরো বর্ণিত আছে, রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেছেনঃ

((لَا عَدْوٰى وَلَا طَيَرَةَ وَيُعْجِبُنِي الْفَأْلُ قَالُوا: وَمَا الْفَأْلُ؟ قَالَ: الْكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ)) (صحيح البخاري، الطب، باب لا عدوٰى، ح:٦٧٧٥ صحيح مسلم، السلام، باب الطيرة والفال ح:٤٢٢٢)

“ইসলামে সংক্রামক ব্যধি আর কুলক্ষণ বলতে কিছুই নেই। তবে ‘ফাল’ আমার কাছে ভালো লাগে। সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘ফাল’ কি জিনিস? জবাবে তিনি বললেনঃ ‘উত্তম কথা’। [যে কথা শিরক মুক্ত] উকবা বিন আমের (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, কুলক্ষণ বা দুর্ভাগ্যের বিষয়টি রাসূল (সাঃ) এর দরবারে উল্লেখ করা হলো। জবাবে তিনি বললেনঃ এগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে ‘ফাল’। কুলক্ষণ কোন মুসলমানকে স্বীয় কর্তব্য পালনে বাঁধাগ্রস্ত করতে পারে না। তোমাদের কেউ যদি আপছন্দনীয় কোন কিছু প্রত্যক্ষ করে তখন সে যেন বলেঃ

((اللَّهُمَّ لَا يَأْتِي بِالْحَسَنَاتِ إِلَّا أَنْتَ، وَلَا يَدْفَعُ السَّيِّئَاتِ إِلَّا أَنْتَ وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِكَ)) (سنن أبي داود، الكهانة والتطير، باب في الطيرة، ح:٩١٩٣)

“হে আল্লাহ তুমি ছাড়া কেউ কল্যাণ দিতে পারে না। তুমি ছাড়া কেউ অকল্যাণ ও দূরাবস্থা দূর করতে পারে না। ক্ষমতা ও শক্তির আধার একমাত্র তুমিই।” [আবু দাউদ] ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে ‘মারফু’ হাদীসে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ

((اَلطِّيَرَةُ شِرْكٌ، اَلطِّيَرَةُ شِرْكٌ، وَمَا مِنَّا إِلَّا …. وَلَٰكِنَّ اللهَ يُذْهِبُهُ بِالتَّوَكُّلِ)) (سنن أبي داود، الكهانة ولطيرة، باب في التطير، ح:٠١٩٣ وجامع الترمذي، السير، باب ما جاء في الطيرة، ح:٣١٦١)

“পাখি উড়িয়ে গণনা করা শিরকী কাজ, পাখি উড়িয়ে লক্ষণ নির্ধারণ করা শিরকী কাজ, এ কাজ আমাদের নয়। আল্লাহ তা‘আলা তাওয়াক্কুলের মাধ্যমে মুসলিমের দুশ্চিন্তা দূর করে দেন।” [আবু দাউদ, তিরমিযী] ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, ‘কুলক্ষণ বা দুর্ভাগ্যের ধারণা যে ব্যক্তিকে তার স্বীয় প্রয়োজন, দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে দূরে রাখলো, সে মূলতঃ শিরক করলো।সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞাসা করলেন, এর কাফ্‌ফারা কি? উত্তরে তিনি বললেন, তোমরা এ দু‘আ পড়বে-

((اَللَّهُمَّ لَا خَيْرَ إِلَّا خَيْرُكَ، وَ لَا طَيْرَ إِلَّا طَيْرُكَ وَ لَا إِلَٰهَ غَيْرُكَ)) (مسند أحمد:٢/٠٢٢)

“হে আল্লাহ তোমার থেকে যে মঙ্গল আসে তা ব্যতীত কোনো মঙ্গল নেই। তোমার থেকে যে অকল্যাণ আসে তা ছাড়া কোন অকল্যাণ নেই। আর তুমি ছাড়া কোন ইলাহ নেই।” [আহমাদ] ফজল বিন আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ

((إِنَّمَا الطِّيَرَةُ مَا أَمْضَاكَ أَوْ رَدَّكَ)) (مسند أحمد:١/٣١٢)

“তিয়ারাহ্‌” অর্থাৎ কুলক্ষণ হচ্ছে এমন জিনিস যা তোমাকে কোনো অন্যায় কাজের দিকে ধাবিত করে অথবা কোন ন্যায় কাজ থেকে তোমাকে বিরত রাখে।” [আহমাদ]

ব্যাখ্যাঃ

কুলক্ষণ ধারণা পোষণ শিরকের অন্তর্ভুক্ত এবং পরিপূর্ণ তাওহীদের পরিপন্থী তবে এটা ছোট শিরক, এটার উদাহরণ এরূপ যেমন পাখি উড়িয়ে ভাগ্যের ভাল-মন্দ নির্ণয় করা, অথবা কোন ঘটনা থেকে কুলক্ষণ নির্ণয় করা।

‘মনে রেখ আল্লাহর কাছেই রয়েছে তাদের কুলক্ষণসমূহের চাবিকাঠি। কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোকই তা বুঝে না। অর্থাৎ তাদের কাছে কল্যাণকর এবং ক্ষতিকর ভাল-মন্দ যা কিছু ঘটে তা সবকিছুই তাকদীরের কারণে। যা আল্লাহর কাছে শিরধার্য। কুলক্ষণের ধারণা নবীদের চিরশত্রু পৌত্তলিকদের অন্যতম গুণাবলী ফলে এটা অবশ্যই নিন্দনীয়। পক্ষান্তরে নবীদের অনুসারীগণ সবকিছুতেই তাদের ভাগ্যের উপর বিশ্বাস করে যেমন আল্লাহ বলেন “নিশ্চয় তাদের কুলক্ষণ সমূহের চাবিকাঠি আল্লাহর কাছে” তাঁরা বলেন, তোমাদের দুর্ভাগ্য তোমাদের সাথেই রয়েছে। সুতরাং কুলক্ষণ ধারণা, রাসূলগণের শত্রুদের ও মুশরিকদের অভ্যাসের অন্তর্ভুক্ত।

‘তিনি বলেন ইসলামে সংক্রামক ব্যাধি ও কুলক্ষণ বলতে কিছুই নেই।’ কোন ব্যাধির সংক্রমিত হবার নিজস্ব ক্ষমতা নেই বরং আল্লাহর ইচ্ছায় কখনও কখনও সংক্রমিত হয়ে থাকে। জাহেলিয়াতের যুগে মানুস ধারণা রাখত যে ব্যাধি নিজে নিজেই সংক্রমিত হয়ে থাকে, ফলে আল্লাহ তা’আলা তাদের সে আকিদাকে বাতিল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। পাখি উড়িয়ে যা কখনও কখনও হৃদয়ে উদয় হয় কিন্তু এটার কোনই প্রভাব পড়ে না।

‘ফাল’ তথা উত্তম আল্লাহর সাথে ভাল ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় তা প্রসংসিত কিন্তু কুলক্ষণ যেহেতু আল্লাহর সাথে খারাপ ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত ফলে কুলক্ষণ অত্যান্ত নিন্দনীয় কাজ।

কুলক্ষণ কথা ও কাজের মাধ্যমে হতে পারে কিন্তু উত্তম ধারণাই কাঙ্ক্ষিত হওয়া উচিত। কেননা লক্ষণ শুভ মনে করা বক্ষকে প্রশস্ত করে সংকীর্ণতাকে দূর করে বান্দা যখন কোন কাজে শুভ লক্ষণ গ্রহণ করে তখন তার অন্তর থেকে শয়তানি প্রভাব দূর হয়ে যায়।
উপরের বর্ণিত দু’আ ‘হে আল্লাহ তুমি ছাড়া কেউ কল্যাণ দিতে পারে না। তুমি ছাড়া কেউ আকল্যাণ ও দূরাবস্থা দূর করতে পারে না। ক্ষমতা ও শক্তির আধার একমাত্র তুমিই।’ যার মাধ্যমে মনে উদয় হওয়া সকল প্রকার কুলক্ষণের অশুভ ধারণা থেকে মুক্তি পাওয়ার ব্যাপারে এটি একটি অত্যন্ত কার্যকর মহান দু’আ।

ইবনে মাসউদ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস পাখি উড়িয়ে ভাগ্য গণনা করা শিরকি কাজ, অর্থাৎ শিরকে আসগার বা ছোট শিরক। সঠিকভাবে আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুল, পাখি উড়িয়ে ভাগ্য গণনা করার কাজগুলির মত শয়তানী চক্রান্ত দূর করে দেয়।

‘কুলক্ষণ ধারণা, যে ব্যক্তিকে তার স্বীয় প্রয়োজন, দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে দূরে রাখলো, সে মূলতঃ শিরক করলো। হাদীসটি পাখি উড়িয়ে ভাগ্য গণনা করা শিরক হওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট প্রমাণ।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

০১। “জেনে রাখ তাদের দুর্ভাগ্য আল্লাহর কাছে নিহিত” [সূরা আরাফের ১৩১ ও সূরা ইয়াসীনের ১৯ নং আয়াত) এবং “তোমাদের দুর্ভাগ্য তোমাদের সাথেই রয়েছে।” এ আয়াত দু’টির ব্যাপারে সতর্কীকরণ।

০২। সংক্রামক রোগের অস্বীকৃতি।

০৩। কুলক্ষণের অস্বীকৃতি।

০৪। পেঁচার ডাকে কোন রহস্য থাকার অস্বীকৃতী।

০৫। কুলক্ষণে ‘সফর’ এর অস্বীকৃতি স্থাপন (অর্থাৎ কুলক্ষুণে ‘সফর মাস’ বলতে কিছু নেই। জাহেলী যুগে সফর মাসকে কুলক্ষুনে মনে করা হতো, ইসলাম এ ধারণাকে বাতিল ঘোষণা করেছে।

০৬। ‘ফাল’ উপরোক্ত নিষিদ্ধ বা অপছন্দনীয় জিনিসের অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং এটা মোস্তাহাব।

০৭। ‘ফাল’ এর ব্যাখ্যা।

০৮। অনিচ্ছায় অন্তরে উদয় হওয়া কুলক্ষণের ধারণা সৃষ্টি হওয়া ক্ষতিকারক নয় বরং তা আল্লাহর উপর ভরসা করাতে দূর হয়ে যায়।

০৯। যার অন্তরে কুলক্ষণের ধারণা উদয় হবে সে কি দোয়া পড়বে তার বর্ণনা।

১০। কুলক্ষণ শিরক হওয়ার ব্যাপারে বর্ণনা।

১১। নিন্দনীয় কুলক্ষণের তাফসীর।


অধ্যায়-২৮

জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কীয় শরীয়তের বিধান

ইমাম বুখারী (রহঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে বলেছেন, কাতাদাহ (রাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা এসব নক্ষত্ররাজিকে তিনটি উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেনঃ (১) আকাশের সৌন্দর্যের জন্য, (২) আঘাতের মাধ্যমে শয়তান বিতাড়নের জন্য এবং (৩) দিক ভুলা পথিকের দিক নির্দেশনা হিসেবে পথের দিশা পাওয়ার জন্য। যে ব্যক্তি এ উদ্দেশ্য ছাড়া এর ভিন্ন ব্যাখ্যা দিবে সে ভুল করবে এবং তার ভাগ্য নষ্ট করবে। আর এমন জটিল কাজ তার ঘাড়ে নিবে যে সম্পর্কে তার কোন জ্ঞান নেই। কাতাদাহ (রাঃ) চাঁদের কক্ষ সংক্রান্ত ভাগ্য গণনা বিদ্যার্জন যেটাকে এস্ট্রলোজি বলা হয় তা অপছন্দ করতেন। আর উ’য়াইন এ বিদ্যাঅর্জনের অনুমতি দেননি। উভয়ের কাছ থেকেই ‘হারব’ (রহঃ) একথা বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমাদ (রহঃ) এবং ইসহাক (রহঃ) [চাঁদের] কক্ষপথ জানার অনুমতি দিয়েছেন। আবু মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেছেনঃ

((ثَلَاثَةٌ لَّا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ: مُدْمِنُ الْخَمْرِ، وَقَاطِعُ الرَّحِمِ، وَمُصَدِّقٌ بِاسِّحْرِ)) (مسند:٤/٩٩٣ وموارد الظمآن إلى زوائد ابن حبان، ح:١٨٣١)

“তিন শ্রণীর লোক জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে নাঃ (১) মাদকাসক্ত ব্যক্তি, (২) আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী এবং (৩) যাদুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী।” [আহমাদ, ইবনু হিব্বান]

ব্যাখ্যাঃ

জ্যোতির্বিদ্যা এর বিধান ও তার প্রকারভেদ সম্পর্কে এ অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। জ্যোতির্বিদ্যা তিন প্রকার। প্রথমটি হচ্ছে ধারণা পোষণ করা যে তারকারাজি নিজেই ক্রিয়াশীল এবং পার্থিবজগতের যাবতীয় ঘটনাবলী নক্ষত্ররাজির ইচ্ছাতেই ঘটে থাকে আর এটা সর্বসম্মতি ক্রমে বড় ধরনের কুফরী এবং ইবরাহীম (আঃ) এর জাতির ন্যায় শিরক। দ্বিতীয়টি হচ্ছে জ্যোতির্বিদ্যাকে ইলমুত্তছীর বলা হয়। আর তা হচ্ছে আকাশের বিভিন্ন অবস্থা যেমন, নক্ষত্রের চলাচল সেগুলির মিলন, বিচ্ছেদ উদয় ও অস্ত থেকে যাবতীয় ঘটনাবলী প্রমাণ গ্রহণ করা। যিনি এ ধরনের কাজ করেন তাকে জ্যোতির্ষী বলা হয়। যা গণকের একটা অংশ। এদের কাছে শয়তান আগমন ঘটে এবং শয়তান তাদেরকে তাদের কথামত খবর প্রদান করে এটা সম্পূর্ণ হারাম এবং কবিরা গুনাহ ও আল্লাহর সাথে প্রকাশ্য কুফুরী। জ্যোতির্বিদ্যার তৃতীয় হচ্ছে ইলমুত্তাসয়ীর সেটা হচ্ছে তারকারাজি ও তার চলাচল সম্পর্কে কেবলা নির্ধারণ, সময় নির্ধারণ এবং কৃষি কার্যের উপযুক্ত সময় নির্ধারণ সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়। ফলে উক্ত প্রকার জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কে জ্ঞানার্জন ও আলোচনায় কোন অসুবিধা নেই জায়েয।

তারকারাজির সৃষ্টির তিনটি রহস্যই সঠিক, কেননা তারকারাজিও আল্লাহর মাখলুক। সুতরাং আল্লাহ আমাদেরকে যা কিছু অবহিত করেছেন তাছাড়া অন্য কোন রহস্য আমাদের জানা নেই।

চন্দ্রের কক্ষপথ সম্পর্কিত জ্ঞানার্জন সঠিক, কেননা আল্লাহ তা’আলা সেটা উল্লেখ করে তাঁর বান্দাদের প্রতি অনুগ্রহের উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন তিনি চন্দ্রকে নূর হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং তার কক্ষপথ নির্দিষ্ট করেছেন যেন তোমরা বছর এবং হিসাব সম্পর্কে অবগত হতে পার।

ইতিপূর্বে বর্ণনা হয়েছে যে, জ্যোতির্বিদ্যা যাদুরই একটি প্রকার। যেমন নবী (সাঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি জ্যোতির্বিদ্যার যতটুকু অংশ শিক্ষা করল সে যেন ঐ পরিমান যাদু শিক্ষা করল।” [আবু দাউদ ও মুসনাদে আহমাদ] মানুষের অজ্ঞাতাসারে স্পষ্টত জ্যোতির্বিদ্যায় যে ক্ষেত্রে মানুষ নিমজ্জিত হচ্ছে তা হলোঃ ব্যাপকভাবে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত ও প্রচারিত রাশিফল বা রাশিচক্র। এটি হলো তাসীরী জ্যোতির্বিদ্যা এবং তা হলো গণকদের কর্মের অন্তর্ভুক্ত। অতএব এটিকে সর্বিকভাবে প্রতিহত করা অপরিহার্য। এ ধরনের পেপার পত্রিকা ঘরে উঠানো, পড়া ও তা সর্ম্পকে অবগত হওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। কেননা যে রাশিফল দেখল সে অবশ্যই যেন ইচ্ছাকৃতভাবে গণকের আশ্রয় গ্রহণ করল! অতএব, যে রাশিফল সম্বলিত প্রত্রিকা গ্রহণ করল ও পড়ল ও তার সেই রাশি সম্পর্কে জানল যাতে সে জন্মগ্রহণ করেছে বা তার উপযুক্ত রাশি নির্ণয় করল ও সে সম্পর্কে পড়ল তবে সে যেন গণকের নিকটই এসে সেগুলি সম্পর্কে জানল যা শরীয়তে নিষিদ্ধ। অতএব, রাশিফলে সে যা পড়ে জানল তা যদি সত্য মনে করে তবে অবশ্যই মুহাম্মদ (সাঃ) এর উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তার সাথে কুফরী করল। সুতরাং রাশিফল প্রয়োগকারীরা হলো, গণকদেরই অন্তর্ভুক্ত ও তাওহীদের পরিপন্থী।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

০১। নক্ষত্র সৃষ্টির রহস্য।

০২। নক্ষত্র সৃষ্টির রহস্য ভিন্ন উদ্দেশ্য বর্ণনাকারীর সমুচিত জবাব প্রদান।

০৩। কক্ষ সংক্রান্ত বিদ্যার্জনের ব্যাপারে মতভেদের সুরাহা (চন্দ্র এবং অন্যান্য নক্ষত্রের গমানাগন যা মানুষের দিক নির্ণয় সময়, মাস, বৎসর, দিন গণনার জ্ঞান অর্জন নিষেধ নেই বরং ভাগ্য গণনা এবং অন্যান্য ভবিষ্যত বাণী করা নিষেধ করা হয়েছে।)

০৪। যাদু বাতিল জানা সত্বেও যে ব্যক্তি যাদুর অন্তর্ভুক্ত সামান্য জিনিসকেও বিশ্বাস করবে, তার প্রতি হুঁশিয়ারী।


অধ্যায়-২৯

নক্ষত্রের উসীলায় বৃষ্টি কামনা করা
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেনঃ

﴿وَتَجْعَلُونَ رِزْقَكمْ أَنَّكُمْ تُكَذِّبُونَ﴾

অর্থঃ “তোমরা (নক্ষত্রের মাঝে) তোমাদের রিযিক নিহিত আছে মনে কর নিশ্চয়ই (আল্লাহর নিয়ামতকে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করছো।” [সূরা ওয়াকেয়াহ্‌- ৮২] আবু মালেক আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেছেনঃ

((أَرْبَعٌ فِي أُمَّتِي مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ لَا يَتْرُكُونَهُنَّ: اَلْفَخْرُ بِالأَحْسَابِ، وَالطَّعْنُ فِي الأَنْسَابِ، وَالاِسْتِسْقَاءُ بِالنُّجُومِ، وَالنِّيَاحَةُ، وَقَالَ: اَلنَّائِحَةُ إِذَا لَمْ تَتُبْ قَبْلَ مَوْتِهَا تُقَامُ يَوْمَ القِيَامَةِ وَعَلَيْهَا سِرْبَالٌ مِّنْ قَطِرَانٍ، وَّدِرْعٌ مِّنْ جَرَبٍ)) (صحيح مسلم، الجنائز، باب التثديد في النياحة، ح:٤٣٩ ومسند احمد:٥/٢٤٣، ٤٤٣)

“জাহেলী যুগের চারটি কুস্বভাব আমার উম্মতের মধ্যে বিদ্যমান থাকবে। যা তারা পুরোপুরি পরিত্যাগ করতে পারবে না। (১) আভিজাত্যের অহংকার করা। (২) বংশের বদনাম গাওয়া। (৩) নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি কামনা করা এবং (৪) মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করা। তিনি আরো বলেন, ‘মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ কারিনী তার মৃত্যুর পূর্বে যদি তাওবা না করে, তবে কিয়ামতের দিন তেল চিট-চিটে জামা আর মরিচা ধরা বর্ম পরিধান করে উঠান হবে।” [মুসলিম] ইমাম বুখারী ও মুসলিম যায়েদ বিন খালেদ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেনঃ

((صَلَّى لَنَا رَسُولُ اللهِ صَلى الله علية وسلم صَلَاةَ الصُبْحِ بِالْحُدَيْبِيَةِ عَلَٰى إِثْرِ سَمَاءٍ كَانَتْ مِنَ اللَّيْل، فَلَمَّا انْصَرَفَ أَقْبَلَ عَلَى النَّاس فَقَالَ: هَلْ تَدْرُونَ مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ؟ قَالُوا: اَللهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: قَالَ: أَصْبَحَ مِنْ عِبَادِي مُؤُمِنٌ بِي وَكَافِرٌ، فَأَمَّا مَنْ قَالَ: مُطِرْنَا بِفَضْلِ اللهِ وَرَحْمَتِهِ فَذَٰلِكَ مُؤْمِنٌ بِي كَافِرٌ بِالْكَوْكَبِ، وَأَمَّا مَنْ قَالَ: مُطِرْنَا بِنَوْءِ كَذَا وَكَذَا، فَذَٰلِكَ كَافِرٌ بِي مُؤْمِنٌ بِالْكَوْكَبِ)) (صحيح البخاري، الاستسقاء، باب قوله تعالى ﴿وتجعلون رزقكم أنكم تكذبون﴾ ح:٨٣٠١ وصحيح مسلم، الإيمان، باب بيان كفر من قال مطرنا بالنوء، ح:١٧)

“রাসূল (সাঃ) হুদাইবিয়াতে আমাদেরকে নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করলেন, সে রাতে আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন ছিল। সালাতের পর রাসূল (সাঃ) লোকদের দিকে ফিরে বলতে লাগলেন, “তোমাদের কি জানা আছে তোমাদের প্রভু কি বলেছেন? লোকেরা বলল, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন।’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহ পাক বলেছেন, আমার বান্দাদের মধ্যে কেউ আমার প্রতি ঈমাদার হিসাবে আবার কেউ কাফের হিসেবে রাত্রি অতিবাহিত করেছে। যে ব্যক্তি বলেছে, আল্লাহর ফজলে ও রহমতে বৃষ্টি হয়েছে, সে আমার প্রতি ঈমান এনেছে আর নক্ষত্রকে অস্বীকার করেছে।’ পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি বলেছে, ‘অমুক অমুক নক্ষত্রের ‘উসীলায়’ বৃষ্টিপাত হয়েছে, সে আমাকে অস্বীকার করেছে আর নক্ষত্রের প্রতি ঈমান এনেছে।” ইমাম বুখারী ও মুসলিম ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এ অর্থেই হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাতে এ কথাও আছে যে, কেউ কেউ বলেছেন, ‘অমুক অমুক নক্ষত্র সত্য প্রমাণিত হয়েছে।’ তখন আল্লাহ তা‘আলা আয়াত নাযিল করেনঃ

﴿فَلَآ أُقْسِمُ بِمَوَٰقِعِ ٱلنُّجُومِۙ ۞ وَإِنَّهُۥ لَقَسَمٌ لَّوْ تَعْلَمُونَ عَظِيمٌ ۙ ۞ إِنَّهُۥ لَقُرْءَانٌ كَرِيمٌ ۞ فِي كِتَٰبٍ مَّكْنُونٍ ۞ لَّا يَمَسُّهُۥ إلَّا ٱلْمُطَهَّرُونَ ۞ تَنْزِيلٌ مِّن رَّبِّ ٱلْعَٰلَمِينَ ۞ أَفَبِهَٰذَا ٱلْحَدِيثِ أَنْتُمْ مُّدْهِنُونَ ۞ وَتَجْعَلُونَ رِزْقَكُمْ أَنَّكُمْ تُكَذِّبُونَ﴾

অর্থঃ “আমি শপথ করছি নক্ষত্র রাজির অস্তাচলের, অবশ্যই এটা এক মহা শপথ, যদি তোমরা জানতে, নিশ্চয়ই এটা সম্মানিত কুরআন, যা আছে সুরক্ষিত কিতাবে, যারা পুত-পবিত্র তারা ব্যতীত অন্য কেউ তা স্পর্শ করে না। এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতারিত। তবুও কি তোমরা এই বাণীকে তুচ্ছ গণ্য করবে? এবং তোমরা মিথ্যারোপকেই তোমাদের উপজীব্য করে নিয়েছো।” [সূরা ওয়াকিয়াহ- ৭৫-৮৬]

ব্যাখ্যাঃ

অর্থাৎ বৃষ্টি বর্ষণের কারণ হিসেবে নক্ষত্রের উল্লেখ করা এটা সম্পূর্ণ তাওহীদ পরিপন্থী। সমস্ত নিয়ামত একমাত্র আল্লাহর দিকে সম্বোধন করাতেই তাওহীদ পূর্ণতা লাভ করে এবং যেন নিয়ামতের কোন অংশই আল্লাহ ছাড়া অন্য দিকে সম্বোধন না করা হয়। যদিও সেখানে কেউ উক্ত নিয়ামতের কারণ বা মাধ্যমেও হয়। এর ফলে দুইভাবে সীমালঙ্ঘন ঘটে থাকেঃ (১) নক্ষত্র বৃষ্টি বর্ষনের কারণ নয়। (২) বৃষ্টি বর্ষনের জন্য কারণ সাব্যস্ত করা যাকে আল্লাহ তা‘আলা কারণ সাব্যস্ত করেননি। অথচ নিয়ামত, অনুগ্রহ ও বৃষ্টি বর্ষনের সম্পর্ক নক্ষত্রের দিকে করা।

‘তোমরা (নক্ষত্রের মধ্যে তোমাদের) রিযিক নিহিত আছে মনে করে আল্লাহর নিয়ামতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছো।’ তাফসীর বিশারদগণ বলেছেন যে আল্লাহর ব্যাপারে অত্র নিয়ামতকে অন্যের দিকে সম্বোধন করার ব্যাপারে অত্র আয়াতে সাবধান করে দেয়া হয়েছে।

‘জাহেলী যুগের কুস্বভাগুলি অত্যান্ত নিন্দনীয়। সহীহ বুখারীতে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে নবী (সাঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর নিকট সবচেয়ে ক্রোধের ব্যক্তি তিন প্রকারের লোক তন্মধ্যে একজন ঐ ব্যক্তি যে ইসলামে জাহেলী যুগের প্রথা অন্বেষণ করে।” অভিজাত্যের অহংকার করাঃ অর্থাৎ স্বীয় বংশের গর্ব ও বড়ত্ব প্রকাশ করা। বংশের বদনাম করাঃ অর্থাৎ তাচ্ছিল্লসহ এ ধরনের কথা যে অমুক তো ঐ বংশের অথবা দলীল বিহীন ও বিনা প্রয়োজনেই কারো বংশ অস্বীকার করা ও তাকে অন্যায় ভাবা। নক্ষত্রের সাহায্যে বৃষ্টি কামনা করাঃ অর্থাৎ বিশ্বাস করা যে নক্ষত্রের কারণে বৃষ্টি হয়, বা এর চেয়েও যা ভয়াবহ তা হলো নক্ষত্রের নিকট বৃষ্টি কামনা করা। মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করাঃ মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপকারিনী যদি তওবা ছাড়া মৃত্যুবরণ করে তবে কিয়ামতের দিন তাকে আগুনের জামা পরানো হবে। মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করা কবীরা গুনাহ। বিপদের সময় চিৎকার করে কান্নাকাটি করা এবং বুকের কাপড় ছিড়ে ফেলা ইত্যাদি করা, যা সম্পূর্ণ ধৈর্য্যের পরিপন্থী এবং জাহেলী যুগের প্রথার অনুরূপ।

‘লোকেরা বললো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন।’ এ কথা শুনামাত্র রাসূল (সাঃ) এর জিবদ্দশাতেই বলা হতো; কিন্তু রাসূল (সাঃ) এর মৃত্যুর পর যদি কাউকে এমন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় যা তার জানা নেই তবে সে যেন বলে আল্লাহই ভাল জানেন।

‘সে আমার প্রতি ঈমান এনেছে আর নক্ষত্রকে আস্বীকার করেছে। কেননা সে নিয়ামতকে একমাত্র আল্লাহর দিকে সম্বোধন করেছে যা তার ঈমানের প্রমাণ করে।’

‘যে ব্যক্তি বলেছে, অমুক অমুক নক্ষত্রের ‘উসীলায়’ বৃষ্টিপাত হয়েছে, সে আমাকে অস্বীকার করেছে আর নক্ষত্রের প্রতি ঈমান এনেছে।’ নক্ষত্রকে যদি বৃষ্টির কারণ হিসেবে মনে করে তবে সেটা ছোট কুফরী হবে। কিন্তু যদি মনে করে যে নক্ষত্রই বৃষ্টিবর্ষণ করেছে এবং মানুষের প্রতি রহমত বর্ষণ করেছে তখন সেটা ভয়াবহ কুফরী হবে।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

০১। সূরা ওয়াকেয়ার উল্লেখিত আয়াতের তাফসীর।

০২। জাহেলী যুগের চারটি স্বভাবের উল্লেখ।

০৩। উল্লেখিত স্বভাবগুলোর কোন কোনটির কুফরী হওয়ার উল্লেখ।

০৪। এমন কিছু কুফরী আছে যা মুসলিম মিল্লাত থেকে একেবারে বের করে দিবে না আবার এমন কতক কুফুরী আছে যা মুসলিম মিল্লাত থেকে বের করে দেয়।

০৫। ‘বান্দাদের মধ্যে কেউ আমার প্রতি বিশ্বাসী আবার কেউ অবিশ্বাসী হয়েছে এ বাণীর উপলক্ষ হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামত [বৃষ্টি] নাযিল হওয়া।

০৬। এ ব্যাপারে ঈমানের জন্য মেধা ও বিচক্ষণতার প্রয়োজন।

০৭। এ ক্ষেত্রে কুফরী থেকে বাঁচার জন্য বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার প্রয়োজন।

০৮। অমুক অমুক নক্ষত্রের প্রভাব সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে (এই কুফুরী কথার) মর্মার্থ বুঝতে হলে জ্ঞান-বুদ্ধি প্রয়োজন।

০৯। তোমরা জানো কি? কোনো বিষয় শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষক ছাত্রকে এরূপ প্রশ্ন করতে পারেন।

১০। মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপকারিনীর প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ।


অধ্যায়-৩০

আল্লাহ তা‘আলার ভালোবাসা দ্বীনের স্তম্ভ
আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

﴿وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ ٱللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ ٱللَّهِ ۖ﴾

অর্থঃ “আর কোন লোক এমন রয়েছে যারা অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালবাসা পোষণ করে যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে।” [সূরা বাকারাহ- ১৬৫] আল্লাহ তা‘আলা আরও ইরশাদ করেনঃ

﴿قُلْ إِنْ كَانَ ءَابَآؤُكُمْ وَأَبْنَآؤُكُمْ وَإِخْوَٰنُكُمْ وَأَزْوَٰجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَٰلٌ ٱقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَٰرَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَٰكِنُ تَرْضُوْنَهَآ أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِّنَ ٱللهِ وَرَسُولِهِۦ وَجِهَادٍ فِى سَبِيلِهِۦ فَتَرَبَّصُواْ حَتَّىٰ يَأتِىَ ٱللَّهُ بِأَمْرِهِۦۗ﴾

অর্থঃ “বল তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং বাসস্থান যাকে তোমরা পছন্দ কর, আল্লাহ তাঁর রাসুল ও তার রাহে জিহাদ করা থেকে বেশি প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত।” [সূরা তাওবা- ২৪] আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ

((لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَّلَدِهِ وَوَالِدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِيْنَ)) (صحيح البخاري، الإيمان، باب حب الرسول من الإيمان، ح:٥١ وصحيح مسلم، الإيمان، باب وجوب محبة الرسول أكثر من الأهل والولد والوالد والناس أجمعين، ح:٤٤)

“তোমাদের মধ্যে ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার সন্তান-সন্ততি, পিতা-মাতা এবং সমস্ত মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।” [বুখারী ও মুসলিম] আনাস (রাঃ) থেকে আরো বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসুল (সাঃ) ইরশাদ করেছেনঃ

((ثَلَاثٌ مَّنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ بِهِنَّ حَلَاوَةَ الإيمَانِ، أَنْ يَّكُونَ اللهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا، وَأَنْ يُّحِبَّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا للهِ، وَأَنَ يَّكْرَهَ أَنْ يُّعُودَ فِي الْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنْقَذَهُ اللهُ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُّقْذَفَ فِي النَّارِ)) (صحيح البخاري، باب حلاوة الإيمان، ح:٦١،١٢، ١٤٩٦ وصحيح مسلم، الإيمان، باب بيان خصال من اتصف بهن وجد حلاوة الإيمان، ح:٣٤)

অর্থঃ “যার মধ্যে তিনটি জিনিস বিদ্যমান আছে সে ব্যক্তি এগুলো দ্বারা ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পেরেছে। (১) তার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সর্বাধিক প্রিয় হওয়া (২) একমাত্র আল্লাহ পাকের (সন্তুষ্টি লাভের) জন্য কোনো ব্যক্তিকে ভালবাসা। (৩) আল্লাহ পাক তাকে কুফরী থেকে উদ্ধার করার পর পুনরায় কুফরীর দিকে প্রত্যাবর্তন করা তার কাছে জাহান্নমের আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতই অপছন্দনীয় হওয়া।” অন্য বর্ণনায় আছেঃ

((لَا تَجِدُ أَحَدٌ حَلَاوَةَ الإيمَانِ حَتَّى …)) (صحيح البخاري، الأدب، باب الحب في الله، ح:١٤٠٦)

“কেউ ঈমানের স্বাদ পাবে না যতক্ষণ না…….।” (হাদীসের শেষ পর্যন্ত)। ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ

((مَنْ أَحَبَّ فِي اللهِ، وَأَبْغَضَ فِي اللهِ، وَوَالَٰى فِي اللهِ، وَعَادَٰى فِي اللهِ، فَأَنَّمَا تُنَالُ وَلاَيَةُ اللهِ بِذَٰلِكَ وَلَنْ يَّجِدَ عَبْدٌ طَعْمَ الإِيمَانِ وَإِنْ كَثُرَتْ صَلَاتُهُ وَصَوْمُهُ حَتَّى يَكُونَ كَذَٰلِكَ لَا يُجْدِي عَلَٰى أَمْرِ الدُّنْيَا، وَذَٰلِكَ لَا يُجْدِي علَٰى أَهْلِهِ شَيْئًا)) (رواه ابن المبارك في كتاب الزهد، ح:٣٥٣ وابن أبي شيبة في المصف بالشطر الأول فقط، ح:٩٥٧٤٣ وأخرجه الطبراني أيضا موقوفا على ابن عمر في المعجم الكبير:٢١/٧٣٥٣١)

“যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসে, আল্লাহর উদ্দেশ্যেই ঘৃণা করে, আল্লাহর উদ্দেশ্যেই বন্ধুত্ব স্থাপন করে, আল্লাহর জন্যই শত্রুতা পোষণ করে; সে ব্যক্তি এ বৈশিষ্ট্যের দ্বারা নিশ্চয়ই আল্লাহর বন্ধুত্ব লাভ করবে। আর এ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়া ব্যতীত সালাত, সিয়াম পরিমাণ যত বেশিই হোক না কেন, কোনো বান্দাহই ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পারবে না।” সাধারণতঃ মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে পার্থিব স্বার্থে। এ জাতীয় ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের দ্বারা কোনো উপকার সাধিত হয় না। (ইবনে জারীর) ইবনে আব্বাস (রাঃ) আল্লাহর এ বাণীটি বলেনঃ

﴿وَتَقَطَّعَتْ بِهِمُ ٱلْأَسْبَابُ﴾

অর্থঃ “তাদের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।” [সূরা বাকারাঃ ১৬৬] এ সম্পর্ক হচ্ছে বন্ধুত্ব ও ভালবসার সম্পর্ক।

ব্যাখ্যাঃ

এখানে গ্রন্থকার (রহঃ) আন্তরিক ইবাদত সম্পর্কে আলোচনা করতে চাচ্ছেন এবং এককভাবে আল্লাহর জন্য অন্তর্গত ইবাদত করার পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন এটা তাওহীদের অতীব জরুরী একটা বিষয় ও তাওহীদের পরিপূর্ণতা দানকারী। বান্দার নিকট আল্লাহই যেন সব কিছুর চেয়ে প্রিয় হয় এমন কি নিজের অন্তরের চেয়ে। এখানে মুহাব্বাত বলতে ইবাদতের মুহাব্বত বুঝান হয়েছে। অর্থাৎ, মানুষ তার প্রিয়তম আল্লাহর সাথে এমন গভীর সম্পর্ক রাখবে এবং তাঁর সাথে এমন মুহাব্বত হবে যে সে আনন্দচিত্তে তার সমস্ত হুকুমকে পালন করবে এবং তাঁর নিষিদ্ধ কাজ থেকে বেঁচে থাকবে। যখনই তা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সাথে করা হবে তখন তা শিরকে আকবার অর্থাৎ বড় শিরকে রূপান্তরিত হবে। এই মুহাব্বতই দ্বীনের স্তম্ভ এবং অন্তরের সঠিকতার ভিত্তি।

‘হে রাসূল আপনি বলে দিন যদি তোমাদের মাত-পিতা, সন্তান-সন্ততি, ভাই-বোন…।’ এখানে আল্লাহ তা‘আলা ধমক দিয়েছেন এবং এখানে এ কথা প্রমাণিত যে আল্লাহর মুহাব্বাতের উপর অন্য কারও মুহাব্বতকে প্রাধান্য দেয়া কবিরা হুনাহ ও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সুতরাং তাওহীদকে পূর্ণতা দিতে হলে প্রত্যেক প্রিয়তমের চেয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বেশি ভালবাসা দিতে হবে এবং নবী (সাঃ) এর প্রতি মুহাব্বত আল্লাহর পথে মুহাব্বাত, আল্লাহ আমাদেরকে রাসূল (সাঃ) কে ভালবাসার নির্দেশ দিয়েছেন।

অর্থাৎ, আমার প্রিয় বিষয়গুলিকে অন্যের প্রিয় বিষয়বস্তুর চেয়ে এরূপ অগ্রাধিকার দিতে হবে যে, তার অন্তরে আমার মুহাব্বত তার সন্তান, পিতা-মাতা এবং সমস্ত লোকের মুহাব্বত থেকে বেশি হয়। অবশ্য এ মুহাব্বত প্রকাশ পাবে কর্মের মাধ্যমে। অতএব, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ইবাদতের ভালবাসা বেশি থাকে তবে সে আকাঙ্খা ও ভয়-ভীতির সাথে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য চেষ্টা চালাবে এবং তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচার যথা সম্ভব চেষ্টা করবে। অনুরূপ যে ব্যক্তি নবী (সাঃ) এর সাথে প্রকৃত মহাব্বত রাখে সেও প্রকৃত পক্ষে উক্ত নীতি অবলম্বন করবে।

ঈমানেরও এক মধুর স্বাদ রয়েছে যা আত্মা দিয়ে অনুভব করা যায়।

ভালবাসার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর ওয়ালীতে পরিণত হয়। (ওয়ালী) বেলায়াত এর অর্থ হলো, মুহাব্বত ও সাহায্য।

‘তাদের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।’ কেননা মুশরিকগণ তাদের উপাস্যদের সাথে শিরক করত ও তাদেরকে ভালবাসত এবং ধারণা করতে যে এরা তাদের জন্য কিয়ামতের দিন সুপারিশ করবে; কিন্তু তাদের সকল ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত হবে।

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়ঃ

০১। সূরা বাকারার ১৬৫ নং আয়াতের তাফসীর।

০২। সূরা তাওবার ২৪ নং আয়াতের তাফসীর

০৩। রাসূল (সাঃ) এর প্রতি ভালবাসাকে জীবন, পরিবার ও ধন-সম্পদের উপর অগ্রাধিকার দেয়া ওয়াজিব।

০৪। কোন কোন বিষয় এমন আছে যা ঈমানের পরিপন্থী হলেও এর দ্বারা ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাওয়া বুঝায় না। [এমতাবস্থায় তাকে অপূর্ণাঙ্গ মুমিন বলা যেতে পারে।]

০৫। ঈমানের একটা স্বাদ আছে। মানুষ কখনো এ স্বাদ অনুভব করতেও পারে, আবার কখনো অনুভব নাও করতে পারে।

০৬। অন্তরের এমন চারটি আমল আছে যা ছাড়া আল্লাহ পাকের বন্ধুত্ব ও নৈকট্য লাভ করা যায় না, ঈমানের স্বাদ ও অনুভব করা যায় না।

০৭। একজন (জলীলুল কদর) সাহাবী দুনিয়ার এ বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব সাধারণতঃ গড়ে উঠে পার্থিব্য বিষয়ের ভিত্তিতে।

০৮। ﴿وَتَقَطَّعَتْ بِهِمُ ٱلْأَسْبَابُ﴾ এর তফসীর।

০৯। মুশরিকদের মধ্যেও এমন লোক রয়েছে যারা আল্লাহকে খুব ভালবাসে। কিন্তু শিরকের কারণে এ ভালবাসা অর্থহীন।

১০। সূরা তাওবার উক্ত আয়াতে উল্লেখিত আটটি জিনিসের ভালবাসা যার অন্তরে স্বীয় দ্বীনের চেয়েও বেশি, তার প্রতি হুঁশিয়ারী উচ্চারণ।

১১। যে ব্যক্তি আল্লাহ পাকের সাথে কাউকে শরিক করে এবং ঐ শরিককে আল্লাহ পাককে ভালবাসার মতই ভালবাসে সে শিরকে আকবার অর্থাৎ বড় ধরণের শিরক করলো।

Page- 4

© Dawah wa Tablig is the proparty of Md. Shamsul Alam since 2013